বিশ্বের সবচেয়ে ধনী পরিবারগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিশাল সম্পদ গড়ে তুলেছে। তাদের প্রভাব কেবল ব্যক্তিগত সম্পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং বৈশ্বিক বাজার, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবণতা তাদের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে।
বংশপরম্পরায় পাওয়া পুরোনো ধনসম্পদ ও নতুন ব্যবসা সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে এসব পরিবার দেখিয়ে দিয়েছে কীভাবে ধনসম্পদ, ক্ষমতা ও প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বিস্তৃত হয়। ২০২৫ সালে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ১০ পরিবারের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে ব্লুমবার্গ। তালিকা অনুযায়ী ধনী পরিবারগুলো সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
তালিকায় শীর্ষে আছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বখ্যাত খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওয়ালমার্টের মালিক ওয়ালটন পরিবার। পরিবারটির মোট সম্পদের পরিমাণ ৫১ হাজার ৩৪০ কোটি ডলার। তারা ওয়ালমার্টের প্রায় ৪৪ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, যা বিরল ঘটনা। বিশ্বে এই কোম্পানির আওতায় ১০ হাজার ৭৫০টির বেশি সুপার স্টোর পরিচালিত হয়।
পরিবারের আয়ের একটা বড় অংশই আসে ওয়ালমার্টের বিপুল বিক্রয় থেকে। গত অর্থবছরে কোম্পানির আয় হয়েছে ৬৮ হাজার ১০০ কোটি ডলার। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরিবারটি কোম্পানি পরিচালনা ও এর প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছে।
আবুধাবির আল–নাহিয়ান পরিবারের সম্পদের পরিমাণ ৩৩ হাজার ৫৯০ কোটি ডলার। তারা বহু বছর ধরে এ বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছে। পরিবারটি দীর্ঘকাল ধরে আবুধাবির সব গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।
বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনীতি পরিচালনা ও দেশের সম্পদের দায়িত্ব সামলানোর মধ্য দিয়ে পরিবারটি আয় করে থাকে।
পরিবারটির ক্ষমতা শুধু তেল খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তারা আবাসন শিল্প খাত, ব্যাংকিং ও বহুজাতিক কোম্পানি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
আল নাহিয়ান পরিবার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেও গভীরভাবে যুক্ত।
আল–সৌদ পরিবারের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২১ হাজার ৩৬০ কোটি ডলার। তাদের আয়ের একটি বড় অংশই আসে দেশের বিশাল তেল ভান্ডার থেকে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি সৌদি আরামকোর মাধ্যমে তারা এসব তেল ভান্ডার পরিচালনা করে থাকে।
বাদশাহ সালমান ও সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মতো রাজপরিবারের প্রভাবশালী সদস্যরা পরিবারের বেশির ভাগ সম্পদের মালিক। তারা সরকারি বিনিয়োগ তহবিলের মাধ্যমে অবকাঠামো, পর্যটনসহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রকল্পে বিনিয়োগ করেছে।
কাতারের শাসক আল–থানি পরিবারের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৯ হাজার ৯৫০ কোটি ডলার। মূলত বিংশ শতাব্দীতে তাদের বিপুল অফশোর গ্যাস সম্পদ থেকে বড় ধরনের সম্পদ গড়েছে তারা।
এ ছাড়া বিভিন্ন হোটেল ও বিমা প্রতিষ্ঠানে মালিকানা এবং চুক্তিভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক খাত থেকেও তারা অর্থ উপার্জন করে থাকে।
বিপুল সম্পদের মালিকানার পাশাপাশি পরিবারটি রাজনৈতিকভাবেও ক্ষমতাধর। আর এসবের সুবাদে পরিবারটি কাতারের অর্থনৈতিক ও সামাজিক গতিপথ নির্ধারণের সুযোগ পায়। বিদেশে তাদের বহু সম্পদের মধ্যে রয়েছে লন্ডনের হাররডস এবং উচ্চমানের ফ্যাশন ব্র্যান্ড ভ্যালেন্তিনো।
ফ্রান্সভিত্তিক এরমেস পরিবার ছয় প্রজন্ম ধরে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বিলাসবহুল প্রতিষ্ঠান এরমেসকে পরিচালনা করে আসছে। তাদের সম্পদের পরিমাণ ১৮ হাজার ৪৫০ কোটি ডলার। বিরকিন ও কেলি ব্যাগের জন্য পরিবারটি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত।
এরমেস এমন একটি ব্র্যান্ড, যা এখনো বিলাসিতা ও নিখুঁত কারুশিল্পের জন্য পরিচিত। তারা সীমিত পরিমাণ পণ্য তৈরির মাধ্যমে নিজেদের উচ্চ মূল্য ধরে রেখেছে।
এরমেস কোম্পানির মূল অংশের মালিকানা থেকে কোম্পানিটি তাদের সম্পদ গড়েছে।
কোচ পরিবারের সদস্যরা তাদের বাবার তেল পরিশোধনাগারকে ১৫ হাজার ৫০ কোটি ডলারের ব্যবসায় পরিণত করেছে। এটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম বেসরকারি মালিকানাধীন উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠান।
এই পরিবারের ব্যবসাগুলো বেশ বৈচিত্র্যময়। রাসায়নিক থেকে শুরু করে সার, কাগজজাত পণ্য, ইলেকট্রনিকসসহ অনেকগুলো ক্ষেত্র নিয়ে তারা কাজ করে থাকে।
ব্যবসায়িক খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ এবং কৌশলগত প্রভাবের মধ্য দিয়ে পরিবারটি তাদের গুরুত্ব ধরে রেখেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান মার্স ইনকরপোরেটেডের মালিক মার্স পরিবারের সম্পদের পরিমাণ ১৪ হাজার ৩৪০ কোটি ডলার। এম অ্যান্ড এম, মিল্কি ওয়ে, স্নিকার্সের মতো বিখ্যাত চকলেট ব্র্যান্ডের জন্য কোম্পানিটি বেশ পরিচিতি পেয়েছে।
পরিবারটি পোষা প্রাণীর যত্ন ও সুরক্ষাবিষয়ক বিশাল আকারের একটি ব্যবসাও পরিচালনা। তাদের মোট আয়ের প্রায় অর্ধেকই এখান থেকে আসে।
আরও বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে মার্স পরিবারের ব্যবসার সম্প্রসারণ হচ্ছে। যেমন—২০২৫ সালে তারা কেলানোভা নামে একটি স্ন্যাকস প্রস্তুতকারী কোম্পানি কিনে নিয়েছে।
মার্স পরিবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বৈচিত্র্যময়ভাবে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের দিকে মনোযোগ দিয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা নীরবে বেশির ভাগ ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্বে শীর্ষ ১০ ধনী পরিবারের তালিকায় একমাত্র আম্বানি পরিবারটি ভারতের প্রতিনিধিত্ব করছে। এ কোম্পানির সম্পদের পরিমাণ ১০ হাজার ৫৬০ কোটি ডলার।
মুকেশ আম্বানির মালিকানাধীন রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের যাত্রা শুরু হয়েছিল টেক্সটাইল খাতের মধ্য দিয়ে। বর্তমানে তা তেল শোধন, টেলিকম, খুচরা বিক্রি ও ভোগ্য পণ্য পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম ইশা, আকাশ ও অনন্ত এখন ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার দিকে এগোচ্ছে।
কীভাবে ব্যবসায় বৈচিত্র্য আনা যায় ও ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করা যায় তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এ আম্বানি পরিবার।
ফ্রান্সভিত্তিক সম্পদশালী পরিবার ওয়ের্ত-হাই-মার বিলাসবহুল ফ্যাশন হাউস শ্যানেলের মালিক। বর্তমানে দুই ভাই মিলে ব্যবসা সামলাচ্ছেন। তবে শ্যানেল কোম্পানির যাত্রা শুরু হয়েছিল তাঁদের দাদা কোকো শ্যানেলের হাত ধরে।
পরিবারটি বিশ্বের অন্যতম সেরা ফ্যাশন ব্যবসা চালায়। কোম্পানির সম্পদের পরিমাণ ৮ হাজার ৫৬০ কোটি ডলার।
শ্যানেলের এখনো তাদের ক্ল্যাসিক পণ্য, যেমন ‘লিটল ব্ল্যাক ড্রেস’ ও নাম্বার ফাইভ পারফিউমের মতো চিরাচরিত জনপ্রিয় পণ্যগুলো থেকে এখনো আয় করে যাচ্ছে শ্যানেল।
কানাডাভিত্তিক থমসন পরিবারের সম্পদের পরিমাণ ৮ হাজার ২১০ কোটি ডলার। তারা তাদের হোল্ডিং কোম্পানি উডব্রিজের মাধ্যমে থমসন রয়টার্সসহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করে।
আবাসন শিল্প, শিল্পকর্ম সংগ্রহ, গণমাধ্যম ও আর্থিক তথ্যভান্ডারসহ বিভিন্ন খাতে পরিবারটির বিনিয়োগ আছে।
বর্তমানে থমসন পরিবারের পক্ষ থেকে ব্যবসায়িক কাজকর্ম সামলানোর কাজটি করেন ডেভিড থমসন। তিনি পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের সদস্য।
পরিবারটি সাংবাদিকতার ঐতিহ্য এবং আধুনিক বিনিয়োগ কৌশলের সমন্বয়ে কার্যকরভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে।