গুয়াতেমালা: রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এবং গণহত্যার ইতিহাস মুছে ফেলার নিরন্তর অপচেষ্টা

গুয়াতেমালায় মায়া আদিবাসীদের ওপর প্রেসিডেন্ট ইফরাইন রিওস মন্তের প্রশাসনের নির্মম গণহত্যা এবং পরবর্তী সময়ে তা মুছে ফেলার চেষ্টা আধুনিক ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। গুয়াতেমালা ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী গোষ্ঠী—সরকারি কর্মকর্তা, ধর্মীয় নেতা, সাংবাদিক ও সামরিক কর্তাব্যক্তিরা—সুসংগঠিত চক্রান্তের মাধ্যমে বছরের পর বছর ধরে এই ভয়াবহ সত্যকে অস্বীকার করে আসছে। এই সিরিজের পঞ্চম পর্বে সেই ঐতিহাসিক ঘটনা এবং সত্য গোপনের বহুমুখী অপচেষ্টার বিশদ আলোচনা করা হয়েছে।

মায়াদের ওপর গণহত্যা চালানোর অভিযোগে ২০১৩ সালে গুয়াতেমালার আদালত সাবেক প্রেসিডেন্ট রিওস মন্তকে দোষী সাব্যস্ত করার পাশাপাশি সরকারকে ক্ষমা চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তখনই গুয়াতেমালা সিটির রাজপথে দেখা গিয়েছিল গণহত্যার স্বীকৃতি দাবির এমন পোস্টারফাইল ছবি: রয়টার্স

গুয়াতেমালায় মায়া আদিবাসীদের ওপর প্রেসিডেন্ট ইফরাইন রিওস মন্তের প্রশাসনের নির্মম গণহত্যা এবং পরবর্তী সময়ে তা মুছে ফেলার চেষ্টা আধুনিক ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। গুয়াতেমালা ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী গোষ্ঠী—সরকারি কর্মকর্তা, ধর্মীয় নেতা, সাংবাদিক ও সামরিক কর্তাব্যক্তিরা—সুসংগঠিত চক্রান্তের মাধ্যমে বছরের পর বছর ধরে এই ভয়াবহ সত্যকে অস্বীকার করে আসছে।

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, গণহত্যার ঐতিহাসিক পটভূমি এবং কাঠামোগত ভিত্তি

গুয়াতেমালায় ১৯৬০ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ছত্রিশ বছরব্যাপী যে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ চলেছিল, তাতে দুই লাখেরও বেশি মানুষ নিহত বা গুমের শিকার হন। জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘কমিশন ফর হিস্টোরিক্যাল ক্লারিফিকেশন’ (সিইএইচ) এবং ক্যাথলিক চার্চের মানবাধিকার অফিসের বিশদ প্রতিবেদনে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে এই হতাহতদের অন্তত ৮৩ শতাংশই ছিলেন মায়া আদিবাসী। আরও ভয়াবহ তথ্য হলো, এই ব্যাপক নৃশংসতার প্রায় ৯৩ শতাংশই সংঘটিত হয়েছিল গুয়াতেমালা সরকারের সামরিক বাহিনী এবং তাদের আধা সামরিক গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা। বিশেষ করে ১৯৮১ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ইফরাইন রিওস মন্তের শাসনামলে মায়া আদিবাসীদের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং সুপরিকল্পিত গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল।

গুয়াতেমালায় ১৯৮১ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ইফরাইন রিওস মন্তের শাসনামলে মায়া আদিবাসীদের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং সুপরিকল্পিত গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল। এই ব্যাপক নৃশংসতার প্রায় ৯৩ শতাংশই সংঘটিত হয়েছিল সামরিক বাহিনী এবং আধা-সামরিক গোষ্ঠীগুলোর দ্বারা। হতাহতদের ৮৩ শতাংশই ছিলেন মায়া আদিবাসী।

