বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ফারুক চৌধুরী ছিলেন একজন অত্যাধুনিক লেখক। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে অবসর গ্রহণ করার পর একজন মানুষ যে কী পরিমাণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক, ব্যক্তিগত জীবনের, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেছেন, তা অতুলনীয়। মাত্র দেড় দশকে তাঁর লেখা যে বইগুলো তিনি প্রকাশ করেছিলেন, সেগুলো আমাদের সব বন্ধুকেই, বিশেষ করে আমাকে অত্যন্ত অভিভূত করেছিল। একদিন আমাকে বলেছিলেন, সেটা সম্ভব হয়েছিল একটি কারণে—তিনি দীর্ঘ কর্মজীবনে প্রতিদিন ডায়েরি/দিনলিপি তৈরি করে রাখতেন। সামাজিক দিক থেকে ফারুক ছিলেন একজন অতুলনীয় আপ্যায়ক, জীবনকে উপভোগ করার তাগিদে ও আনন্দে, তাঁর বন্ধুদের নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক, সাংস্কৃতিক দিক আলোচনা নিয়ে সময় কাটানো ও বন্ধুবাৎসল্য। এই সবদিকেই তাঁর স্ত্রী জীনা ভাবি ছিলেন সহায়িকা ও প্রেরণা।

আরও ছিল দেশ–বিদেশে ভ্রমণ, জনসেবা ইত্যাদি। ‘জীবনের বালুকাবেলায়’ বহু মুক্তা কুড়িয়েছেন—আত্মীয়, পরিবার ও বন্ধুদের জন্য।

এবার আমি অনেক পুরোনো দিনে ফিরে যেতে চাই। আমার সঙ্গে ফারুকের প্রথম দেখা—তখনকার দিনের নেত্রকোনা মহকুমার সদর শহরে। আমার আব্বা (সরকারি) কর্মসূত্রে ১৯৪২–৪৬ সময়ে সেখানে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৪৬ সালের শেষে (অষ্টম শ্রেণি শেষ করে) যখন আমরা চলে আসি কিশোরগঞ্জ মহকুমার বাজিতপুরে, তার অল্প কিছুদিন আগে ফারুকের পিতা গিয়াসউদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী নেত্রকোনায় পদায়িত হন এবং আমি যেই স্কুলেই পড়তাম (আঞ্জুমান হাইস্কুল), সেই স্কুলেই ফারুক ভর্তি হন।

এরপর দেখা হয় ঢাকা কলেজে ১৯৪৯ সালে, যেখানে আমরা ভর্তি হই—ফারুক আইএ ক্লাসে, আর আমি আইএসসিতে। মজার ব্যাপার, আমরা দুজনেই একই হোস্টেলে ছিলাম, তখনকার দিনের ঢাকা কলেজের কাছেই, আগামসিহ লেনে। সে বছর আরও যাঁরা আমাদের সহপাঠী হলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন এ বি এম সিদ্দিক (আইএমএফে চাকরিজীবন সমাপ্ত করে এখন ওয়াশিংটন থাকেন), ওয়াহিদুল হক (সদ্য প্রয়াত এককালে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী), গোলাম মোস্তাফা (পরবর্তীকালে সিএসপি হিসেবে কর্মজীবন শেষ করে রাজনীতিতে চলে যান—প্রথম জাতীয় পার্টিতে ও পরে আওয়ামী লীগে এবং একবার জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন) এবং আরও ছিলেন আনিসুর রহমান (বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও প্রথম বাংলাদেশ পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য), সৈয়দ ফজলে আলী (পরবর্তীকালে চার্টার্ড অ্যাকাউনট্যান্ট হয়ে) বাংলাদেশের (পূর্ব পাকিস্তানের সময়েই) প্রথম দুটি সিএ কোম্পানির মধ্যে ছিল একটি ও মুশতাক আহম্মদ (পরবর্তীকালে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে যোগদান করেন—লে. কর্নেল পদে উন্নীত হন, কিন্তু ১৯৭১ সালের প্রথম দিকেই পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর হাতে নিহত হন। বেঁচে থাকলে মুশতাকই হতেন বাংলাদেশ আর্মির জ্যেষ্ঠতম অফিসার। আরও আমাদের সহপাঠী ছিলেন রফিকুল ইসলাম (সদ্য প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদ্‌যাপন কমিটির প্রধান)। আমাদের সঙ্গে আরও পরিচয় হলো সৈয়দ ইশতিয়াক আহমদের। (পরবর্তীকালে বাংলাদেশের ব্যারিস্টার ও অ্যাটর্নি জেনারেল) ও আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ খান, আমাদের এক বছরের প্রবীণ; আরও আমাদের সঙ্গে ছিলেন সুলতান আহমদ (পরবর্তীকাল বাংলাদেশের নৌবাহিনীর প্রধান)।

default-image

মজার বিষয় হলো, আমরা কয়েকজন—ফারুক চৌধুরী, আমি, ওবায়দুল্লাহ খান, মুশতাক আহম্মদ আগামসিহ লেনের হোস্টেলটিতে ছিলাম। দুঃখের বিষয়, ১৯৫১ সালের ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার ফল যখন বের হলো, দেখা গেল আমি আইএসসিতে প্রথম স্থান অধিকার করি, কিন্তু ফারুক, সুলতান, মুশতাক—এই তিনজনই একটি বিষয়ে ফেল করেছে।

