দুই. 

পশ্চিমের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান সম্পর্ক সে তুলনায় অনেক অনিশ্চয়তায় ভরা। বাংলাদেশের চারটি ইস্যু নিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকার উদ্বেগ রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে, শ্রম অধিকার, মানবাধিকার, মানব পাচার ও গণতন্ত্র। এগুলো উপেক্ষা করার উপায় নেই বাংলাদেশের, কারণ বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের প্রায় সবটাই যায় এ দেশগুলোতে। মানবাধিকার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র র​্যাব এবং এর কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। শ্রম অধিকার প্রশ্নে জিএসপি সুবিধা বাতিল করেছে আগেই। মানব পাচার এবং বেআইনি অভিবাসীদের ফেরত প্রসঙ্গে ইউরোপের সঙ্গে মতানৈক্য চলছে। এর মধ্যে ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ ঘটলে ইবিএ সুবিধা বাতিল হয়ে যাবে। পরিবর্তে জিএসপি প্লাস সুবিধা পেতে হলে মানতে হবে অনেক শর্ত। তবে এক্ষুনি যে ইস্যুটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তা হচ্ছে গণতন্ত্র। বছরখানেক পর সাধারণ নির্বাচন হবে বাংলাদেশে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যে বার্তাটি আসছে পশ্চিম থেকে, তা হলো এই যে এবারের নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হতে হবে; ২০১৪ বা ২০১৮ সালের মতো হলে চলবে না। 

তিন. 

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক প্রধানত অর্থনৈতিক। চীন আমাদের আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস, উন্নয়ন প্রকল্প অর্থায়নেরও। বিশ্বব্যাপী চীন তার প্রভাববলয় বিস্তার করছে। সেখানে তারা বাংলাদেশকেও চায়। তবে রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের পরিবর্তে নিজ স্বার্থে চীন মিয়ানমারের পক্ষ নিয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পে প্রতিশ্রুতির তুলনায় অর্থছাড়ও খুবই কম। ২০২২ সালে দাঁড়িয়ে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক খুব মধুর, এটা বলা যাচ্ছে না। 

চার. 

প্রবাসী শ্রমিকদের গন্তব্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গতানুগতিক। দুর্নীতির কারণে বন্ধ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলছে আবার। তবে শ্রমিক পাঠানোর অধিকার চলে গেছে একটি সিন্ডিকেটের হাতে, এবং তারা তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের কাছ থেকে যথারীতি অতি উচ্চ হারে অর্থ গ্রহণ করছে। 

দ্বিতীয় প্রশ্ন, এ মুহূর্তে বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এবং বাংলাদেশ সরকারের চ্যালেঞ্জগুলো কী? চ্যালেঞ্জ প্রধানত তিনটি। প্রথমত, ভারত এবং চীনের সঙ্গে ভারসাম্যহীন সম্পর্ক, দ্বিতীয়ত, মানবাধিকার এবং গণতন্ত্র নিয়ে ইউরোপ-আমেরিকার অবস্থানের ইতিবাচক নিষ্পত্তি এবং তৃতীয়ত, রোহিঙ্গা সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে পাওয়া। 

তৃতীয় প্রশ্ন, চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় কী করতে পারে বাংলাদেশ? ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একপ্রকার ভারসাম্য বজায় রেখে আসছে, যদিও এতে কোনো পক্ষই পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয়। ভারতের সঙ্গে সম্প্রতি সামরিক সহযোগিতার খানিকটা বিস্তার ঘটছে। আবার চীনের সহায়তায় প্রস্তাবিত তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে ভারত উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশকে নিজ স্বার্থরক্ষায় প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে হবে কোনো পক্ষকে খুব বেশি ক্ষুব্ধ না করে। 

দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটি জটিল এ কারণে যে এতে জনস্বার্থ এবং ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থ সাংঘর্ষিক হতে পারে। মানুষ অবশ্যই চায় সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন, যাতে নির্বিঘ্নে ভোট দিয়ে সংসদ সদস্যদের নির্বাচন করা যায়। পক্ষান্তরে সুষ্ঠু নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের পরাজয়ের সম্ভাবনা থেকে যায় সব সময়ই। এ বিষয়ে অভ্যন্তরীণ এবং বহির্দেশীয় চাপ সামাল দিতে আগামী এক বছরে কী পদক্ষেপ নেয় সরকার, সেটাই দেখার বিষয়। 

রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে একটি বিষয় পরিষ্কার, তা হচ্ছে বাংলাদেশ সম্পূর্ণ একা, তার পাশে কেউ নেই। পশ্চিমা দেশগুলো কোনো শক্ত পদক্ষেপ নেয়নি। চীন, রাশিয়া ও ভারত আছে মিয়ানমারের পাশে। এমনকি সামরিক অভ্যুত্থানের পরও জাপান, সিঙ্গাপুর ও কোরিয়ার বিনিয়োগ অব্যাহত আছে দেশটিতে। দীর্ঘ মেয়াদে সমাধানের লক্ষ্যে দুটি কাজ করতে পারে বাংলাদেশ। ক্ষমতাসীন সামরিক সরকার ছাড়াও জাতীয় ঐক্যের সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের একটি আনুষ্ঠানিক চ্যানেল খোলা যায়। আরাকান আর্মির সাম্প্রতিক সাফল্যের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের সঙ্গেও একটি যোগাযোগের পথ খোলা প্রয়োজন। দ্বিতীয় বিষয়টি অভ্যন্তরীণ। মিয়ানমারের বিপরীতে বাংলাদেশের সামরিক শক্তির অপ্রতুলতার পরিপ্রেক্ষিতে ন্যূনতম শক্তি–সাম্য প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সামরিক শক্তি শুধু যুদ্ধ করার জন্য নয়, যুদ্ধ পরিহার করার জন্যও প্রয়োজন। 

এ বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ব্যাপক ও জটিল। মন্ত্রণালয়ের কর্ণধার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখনিঃসৃত বিভিন্ন বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানটি, সরকার এবং সর্বোপরি বাংলাদেশ বারবার বিব্রত হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অভিজ্ঞ এবং পরিপক্ব কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর দূরত্বের কথা শোনা যায়। এই কঠিন সময়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি সুসমন্বিত টিম প্রয়োজন, যে টিমের নেতৃত্বে থাকবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, কিন্তু পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান মানবসম্পদকে যথাযথ ভূমিকা পালন করার সুযোগ দিতে হবে। 

লেখক: সাবেক পররাষ্ট্রসচিব