রিওস মন্তের প্রশাসন মায়া জনগোষ্ঠীকে বামপন্থী গেরিলা আন্দোলনের সমর্থক এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। তাদের ভ্রান্ত ও বিদ্বেষপূর্ণ ধারণা ছিল, সাধারণ মায়া পরিবারগুলো গেরিলাদের খাদ্য, বাসস্থান এবং অন্যান্য সামাজিক সহায়তা দেয়। এই ধারণার বশবর্তী হয়ে সামরিক বাহিনী এমন একটি ‘স্কর্চড আর্থ’ বা পোড়ামাটি নীতি গ্রহণ করে, যার মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় মায়া জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বকেই সমূলে ধ্বংস করে দেওয়া। সামরিক বাহিনী ৬২৬টি গ্রামে ভয়াবহ হামলা চালায়, যার মধ্যে ৪৪০টি গ্রাম সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। মানুষের ঘরবাড়ির পাশাপাশি মাঠের ফসল ও গবাদিপশুও পুড়িয়ে বা মেরে ফেলা হয়, যা ছিল তাদের অর্থনৈতিক অস্তিত্বের মূল ভিত্তি।

রিওস মন্তের মাত্র ১৭ মাসের শাসনামলকে (মার্চ ২৩, ১৯৮২ থেকে আগস্ট ৭, ১৯৮৩) গৃহযুদ্ধের সবচেয়ে নিষ্ঠুর সময় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যেখানে গড়ে প্রতি মাসে ১৯টি করে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়েছিল। এই নিধনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল মায়া পরিবারগুলোর প্রজননক্ষমতা ধ্বংস করা, যার অংশ হিসেবে শিশুদের ‘খারাপ বীজ’ আখ্যা দিয়ে ব্যাপকভাবে হত্যা করা হয় এবং অনেক জীবিত মায়া শিশুকে জোরপূর্বক সামরিক পরিবারে হস্তান্তর করা হয়। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয়ভাবে নারীদের ওপর সংঘটিত ব্যাপক ধর্ষণের মর্মান্তিক ঘটনাগুলোকেও সরকার ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করে আসছে।

১৯৮২ সালে রিওস মন্ত অমানবিক রসিকতা করে বলেছিলেন যে তাদের কোনো পোড়ামাটি নীতি নেই, বরং তাদের নীতি হলো “কমিউনিস্টদের পুড়িয়ে মারা”। ২০১৩ সালে যখন রিওস মন্তকে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং ১৫টি হত্যাযজ্ঞে প্রায় ১,৭০০ ইক্সিল মায়া আদিবাসীকে হত্যার অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করা হয়, তখনও তিনি তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন।

রিওস মন্তের চতুরতা এবং প্রকাশ্য অস্বীকৃতি

গণহত্যা চলার সময় থেকে শুরু করে তার বিচারপ্রক্রিয়া পর্যন্ত রিওস মন্ত অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস অস্বীকার করে এসেছেন। গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তিনি বারবার দাবি করেছেন যে তাঁর সামরিক বাহিনী বেসামরিক মায়াদের ওপর কোনো ধরনের পোড়ামাটি নীতি প্রয়োগ করছে না। তিনি বিপুলসংখ্যক প্রাণহানির সম্পূর্ণ দায়ভার আদিবাসী বিদ্রোহীদের ওপর চাপিয়ে দিতেন।
১৯৮২ সালের জুলাই মাসে এক ভাষণে তিনি নির্দয়ভাবে ঘোষণা করেছিলেন, ‘যদি তোমরা আমাদের সঙ্গে থাকো, তবে আমরা তোমাদের খাওয়াব; আর তা না হলে আমরা তোমাদের হত্যা করব।’

একই বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর রিওস মন্ত সাংবাদিকদের সামনে চরম অমানবিক রসিকতা করে বলেছিলেন যে তাদের কোনো পোড়ামাটি নীতি নেই, বরং তাদের নীতি হলো ‘কমিউনিস্টদের পুড়িয়ে মারা’।

২০১৩ সালে আদালতে বিচারের মুখোমুখি হন গুয়াতেমালার সাবেক প্রেসিডেন্ট ইফরাইন রিওস মন্ত
ফাইল ছবি: রয়টার্স

পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালে যখন রিওস মন্তকে মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং ১৫টি হত্যাযজ্ঞে প্রায় ১ হাজার ৭০০ ইক্সিল মায়া আদিবাসীকে হত্যার অভিযোগে গুয়াতেমালা সিটির আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা হয়, তখনো তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন।

বিচারকক্ষে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি জোরালোভাবে দাবি করেন যে তিনি কখনোই কোনো নির্দিষ্ট বর্ণ বা জাতিগোষ্ঠীর ওপর হামলার অনুমোদন বা নির্দেশ দেননি। তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে বলেন, একটি সমগ্র জাতিগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার কোনো ইচ্ছা বা উদ্দেশ্য তাঁর কখনোই ছিল না। তিনি এমনকি এ–ও দাবি করেন যে স্কোয়াড লিডাররা মাঠে কী করেছে, তা রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তাঁর জানা ছিল না।

রিগান প্রশাসনের ন্যক্কারজনক ভূমিকা

গুয়াতেমালায় গণহত্যার অস্বীকৃতির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান এবং তাঁর প্রশাসনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত নেতিবাচক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। রিগান প্রশাসন খুব ভালোভাবে জানত যে গুয়াতেমালার সামরিক বাহিনী মায়া জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে, তা সত্ত্বেও তারা রিওস মন্তকে মিত্র হিসেবে সাদরে গ্রহণ করে এবং দাবি করতে থাকে যে তিনি কমিউনিজমের বিস্তার রোধ করার চেষ্টা করছেন।

১৯৮২ সালের ডিসেম্বরে হন্ডুরাসে এক সাক্ষাতের পর রোনাল্ড রিগান প্রকাশ্যে রিওস মন্তের প্রশংসা করে তাঁকে একজন ‘সৎ ও নিষ্ঠাবান মহান মানুষ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। অথচ এই সাক্ষাতের মাত্র ১০ দিন আগেই মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে গুয়াতেমালার সেনাবাহিনী কর্তৃক বিপুলসংখ্যক আদিবাসী নারী, পুরুষ ও শিশুদের হত্যার একটি সুপ্রতিষ্ঠিত প্রতিবেদন জমা পড়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান
ফাইল ছবি: রয়টার্স

রিগান প্রশাসনের মানবাধিকারবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এলিয়ট আব্রামস বারবার রিওস মন্তের সরকারের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন এবং নির্লজ্জের মতো দাবি করেছেন যে রিওস মন্তের নীতি মানবাধিকার পরিস্থিতির ‘উল্লেখযোগ্য উন্নতি’ সাধন করেছে। মূলত মধ্য আমেরিকায় কমিউনিস্টদের প্রভাব ঠেকানোর রাজনৈতিক বাসনা থেকেই রিগান প্রশাসন গুয়াতেমালার রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে শুধু অস্বীকারই করেনি, বরং মার্কিন দূতাবাস অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে হেয় করে স্মারকলিপি তৈরি করেছিল। সেখানে দাবি করা হয়েছিল যে এই সংস্থাগুলো মূলত বিদ্রোহীদের সমর্থন করছে এবং মার্কিন কংগ্রেসকে যুদ্ধক্ষেত্র বানিয়ে গুয়াতেমালা সরকারকে অস্ত্রবঞ্চিত করার ষড়যন্ত্র করছে। এলিয়ট আব্রামস মানবাধিকারকর্মীদের ‘অজ্ঞ এবং স্বধার্মিক’ বলে জনসমক্ষে অপমান করেছিলেন।

গুয়াতেমালায় গণহত্যার অস্বীকৃতির ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগান এবং তার প্রশাসনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত নেতিবাচক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। রেগান ১৯৮২ সালের ডিসেম্বরে হন্ডুরাসে এক সাক্ষাতের পর রিওস মন্তের প্রশংসা করে তাকে একজন “সৎ ও নিষ্ঠাবান মহান মানুষ” হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।