আমি সলিমুল্লাহ হলে বিএসসি (অনার্স) ক্লাসে ভর্তি হলাম ফিজিকস পড়তে। কিন্তু আমার দায়িত্ব ছিল, যে তিনজন ফেল করেছিলেন, তাঁদের সপ্তাহে দুই দিন করে প্রাইভেট পড়ানোর। সৌভাগ্য যে পরের বছর সবাই পাস করে গেলেন।

এঁদের মধ্যে ফারুক সলিমুল্লাহ হলে এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন ইংরেজিতে অনার্স ডিগ্রির জন্য, সুলতান চলে গেলেন নৌবাহিনীতে যোগ দিতে এবং মুশতাকও আর্মিতে যোগ দিলেন। ওবায়দুল্লাহ আগেই সলিমুল্লাহ হলে চলে এসেছিলেন ১৯৫০ সালে।

সলিমুল্লাহ হলে আমাদের নতুন জীবন শুরু হলো—যেখানে ফারুক চৌধুরী একাধিক গোষ্ঠীর মাধ্যমে আমাদের বন্ধুমহলকে সম্প্রসারিত করলেন। ফারুক ও মুহিত—দুজনই টেনিস খেলতে ভালোবাসতেন। আমাদের প্রাক্তন ঢাকা কলেজের গোষ্ঠী ছাড়াও আরেকটি গোষ্ঠী সৃষ্টি হলো—যেখানে বেশির ভাগই ছিল সিলেটের। (সিলেট ছিল ফারুকের পৈতৃক বাসস্থানের জেলা)। বলা প্রয়োজন, ফারুকের পিতা গিয়াসউদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী ছিলেন সাবেক আসাম–বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা, যিনি ১৯৪৭ সালে নেত্রকোনার মহকুমা হাকিম হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে কর্মজীবনে অনেক উচ্চ পদে পদায়িত হন। সে কথা পরে বলব।

সিলেট গোষ্ঠীর সঙ্গে ক্রমেই আমার সখ্য বৃদ্ধি পায়। তাঁদের মধ্যে যাঁরা সুপরিচিত তাঁরা ছিলেন প্রয়াত ভিকারুল ইসলাম চৌধুরী (পরবর্তীকালে ব্যারিস্টার ও বিআরএসির প্রথম পরিষদের সদস্য, প্রয়াত স্যার ফজলে হাসান আবেদের বিশিষ্ট বন্ধু—দেশে ও বিদেশে মুক্তিযুদ্ধ আন্দোলনে), প্রয়াত সাফাৎ আহম্মদ চৌধুরী (বাংলাদেশের/পূর্ব পাকিস্তানের) প্রথম অ্যাকচ্যুয়ারি ও গ্রিনডেল্টা ইনস্যুরেন্স কোম্পানির একজন প্রতিষ্ঠাতা, প্রয়াত জাকারিয়া খান চৌধুরী (বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও সাবেক মন্ত্রী), এ এস মাহমুদ (একুশে টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিষ্ঠাতা ও দ্য ডেইলি স্টার–এর প্রতিষ্ঠাতাদের একজন)। আরও আসতেন ওই গোষ্ঠীতে আবদুল বারী (পরবর্তীকালে কূটনীতিক ও রাষ্ট্রদূত), শফিক রেহমান (পরবর্তীকালে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও লেখক, যায়যায়দিন সাপ্তাহিকের সম্পাদক), তুখোড় ছাত্রনেতা আবিদ হোসেন (পরবর্তীকালে সলিমুল্লাহ হলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত) সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে ছুটির দিনে আড্ডা চলত এবং অনেক সময় আমরা চলে যেতাম সিনেমা দেখতে—মুকুল ও রূপমহল সিনেমা হলে। বাংলা, হিন্দি ও ইংরেজি সিনেমা দেখতে। আমাদের, বিশেষ করে ফারুকের প্রিয় রেস্টুরেন্ট ছিল—নবাবপুর রোডের সলিমাবাদ রেস্টুরেন্ট, যেখানে আমরা সুযোগ পেলেই যেতাম কাচ্চি বিরিয়ানি খেতে—১ টাকা ২৫ পয়সা করে প্লেট।

এরপর এল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। যেখানে আমরা সবাই যুক্ত হই এবং আমি ছিলাম এস এম হলে প্রতিষ্ঠিত ভাষা আন্দোলন অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছাত্র, প্রতিদিনের আন্দোলনের কর্মসূচি সবাইকে জানিয়ে দেওয়ার জন্য। আমার ঊর্ধ্বতন নেতা ছিলেন একরামুল আমিন, যিনি কেমিস্ট্রিতে এমএসসি করেছিলেন।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের সমর্থক হিসেবে আমরা সবাই অনেক মিছিলে যোগ দিয়েছি—এবং যেদিন যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের খবর ঘোষণা করা হলো রেডিওতে, আমি তা শুনে বন্ধুদের জানানোর জন্য এমন দৌড় দিলাম যে তাতে আমার বুকে ব্যথার সৃষ্টি হলো। তখন আমাদের অনার্স পরীক্ষা চলছিল, কিন্তু পরের দিন, ডাক্তারের পরামর্শে আমার পক্ষে আর পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব হলো না। অর্থাৎ আমি ছাত্রজীবনে এক বছর পিছিয়ে গেলাম। তবে ফারুক আর আমি আবার একই বছরের ছাত্র হয়ে গেলাম। আমার জন্য সময়টা ছিল কঠিন। কারণ, আমার স্কলারশিপ বন্ধ হয়ে গেল এবং আমার আব্বার পক্ষে হলে থাকা–খাওয়ার খরচের জন্য অতিরিক্ত চাপের সৃষ্টি হলো। এর মধ্যে আমার ছোট ভাই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়েছিল (যা পরবর্তীকালে হয়ে গেছে বুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে।

