ছয় হাজার বছর আগে বসতি গড়ে ওঠা ইরান এখন কেমন
ইরান আবার আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রে এসেছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ থেকে দুই সপ্তাহের বিক্ষোভ, সংঘর্ষ, হতাহত ও গ্রেপ্তারে টালমাটাল পরিস্থিতি আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বারবার হামলার হুমকির কারণে ইরানের দিকে নজর সবার।
উত্তরে কাস্পিয়ান সাগর থেকে দক্ষিণে ওমান উপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ইরানের চিত্র দেশটির ইতিহাসের মতোই বৈচিত্র্যময়। দেশটি হরমুজ প্রণালিসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ জলপথের কাছে অবস্থিত, যে পথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়।
সহস্রাব্দ প্রাচীন ইতিহাসের দেশ ইরান বিশ্বের অন্যতম আদি ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ এক দেশ। ইতিহাসের পরিক্রমায় এ জনপদ ধারাবাহিকভাবে জনবসতিপূর্ণ ও প্রভাবশালী থেকেছে।
একনজরে ইরান
৯ কোটি ২০ লাখ জনসংখ্যার দেশ ইরান আয়তন ও জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের ১৭তম বৃহত্তম দেশ। দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৪১ হাজার ৮০০ কোটি ডলার, যা অর্থনীতির আকারের দিক থেকে বিশ্বে ৩৬তম। দেশটিতে বেকারত্বের হার প্রায় ৭ দশমিক ২ শতাংশ।
ইরানে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের সাক্ষরতার হার ৮৯ শতাংশ ও তরুণদের মধ্যে এই হার প্রায় ৯৯ শতাংশ। তবে গ্রাম ও শহরভেদে এই হারে ভিন্নতা রয়েছে। দেশটি তেল ও গ্যাসে সমৃদ্ধ। তেল উৎপাদনে বিশ্বে নবম ও প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ইরান।
আয়তনে কত বড় ইরান
পশ্চিম এশিয়ায় অবস্থিত ইরান সৌদি আরবের পর মধ্যপ্রাচ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। দেশটির আয়তন প্রায় সাড়ে ১৬ লাখ বর্গকিলোমিটার (৬ লাখ ৩৬ হাজার বর্গমাইল), যা আয়তনের দিক থেকে বিশ্বে ১৭তম।
ইরানের সঙ্গে সাতটি দেশের স্থলসীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে ইরাকের সঙ্গে দেশটির সীমান্ত দীর্ঘতম। এরপর ক্রমান্বয়ে রয়েছে তুর্কমেনিস্তান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, আজারবাইজান, তুরস্ক ও আর্মেনিয়ার সঙ্গে সীমান্ত।
ইরানের আয়তন যুক্তরাষ্ট্রের মোট স্থলভাগের প্রায় ছয় ভাগের এক ভাগ, যা দেশটির আলাস্কা অঙ্গরাজ্যের প্রায় সমান।
দেশটি ইউরোপের ছয় ভাগের এক ভাগ এবং অস্ট্রেলিয়ার প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগের সমান। এ ছাড়া ইরান আয়তনে ভারতের প্রায় অর্ধেক এবং ইসরায়েলের চেয়ে প্রায় ৮০ গুণ বড়।
ইরানের প্রধান জনবসতি
ইরানের ৯ কোটি ২০ লাখ মানুষের বেশির ভাগই দেশটির পশ্চিম অর্ধেকাংশে বসবাস করেন। এ অঞ্চলের বন্ধুর পাহাড়ের কোল ঘেঁষে থাকা উর্বর উপত্যকা ও নদী অববাহিকাগুলোই বিশাল জনসংখ্যার জীবনধারণের প্রধান উৎস।
৯৬ লাখ মানুষের শহর তেহরান ১৭৯৫ সাল থেকে দেশটির রাজধানী ও এটিই ইরানের বৃহত্তম শহর। আলবোর্জ পর্বতশ্রেণির পাদদেশে অবস্থিত এ শহরের ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল ছয় হাজার বছরের আগে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত মাশহাদ ৩৪ লাখ বাসিন্দার এক শহর। এটি ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী। ১ হাজার ২০০ বছরের বেশি পুরোনো ইতিহাসের এই শহর দেশটির অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
ইরানের তৃতীয় বৃহত্তম শহর ইসফাহানে প্রায় ২৩ লাখ মানুষের বসবাস। আড়াই হাজার বছরের বেশি পুরোনো এই শহর ১৫০১ থেকে ১৭২২ সাল পর্যন্ত প্রভাবশালী সাভাবি সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল। বর্তমানে ইসফাহান প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি টেক্সটাইল, ইস্পাত ও উৎপাদনশিল্পের কেন্দ্র। এখানে রয়েছে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাও।
ইরানের অন্যান্য জনবহুল শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে শিরাজ (১৭ লাখ), তাবরিজ (১৭ লাখ), কারাজ (১৬ লাখ), কোম (১৪ লাখ) ও আহভাজ (১৩ লাখ)।
তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশ
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশের বয়স ৩৯ বছরের নিচে। দেশটির মানুষের বয়স ৩৩–৩৪ বছর। আর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৭ শতাংশ মানুষই এখন শহরে বসবাস করেন।
ইরানের জনসংখ্যার সবচেয়ে বড় অংশটি ৩০ থেকে ৩৯ বছর বয়সীদের। এর অর্থ হলো দেশটির সিংহভাগ মানুষের জন্ম ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর, যে বিপ্লবের মাধ্যমে পাহলভি শাহ শাসনের অবসান ঘটেছিল।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ পেশাজীবীদের মধ্যে দেশত্যাগের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মূলত চরম অর্থনৈতিক সংকটের কারণেই তাঁরা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন।
জাতিগত বৈচিত্র্য
ইরান জাতিগত ও সাংস্কৃতিকভাবে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় একটি দেশ। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬১ শতাংশ পারসিয়ান। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রয়েছে আজারবাইজানীয় (১৬ শতাংশ), কুর্দি (১০ শতাংশ) ও লুর (৬ শতাংশ)। আছে আরব (২ শতাংশ), বেলুচ (২ শতাংশ), তুর্কিকসহ (২ শতাংশ) অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীও।
ইরানের জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ শিয়া মুসলিম। অন্যদিকে সুন্নি ও অন্যান্য মুসলিম কমিউনিটির মানুষের সংখ্যা প্রায় ৯ শতাংশ। মাইনোরিটি রাইটস গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, বাকি ১ শতাংশের মধ্যে রয়েছেন প্রায় ৩ লাখ বাহাই, ৩ লাখ খ্রিষ্টান, ৩৫ হাজার জরাথুস্ত্র (জোরাস্ত্রিয়ান), ২০ হাজার ইহুদি ও ১০ হাজার সাবেইন এ মানদায়িন।
কুর্দিস্তান, খুজেস্তান ও সিস্তান-বালুচিস্তানের মতো সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী দেশটির জাতিগত ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যের পাশাপাশি আঞ্চলিক রাজনীতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইরানের একমাত্র সরকারি ভাষা ফারসি। তবে দেশজুড়ে অনেক অঞ্চলে বৈচিত্র্যময় আরও অনেক ভাষা প্রচলিত রয়েছে।