জাতিসংঘ কি টিকে থাকতে পারবে

জাতিসংঘ দিবস আজ ২৪ অক্টোবর। ১৯৪৫ সালের এই দিনে জাতিসংঘের সনদ কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে বিশ্ব সংস্থাটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা ও লিগ অব নেশনসের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ সংস্থাটির অস্তিত্ব টেকানো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জাতিসংঘফাইল ছবি

সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল জাতিসংঘ। কিন্তু আট দশকের বেশি সময়ের পথচলায় বিশ্ব সংস্থাটি আজ গভীর সংকট ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নের মুখে। যুদ্ধ বন্ধে ব্যর্থতা, ভূরাজনৈতিক বিভাজন, জলবায়ুসংকট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো নতুন চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি বড় শক্তিগুলোর স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণে জাতিসংঘের ভূমিকা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে।

এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ উদ্যোগকে জাতিসংঘের বিকল্প হিসেবে দেখার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার যে মহৎ প্রত্যাশা নিয়ে জাতিসংঘের যাত্রা শুরু হয়েছিল, ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রাক্কালে সেই স্বপ্ন ও বাস্তবতার ব্যবধানই সামনে আসছে আরও স্পষ্টভাবে।

ফিরে যাওয়া যাক ১৯৪৫ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের ৩২তম প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের মৃত্যুর ঠিক চার দিন পর, ১৯৪৫ সালের ১৬ এপ্রিল বিকেলে কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে ভাষণ দেন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান। ১২ বছরের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে স্মরণ করার পাশাপাশি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ বিজয় ছিনিয়ে এনে তাঁর স্মৃতিকে সম্মান জানানোর জন্য তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।

তবে ট্রুম্যান একই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেন, কেবল জার্মানি ও জাপানকে পরাজিত করাই যথেষ্ট নয়; বরং এক সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলার নেতৃত্বেও যুক্তরাষ্ট্রকে সামনে থাকতে হবে। এমন এক বিশ্ব, যেখানে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ ও গণনৃশংসতা শুরুতেই থামিয়ে দেওয়া সম্ভব।

১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর কার্যকর হয় জাতিসংঘ সনদ। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় সংস্থাটির কাঠামো, মূলনীতি ও লক্ষ্যের। নতুন এই বিশ্ব সংস্থা গঠন ছিল তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের বহু বছরের প্রচেষ্টার ফসল। অবশ্য সংস্থাটি আলোর মুখ দেখার ছয় মাস আগেই মারা যান তিনি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর গঠিত ‘লিগ অব নেশনস’-এর ব্যর্থতাকে কাটিয়ে ওঠাই ছিল রুজভেল্টের মূল উদ্দেশ্য। তিনি আন্তর্জাতিক এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যা বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা, বন্ধুভাবাপন্ন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বজায় রাখা এবং বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, মানবিক ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক সমস্যাগুলোর সমাধানে সমন্বিত পদক্ষেপ নিশ্চিত করবে।

যদিও রুজভেল্টের সেই সুদূরপ্রসারী ও মহৎ স্বপ্নের সবটুকু জাতিসংঘ বাস্তবায়ন করতে পারেনি; তবু আন্তর্জাতিক আলোচনার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে, অসংখ্য শান্তি রক্ষা মিশনের মাধ্যমে এবং বহুমুখী মানবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে সংস্থাটির সূচনা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় সাফল্য বলে গণ্য হয়।

লিগ অব নেশনসের ব্যর্থতা

জাতিসংঘের জন্ম মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঠেকাতে লিগ অব নেশনসের ব্যর্থতারই ফল। লিগ অব নেশনস ছিল তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের প্রিয় এক ভাবনা। ১৯১৯ সালের প্যারিস শান্তি সম্মেলনে তিনি সংশয়ী মিত্র নেতাদের একটি যৌথ নিরাপত্তা সংস্থা গঠনের বিষয়ে রাজি করাতে সক্ষম হন।