আমি ভাবলাম যে কোনো প্রাইভেট টিউশনি করে কিছু আয় করা যায় কি না। ফারুককে আমি সেটা বললাম। এমনই সৌভাগ্য যে এক মাসের মধ্যে আমাদের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ডা. আমিনা রহমান আমাকে ডাকলেন। বললেন যে তাঁর ছেলে দার্জিলিংয়ে পড়াশোনা করে এবং সে পরবর্তী মাসে শীতকালীন ছুটিতে ৬–৮ সপ্তাহের জন্য ঢাকা আসবে। আমি কি তাকে ফিজিকস ও ম্যাথমেটিকসে কিছু কিছু বিষয়ে পড়াতে পারব? আমি বললাম, নিশ্চয়ই পারব, কিন্তু সপ্তাহে দুদিন, বিকেলে বা সন্ধ্যায়, ক্লাসের পর। পরবর্তীকালে এই ডা. আমিনা রহমান ফারুক চৌধুরীর শাশুড়ি হয়েছিলেন। ডা. আমিনা রহমানের ছেলে রিয়াজ রহমান (এককালের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী) আমার একমাত্র ছাত্র!

ফারুক চৌধুরীর কথা আলোচনা করতে গেলেই তাঁর পিতা মরহুম গিয়াসউদ্দিন আহম্মদ চৌধুরীর কথা মনে পড়ে—যিনি এককালে তদানীন্তন বগুড়া, যশোর এবং আরও দুটি জেলার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন এবং ঢাকা বিভাগের কমিশনার পদে নিয়োজিত হয়েছিলেন। দক্ষ, প্রতিভাবান, সাহসী, বিনম্র ও একাগ্রচিত্ত একজন প্রশাসক হিসেবে তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। প্রথমে যখন ঢাকায় আসেন, তখন বেইলি রোডে ‘কাহ্‌কাশাম’ নামে একটি সরকারি ভবনে ছিলেন, যে ভবনে একটি তলায় আমার (ভবিষ্যৎ) স্ত্রীর পিতা ও পরিবার থাকত, সমসাময়িক ও সহকর্মী হিসেবে, একই প্রকার পদে। আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন তিনি ফারুকের সহপাঠী হিসেবে।

default-image

ফারুকের পরিবার ছিল একটি অতুলনীয় পরিবার—চার ভাই ও দুই বোনকে নিয়ে—একটি সম্পূর্ণ ‘একান্ত জগৎ’ যেন। আমি যখনই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যেতাম (পরবর্তীকালে যখন আমি নবীন সরকারি কর্মকর্তা), তিনি তাঁর কর্মজীবনের কথা শোনাতেন। একবার (১৯৬০ সালে যখন আমি পূর্ব পাকিস্তানের অর্থ বিভাগে সেকশন অফিসার), ঈদের দিন আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম রিকশায় করে। তোপখানা রোড থেকে বেইলি রোড খুব দূরে ছিল না। যখন চলে আসব, আমাকে তিনি বললেন, ‘চলো, আমি তোমাকে দিয়ে আসব।’ আমি না, না, করলাম—কিন্তু উনি কিছুতেই শুনলেন না। ঈদ উপলক্ষে তাঁর ড্রাইভার ছুটিতে ছিল, তাই তিনি নিজেই গাড়ি চালিয়ে আমাকে পৌঁছে দিয়ে গেলেন!

১৯৫৫ সালে ফারুক ইংরেজিতে অনার্স ডিগ্রিপ্রাপ্ত হন এবং আমি ফিজিকসে অনার্স ডিগ্রি অর্জন করি। কিছুদিন পর ফারুক আমাকে বললেন, চলুন, আমরা সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিসের জন্য পরীক্ষা দিই। আমি বললাম যে আমি তো বিজ্ঞানের ছাত্র, আমার পক্ষে তা সম্ভব না–ও হতে পারে। ফারুক তখন মনে করিয়ে দিলেন যে সে বছরই বিজ্ঞানের দুজন ছাত্র ও আমাদের বন্ধু আতাউল করিম ও শামসুল আলম—একজন ফিজিকস ও অন্যজন কেমিস্ট্রির ছাত্র/ডিগ্রিধারী (আমাদের চেয়ে এক বছরের প্রবীণ) পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে নিয়োগ পেয়েছিলেন, এরূপ পরীক্ষার মাধ্যমে (তাঁরা দুজনেই প্রয়াত)।

কয়েক দিন পর বিষয়টি আমি আমাদের ছাত্রজীবনের বিশিষ্ট বন্ধু (ও পরবর্তীকালে দীর্ঘদিনের সহকর্মী, ২০১১ সালে প্রয়াত), গোলাম কিবরিয়ার সঙ্গে আলোচনা করলাম। কিবরিয়াও পদার্থবিজ্ঞানেরই ছাত্র ছিল। তিনি বললেন, ‘আমিও তা–ই ভাবছি, বিশেষ করে আতাউল করিম ও শামসুল আলমের চাকরি পাওয়া দেখে।’ আমি যখন ফারুককে এটি জানালাম, তিনি আমাকে আরও উৎসাহিত করলেন।

অবশেষে, ১৯৫৫ সালের শেষের দিকে আমরা লিখিত পরীক্ষা দিলাম, যার ফল বের হলো ১৯৫৬ সালের মার্চ মাসের দিকে। [এরপর একে একে হয় সাইকোলজিক্যাল টেস্ট, মেডিকেল টেস্ট ও সর্বশেষ, ভাইভা ভোস (ইন্টারভিউ)]।

১৯৫৬ সালের মার্চ মাসে একদিন সন্ধ্যাবেলা ফারুক দৌড়াতে দৌড়াতে আমার ঘরে এসে বললেন, ‘চলুন চলুন, পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়ে গেছে—এক্ষুনি রেডিওতে শুনলাম আর কাজী ফজলুর রহমান (আমাদের চেয়ে দুই বছরের প্রবীণ) ফার্স্ট হয়ে গেছে।’ জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় যাব? বললেন, ব্রিটিশ কাউন্সিল অফিসে, সেখানে কালকের খবরের কাগজের অ্যাডভান্স কপি ওদের অফিসের বোর্ডে টানিয়ে দেবে রাত নয়টার দিকে। আমরা নয়টার একটু পরেই সেখানে পৌঁছালাম—পুরানা পল্টনে ব্রিটিশ কাউন্সিলের অফিসটি ছিল। দেখলাম, সেখানে আরও অনেকেই গেছেন—যাঁদের মধ্যে ছিলেন মুহিত, সালাহুদ্দীন, গোলাম মোস্তাফা। বাঙালির মধ্যে (তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান) কাজীর পরেই ছিলাম আমি—প্রথম ১০ জনের মধ্যে এবং আবদুল বারী ও ফারুক চৌধুরী (যাঁরা সেই বছর পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে নিয়োজিত হয়েছিলেন) ছিলেন ২৫–৩০–এর মধ্যে। কয়েক মাস পর অন্য সব টেস্ট সমাপ্ত হওয়ার পর যখন পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হলো, দেখা গেল লিখিত পরীক্ষায় আমি সমগ্র পাকিস্তানে প্রথম হয়েছিলাম, কিন্তু ইন্টারভিউতে খুব ভালো নম্বর পাইনি। ফলে সমগ্র পাকিস্তানে আমার স্থান আসে সপ্তম স্থানে। কাজী ফজলুর রহমান (লন্ডন থেকে পরীক্ষা দিয়েছিলেন), কিবরিয়া ও ফারুক চৌধুরী ইন্টারভিউতে অনেক বেশি নম্বর পেয়েছিলেন—প্রকৃতপক্ষে পূর্ব পাকিস্তানের প্রার্থীদের মধ্যে ফারুক চৌধুরী ইন্টারভিউতে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছিলেন, যেটি ছিল তাঁর পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে নিয়োগ পাওয়ার মূল ভিত্তি।

১৯৫৬ সালের আগস্ট মাসে আমাদের নিয়োগপত্র পেলাম—ফারুক পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে, আর আমাকে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে লাহোরে সেপ্টেম্বর মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে যোগদানের নির্দেশ, কিন্তু পিএফএসে নিয়োগপ্রাপ্তদের তার দুই সপ্তাহ আগেই। ফারুক চৌধুরী ও আবদুল বারী তাই আগেই চলে গেলেন করাচিতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ দিতে। সেখান থেকে তাঁরা গেলেন যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন শহরে ফ্লেচারস স্কুল অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসিতে ট্রেনিং এবং ছয় মাস পর প্যারিসে—ফরাসি ভাষা শেখার জন্য। তা–ই ছিল চাকরির নিয়ম।

১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বরের পর থেকে আমরা, সহকর্মী বন্ধুরা, বিশেষ করে আমি ও ফারুক, প্রতি মাসেই চিঠি আদান–প্রদান করতাম। কারণ ছিল নিতান্তই ব্যক্তিগত—দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের প্রথম ছেদ। একটি চিঠির কথা আমার খুব মনে পড়ে। ফারুক চৌধুরী পুরোনো দিনের কথা টেনে এনে আমাদের মন ভারী করে দিতেন। সেটাতে তিনি আমাদের ছাত্রজীবনের দিনগুলোর সখ্যের কথা বলতে বলতে শেষে লিখলেন, ‘আজ আমরা কেউ পঞ্চনদের দেশে, আর কেউ পঞ্চহ্রদের দেশে’।

default-image

সিএসপি অফিসারদের প্রশিক্ষণ/দক্ষতা অর্জন সময়কাল ছিল প্রায় দুই বছর। লাহোরে নয় মাস কাটিয়ে পরবর্তীকালে তিন মাস কাজ করতে হতো জেলা পর্যায়ে, ম্যাজিস্ট্রেটের অফিসে এবং পরবর্তী এক বছর বিলেতে, অক্সফোর্ড কিংবা কেমব্রিজে। আর পিএফএস অফিসারদের যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে Fletcher's School of Law Diplomacy–তে প্রায় এক বছর শিক্ষা গ্রহণ করে কিছুদিন থাকতে হতো প্যারিসে ফরাসি ভাষা শিক্ষার জন্য এবং সেখান থেকে করাচিতে পররাষ্ট্র দপ্তরে ফিরতেন তাঁরা বিভিন্ন দেশে পদায়নের জন্য।

