প্রতিটি শিশুর জীবন মূল্যবান

কানাডা দিবসে ১ জুলাই হাজারো মানুষ মিছিলে একত্রিত হয়েছিল শিশু হত্যার প্রতিবাদ জানাতে

কানাডার প্রকৃতিতে এখন নানা রঙের বাহার। হাজার কোটি রঙিন ফুল পাতায় দেশটি সেজে ওঠে এই সময়। বহু সংস্কৃতির মিলন মেলায় তৈরি হওয়া দেশটির প্রতিচ্ছবি যেন গ্রীষ্মকালের এই কানাডা। কানাডা যেন বিশাল টব, যেখানে শত দেশের-শত জাতি-শত ধর্ম আর বর্ণের কোটি নাগরিক ফুল হয়ে ফুটে আছে আপন অস্তিত্ব নিয়ে।

বর্ষণমুখর এক সন্ধ্যায় অজানা এই দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলাম। অভিবাসী জীবনের অনিশ্চয়তা ছিল খুব। অন্য সব অভিবাসীদের মতোই প্রতিদিনের পরিশ্রম ও সংগ্রামের মাধ্যমে একটু একটু করে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছি এই নতুন ভূমিতে। যেখানে মূল্য আছে প্রতিটি মানুষের নিজস্বতার।

কিন্তু চাঁদের যেমন কলঙ্ক আছে, যেমন প্রদীপের নিচেই থাকে অন্ধকার তেমনি কানাডার ইতিহাসের কালোতম অধ্যায় সম্প্রতি আবিষ্কৃত আদিবাসী আবাসিক স্কুলের শিশু-কিশোরদের গণকবর। এটি কানাডার ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম ঘটনা। এর পেছনে রয়েছে কানাডার আদিবাসী যারা প্রকৃত অধিবাসী তাদের ওপর ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার আগ্রাসন। আজ ইতিহাসের পাতা উল্টানোর তাগিদ এসেছে। কানাডার আদিবাসীরা অনাদিকাল থেকে এই মাটিতে বাস করে আসছিল। তাদের শেকড় গাঁথা কানাডার জমিনে। সহজ সরল জীবনে অভ্যস্ত এই জনগোষ্ঠী ছিল সুখী ও সমৃদ্ধ। তারা নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করেছিল আপন সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের আলোকে। ১৮০০ শতকে ইউরোপীয়রা যখন কানাডা আসা শুরু করল, তখন থেকেই তারা আদিবাসীদের ওপর দখলদারি প্রতিষ্ঠার জন্য উঠে পড়ে নেমেছিল। আদিবাসীদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ওপর ইউরোপীয় দল নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের নির্মম এক আগ্রাসী যুদ্ধ শুরু করেছিল। সুদূর প্রসারী এই নীল নকশার অংশ হিসেবে আদিবাসী ঘরের শিশু-কিশোর সন্তানদের তাদের পরিবার, ভাষা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ধর্ম ও বিশ্বাস থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করতে তাদের আবাসিক স্কুলে দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। এই সব আবাসিক স্কুলের শিশুদের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা তাদের পরিবারের জানার কোনো সুযোগ ছিল না। ক্যাথলিক চার্চ আবাসিক স্কুলের অভ্যন্তরে তাদের ওপর প্রতিনিয়ত নির্মম অত্যাচার ও যৌন হয়রানি করা হতো। আবাসিক স্কুল থেকে বেঁচে ফেরত আসা আদিবাসীদের অনেকেই এই নির্মম অত্যাচারের ঘটনা বারবার সবার গোচরে আনার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সে রকম করে কখনোই আবাসিক স্কুলের ঘটনা নিয়ে কোনো অনুসন্ধান করা হয়নি।

