দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নির্বাচন তো হচ্ছে, গণতন্ত্র কোথায়?
সারা বিশ্বেই গণতন্ত্র পিছু হটছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াও এর বাইরে নয়। এই অঞ্চলের দেশগুলোয় নিয়মিত বিরতিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে নির্বাচন। কিন্তু অবস্থা দাঁড়িয়েছে এমন, ‘যে যায় লঙ্কায়, সেই হয় রাবণ’! অর্থাৎ কর্তৃত্ববাদী সরকারব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। বেশি বেশি নির্বাচন হলেও গণতন্ত্রের দেখা নেই এশিয়ার এই দেশগুলোয়।
এবার দেখা যাক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আছে কোন কোন দেশ। এশিয়ার এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, সিঙ্গাপুর, কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম। গণতন্ত্র পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন কোনো দেশ কিন্তু খুঁজে পাওয়া যাবে না। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতের্তে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে আইনের শাসনকে আস্তাকুঁড়েতে ছুড়ে ফেলেছেন। মাদক ব্যবসার অজুহাতে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হচ্ছে হাজার হাজার নাগরিককে। অভিযোগ আছে, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকেই নিখাদ নিরীহ স্বভাবের। অন্যদিকে, কম্বোডিয়ার বর্তমান শাসক হুন সেন আগামী জুলাইয়ে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনকে সামনে রেখে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করেছেন এবং বিরোধী দলকে বিলুপ্ত ঘোষণা করেছেন। আর মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সামরিক বাহিনীর নির্যাতন দেখেও না দেখার ভান করছে অং সান সু চির সরকার।
প্রশ্ন হলো, গণতন্ত্রের এই উল্টো যাত্রার ফলাফল কী? দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এক ডজনেরও বেশি দেশ রয়েছে। এসবের মধ্যে ওপরে উল্লিখিত দেশগুলোয় উদারবাদী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় অনেক কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে। তারপরও পাওয়া যাচ্ছে না আকাঙ্ক্ষিত ফল। গণতন্ত্রের লেবাসে টিকে থাকছে রাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও জাতিগত উগ্র জাতীয়তাবাদ।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোয় গণতন্ত্রের চিত্র নিয়ে কিছু প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে থিংক ট্যাংক ফ্রিডম হাউস। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনের আলোকে দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, এসব দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন আরও কঠোর হচ্ছে। একমাত্র পূর্ব তিমুরে স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে দেখা গেছে, যা ছিল রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার ও সিঙ্গাপুরের নির্বাচন ছিল মোটামুটি স্বচ্ছ। ফ্রিডম হাউসের মতে, কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের সাধারণ নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রভাব ছিল পুরোপুরি। সম্প্রতি থাইল্যান্ডের সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখলের চার বছর পূর্তিও করেছে। তবে মালয়েশিয়ায় দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। সেখানে স্বাধীনতার পর থেকে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক জোট বারিসান ন্যাশনালকে হারিয়ে দিয়েছে বিরোধী দলের জোট পাকাতান হারাপান।
ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এবার শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হলেও এর আগে মালয়েশিয়ায় কিন্তু একদলীয় শাসনই ছিল। ১৯৫৭ সাল থেকে একচ্ছত্রভাবে ক্ষমতার স্বাদ নিয়েছে বারিসান ন্যাশনাল। নাজিব রাজাককে হারিয়ে এবার ভেলকি দেখিয়েছেন ৯২ বছর বয়সী রাজনীতিক মাহাথির মোহাম্মদ। মাহাথির এবার নিজের পুরোনো দলের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। তাই একদিক থেকে দলীয় কর্তৃত্বে পরিবর্তন এলেও ব্যক্তি কর্তৃত্বে কোনো পরিবর্তন আসেনি। কারণ, মাহাথিরও তাঁর ২২ বছরের শাসনামলে লৌহমানব হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। বিরোধীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছেন বলেও অভিযোগ আছে তাঁর বিরুদ্ধে।
ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের ড্যানিয়েল স্ল্যাটার বলছেন, ১৯৭০ বা ৮০-র দশকের সময় থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোনো দেশে গণতন্ত্রের ন্যূনতম মানও রক্ষা করা হয়নি। এর মধ্যে ১৯৭৩-৭৬ সাল পর্যন্ত শুধু থাইল্যান্ডে গণতান্ত্রিক শাসন লক্ষ করা গেছে। তবে সেখানে সামরিক শাসন জারি হতেও দেরি হয়নি। এই অঞ্চলে এসব পরিবর্তনের জন্য ওই সময়কার স্নায়ুযুদ্ধও দায়ী বলে মনে করেন ড্যানিয়েল স্ল্যাটার।
ফিলিপাইনে ১৯৮৬ সালে কোরি আকিনোর নেতৃত্বে একটি গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। আজ থেকে ২০ বছর আগে ইন্দোনেশিয়ার দীর্ঘদিনের একনায়ক সুহার্তো পদত্যাগ করেছিলেন। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে ব্যালটের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পথ সুগম হয়েছিল। ২০১৫ সালে ছয় দশকের সামরিক শাসনের অবসান ঘটে মিয়ানমারে, ক্ষমতায় আসে অং সান সুচির নির্বাচিত সরকার। কিছুদিন আগের মালয়েশিয়ায় নির্বাচনের ফলাফল হিসাবে নিলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত সরকারের সাফল্য সামান্যই।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নির্বাচনের কমতি কোনোকালেই ছিল না। অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটির গবেষক লি মরগেনবেসা ও আমেরিকার কর্নেল ইউনিভার্সিটির গবেষক টম পেপিনস্কি এ-সংক্রান্ত একটি হিসাব দিয়েছেন। তাঁদের হিসাবে ১৯৪৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত সময়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নির্বাহী ও আইনসভা মিলিয়ে প্রায় ১১০টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এসব নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের পত্তন হওয়ার কথা থাকলেও হয়েছে তার উল্টো। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা গেছে। সিঙ্গাপুরে যেমন একাধিপত্য পিপলস অ্যাকশন পার্টির (পিএপি)। মালয়েশিয়ায় এত দিন দাপট ছিল বারিসান ন্যাশনালের। ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়াতেও ভিন্ন কিছু ঘটেনি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল বদল হলেও বদলায়নি কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা। অর্থাৎ সরকারের আচরণ গণতান্ত্রিক হয়নি।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, দুটি অস্ত্র দিয়ে কর্তৃত্ববাদীরা এই অঞ্চলে টিকে রয়েছেন। একটি হলো রাষ্ট্রীয় শক্তি, যার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও বিচারিক কাঠামো ব্যবহার করে ক্ষমতায় টিকে থাকছেন শাসকেরা। এভাবে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে বিরোধীদের দমন করে কর্তৃত্ববাদী শাসন চলছে। অন্যটি হলো সমর্থকদের পুরস্কৃত করার অভ্যাস। অর্থাৎ, একদিকে বিরোধী শক্তির ওপর নিপীড়ন ও অন্যদিকে অন্যায় সুবিধা দিয়ে নিজেদের সমর্থকগোষ্ঠী বৃদ্ধি করার মাধ্যমে ক্ষমতাসীনেরা রাজত্ব করতে চাইছেন।
তবে দীর্ঘদিনের অপশাসনে কোনো এক সময় ভাঙন আসেই। মালয়েশিয়ায় ঠিক সেটিই হয়েছে। তবে এর জন্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো ও আদালতের স্বাধীনতা অত্যন্ত জরুরি। ঠিক সে কারণেই এসব ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের অবহেলা বেশি। আর পরাজয়ের আশঙ্কা থাকায় পরবর্তী নির্বাচনে তাদের আস্থা সবচেয়ে কম। কারণ, পরাক্রমশালী শাসকও বিশ্বাস করেন না যে গণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে তাদের জয় চিরস্থায়ী।