ফারুকের প্রথম পদায়ন ছিল রোম দূতাবাসে এবং ওখানেই তাঁর পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। সেখান থেকে ফারুক গেলেন চীনে এবং তারপর ইউরোপের ব্রাসেলসে ও উত্তর আফ্রিকার আলজেরিয়ায়। আলজেরিয়া থেকে তাঁর পরবর্তী পদায়ন হয় ইসলামাবাদে এবং যাওয়ার পথে কয়েক দিনের জন্য সপরিবার লন্ডন আসেন। আমি তখন লন্ডনে Nuffield Foundation–এর ফেলোশিপ ছিলাম (মার্চ ১৯৬৯ থেকে অক্টোবর ১৯৬৯ পর্যন্ত)। আমরা ইসলামাবাদে ফিরে এসে খুশি হলাম যে ফারুকের ও আমাদের সরকারি বাসা হয়েছে একদম পাশাপাশি। আমার ছেলেমেয়ে ও ফারুকের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে তখন থেকেই বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে—যেমনটি হয়েছিল জীনা ভাবি ও আমার স্ত্রীর সঙ্গে।

ইসলামাবাদে তখন আমাদের খুব কাছেই ছিলেন অনেক বাঙালি কর্মকর্তা—সিভিল, ফরেন ও অন্যান্য সার্ভিসের। দুটি পাশাপাশি রাস্তায় ছিলেন এনায়েত করিম, সামসুল কিবরিয়া, আতাউল করিম, মো. মোহসীন, আবদুর রশীদ, জি এস চৌধুরী, ওবায়দুল্লাহ খান, আবুল আহসান, হুমায়ুন কবীর, সাত্তার ভাই (আমার বড় ভায়রা), হেদায়েত আহমদ, আবদুর রব চৌধুরীসহ আরও কয়েকজন। প্রবীণদের মধ্যে ছিলেন এ কে এম আহসান, সানাউল হক, এস এ খায়ের, মফিজুর রহমান, নুরুল ইসলাম, এ মোমেন, তাবারক হোসেন (পরবর্তীকালে) শফিউল আজম। আমার শিক্ষা ও কর্মজীবনের সবচেয়ে বড় বন্ধু গোলাম কিবরিয়া, তাঁর স্ত্রী নাদেরা বেগম—তাঁরাও ছিলেন। ইসলামাবাদে কর্মজীবনের সময় ও অবস্থান ছিল আমাদের জীবনের একটি নতুন অধ্যায়, তা বললে ভুল হবে না। ওই বয়সের সবচেয়ে আনন্দময় দিনগুলো। আমাদের ছেলেমেয়েদেরও বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে তখন—যার বেশির ভাগ আজও রয়েছে। আমাদের আড্ডার আরও সাথি ছিলেন বন্ধু অধ্যাপক আনিসুর রহমান ও শিল্পী সৈয়দ জাহাঙ্গীর। তবে ফারুক চৌধুরীর বাড়ির পার্টিগুলোই হতো সবচেয়ে আনন্দময়। কারণ, জীনা ভাবি ও ফারুকের অনবদ্য আতিথেয়তা। আর সেগুলো বেশির ভাগই ছিল গানের আসর ও সামাজিক পার্টি।

এর মধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে পাকিস্তানে অনেক পরিবর্তন ঘটে। বিশেষ করে তথাকথিত ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র’ মামলা থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে অব্যাহতি দিতে আইয়ুব খানের সরকার বাধ্য হয়। পূর্ব পাকিস্তানে ১৯৬৯ সালের গণ–আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে জনগণের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ আখ্যায়িত করা হয়। ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিলে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক তৎপরতা বহুগুণ বেড়ে যায় এবং তিনি পূর্ব বাংলার জেলার পথে–প্রান্তরে ভ্রমণ করে জনগণকে ৬ দফা ও ১১ দফার দাবিতে বাঙালির প্রধান ও একমাত্র কর্মসূচি হিসেবে উদ্বুদ্ধ করেন। সেই দিনগুলো ইসলামাবাদে থেকেও আমাদের জন্য ছিল প্রত্যাশা ও উন্মাদনার দিন।

ফারুক ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে কয়েক দিনের জন্য ঢাকা গিয়েছিলেন। ২৪ জানুয়ারি গিয়াসউদ্দিন সাহেব তাঁর দুই ছেলে—ফারুক ও ইনামকে নিয়ে গাড়ি করে সাভার যান। সাভার থেকে ঢাকা ফেরার পথে গাড়িটি দুর্ঘটনায় পতিত হয়। গিয়াসউদ্দিন সাহেব মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ২৭ জানুয়ারি মৃত্যুমুখে পতিত হন। ইনাম ও ফারুক বেঁচে যান এবং কদিনের মধ্যেই ফারুক শোক ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ইসলামাবাদ ফিরে আসেন। দুঃখের বিষয়, মার্চ মাসে যশোর ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত, ফারুক চৌধুরীর ছোট বোন নাসিমের স্বামী কর্নেল আব্দুল হাই পাকিস্তানি সেনাদের হাতে নিহত হন। অল্প সময়ে পরিবারে এত বড় দুর্যোগ ঘটায় ফারুক ও জীনা ভাবি সপরিবার ঢাকা চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাতে সম্মতি প্রদান করে। ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি অফিস ছিল, যেখানে ফারুক চৌধুরীকে পরিচালকের দায়িত্বে নিয়োগ করা হয়।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু লন্ডন থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে ফেরার পথে যাত্রাবিরতি করেন—বিশেষ করে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করার জন্য। মন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদের সঙ্গে ফারুক চৌধুরীও দিল্লিতে আসেন ঢাকা থেকে। সে দিনটি ছিল একটি বিশেষ দিন এবং বঙ্গবন্ধু ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরির সঙ্গেও দেখা করেন, ঢাকার পথে আবার রওনা হওয়ার আগে।