ধর্মীয় গোষ্ঠী ও রক্ষণশীল গণমাধ্যমের সুকৌশলী সমর্থন

রিওস মন্তের প্রতি সমর্থন এবং গণহত্যার অস্বীকৃতির ক্ষেত্রে গুয়াতেমালা ও যুক্তরাষ্ট্রের ইভাঞ্জেলিক্যাল বা কট্টরপন্থী খ্রিষ্টান গোষ্ঠীগুলোর অন্ধ সমর্থনও একটি বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।

ক্ষমতা দখলের পর রিওস মন্ত একজন ‘বর্ন এগেইন’ খ্রিষ্টান হিসেবে আবির্ভূত হন এবং বিশ্বের প্রথম পেন্টেকোস্টাল রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত ধর্মপ্রচারক প্যাট রবার্টসন ও জেরি ফলওয়েলের সঙ্গে তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। রবার্টসন দুর্নীতিগ্রস্ত অলিগার্কি এবং রাশিয়ার মদদপুষ্ট কমিউনিস্ট স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে রিওস মন্তকে যথার্থ বিকল্প হিসেবে তুলে ধরে তাঁর প্রশংসা করেছিলেন। ইভাঞ্জেলিক্যাল নেতারা রিওস মন্তকে এমন একজন ত্রাতা হিসেবে বিশ্বাস করতেন, যাঁকে ঈশ্বর নিযুক্ত করেছেন গুয়াতেমালাকে কমিউনিজমের হাত থেকে বাঁচাতে। তাঁরা রিওস মন্তের সামরিক অভিযানের জন্য লাখ লাক ডলারের তহবিল সংগ্রহ করেছিলেন এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে কমিউনিস্ট হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের প্রতিবেদনের সত্যতা অস্বীকার করেছিলেন।

রিওস মন্তের বিচার প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক বামপন্থীদের একটি প্রতিশোধমূলক মহড়া এবং “বাস্তবতা থেকে বিচ্যুতি” হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাংবাদিক মেরি আনাস্তাসিয়া ও'গ্র্যাডি। তিনি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীনভাবে দাবি করেছিলেন যে গুয়াতেমালা রাষ্ট্র কর্তৃক ইক্সিল আদিবাসীদের ধ্বংস করার কোনো বাস্তব সত্যতা নেই, বরং রিওস মন্ত তাদের বামপন্থী বিপ্লবের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করেছিলেন।

মার্কিন রক্ষণশীল গণমাধ্যমও এই রাষ্ট্রীয় অস্বীকৃতির পালে হাওয়া জুগিয়েছে। রিওস মন্তের বিচারপ্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক বামপন্থীদের একটি প্রতিশোধমূলক মহড়া এবং ‘বাস্তবতা থেকে বিচ্যুতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাংবাদিক মেরি আনাস্তাসিয়া ও’গ্র্যাডি। তিনি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীনভাবে দাবি করেছিলেন যে গুয়াতেমালা রাষ্ট্র কর্তৃক ইক্সিল আদিবাসীদের ধ্বংস করার কোনো বাস্তব সত্যতা নেই, বরং রিওস মন্ত তাঁদের বামপন্থী বিপ্লবের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করেছিলেন।