এই সংস্থার উদ্দেশ্য ছিল—সদস্যদেশগুলো একত্র হয়ে কোনো আগ্রাসী শক্তিকে দমন করবে এবং প্রয়োজনে পরাজিত করবে। তবে উইলসন নিজ দেশের জনগণকে তাঁর এই ভাবনার গুরুত্ব বোঝাতে ব্যর্থ হন। মার্কিন সিনেট দুই দফা ভার্সাই চুক্তি বাতিল করে, আর এর সঙ্গেই ভেস্তে যায় লিগে যোগ দেওয়ার সুযোগ।

যুক্তরাষ্ট্রের অনুপস্থিতি, কোনো সিদ্ধান্তের জন্য সব সদস্যের সর্বসম্মত অনুমতির বাধ্যবাধকতা, আগ্রাসীদের শাস্তির কার্যকর ব্যবস্থার অভাব এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তার চেয়ে নিজ নিজ স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার নীতিনির্ধারণী মনোভাব শেষ পর্যন্ত লিগ অব নেশনসকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। ১৯৩০-এর দশকে জার্মানি, ইতালি ও জাপানের সামরিক আগ্রাসন থামাতে একেবারেই ব্যর্থ হয় এই সংস্থা।

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন
ছবি: রয়টার্স

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও জাতিসংঘের উৎস

১৯৪১ সালের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেওয়ার পর অক্ষশক্তি-বিরোধী জোটের নেতারা নিজেদের ‘ইউনাইটেড নেশনস’ বা জাতিসংঘ হিসেবে উল্লেখ করতে শুরু করেন। ১৯৪৩ সালের শেষের দিকে ইরানের তেহরানে প্রথম প্রধান শীর্ষ সম্মেলন শেষে রুজভেল্ট, যুক্তরাজ্যের উইনস্টন চার্চিল ও সোভিয়েত ইউনিয়নের জোসেফ স্টালিন যৌথ উদ্দেশ্যের ওপর একটি ঘোষণা জারি করেন।

জার্মানি ও জাপানকে পরাজিত করার পাশাপাশি জাতিসংঘের এই তিন নেতা শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলেন, যা বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের সদিচ্ছা অর্জন করবে।

তেহরান সম্মেলনে স্টালিনের সঙ্গে এক ব্যক্তিগত বৈঠকে রুজভেল্ট লিগ অব নেশনসের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠনের পরিকল্পনা তুলে ধরেন, যার মাধ্যমে লিগের ব্যর্থতাগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ওই ব্যবস্থাটিকে ‘দ্য ফোর পুলিশমেন’ বা চার পুলিশ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এটি যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, গ্রেট ব্রিটেন ও চীনকে নিয়ে গঠিত হওয়ার কথা ছিল।

শান্তির প্রতি যেকোনো হুমকি এবং আকস্মিক জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা এই সংস্থার থাকবে বলে বলা হয়। যদিও লিগ অব নেশনসের কোনো কার্যকর প্রশাসনিক ক্ষমতার অভাবের মতো প্রাণঘাতী ত্রুটি দূর করার দিক থেকে এই প্রস্তাবের সুবিধা ছিল, তবু নতুন এই আন্তর্জাতিক সংস্থায় কার হাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা ও প্রভাব থাকবে, তা নিয়ে এক জটিল প্রশ্ন দেখা দেয়।

লিগ অব নেশনসের জায়গায় একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠনের কাঠামো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয় ১৯৪৪ সালের ২১ আগস্ট থেকে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত, ওয়াশিংটন ডিসির জর্জটাউনের ডুমবার্টন ওকস নামের একটি এস্টেটে। সম্মেলন শেষের দুদিন পর মার্কিন কর্মকর্তারা একটি সাধারণ আন্তর্জাতিক সংস্থা–সংক্রান্ত প্রস্তাবের প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।

এর লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা, জাতিগুলোর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা; অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অন্যান্য মানবিক সমস্যার সমাধানে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অর্জন করা এবং এই সাধারণ লক্ষ্যগুলো অর্জনে জাতিগুলোর পদক্ষেপের মধ্যে সামঞ্জস্য আনার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করা।

এই চূড়ান্ত রূপরেখাটি এর প্রায় এক বছর আগে তেহরান সম্মেলনে স্টালিনের কাছে রুজভেল্টের পেশ করা পরিকল্পনার সঙ্গে অনেকাংশে মিলে যায়। নতুন এই সংস্থা শান্তিকামী সব রাষ্ট্রের জন্য উন্মুক্ত থাকার কথা ছিল। এতে একটি সাধারণ পরিষদ (সব সদস্যদেশ নিয়ে গঠিত) এবং একটি নিরাপত্তা পরিষদসহ কয়েকটি প্রধান অঙ্গ থাকার প্রস্তাব করা হয়। নিরাপত্তা পরিষদে প্রধান মিত্রদেশ—যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, চীন ও ফ্রান্সের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত থাকার কথা বলা হয়।

১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইয়াল্টা সম্মেলনে মিত্রশক্তির নেতারা আবার তাঁদের জোটের প্রাতিষ্ঠানিক নাম ‘ইউনাইটেড নেশনস’ বা ‘জাতিসংঘ’ রেখে একটি নতুন আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠনের দাবি জানান। সেই বৈঠকে তিন প্রধান মিত্রশক্তির নেতা—রুজভেল্ট, চার্চিল ও স্টালিন উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলন শেষে দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, তিন মিত্রনেতা শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে আমাদের মিত্রদের নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব একটি সাধারণ আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠনে সম্মত হয়েছেন। কথিত বিগ থ্রি দুই মাস পর, ২৫ এপ্রিল সান ফ্রান্সিসকোতে নতুন সংস্থার সনদ তৈরির জন্য একটি সম্মেলন আহ্বানের অঙ্গীকার করেন।

১৯৪৫ সালের ২৬ এপ্রিল সান ফ্রান্সিসকোয় ‘ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন’-এ ৫০টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। তবে সম্মেলনটি শুরু হয় বিষাদের মধ্য দিয়ে। যাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রচেষ্টায় এই বিশ্ব সম্মেলন বাস্তবায়িত হয়েছিল, সেই ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট ঠিক দুই সপ্তাহ আগে মারা যান। দুই মাস ধরে প্রতিনিধিরা ডুমবার্টন ওকসে ছাঁচ তৈরি করা চুক্তির ধারাগুলোকে পরিমার্জিত করেন।

সদস্যপদ গ্রহণ এবং জাতিসংঘের এখতিয়ারের সীমা নিয়ে ঝুলে থাকা সংকটগুলোর সমাধান করা হয়। সান ফ্রান্সিসকো সম্মেলন চলে দুই মাস ধরে। প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক সংস্থার কাঠামো নিয়ে সেখানে তীব্র বিতর্ক হয়। ক্ষমতাধর নিরাপত্তা পরিষদের গঠন এবং এর সদস্যদেশগুলোকে দেওয়া ক্ষমতাসহ নানা বিষয়ে প্রতিনিধিরা বিতর্ক চালান। জার্মানির বিরুদ্ধে যৌথ বিজয় সত্ত্বেও, যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে তৈরি হতে থাকা উত্তেজনা এই আলোচনাকে জটিল করে তোলে। নতুন বিশ্ব সংস্থা গঠনের ক্ষেত্রে একে অপরের উদ্দেশ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত কর্মকর্তাদের মধ্যে সন্দেহ বাড়তে থাকে।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস
ছবি: রয়টার্স

প্রচুর বিতর্ক ও আপসের পর ১৯৪৫ সালের ২৫ জুন প্রতিনিধিরা সর্বসম্মতিক্রমে জাতিসংঘের নতুন সনদ অনুমোদন করেন। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস পরের দিন প্রতিবেদন করেছিল, ওয়ার মেমোরিয়াল অপেরা হাউসে তিন হাজারের বেশি মানুষ এক মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে হাততালি দেন।

সান ফ্রান্সিসকো সম্মেলন শেষ হওয়ার এক সপ্তাহ পর, ট্রুম্যান নিজে ক্যাপিটল হিলে গিয়ে সিনেটকে জাতিসংঘ সনদ চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য অনুরোধ জানান। সিনেটের সাবেক সহকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এই সনদ এমন এক বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত, যেখানে একটি প্রজন্ম দু-দুবার বৈশ্বিক শান্তি বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার শিক্ষাই লেখা রয়েছে এই নথিতে।

