default-image

করোনাভাইরাস শুধু আমাদের নয়, বিশ্বের জন্যই এক নতুন অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতা আমাদের স্বাস্থ খাতের কী কী চ্যালেঞ্জকে সামনে নিয়ে এল?

ফেরদৌসী কাদরী: করোনাভাইরাস অনেক চ্যালেঞ্জ আমাদের সমনে নিয়ে এসেছে। শুরুতে আমরা ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থা এ ধরনের একটি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল না। বিশ্বের অধিকাংশ দেশই আসলে প্রস্তুত ছিল না। আমরা দেখেছি যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, স্পেন বা ফ্রান্সের মতো দেশগুলোতে কীভাবে মানুষ মারা যাচ্ছিল। এ ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমরা কখনো যাইনি। মার্চের শুরুতে বাংলাদেশে সংক্রমণ ধরা পড়ার পর আমাদের হাসপাতালগুলোও রোগীতে ভরে যেতে শুরু করল। এই পরিস্থিতি মোকাবিলাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তখন আমাদের পরীক্ষা করার মতো পর্যাপ্ত ল্যাব ছিল না, প্রশিক্ষিত জনগোষ্ঠী ছিল না। কিন্তু সেই ল্যাব আমরা বাড়িয়েছি। চিকিৎসা কীভাবে করতে হবে, সেটা আমাদের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা দ্রুত আত্মস্থ করেছেন। জনগণের অনেকের মধ্যেও সচেতনতা বেড়েছে। এসব চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে আমরা তা মোকাবিলা করে যাচ্ছি।

বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলছেন ভবিষ্যতে এ ধরনের আরও ভাইরাস আসতে পারে, এসব মাথায় রেখে আমাদের সামনের করণীয় কী?

ফেরদৌসী কাদরী: অন্য অনেক দেশের সঙ্গে তুলনা করলে এ পর্যন্ত আমরা ভালোভাবেই পরিস্থিতি সামাল দিয়েছি। অনেকে কিছু শিখেছি। আসলে সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা আমাদের কাছে এখনো পরিষ্কার নয়। তবে করোনা আমাদের শিখিয়েছে যে, এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের কোনো প্রস্তুতিই ছিল না, সেই ঘাটতিগুলো দূর করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিগুলো নিতে হবে। করোনার কারণে আমরা ল্যাবের সংখ্যা বাড়িয়েছি, অনেক ল্যাব সক্রিয় ছিল না, সেগুলোকে কার্যকর করা হয়েছে। আমি মনে করি, এই সক্রিয়তা ধরে রাখতে হবে। প্রশিক্ষিত জনবল একটা বড় সমস্যা। ফলে প্রশিক্ষণের দিকটিকে মনোযোগ থাকতে হবে। আমাদের চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মীরা এ সময়ে অনেক কিছু শিখেছেন, এই শেখার ধারাবাহিকতা অব্যাহতভাবে ধরে রাখতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ও সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় কীভাবে কাজ করতে হয়, সেটা তারা যথেষ্ট দায়িত্বশীলতার সঙ্গে করেছেন। তবে এ ক্ষেত্রে আরও অ্যাডভান্স প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। নতুন রোগের ব্যাপারের সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে। গবেষণা কার্যক্রম অব্যাহত না রাখলে নতুন রোগ সামাল দিতে সমস্যা হবে।

বিজ্ঞাপন
এখন ওয়ান হেলথ ধারণা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। প্রাণী ও প্রকৃতি থেকে মানুষের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে পড়ার বিপদ সামনের দিনগুলোতে বাড়তে পারে।

গবেষণা অবকাঠামোর ক্ষেত্রে কী করা জরুরি?

ফেরদৌসী কাদরী: এখন ওয়ান হেলথ ধারণা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। প্রাণী ও প্রকৃতি থেকে মানুষের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে পড়ার বিপদ সামনের দিনগুলোতে বাড়তে পারে। ফলে এ ক্ষেত্রে গবেষণায় সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। আগেই বলেছি করোনার কারণে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা উদ্যোগী হয়েছি এবং তা ধরে রাখতে হবে। তবে নতুন গবেষণার জন্য আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে গবেষণায় যেন আমরা পিছিয়ে না পড়ি। আমাদের দেশে উচ্চ মাত্রার বায়ো সেফটি নিশ্চিত করে এমন ল্যাব নেই। এ ধরনের ল্যাব গড়ে তুলতে হবে। এটা জাতীয় পর্যায়ে করতে হবে, যাতে বিভিন্ন ক্ষেত্রের গবেষক ও বিজ্ঞানীরা প্রয়োজন অনুযায়ী তা ব্যবহার করতে পারেন। চিকিৎসা গবেষণার ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে আমাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। প্রাণী নিয়ে গবেষণা করা যায় সে ধরনের উচ্চমান ও নিরাপত্তা সংবলিত অ্যানিমেল সেন্টার গড়ে তুলতে হবে। আমি মনে করি এর জন্য তহবিলের অভাব হবে না। সরকার উদ্যোগ নিলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের যুক্ততা ও সাহায্য–সহযোগিতা পাওয়া যাবে। বায়ো সেফটি ল্যাবের (বিসিএল) বিভিন্ন মাত্রা রয়েছে। ভারতে বিসিএল ৩ ও ৪ পর্যায়ের ল্যাব আছে, কিন্তু আমাদের দেশে নেই।

টীকা-ভ্যাকসিন তৈরি ও গবেষণায় আমাদের সক্ষমতা বাড়ানোর পথ কী?

ফেরদৌসী কাদরী: টিকা ও ভ্যাকসিন তৈরির গবেষণায় অনেক অর্থের প্রয়োজন হয়। এ ব্যাপারে আমাদের দেশীয় কোম্পানিগুলোকে সাহস জোগাতে হবে ও উৎসাহিত করতে হবে। এ জন্য সরকারের তরফ থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভ্যাকসিন গবেষণার জন্য প্রি কোয়ালিফায়েড সনদ নিতে হবে। গবেষণার জন্য হাই কনটেনমেন্ট ফ্যাসিলিটি তৈরি করতে হবে।

default-image

আপনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টিকাবিষয়ক বৈজ্ঞানিক উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর মানুষ কীভাবে টিকা পাবে?

ফেরদৌসী কাদরী: অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশগুলোর মানুষের টিকা পাওয়ার জন্য কোভ্যাক্স নামের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ আছে। বলা যায়, টিকার মজুত গড়ে তোলার জন্য এই উদ্যোগ। এই উদ্যোগ থেকে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর ২০ শতাংশ মানুষের টিকা পাওয়া নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। ৯টি কোম্পানির এ পর্যন্ত কোভ্যাক্স উদ্যোগে টিকা দেওয়া বা বিক্রিতে সম্মতি দিয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে ২০০ কোটি ডোজ টিকার দরকার হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রতিটি দেশের করোনা মোকাবিলায় যুক্ত সামনের সারির কর্মী ও ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর টিকা পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। তাঁদের মধ্যে আছেন স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ, সাংবাদিক, বয়স্ক মানুষ এবং অসংক্রামক রোগে ভোগা মানুষ। বাংলাদেশ সরকার নিজ উদ্যোগে টিকা কেনা এবং কোভ্যাক্স উদ্যোগ থেকে টিকা পাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বলে জেনেছি। সেই টিকা যেন মানুষ ঠিকমতো পায়, সেদিকেও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতি থাকা উচিত বলে আমি মনে করি। এখন থেকে প্রস্তুতি নিলে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের মানুষকে টিকা দেওয়া সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের সুনাম আছে।

প্রথম আলো: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

ফেরদৌসী কাদরী: আপনাকেও ধন্যবাদ।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0