তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে আড়াই বছরের জলিল আহমেদকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। হাত-পা পুরো ঠান্ডা। কিন্তু দেখতে তার বয়স আরও কম মনে হয়। কারণ, সে গুরুতর অপুষ্টিতে ভুগছে ও যক্ষ্মায় আক্রান্ত। চিকিৎসকেরা তাকে বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে।
জলিলের মা মার্খা বলেন, ‘ওর কষ্ট দেখে আমি অসহায়, পুরো রাত আতঙ্কে কেটেছে। মনে হয়েছে এই বুঝি ও শ্বাস নেওয়া বন্ধ করে দিল।’
এই দৃশ্য লস্কর ঘা শহরের প্রধান হাসপাতালের জরুরি বিভাগের। কয়েক সেকেন্ড পরপর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে একের পর এক শিশু আসছে। পেছনে ছুটছেন শিশুদের অভিভাবক, চিকিৎসক ও সেবিকারা। একদিকে শিশুদের চিৎকার, অন্যদিকে শিশুদের মায়েদের আকুতি ‘দয়া করে আমার সন্তানকে বাঁচান।’
লস্কর গা আফগানিস্তানের হেলমান্দ প্রদেশের রাজধানী শহর। কাবুল থেকে ৪০০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমের এই প্রদেশটি আফগানিস্তানের যুদ্ধবিধ্বস্ত প্রদেশগুলোর একটি। খবর বিবিসির।
হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ারে কোনো জায়গা নেই। কিন্তু জলিলের জন্য জায়গা করতে হবে। একজন চিকিৎসক পাঁজাকোলে জলিলকে তুলে নিয়েছেন আর নার্স জলিলকে দেওয়া স্যালাইনের বোতল নিয়ে ছুটছেন।
হাসপাতালের কর্মীদের একটুও দম ফেলার সময় নেই। একের পর এক শিশু রোগী আসছে। এর মধ্যে পাঁচ মাসের আলাককে সামলাতে হবে। তাকে অক্সিজেন দেওয়া হয়েছে। এই বয়সে এ নিয়ে তিনবার হাসপাতালে আসতে হলো তাকে। কয়েক ঘণ্টা আগেও চিকিৎসকেরা আশঙ্কা করছিলেন শিশুটি হয়তো অক্সিজেন টানতে পারবে না। কিন্তু সে এখন পারছে।
এই ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে ভর্তি প্রতি পাঁচ শিশুর একজনের মৃত্যু হচ্ছে। সম্প্রতি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হাম ছড়িয়ে পড়ার কারণে কয়েক সপ্তাহ ধরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য হাম একটি মারাত্মক আঘাত। কারণ, এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা নষ্ট করে।
দাতব্য সংস্থা মেডিসিন স্যানস ফ্রন্টিয়ার্স এই হাসপাতাল চালায়। ১৫ লাখ বাসিন্দার এই প্রদেশে হাতে গোনা যে কটি প্রতিষ্ঠান পুরোপুরি কাজ করতে পারছে, তার একটি এই হাসপাতাল। এখানে ৩০০ শয্যা থাকলেও প্রতিদিন ৮০০ রোগী ভতি৴ হয়, যাদের বেশির ভাগই শিশু।
এখানকার লোকজনের আসলে কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই। বৈদেশিক অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আফগানিস্তান অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। এ পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে অনাহারের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে এবং জনস্বাস্থ্য সেবা প্রায় পতনের মুখে।
শিশু অপুষ্টি আফগানিস্তানে দীর্ঘদিনের সমস্যা। জাতিসংঘের শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত বছরের আগস্টে অপুষ্টিতে ভোগা হাসপাতালে ভর্তি শিশুর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৪০৭। ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২১৪ জনে। কিন্তু প্রকৃত সংখ্যা অবস্থা আরও বেশি। কারণ, অনেকে অর্থের অভাবে হাসপাতালেও আসতে পারেন না। আর কষ্ট করে অর্থ জোগাড় করতে পারলেও এবড়োখেবড়ো পাথুরে রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাত্রার পর ভালো চিকিৎসা পাওয়া যাবে, তেমন প্রতিষ্ঠানের নিশ্চয়তাও নেই।
প্রদেশের মুসা কোয়ালা এবং গেরেশক জেলার হাসপাতালগুলো অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের দ্বারা পূর্ণ, কিন্তু কোনো হাসপাতালেই অপারেশনাল ক্রিটিক্যাল কেয়ার নেই। নেই নারী চিকিৎসক। হাসপাতাল ভবনগুলো জরাজীর্ণ, ঠান্ডা ও অন্ধকারময়। বিদ্যুৎ সেখানে আসে-যায়। রাতের তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যায়।
গেরেশক জেলা হাসপাতাল কক্ষের মাঝখানে গ্যাস সিলিন্ডারের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা একটি ছোট্ট হিটার। সেখান থেকে নামমাত্র উষ্ণতা ছড়ায়। মা ও শিশুরা কম্বলের নিজে জড়োসড়ো হয়ে বসে থাকে।
হাসপাতালের কাছেই মাটির ঘরে বসবাস করেন হামিদ গুল। তাঁর দুই মেয়ে ফারজানা ও নাজদানা। দুজনই অপুষ্টিতে ভুগছে। নাজদানা অনেক অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে দাদাবাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন হামিদ। কারণ, তাকে ভরণপোষণের ক্ষমতা বাবা হিসেবে তাঁর নেই। হামিদকে সাহায্য করতে এরই মধ্যে ১০ বছরের ছেলে নাসিবুল্লাহ জমিতে কাজ শুরু করেছে।
হামিদের এই সীমাহীন দুর্ভোগ বিদেশিদের অতীত ও বর্তমান কর্মকাণ্ডের ফল বলে তিনি মনে করেন। পাঁচ বছর আগে হামিদের বাড়ি মার্কিন বিমান হামলায় বিধ্বস্ত হয়। শুধু যে বাড়িই শেষ হয়েছে তা নয়, তিনি ওই ঘটনায় হারিয়েছেন বাবা-মা, ছয় ভাই ও এক বোনকে।
হামিদ বলেন, ‘তালেবানের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। আমার বাড়িটিতে অন্যায়ভাবে বোমা হামলা চালানো হয়েছে। না যুক্তরাষ্ট্র, না আগের সরকার, না বর্তমান কেউ আমাকে এতটুকু সহায়তা করেনি। আমরা শুধু শুকনো রুটি খেয়ে আছি। প্রতি সপ্তাহে দুই-তিন রাত আমরা খালি পেটে ঘুমাতে যাই। আমরা যেখানেই গেছি, সেখানেই জানতে চেয়েছি তারা কী খেয়ে আছে। বেশির ভাগ মানুষই বলেছে পুরো পরিবার শুধু কয়েক টুকরো শুকনা রুটি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে খেয়েছে।’
আফগানিস্তানে খাদ্য–সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার শিশুরা। এই প্রজন্মের ছোট্ট শিশুরা এখন মৃত্যুর মুখে। তবে অপুষ্টির কারণে মারা যাওয়া এই শিশুদের কোনো হিসাব রাখা হয় না। তাই হয়তো বিশ্ব কখনোই আফগানিস্তানে মারা যাওয়া এই শিশুদের কথা জানতে পারবে না।