দেশে ফেরার পর বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক নেতা ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে অনেক সময় দিতে হয়। ওই সময় ফারুকের ব্যস্ততাও অনেক বেড়ে যায় এবং বঙ্গবন্ধু ফারুককে তাঁর দায়িত্ব পালনের জন্য অত্যন্ত পছন্দ করতেন বলে ফারুক ও অন্যরা আমাকে (ইসলামাবাদে আটক) জানাত। কারণগুলো ছিল ডেপুটি চিফ অব প্রটোকল হিসেবে পররাষ্ট্র দপ্তরটি পুনর্গঠন ও দায়িত্ব পালনে দক্ষতা ও কঠিন পরিশ্রম। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ডেপুটি চিফ/চিফ অব প্রটোকল হিসেবে সব বৈদেশিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে ফারুক চৌধুরীকে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকতে হয়। পেশাগত, পরিবারগত দিক থেকে ওই সময় ছিল ‘অভিজ্ঞতাপূর্ণ ও বৈষম্যময়’—ফারুক আমাকে বলেছিলেন। আরও বলেছিলেন বঙ্গবন্ধুর ‘নিকট সান্নিধ্য’ পাওয়ার সুযোগ।

কিছুদিন পরই তাঁকে ডেপুটি চিফ অব প্রটোকল হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অতঃপর তাঁকে লন্ডনে ডেপুটি হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৭৩–৭৪ সালে দাপ্তরিক কাজে লন্ডন দিয়ে যাতায়াত করতে হতো এবং একাধিকবার আমি ফারুক ও জীনা ভাবির আতিথেয়তার সুযোগ গ্রহণ করি।

default-image

আমরা সবাই জানি, ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে বাংলায় বক্তৃতা প্রদান করেন এবং ফারুক চৌধুরীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তার ইংরেজি অনুবাদ করতে। বক্তৃতাটি ছিল ১৬ মিনিটের এবং বঙ্গবন্ধু ফারুককে হাসতে হাসতে বলেছিলেন, ‘মনে করবে, ওই সময়টুকুর জন্য তুমিই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।’

১৯৭৫ সালের মে মাসে Commonwealth Heads of Governments Meeting (CHOGM), জ্যামাইকা দ্বীপের রাজধানী কিংসটনে অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধুর দলে ছিলেন জাতিসংঘে নিযুক্ত স্থায়ী প্রতিনিধি এস এ করিম, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন এবং লন্ডন থেকে ফারুক চৌধুরীকে সেখানে যোগ দিতে বলা হয়েছিল। অন্যদের মধ্যে ছিলাম আমি এবং বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব ড. ফরাসউদ্দিন। সেটিই ছিল বঙ্গবন্ধুর শেষ বিদেশযাত্রা।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর সরকারে ও আমলাতন্ত্রে বহু পরিবর্তন ঘটে এবং ফারুকের দায়িত্ব পালনের পটে অনেক কিছু বদলে যায়। ১৯৭৬ সালের জুন মাসে তাঁকে আবুধাবিতে মহাপরিচালকের মর্যাদায় নিয়োজিত করা হয়। ১৯৭৭ সালের জুলাই মাসে আমি সপরিবার ওয়াশিংটন (বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক হিসেবে) যাওয়ার পথে ফারুকের সঙ্গে দুই দিন ছিলাম।

কিছু নতুন প্রসঙ্গ সম্বন্ধে এবার বলতে হয়। ১৯৭৬ সালের ডিসেম্বর মাসে জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক শাসকের কর্মভার গ্রহণ করেন এবং ১৯৭৭ সালের এপ্রিল মাসে নেন দেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব। সে বছরের জুন মাসে লন্ডনে কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলন হয় এবং তাঁর অভিজ্ঞতার জন্য ফারুক চৌধুরীকে বাংলাদেশ দলের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এরপর রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমান ইউরোপের কয়েকটি দেশ সফর করেন—অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহায়তার জন্য। একইভাবে বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষে তিনি আফ্রিকার কিছু দেশ ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশ সফর করেন। ফারুক আমাকে বলেছিলেন যে বিদেশে ভ্রমণকালে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে মুখোমুখি আলোচনায় বেশ গুরুত্ব দিতেন। একসময় দেখা গেল যে বৈদেশিক সম্পর্ক স্থাপনে, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর নীতি অনুসরণ করতে চেয়েছিলেন। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধু ভারত ভ্রমণ করেন এবং রাজভবনে আনুষ্ঠানিক একটি ভোজসভায় তিনি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেছিলেন এবং বলেছিলেন, যত শিগগির সম্ভব করে ফেলতে।

ফারুকের কাছ থেকে আমি জেনেছিলাম যে ১৯৮০ সালের মে মাসের প্রথম দিকে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর সরকারপ্রধানদের কাছে বিশেষ দূত মারফত একটি বার্তা পাঠিয়েছিলেন—ভারত, নেপাল, পাকিস্তান, ভুটান, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কায়। চিঠির ভাষা কিছু কিছু ভিন্ন ছিল কিন্তু ফারুকের কথায়, ‘একই অর্থবহ চিঠি’। ওই চিঠিগুলো খসড়া প্রস্তুতিতে ফারুকের বিশেষ ভূমিকা ছিল বলে আমার মনে হয়েছে এবং সেটি ছিল ‘বাংলাদেশের গঠনমূলক পররাষ্ট্রনীতির জ্বলন্ত স্বাক্ষর’। চিঠিতে উল্লেখ করা ছিল বিভিন্ন জাতিসমূহের ঐক্যগোষ্ঠীর কথা—যেমন ইইসি (ইউরোপিয়ান অর্থনৈতিক গোষ্ঠী), আসিয়ান (দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়ায়), আফ্রিকান ঐক্য সংস্থা, বেনেলুক্স (বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও লুক্সেমবার্গ) ইত্যাদি।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাঁর প্রস্তাবিত গোষ্ঠীর নাম দিয়েছিলেন ‘SARC’ (South Asian Regional Cooperation), যা পরবর্তী সময়ে বাস্তবায়িত হয়েছিল SAARC হিসেবে (South Asian Association for Regional Cooperation)।