ক্যামলুপস আবাসিক স্কুলের (সাস্কাচুয়ানের যে স্কুলটির ২৫০ শিশুর গণকবর আবিষ্কৃত হয়েছিল) বেঁচে ফেরত আসা একজন ছাত্র গ্লোব নিউজের সঙ্গে তার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে অশ্রু সজল চোখে বলেছে, আবাসিক স্কুলের সেই দিনগুলো এখনো প্রতিদিন তাকে দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে। তার ও অন্যদের ওপর শারীরিক, মানসিক নির্যাতন তো ছিলই, তাদের নিজস্ব বিশ্বাস ও ঐতিহ্যকে সমূলে উৎপাটন করার জন্য নানা ধরনের নিষ্ঠুর অত্যাচার করা হতো। আজ এই অনুদ্‌ঘাটিত ঘটনা সবার সামনে ক্রমশ প্রকাশ হয়ে হচ্ছে প্রথমে সাস্কাচুয়ান ও সম্প্রতি ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় আদিবাসী আবাসিক স্কুলের শিশুদের গণকবর আবিষ্কার হওয়ার পর। অভিবাসীদের অভয়ারণ্য বলে পরিচিত মানবিক দেশ কানাডার এই কালো ইতিহাস এই দেশের মানুষকে ব্যথিত, লজ্জিত ও অনুতপ্ত করে তোলে।

১ জুলাই ছিল কানাডা দিবস, দেশের ১৫৪তম জন্মদিন। এবারে কানাডা দিবসের উৎসব উদ্‌যাপনের ধরন বদলে গিয়েছে। কানাডার বিভিন্ন প্রদেশে হাজারো মানুষ মিছিলে একত্রিত হয়েছিল এই ঘটনার প্রতি তাদের তীব্র ধিক্কার জানাতে, নিহত সব শিশু এবং আবাসিক স্কুল থেকে বেঁচে ফেরত আসা শিক্ষার্থীদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাতে। কমলা পোশাকে সজ্জিত বিশাল সেই মিছিলে আদিবাসী, আবাসিক স্কুলের সাবেক শিক্ষার্থীসহ সাধারণ নাগরিকদের অংশগ্রহণ ছিল। ‘প্রতিটি শিশুর জীবন মূল্যবান’—এই ছিল মিছিলের মূল বক্তব্য।

নিষ্ঠুর এই হত্যাযজ্ঞের সুষ্ঠু তদন্ত এখন জনসাধারণের প্রাণের দাবি। কানাডার সরকার, বিরোধ দলসহ আপামর জনসাধারণ এই ঘটনার জন্য লজ্জিত, মর্মাহত ও ক্ষমা প্রার্থী। হয়তো লক্ষ কোটি বছর কানাডাকে তার এই কালো ইতিহাসের জন্য ক্ষমা চেয়ে যেতে হবে।

এখানে একটি ইতিবাচক ঘটনার উল্লেখ হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবে না। গত ৫ জুলাই, ১৫৪ বছরের কানাডার ইতিহাসে মেরি সাইমন নামের এই প্রথম একজন আদিবাসী, যিনি একজন কূটনৈতিক এবং আদিবাসী অধিকার রক্ষাবিষয়ক আইনজীবী গভর্নর জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। অবশ্যই এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। হাজার বছরের শোষণ ও শাসনে নিষ্পেষিত প্রকৃত আদিবাসীরা তাদের গৌরবময় ঐতিহ্য ও অধিকার নিয়ে এই দেশে স্বমহিমায় অবস্থান করুক, এটাই এখন নাগরিকদের দাবি। আর কখনোই যেন কোনো শোষণের জাঁতাকলে পরে পৃথিবীর কোনো দেশের কোনো শিশুকে এমন নির্মম মৃত্যু ও অত্যাচারের শিকার না হতে হয়। প্রতিটি শিশুর জীবন হোক বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।

কানাডা ক্ষমা চাইতে জানে-ভুল স্বীকার করতে জানে—এটাই এই দেশের সৌন্দর্য। কানাডা অটুট থাকুক তার বহু জাতির বৈশিষ্ট্যের সম্মান নিয়ে।