ট্রুম্যান কিন্তু উড্রো উইলসনের মতো ব্যর্থতার মুখে পড়েননি। রুজভেল্টের বিচক্ষণতা ও সনদ তৈরির প্রতিটি ধাপে কংগ্রেসকে যুক্ত রাখার কৌশল বাস্তবে বড় ইতিবাচক ফল দেয়। সিনেট ও যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের মধ্যে জাতিসংঘ তৈরির বিষয়ে ব্যাপক উৎসাহ তৈরি হয়েছিল। ১৯৪৫ সালের ২৮ জুলাই সিনেটে ৮৯-২ ভোটে সনদটি অনুমোদিত হয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও বেশ দ্রুতই সনদটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। অবশেষে ২৯টি দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে অনুস্বাক্ষর করার পর ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর বিশ্বমঞ্চে আনুষ্ঠানিকভাবে পথচলা শুরু করে ‘জাতিসংঘ’।

জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার উত্তরাধিকার: ব্যর্থতা ও সাফল্যের কথা

জাতিসংঘের উত্থান বৈশ্বিক রাজনীতিকে পাল্টে দিয়েছিল। তবে এর প্রতিষ্ঠাতারা যতটা আশা করেছিলেন, ঠিক ততটা পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি। সংঘাত প্রতিরোধ ও তা নিরসনে সংস্থাটির সাফল্য খুব একটা মসৃণ নয়। যেসব কারণে লিগ অব নেশনস ব্যর্থ হয়েছিল, ঠিক একই সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই জাতিসংঘের পক্ষে বিশ্বজুড়ে পূর্ণ শান্তি বা যৌথ নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

বাধ্য করার মতো কার্যকর ক্ষমতার অভাব, সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বা আসল আগ্রাসীকে চিহ্নিত করতে রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক দ্বিমত এবং নিজস্ব সীমানা থেকে দূরে কোনো স্থানে সংঘাত হলে হস্তক্ষেপ না করার মানসিকতা জাতিসংঘকেও প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত করেছে।

অন্যদিকে প্রতিষ্ঠাকালীন বড় শক্তিগুলোর সমঝোতায় নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভেটো ক্ষমতা সনদে অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে জাতিসংঘের বড় সাফল্যগুলো মূলত দেখা যায় ছোট আকারের আঞ্চলিক সংঘাতগুলোতে, যেখানে ভেটো পাওয়ার থাকা বড় শক্তিগুলোর তেমন কায়েমি স্বার্থ নেই অথবা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো নিজেরাই যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে ও শান্তি ফিরিয়ে আনতে জাতিসংঘের সাহায্য চায়।

অবশ্য অন্যদিকে শিশুদের মৃত্যুর হার কমানো, গুটিবসন্ত নির্মূল করা, দুস্থ ও দুর্ভিক্ষপীড়িত লাখ লাখ মানুষকে অন্নসংস্থান দেওয়া এবং বিশ্বজুড়ে মানবাধিকারকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের বিশেষায়িত অঙ্গসংগঠনগুলোর সাফল্য অসাধারণ। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জাতিসংঘ কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ধরন বদলে দিয়েছে। ছোট-বড় সব রাষ্ট্রের জন্যই এটি এমন এক উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক মঞ্চ, যেখানে নীতিগতভাবে প্রতিটি দেশ সমান এবং নিজেদের কথা বৈশ্বিক দরবারে তুলে ধরার অধিকার রাখে। প্রকৃতপক্ষে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান ও বিশ্বশান্তির দাবি জানানোর জন্য বিশ্বজুড়ে প্রতিটি দেশের কাছে জাতিসংঘই আজও একমাত্র নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা

জাতিসংঘে যোগ দেওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত ছিল তাদের আগের বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতি থেকে বেরিয়ে আসার এক পদক্ষেপ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র যেমন লিগ অব নেশনসে যোগ দিতে অস্বীকার করেছিল, এবার বিষয়টি তেমন ঘটেনি। নতুন উদীয়মান পরাশক্তি হিসেবে তারা নবগঠিত জাতিসংঘে যোগ দেয় এবং আজ পর্যন্ত এর সদর দপ্তর নিউইয়র্ক শহরেই রয়ে গেছে। ইতিহাসবিদ রবার্ট ডিভাইনের ভাষায়, এটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বমঞ্চে নিজেদের ভূমিকা পূর্ণাঙ্গভাবে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রবাসীর জন্য ‘দ্বিতীয় সুযোগ’।

বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘নিজস্ব জাতিসংঘ’ গড়তে চাচ্ছেন। তিনি সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, বিশ্বের সমস্যাগুলো মোকাবিলায় জাতিসংঘ যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তিনি চান, তাঁর গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’ (শান্তি পর্ষদ) এই দায়িত্ব গ্রহণ করুক।

নিরাপত্তা পরিষদ গত বছরের ১৭ নভেম্বর এ–সংক্রান্ত প্রস্তাব গ্রহণ করে। এতে গাজা সংঘাত-পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় ‘বোর্ড অব পিস’-এর ভূমিকার কথা বলা হয় এবং একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসনিক কাঠামোকে স্বাগত জানানো হয়। ২২ জানুয়ারি ২০২৬ সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ট্রাম্প বোর্ডটির সনদ অনুমোদন করেন। হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে গাজায় শান্তি, পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতার কথা বলা হয়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
ছবি: রয়টার্স

সম্প্রতি ওয়াশিংটনে অবস্থিত ইউনাইটেড স্টেটস ইনস্টিটিউট অব পিসের সাবেক কার্যালয়ে কাজ শুরু করেছে সংস্থাটি। ভবনটির কার্যক্রম গত বছর বন্ধ করে দিয়ে ট্রাম্পের নামে নামকরণ করা হয়। তবে বোর্ড অব পিসের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, জাতিসংঘের সঙ্গে তাঁদের সহযোগিতা সুবিন্যস্ত করা হয়েছে; যা ত্রাণ বিতরণে জাতিসংঘ যেসব বাধার মুখোমুখি হয়েছিল তা দূর করে আরও কার্যকারিতা বাড়াবে।

গত জানুয়ারিতে গৃহীত সনদ অনুযায়ী নিজেকে বোর্ড অব পিসের আজীবন চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করেন ট্রাম্প। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ গত বছর এই বোর্ড গঠনের অনুমোদন দেয়। তবে ট্রাম্প নিজেকে আজীবন চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা করা এবং গাজার বাইরেও বোর্ডের পরিধি বৃদ্ধি করায় বেশির ভাগ দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এতে যোগ দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে।

এ পর্যন্ত ২৮টি দেশ বোর্ডে যোগ দিয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে ‘বোর্ড অব পিস’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সদস্য ও অ-সদস্য দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে বড়াই করেছিলেন ট্রাম্প—যার কিছু কিছু এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য খ্যাত নরওয়ে বোর্ড অব পিসকে একত্র করে একটি আয়োজনের আয়োজক হতে সম্মত হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, এশিয়ার একাধিক দেশকে নিয়ে অনুদান সংগ্রহের একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ জাপান।

ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘চীন এতে যুক্ত হতে যাচ্ছে এবং আমি মনে করি রাশিয়াও এতে যুক্ত হবে।’ এর কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি এবং নতুন কোনো দেশ সনদে স্বাক্ষর করেনি। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ যে বোর্ড অনুমোদন করেছিল, ট্রাম্প সেটিকে অন্য রূপ দেওয়ার ফলে সৃষ্ট সীমাবদ্ধতাই এতে প্রকাশ পেয়েছে।

জাতিসংঘের সংস্কার দাবি

এবার জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের মূল সুরটি ছিল সংস্কার ঘিরে। নিরাপত্তা পরিষদ সংস্কার অধিবেশনের গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল। এটি নতুন কোনো দাবি নয়; নেহরু থেকে নক্রুমা, নিয়েরেরে থেকে ম্যান্ডেলা—সবাই এই দাবি তুলে গেছেন। তবে এটি এখন নতুন ও তীব্র রূপ ধারণ করেছে। কারণ, বৈশ্বিক ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ এখন বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার হিসাবের সঙ্গে আর মিলছে না।

১৪০ কোটির বেশি মানুষের বসতি নিয়ে আফ্রিকা বিশ্বের দ্বিতীয় জনবহুল মহাদেশ এবং খুব দ্রুতই এটি পৃথিবীর সর্ববৃহৎ কর্মক্ষম জনসংখ্যার অধিকারী হতে চলেছে। একইভাবে বাদ পড়ে আছে ৬৫ কোটি মানুষের লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল। মধ্যপ্রাচ্যেরও কোনো স্থায়ী কণ্ঠস্বর নেই। নিরাপত্তা পরিষদ আজও ১৯৪৫ সালের কাঠামোতেই অবরুদ্ধ হয়ে আছে।

পরিষদটি আসলে কী, তা মনে রাখা প্রয়োজন। ১৫টি দেশ সেই টেবিলে বসে। পাঁচটি দেশ স্থায়ী আসন ও ভেটো ক্ষমতার অধিকারী। বাকি ১০টি অস্থায়ী সদস্যদেশ অঞ্চলভিত্তিক বিন্যাসের মাধ্যমে দুই বছরের মেয়াদে সাধারণ পরিষদ দ্বারা নির্বাচিত হয়, যাদের কোনো সিদ্ধান্ত ঠেকানোর মতো কোনো ক্ষমতা নেই।

জাতিসংঘের সংস্কারের দাবিটি তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমটি হলো জনমিতি। দ্বিতীয়টি হলো সমতা। পরিষদের সিদ্ধান্তগুলো প্রতিটি সদস্যদেশের জন্য বাধ্যতামূলক। অথচ বিপুলসংখ্যক সদস্যের এই সিদ্ধান্তগুলো তৈরিতে কোনো স্থায়ী কণ্ঠস্বর নেই। মানবতার ও উৎপাদনের সংকুচিত অংশীদারত্ব ধারণ করে এমন পাঁচটি দেশ কেন সবার হয়ে সিদ্ধান্ত নেবে?

যে আফ্রিকা পরিষদ কর্তৃক আলোচিত সংঘাতগুলোর সবচেয়ে ভারী বোঝা বহন করে, সেই আফ্রিকাকে কেন এমন একটি টেবিলে আসন দেওয়া হবে না, যেখানে এগুলো নিয়ে আলোচনা হয়? তৃতীয়টি হলো কার্যকারিতা। ব্যর্থতার কারণে যে পরিষদের বৈধতা তলানিতে ঠেকেছে, তা আর দৃঢ়ভাবে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না।

গ্লোবাল সাউথ বা গ্লোবাল সাউথের নতুন স্থায়ী সদস্যরা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও নতুন শক্তি নিয়ে আসবে এবং যেকোনো একক শক্তির পক্ষে বিশ্বকে স্থবির করে রাখা কঠিন করে তুলবে।

অস্তিত্বের সংকট

বিশ্বের বড় পরাশক্তিগুলো নিজেদের মতো চলতে থাকায় তাদের কাছে সাধারণ পরিষদের গ্রহণযোগ্যতা বা প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখাই হয়তো এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস স্বীকার করেছেন, জাতিসংঘ বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। এর একটি হচ্ছে আর্থিক। জাতিসংঘের সংকট শুধু রাজনৈতিক বিভাজন কিংবা যুদ্ধ বন্ধে ব্যর্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; আর্থিক চাপও সংস্থাটির কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করেছিলেন, সদস্যদেশগুলোর বকেয়া চাঁদা ও আর্থিক বিধির সীমাবদ্ধতার কারণে জাতিসংঘ জুলাইয়ের মধ্যেই নগদ অর্থসংকটে পড়তে পারে। পরে ৩০ জুন সাধারণ পরিষদ আর্থিক বিধি সংস্কারের সিদ্ধান্ত নেয়, যা তাৎক্ষণিক আর্থিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা কমায়। তবে সদস্যদেশগুলোর নিয়মিত ও পূর্ণাঙ্গ চাঁদা পরিশোধ না করার সমস্যা এখনো রয়ে গেছে।