প্রথম আলো ইনফোগ্রাফিকস

প্রাতিষ্ঠানিক অস্বীকৃতি, আইনি বাধা ও স্থায়ী দায়মুক্তির অপচেষ্টা

গুয়াতেমালার রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোও পদ্ধতিগতভাবে এই ইতিহাস মুছে ফেলার নিরন্তর চেষ্টা করেছে। সামরিক বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তারা, যাঁরা এই গণহত্যার সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তাঁরা নিজেদের সম্ভাব্য বিচার এড়াতে এবং সামরিক বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষায় ‘ন্যাশনাল কনভারজেন্স ফ্রন্ট’ (এফসিএন) নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। সামরিক প্রবীণদের সংগঠন অ্যাভেমিগুয়া (AVEMIGUA) হাস্যকরভাবে দাবি করেছিল যে গণকবরগুলোতে প্রাপ্ত মৃতদেহগুলো মূলত ভূমিকম্পের কারণে মারা যাওয়া মানুষদের, যা ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের কাছে চরম উপহাস বলে গণ্য হয়েছে। গুয়াতেমালার সাবেক প্রেসিডেন্ট অটো পেরেজ মোলিনা, যিনি নিজেও সেই সময়ে একজন সেনা জেনারেল হিসেবে ওই অঞ্চলে নিযুক্ত ছিলেন, প্রকাশ্যেই ঘোষণা করেছিলেন যে গুয়াতেমালায় কোনো গণহত্যা হয়নি।

১৯৮২ সালে গণকবরের পুঁতে রাখা নিহতদের কফিন তুলে নিয়ে যাচ্ছেন মায়া আদিবাসী গোষ্ঠীর মানুষ
ফাইল ছবি: রয়টার্স

প্রাতিষ্ঠানিক অস্বীকৃতির সবচেয়ে চরম রূপ দেখা যায় ২০১৪ সালের ১৪ মে, যখন গুয়াতেমালার কংগ্রেস একটি নন-বাইন্ডিং প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়, যেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করা হয় যে দেশের ভূখণ্ডে কখনোই কোনো গণহত্যা সংঘটিত হয়নি। ১৫৮ জন আইনপ্রণেতার মধ্যে ৮৭ জন এই নির্লজ্জ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন, যা আদিবাসী সম্প্রদায় ও মানবাধিকারকর্মীদের চরমভাবে ক্ষুব্ধ করেছিল।
পরবর্তী সময়ে গুয়াতেমালার আইনপ্রণেতারা গৃহযুদ্ধ চলাকালীন যুদ্ধাপরাধে জড়িত সেনা ও পুলিশ সদস্যদের সাধারণ ক্ষমা বা অ্যামনেস্টি প্রদানেরও একাধিক চেষ্টা চালান, যার সর্বশেষ অপচেষ্টাটি ছিল ২০১৯ সালের শরতে। এটি মূলত ১৯৯৬ সালের আইন বাতিল করে গণহত্যার অপরাধীদের স্থায়ী দায়মুক্তি দেওয়ারই একটি সুকৌশল।

সত্য উন্মোচনের পথে সাহিত্য, গবেষণা ও আত্মত্যাগ

রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক বাধা সত্ত্বেও গুয়াতেমালার গণহত্যার প্রকৃত ইতিহাস এবং এর ভয়াবহতা উন্মোচনে বেশ কয়েকটি প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘কমিশন ফর হিস্টোরিক্যাল ক্লারিফিকেশন’ (সিইএইচ)-এর বিশদ প্রতিবেদন, যা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে রিওস মন্তের শাসনামলে মায়া আদিবাসীদের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল।

এ ছাড়া ক্যাথলিক চার্চের মানবাধিকার অফিসের উদ্যোগে পরিচালিত ‘রিকভারি অব দ্য হিস্টোরিক্যাল মেমোরি প্রজেক্ট’ ১৯৯৮ সালে প্রকাশ করে তাদের যুগান্তকারী প্রতিবেদন ‘গুয়াতেমালা: নেভার এগেইন!’ (Guatemala: Nunca Mas!)।এই প্রতিবেদনে সহিংসতার শিকার গোষ্ঠী, অপরাধী, নৃশংসতার ধরন এবং কীভাবে শত শত আদিবাসী গ্রাম ধ্বংস করা হয়েছিল, তার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়।

২০১৪ সালের ১৪ মে, যখন গুয়াতেমালার কংগ্রেস একটি নন-বাইন্ডিং প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয়, যেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করা হয় যে দেশের ভূখণ্ডে কখনোই কোনো গণহত্যা সংঘটিত হয়নি। ১৫৮ জন আইনপ্রণেতার মধ্যে ৮৭ জন এই নির্লজ্জ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন, যা আদিবাসী সম্প্রদায় এবং মানবাধিকার কর্মীদের চরমভাবে ক্ষুব্ধ করেছিল।

গবেষক ভিক্টোরিয়া স্যানফোর্ড তাঁর ‘বারিড সিক্রেটস: ট্রুথ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস ইন গুয়াতেমালা’ গ্রন্থে সামরিক কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে এই হত্যাযজ্ঞ এবং তা অস্বীকার করার সামরিক অপচেষ্টার চিত্র তুলে ধরেন। প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা পামেলা ইয়েটস ১৯৮২ সালে রিওস মন্তের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন, যা সেই সময়ের রাষ্ট্রীয় মনোভাব বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

তবে এই সত্য উন্মোচনের পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। ক্যাথলিক চার্চ যখন তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তার মাত্র দুই দিনের মাথায় বিশপ হুয়ান জেরার্ডিকে কংক্রিটের ব্লক দিয়ে মাথা থেঁতলে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পরবর্তী সময়ে প্রমাণিত হয় যে সামরিক নেতৃত্বই এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দিয়েছিল, যাতে যুদ্ধাপরাধের বিচার ঠেকানো যায়।

২০১৩ সালে গুয়াতেমালার আদালত গণহত্যার জন্য দোষি সাব্যস্ত করে সাবেক প্রেসিডেন্ট রিওস মন্তকে ৫০ বছর কারাদণ্ডের রায় দেওয়ার সময় মায়া আদিবাসী গোষ্ঠীর মানুষরা ছিলেন আদালতে। রায়ের পর তাঁরা কান্নায় ভেঙে পড়েন
ফাইল ছবি: রয়টার্স

অস্বীকৃতির ভয়াবহ পরিণতি এবং সত্যের অবিচলতা

গুয়াতেমালার এই সুপরিকল্পিত অস্বীকৃতির পরিণতি সমাজের জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ হয়েছে। কারণ,  গণহত্যার এই প্রাতিষ্ঠানিক অস্বীকৃতি সমাজের গভীরে মারাত্মক বিভাজন সৃষ্টি করে এবং সত্যিকারের পুনর্মিলনের আশাকে নস্যাৎ করে দেয়। এটি অপরাধীদের জন্য বিচারহীনতার এমন এক ভয়ংকর সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করে, যা ভবিষ্যতের সরকারগুলোকেও সমজাতীয় ধ্বংসাত্মক ও অমানবিক অপরাধ করতে উৎসাহিত করতে পারে।

১৯৯৯ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘের পৃষ্ঠপোষকতায় “কমিশন ফর হিস্টোরিক্যাল ক্লারিফিকেশন” (সিইএইচ)-এর বিশদ প্রতিবেদন, যা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে রিওস মন্তের শাসনামলে মায়া আদিবাসীদের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল।

তা সত্ত্বেও, গুয়াতেমালায় সংঘটিত মায়া আদিবাসীদের গণহত্যার এই রাষ্ট্রীয় অস্বীকৃতি শেষবিচারে একটি নিরর্থক প্রচেষ্টা বা ‘ফুল’স এরান্ড’। এর পেছনে সামরিক কর্মকর্তা, ডানপন্থী রাজনীতিবিদ, ধর্মীয় উগ্রবাদ এবং আন্তর্জাতিক মিত্রদের একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক কাজ করলেও জাতিসংঘ কমিশন এবং ক্যাথলিক চার্চের সংগৃহীত বিশদ নথিপত্র অকাট্য দলিল হিসেবে ইতিহাসে চিরকাল সংরক্ষিত থাকবে। ক্ষতিগ্রস্ত আদিবাসী সম্প্রদায় এবং সাহসী মানবাধিকারকর্মীদের নিরলস সংগ্রামের ফলে এই ভয়াবহ গণহত্যার প্রকৃত ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতাশালীদের স্বৈরতান্ত্রিক অস্বীকৃতির মিথ্যাচারকে নিশ্চিতভাবেই পরাজিত করবে।