রাষ্ট্রপতি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ফারুকের কূটনৈতিক দক্ষতা সম্বন্ধে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিলেন, যে সম্বন্ধে আমি বিভিন্ন সূত্রে অবগত হয়েছিলাম। ১৯৮১ সালের মার্চ মাসে প্রবীণ কূটনীতিক হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, যিনি জেদ্দায় রাষ্ট্রদূত ছিলেন, পররাষ্ট্রসচিব নিযুক্ত হন এবং তাঁর স্থলে ফারুক চৌধুরীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। জিয়াউর রহমান (রাষ্ট্রপতি) ফারুককে নাকি বলেছিলেন যে সৌদি আরবের কাছে বাংলাদেশের অনেক প্রত্যাশা রয়েছে। অপ্রত্যাশিতভাবে ১৯৮১ সালের ৩১ মে চট্টগ্রামে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নির্মম হত্যার পর ফারুক চৌধুরী বলেছিলেন, সেই ঘটনাটি ‘ইতি টানল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি কর্মময় অধ্যায়ের’। কিছুদিন পর পদোন্নতির ভিত্তিতে ১৯৮৪ সালের ৭ অক্টোবর ফারুক চৌধুরী আতাউল করিমের (বাংলাদেশের কূটনৈতিক ক্ষেত্রে আরেকটি উজ্জ্বল নক্ষত্র) কাছ থেকে পররাষ্ট্রসচিবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

কিছুদিনের মধ্যেই তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ SARC সম্বন্ধে দেশের ভেতরে ও বাইরে উচ্চপর্যায়ে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর সহযোগিতা স্থাপনে সচেষ্ট হন। পররাষ্ট্রসচিব ফারুক চৌধুরী সরকারের এই প্রস্তাব লিখিতভাবে নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার সব কটি দেশ সফর করেন। তাঁর ভাষায়, ১৯৮৫ সালের সারা বছরই আমাকে সফর করতে হয়েছে সার্কের বিশাল ভূখণ্ডে, এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে; বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব হিসেবে সার্ক প্রতিষ্ঠার দায়িত্বে এবং ঢাকায় একটি শীর্ষ সম্মেলন করতে। বাংলাদেশের বিশেষ অনুরোধে সার্ক এলাকার রাষ্ট্রপ্রধান/সরকারপ্রধানগণ এই প্রস্তাবে সম্মতি প্রদান করেন। এই প্রসঙ্গে একাধিকবার পররাষ্ট্রসচিব/মন্ত্রীকে বিভিন্ন আলোচনা সভায় যোগ দিতে হয়—দেশের ভেতরে ও বাইরে।

১৯৮৫ সালের ১০ মে সার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বিবেচনার জন্য পররাষ্ট্রসচিবগণ আরও একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। সার্কের পরিচয় এত দিন ধরে চলে আসছিল SARC (South Asian Regional Cooperation) হিসেবে। তাঁরা প্রস্তাব করলেন যে ‘উচিত হবে সেই নামে আরও একটি “A” যোগ করে প্রতিষ্ঠানটিকে South Asian Association for Regional Cooreration (SAARC) বলে আখ্যায়িত করার’। প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হলো।

default-image

পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো যে সার্ক শীর্ষ সম্মেলন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে—সেই বছরের ডিসেম্বরের ৭ ও ৮ তারিখে। ঢাকায় সম্মেলনটি হয় সংসদ ভবনে এবং সার্কের জন্ম হয় ৮ ডিসেম্বর বিকেল চারটায়। আমারও সেখানে কিছু দায়িত্ব পালনের জন্য অন্য কর্মকর্তা ও মন্ত্রীদের সঙ্গে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। ফারুকের ভাষায়, ‘সেটা ছিল একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত।’ ফারুক আরও লিখেছেন, ‘১৯৮৫ সাল ছিল আমার জন্য একটি কর্মবহুল বছর। তবে সার্কের প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাপ্তি সন্তুষ্টির একটি বছর!’

কর্মজীবনে ফারুক আর আমি বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে একসঙ্গে কাজ করেছিলাম—১৯৬৯ সালে ইসলামাবাদে, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর কর্মকর্তার দলে জ্যামাইকাতে CHOGM উপলক্ষে, ১৯৮৩ সালে ওআইসি শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষে, ১৯৮৫ সালে সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের জন্য।

পররাষ্ট্রসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ফারুকের সর্বশেষ পদায়ন ছিল ভারতে হাইকমিশনার হিসেবে দীর্ঘদিন। ১৯৯১ সালে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের রাষ্ট্রপতি থাকার সময়কালসহ দায়িত্ব পালন করে ১৯৯২ সালে ফারুক চাকরিজীবন থেকে অবসর নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন।