চলমান বড় সংঘাতগুলো নিরসনহীন বলেই মনে হচ্ছে; সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে নিজেদের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করতে পারছে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ পরিষদের সদস্যদেশগুলো এই মঞ্চে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে নতুন কোনো ব্যবস্থা তৈরি এবং তাদের উদ্বেগের কথাগুলো তুলে ধরতে নতুন একজন মহাসচিব খুঁজছে। জাতিসংঘের নিজস্ব বিশেষজ্ঞরাই যেখানে গাজায় গণহত্যা চলছে বলে উল্লেখ করেছেন, সেখানে তা থামাতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ উঠেছে সংস্থাটির বিরুদ্ধে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জাতিসংঘ বিষয়ক প্রধান ড্যানিয়েল ফোর্টি বলেছেন, বিশ্বনেতাদের বেশির ভাগই মনে করেন না, সাধারণ পরিষদ খুব ভালো অবস্থায় রয়েছে। তা সত্ত্বেও অনেকে এখনো এই মঞ্চের শক্তিকে উপলব্ধি করতে পারেন।

ফোর্টি বলেন, ক্ষুদ্র রাষ্ট্র, মধ্যম সারির পরাশক্তি, এমনকি বড় বড় শক্তির গুটিকয় নেতাসহ বেশির ভাগ নেতাই স্বীকার করেন, জাতিসংঘ একটি বৈশ্বিক আলোচনার মঞ্চ হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইরানকে ঘিরে চলমান বহুল আলোচিত যুদ্ধ থেকে শুরু করে সুদান ও মিয়ানমারে প্রায়ই উপেক্ষিত থাকা মানবিক বিপর্যয়—একের পর এক নানা সংঘাত সামাল দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে জাতিসংঘ।

জাতিসংঘের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ মিশনের ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে ইউক্রেনে বেসামরিক নাগরিক নিহত ও আহত হওয়ার মোট সংখ্যা ২০২৫ সালের পুরো বছরের মোট সংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি–আগস্টে ২ হাজার ২২২ জন নিহত এবং ১৩ হাজার ৫৮ জন আহত হন। এমনকি ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলোও এখন সংঘাত তাদের দেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছে।

ইরাসমাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ওয়েলথের চেয়ার ও ইতিহাস বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আলানা ওম্যালি বলেন, ‘ইউক্রেন থেকে গাজা, সুদান এবং এখন ইরানে যা ঘটছে—সব ক্ষেত্রেই ভেটোসংক্রান্ত সমস্যাটি জাতিসংঘকে পঙ্গু করে রেখেছে।’

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, এই সংঘাতগুলোর কারণে বিশ্বজুড়ে খাদ্যের অভাব, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিসহ বেশ কিছু তীব্র মানবিক সংকট তৈরি হচ্ছে।

ফোর্টি জানান, এ ধরনের সংঘাতে জড়িত পক্ষগুলোর জন্য সাধারণ পরিষদ কিছু আলোচনার সুযোগ তৈরি করে দেবে সত্যি, তবে বড় কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা তাদের কম।

প্রতিষ্ঠার আট দশক পেরিয়ে জাতিসংঘ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে রয়েছে মানবিক সহায়তা, স্বাস্থ্য ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় তার দীর্ঘ অর্জন; অন্যদিকে পরাশক্তিগুলোর দ্বন্দ্ব, ভেটো-অচলাবস্থা ও আর্থিক সংকট।

বিশ্ব সংস্থার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হলেও সব দেশের প্রতিনিধিত্বে বৈশ্বিক সমস্যা নিয়ে আলোচনার এমন বিস্তৃত মঞ্চ এখনো নেই। জাতিসংঘের ভবিষ্যৎ তাই নির্ভর করছে শুধু তার নিজস্ব সংস্কারের ওপর নয়, সদস্যদেশগুলো আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও যৌথ দায়িত্ব পালনে কতটা আন্তরিক হয়, তার ওপরও।

তথ্যসূত্র: আল–জাজিরা, ক্রাইসিস গ্রুপ, কাউন্সিল ফর ফরেন রিলেশন ওআরজি, ন্যাশনাল ডব্লিউডব্লিউটু ওআরজি, বিবিসি, এএফপি