অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অভিবাসী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা বিরোধী দলের

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে আয়োজিত অভিবাসনবিরোধী ‘মার্চ ফর অস্ট্রেলিয়া’ সমাবেশে দেশটির জাতীয় পতাকা হাতে বিক্ষোভকারীরা। ৩১ আগস্ট ২০২৫ছবি: রয়টার্স

অস্ট্রেলিয়ায় ক্ষমতায় এলে চার বছরে সাড়ে ছয় লাখ অস্থায়ী ভিসাধারী কমানোর ঘোষণা দিয়েছে দেশটির বিরোধীদলীয় জোট (কোয়ালিশন)। গতকাল মঙ্গলবার বিরোধীদলীয় নেতা অ্যাঙ্গাস টেইলর এই নতুন অভিবাসন নীতি প্রকাশ করেন। বিরোধী জোটের দাবি, এটি হবে অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অভিবাসন ছাঁটাইয়ের ঘটনা।

জোটের প্রস্তাবিত নীতিতে বলা হয়েছে, তারা ক্ষমতায় এলে প্রথম দুই বছর নিট অভিবাসন কমিয়ে বছরে এক লাখে নামিয়ে আনা হবে। তৃতীয় বছরে এটি হবে ১ লাখ ৩০ হাজার এবং চতুর্থ বছরে ১ লাখ ৬০ হাজার।

২০২৫ সালে অস্ট্রেলিয়ায় নিট অভিবাসন (নতুন আসা মানুষের সংখ্যা থেকে দেশ ছেড়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বাদ দিলে যা থাকে) ছিল ৩ লাখ ১ হাজার।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা শিক্ষার্থীদের ওপর

বিরোধী জোটের এই নীতির কারণে সবচেয়ে বড় বিপাকে পড়বেন বিদেশি শিক্ষার্থী ও সদ্য স্নাতকেরা। পড়াশোনা শেষে কাজের সুযোগ পাওয়া ‘অস্থায়ী স্নাতক ভিসা’ পুরোপুরি বাতিলের কথা বলেছে জোট। বর্তমানে এই ভিসাধারীর সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৭১ হাজার, যা কমিয়ে মাত্র ১০ হাজারে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

পাশাপাশি নতুন বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির সীমা নির্ধারণ করা হবে ২ লাখ ৪০ হাজারে। বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের অস্ট্রেলিয়ায় আনার সুযোগও বন্ধ হয়ে যাবে।

তবে পিএইচডি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষার্থী এবং আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। তাদের জন্য নতুন করে ‘পড়াশোনা-পরবর্তী সাময়িক ভিসা’ চালু হবে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য ও বয়স্কসেবা খাতের কর্মীদের ভিসা বৃদ্ধির সুযোগ রাখা হবে বলে নীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভিসা আবেদনে নতুন নিয়ম

বিরোধীদলীয় জোটের প্রস্তাবিত নীতি অনুযায়ী, অস্থায়ী ভিসার দ্বিতীয় ও পরবর্তী আবেদনগুলো বাধ্যতামূলকভাবে অস্ট্রেলিয়ার বাইরে থেকে করতে হবে। এর ফলে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করে নতুন ভিসার আবেদনের পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে। এ ছাড়া অপেক্ষমাণ আবেদনকারীদের ‘ব্রিজিং ভিসা’ ও অস্থায়ী আশ্রয় ভিসাধারীর সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৯৫ হাজার কমানো হবে। মানবিক ভিসার সংখ্যা অর্ধেক কমিয়ে ১০ হাজারে নামানো হবে। তবে দক্ষ কর্মীদের অস্থায়ী ভিসা এক লাখ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হবে।

অ্যাঙ্গাস টেইলর তাঁর ঘোষণায় অস্ট্রেলিয়াকে ‘হোটেল নয়, বাড়ি’ বলে বর্ণনা করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, টেইলর বোঝাতে চেয়েছেন—মানুষ এখানে কিছুদিন থেকে সুযোগ-সুবিধা ও অর্থ নিয়ে চলে যায়, কিন্তু দেশটির প্রতি তাদের কোনো দায় বা অঙ্গীকার থাকে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, অভিবাসনবিরোধী দল ‘ওয়ান নেশন’ তিন বছরে সাড়ে সাত লাখ অস্থায়ী ভিসাধারীকে ফেরত পাঠানোর কথা বলে জরিপে বিরোধী জোটকে ছাড়িয়ে গেছে। মূলত সেই চাপ সামলাতেই জোট এমন কঠোর অবস্থানে গেছে। অন্যদিকে লেবার সরকার গত মাসে ২০২৮ সালের মধ্যে নিট অভিবাসন ২ লাখ ২৫ হাজারে নামানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল, যার চেয়ে বিরোধী জোটের লক্ষ্যমাত্রা অনেক বেশি কড়া।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে উদ্বেগ

এমন ঘোষণার পর সিডনিসহ অস্ট্রেলিয়াজুড়ে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। পশ্চিম সিডনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করা এক শিক্ষার্থী হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘বছরের পর বছর উচ্চ টিউশন ফি দিয়ে পড়েছি। স্থায়ী বসবাসের সুযোগ তো আগেই কমছে। এখন কাজের অভিজ্ঞতার ভিসাটুকুও গেলে পুরো বিনিয়োগ আর ক্যারিয়ার শেষ।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক কমিউনিটি কর্মী ও ব্যবসায়ী বলেন, ‘ভোটের জন্য রাজনীতিকেরা অভিবাসীদের বলির পাঁঠা বানাচ্ছেন। আবাসনসংকট আর মূল্যস্ফীতি সামলাতে না পেরে দায় চাপানো হচ্ছে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও কর্মীদের ঘাড়ে।’

সরকারি প্রতিক্রিয়া

অভিবাসন বিভাগের সাবেক উপসচিব ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আবুল রিজভী বিরোধী জোটের এই লক্ষ্যমাত্রাকে ‘বাস্তবতাবিবর্জিত’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, অস্ট্রেলিয়ার জটিল প্রশাসনিক কাঠামোতে রাতারাতি কয়েক লাখ ব্রিজিং ভিসার জট কাটানো প্রায় অসম্ভব। এ ছাড়া স্বাস্থ্য ও সেবামূলক খাতে যে তীব্র শ্রমঘাটতি রয়েছে, তা উপেক্ষা করে এই নীতি বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে।

ক্ষমতাসীন সরকারের অভিবাসন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক বিরোধী জোটের এই ঘোষণাকে ‘হঠকারী সিদ্ধান্ত’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, এই নীতি কার্যকর হলে জাতীয় বাজেটে ভয়াবহ ঘাটতি তৈরি হবে এবং দেশজুড়ে উৎপাদন ও সেবা খাতে তীব্র কর্মিসংকট দেখা দেবে।

তবে জোটের এই নীতি এখনো শুধুই প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে। পরবর্তী কেন্দ্রীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২০২৮ সালে। সেই নির্বাচনে বিরোধী জোট জয়ী হতে পারলেই কেবল এই নীতিগুলো কার্যকর হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।