ঢাকায় এসে তাঁর ধানমন্ডির বাসায় অবস্থান নিলেন—যেটি ছিল (তখনকার দিনে) ৩২ নম্বর রাস্তা এবং আমি আমার পরিবারসহ (যে বাড়িটিতে দীর্ঘ ১৮ বছর কাটিয়েছি) ছিলাম (তখনকার দিনের) ২৭ নম্বর রাস্তায়। আমাদের বাড়ি ছিল খুবই কাছাকাছি এবং প্রায়ই আড্ডা দিতাম—অন্য বন্ধুবান্ধবসহ।

চাকরিজীবনে ফারুক ছিলেন একজন দক্ষ ও সফল কূটনীতিক। অনেক কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের স্বার্থ বজায় রেখে অনেক কূটনৈতিক সমস্যার সমাধানে, বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায়/দেশে আনন্দ ও বিষাদের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন ফারুক চৌধুরী। অবসরজীবনে ফারুক চৌধুরীকে ব্র্যাকের চেয়ারপারসন স্যার ফজলে হাসান আবেদ উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেন বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহায়তার জন্য—দেশে ও বিদেশে। একবার ১৯৯৬ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ করার জন্য স্যার আবেদ আমাকে ও ফারুককে তাঁর সহযোগী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার জন্য নিয়ে যান। আমরা বোস্টন, মিজৌরি, পেনসিলভানিয়া এবং আরও দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আলোচনা করি—যা হয়েছিল বেশ ফলপ্রসূ।

দেশে, ধানমন্ডিতে আমরা বিভিন্ন ধরনের আড্ডা দিতাম—বড়, ছোট, ফরমাল, ইনফরমাল ও ঢাকা ক্লাবে। আমার স্ত্রী, জীনা ভাবি ও তাঁদের আর এক বান্ধবী (হামিদা রহমান—ব্যারিস্টার হাবিবুর রহমানের স্ত্রী) মিলে বেশ কিছুদিনের জন্য ‘ত্রয়ী’ নামে একটি অত্যাধুনিক ফ্যাশন হাউস (পোশাকীয়) স্থাপন করেন। যা ছিল তিন বছরের অধিক। আড্ডার গোষ্ঠীতে একটি ছিল ধানমন্ডি, দ্বিতীয়টি ছিল আমাদের সহকর্মী (অবসরপ্রাপ্ত) মনজুর মোরশেদের বাড়িতে এবং তৃতীয়টি ছিল ঢাকা ক্লাবে। ধীরে ধীরে পরিবহনের যানজটের জন্য ঢাকা ক্লাবের আড্ডা হতো দিনের বেলায়।

চলে যাওয়ার বছর দুই আগে থেকে ফারুক প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন। তার আগে প্রায় এক যুগের বেশি সময় ব্র্যাকের উপদেষ্টা হিসেবে বেশ সুনাম অর্জন করেছিলেন।

লেখক ফারুকের আবির্ভাব হয় অবসরকালেই। তাঁর লেখার ধরন ও স্টাইল ছিল ভিন্নধর্মী, ‘কাব্যিক’ বলা যায়। আমার প্রিয় বইগুলো হলো, জীবনের বালুকাবেলায়, স্বদেশ, স্বকাল ও স্বজন, অনাবিল মুখচ্ছবি, প্রিয় ফারজানা (তাঁর মেয়ের নাম)। ফারুকের লেখা শুরু হয় শফিক রেহমানের যায়যায়দিন সাপ্তাহিকের মাধ্যমে, পরে দৈনিক প্রথম আলোতে। লেখার জন্য ফারুক আইএফআইসি ব্যাংক পুরস্কার পেয়েছিলেন। চলে যাওয়ার ৭–৮ মাস আগের সময় বেশ কষ্ট পেয়েছেন; তবু লেখা ছাড়েননি। মৃত্যুর পর দেশের বিশিষ্ট দৈনিক কাগজগুলোতে তাঁর জীবনবৃত্তান্ত ও কর্মক্ষেত্রে সাফল্যের ওপর অনেকেই লিখেছিলেন।

ফারুকের রাজনৈতিক সচেতনতার কথা না বললে আলোচনাটি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আমাদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও চেতনা ছিল একই অঙ্গের—যদিও আমি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করিনি, শুধু ২০০৬ সালের নাগরিক আন্দোলন ছিল এর ব্যতিক্রম। ‘রূপকল্প ২০২১’ প্রস্তাবগুলো উত্থাপন, বর্ণনা ও সংকলনে আমাকে যথেষ্ট সময় দিতে হয়েছিল—সিপিডির বোর্ড সদস্য হিসেবে, যে সংগঠনটির সঙ্গে এখনো যুক্ত আছি ১৯৯৫ সাল থেকে। ফারুক চৌধুরী ছিলেন আরও সক্রিয়। নব্বইয়ের দশকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ফারুক আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। একসময় তিনি ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির চেয়ারম্যানও ছিলেন। ২০০৮ সালের শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের পর জননেত্রী শেখ হাসিনা আবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ায় আমার মতোই ফারুক উল্লসিত হয়েছিলেন। অতঃপর ফারুক সর্ব সময়ের জন্য ব্র্যাকে ফিরে যান এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বিশ্বের বৃহত্তম বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক থেকেই নিজেকে ব্যস্ত ও নিয়ত রাখেন, দেশসেবায় ও দরিদ্রদের সহায়তায়। আমার আজীবন বন্ধু ফারুক চৌধুরী ২০১৭ সালের ১৭ মে তারিখে চলে গেলেন না–ফেরার দেশে।

—এম সাইদুজ্জামান

সাবেক অর্থমন্ত্রী, বাংলাদেশ সরকারের সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনাসচিব এবং সিপিডি ট্রাস্টি বোর্ডের বর্তমান সদস্য।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন