আলমগীর হোসেনের ঘোড়াটি টমেটোবোঝাই ঠেলাগাড়ি বাজারে নেবে। পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের চর, মধ্যগজারিয়া সদর উপজেলা, জামালপুর। ৪ ফেব্রুয়ারি
আলমগীর হোসেনের ঘোড়াটি টমেটোবোঝাই ঠেলাগাড়ি বাজারে নেবে। পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের চর, মধ্যগজারিয়া সদর উপজেলা, জামালপুর। ৪ ফেব্রুয়ারিছবি: লেখক

বাদামি রঙের নামহীন ছোটখাটো ঘোড়াটা আসলে হয়তো ঘাড় ত্যাড়া বিদ্রোহী দুষ্ট স্বভাবের। কিংবা হয়তো তার অভিমান হয়েছিল। আবার হতে পারে, সে নেহাতই ক্লান্ত ছিল।

পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের চরে ১০ মণ টমেটো বোঝাই ঠেলাগাড়ি তার ঘাড়ে জুতে দেওয়ার পর ঠেলাগুঁতা খেয়ে সে ছোটা শুরু করল বটে, কিন্তু গাড়িটা কাত হয়ে পড়ে গেল।

সেই নাটকীয়তার টানে এক বিকেলের কাকতালীয় পরিচয় আরেকটু দূর গড়াল। ১৫ বছর আগেকার গরু চুরির ‘চক্রান্ত’ মামলায় জুলেখা বেগমের স্বামী হজরত আলীর সম্প্রতি জেলে যাওয়ার গল্পটা ক্রমশ জানা হলো।

আর, এক সন্ধ্যায় বাজার থেকে কেনা চাষের রুই আর লাউয়ের তরকারি দিয়ে রাতের খাওয়া সারার আগে মুঠোফোনে তাঁদের বড় ছেলে তরুণ মো. ছামিদুল ইসলাম বললেন তাঁর স্বপ্নের কথা।

গল্পের পেছনে আরও গল্প থাকে। গল্প থাকে গল্পের পরে, আশপাশে। শুরুটা যদি-বা ধরা যায়, শেষ হয়েও শেষ হয় না।

বিজ্ঞাপন

পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের কাছে

বৃহস্পতিবার (৪ ফেব্রুয়ারি) আমরা ঢাকা থেকে গাড়িতে চার-পাঁচ ঘণ্টার পথ পেরিয়ে জামালপুর সদর থানার নান্দিনা বাজারের কাছে খড়খড়িয়া গ্রামে ভাইয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম।

বিকেলে বেরোই ব্রহ্মপুত্রের চর দেখতে। ইঞ্জিনের নৌকা থেকে দেখি, নদীর এক ধারে অজগরের মতো পাইপ এলিয়ে আছে। সরকার নদী খনন করছে, এটা বালু সরানোর পাইপ।

আমাদের স্থানীয় অভিভাবক বাদল সরকার তাঁর ৬৫ বছর বয়সে এ অঞ্চলের ব্রহ্মপুত্রে এই প্রথম খনন হতে দেখছেন। তাঁর ছোটবেলায় নদীতে লঞ্চ চলত। তারপর নদটি মরতে মরতে ক্রমে শীতকালে পায়ে হেঁটে পেরোনো যেত।

default-image

খননের দৌলতে এই শীতে এবার শীর্ণ নদটি কিছু গভীরতা ফিরে পাচ্ছে। নির্মাণকাজের জন্য ব্রহ্মপুত্রের বালুর সুনাম আছে। সেই বালুর ব্যবসারও গল্প আছে। বড়সড় গল্প। বড় বড় মানুষ আর তাঁদের স্নেহধন্য আঁতিপাঁতি গংয়ের গল্প।

তবে এ দেশে সেসব এবং আরও বড় হর্তাকর্তা-বিধাতাদের নানান কেচ্ছাকাহিনি তো বাতাসে উড়ছেই। আমরা শেষ শীতের আমেজে সুখে ঘুরতে গিয়েছি, সেসব গল্প থাক।
করোনাতাড়ানি মুখোশ এঁটে শাল মুড়ি দিয়ে নৌকার গলুইয়ে বসে একলা হাঁসের ডুব দিয়ে মাছ ধরা দেখি। ও পাড়ে বালুর চরে এক ঝাঁক হাঁস তখন ডানা ঝেড়ে ঘরে ফেরার জন্য তৈরি হচ্ছে।

খাড়া পাড়ির ওপরে কলাগাছের ঘেরে কয়েকটি বাড়ি। তিরের মতো ছুটে যায় এক বালক। পাড়ের কাছের পানিতে বড় বড় বাঁশের বেড় দিয়ে ফাঁদ পাতা। ফাঁদের তেরছা কোণের মুখে জাল বসানো রয়েছে।

default-image

বড় মাছ ফাঁদে ঢুকে পড়লে লাফ দেবে আর জালে পড়বে। জালের পিছে নাও বাঁধা। টিনের ছইয়ের মাথায় ছোট একটি সোলার প্যানেল।

লাল ছাপা শাড়ি পরা এক নারী পাড় বেয়ে নেমে বালতিতে নদীর মাটি তোলেন। কেন, তা কে জানে। তীরের রেখায় মাঝেমধ্যে ভুট্টার চারা আর টমেটোর মাচার সারি চোখে পড়ে।

default-image

উঁচু পাড় কোথাও পানিতে খাড়া নেমেছে, কোথাও ঢালু হয়ে। কোথাও বা অনেক দূর ছড়ানো বিরান নিচু তট পানির সঙ্গে কথা বলছে। মোটামুটি ধু ধু একটা জায়গা বেছে সদলবলে চরে নামি। মাঝি বলেন, এর নাম আলগির চর।

বালু-পানির একটুকরো কাদাজমিতে কাঠি দিয়ে নিজেদের নাম লিখি। তারপর দু-এক খাবলা হলুদ শর্ষে, নীল কলাইয়ের ফুল আর সবুজ জংলার ঢাল বেয়ে টমেটোখেতে পৌঁছাই।

ঘোড়ার নাম কী?

দুই সারি ফলন্ত হাইব্রিড টমেটোর মাচার মধ্য দিয়ে সিঁথির মতো পথ উঠে গেছে গ্রামের দিকে। পথের মুখে বাদামি ঘোড়াটি রুক্ষ বালুমাটিতে ঘাস খুঁটে খাচ্ছে তখন। তার লাগাম যার হাতে শক্ত করে ধরা, সেই তরুণের নাম আলমগীর হোসেন।

ও ধারে পলিথিনের ওপরে একটি ওজনযন্ত্র, মাটিতে গড়াচ্ছে বাতিল কিছু টমেটো। একটা ঠেলাগাড়িতে স্বচ্ছ কাপড়ে ঢাকা বাজারমুখী টমেটোর ঝুড়িগুলো বাঁধাছাঁদায় ব্যস্ত আলমগীরের দুই ভাই।

ঘোড়াটিকে সেখানে টেনে নেয় আলমগীর। তার হাতে ছিপছিপে ছোট একটি চাবুক। সে উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। কৃষিকাজও করে। ঘোড়া দিয়ে সে নিজেদের ফসল বাজারে নেয়, অন্যের ‘খ্যাপ মারে’।

default-image

ঘোড়াটি বড় সুন্দর। বিকেলের নরম আলো ছলকে তার বাদামি রং কখনো লালচে দেখায়। সে কেবলই মাথা ঝুঁকিয়ে বালু খোঁটে ঘাসের খোঁজে। তার গলার ঘণ্টি ঝুনঝুন বাজে।

আলমগীরকে জিজ্ঞাসা করি, ঘোড়ার নাম কী? সে হেসে ফেলে। বলে, ‘ঘোড়ার তো নাম নাই।’ পেছন থেকে কেউ ব্যাখ্যা করে, ‘ঘোড়া ঘোড়া-ই!’

ইতিমধ্যে আলমগীরের মা জুলেখা বেগম থালাভর্তি লাল-সবুজ টমেটো নিয়ে আসেন শহুরে অতিথিদের খাওয়ানোর জন্য। বলেন, ‘আমরা কাজ করি; সমানে খাই তুইলা তুইলা।’ একটায় কামড় বসাতে মিষ্টি রসে মুখ ভরে যায়!

বড় মেয়ে হেলেনা খাতুনের বিয়ে হয়ে গেছে, নাইয়র এসেছেন। মাঠে জুলেখার পুরো পরিবার হাজির, বাদে ছেলেমেয়েদের বাবা। মা বলেন, ‘স্বামী জেলত।’

জুলেখা স্বামীর জেলে যাওয়ার গল্পও বলেন। তবে গড়গড়িয়ে বলা আঞ্চলিক ভাষার সবটা কথা বুঝতে পারি না। শুধু বুঝি, ‘মামলা গেছিল গা। আবার এত দিনে ধইরা লয়া গেছে গা।’ চুরির অভিযোগে ‘মিথ্যা কেস ফাঁসাইছে।’

default-image

সবার ছোট ছেলেটি, যার নাম জুয়েল রানা, টমেটোর ঝুড়িতে শেষ বাঁধন দিচ্ছিল। তাকে দেখিয়ে মা বলেন, মামলার সময় ‘তিন মাসের কোলো এইডা।’ সে ছেলে এখন ক্লাস এইটে পড়ে।

জুলেখার পরনে লম্বা সবুজ জামা, ওড়নায় ঘেরা মুখে সোনার নাকছাবিটি ঝকমক করে। তাঁকেও ঘোড়ার নাম জিজ্ঞাসা করি। হেসে ফেলে তিনি ছেলেদের জিজ্ঞাসা করেন, ‘ঘোড়ার নাম দাও নাই বাবা?’ আমাকে বলেন, ‘ডাকে “ঘোড়া”!’

বড় ছেলে মো. ছামিদুল ইসলাম দুই বছর হয় এসএসসি পাস করে পুরোপুরি কৃষিকাজে লেগেছেন। তাঁদের অংশের চর ও গ্রামের নাম মধ্যগজারিয়া। সদর থানার ৪ নম্বর তুলসীরচর ইউনিয়ন।

default-image
বিজ্ঞাপন

চর গোবিন্দবাড়ি, মধ্যগজারিয়া, রেহাইগজারিয়া, বাঘচর, সাহেবের চর—অনেকগুলো গ্রামে ছড়ানো এই চরাঞ্চলের নাম আলগির চর। কিন্তু তা লোকমুখে, ‘এমনে কোনো নাম কাগজে নাই।’

এত কিছুর এত নাম আছে, তো ঘোড়ার একটা নাম নাই? ছামিদুলও হাসেন। বলেন, ‘ঘোড়ার নাম তো ঘোড়া-ই। তবু চায়না দেশের ওরাঘোড়ার নাম রাখে, কারণ ওরা ঘোড়ায় একটু শিকারি করে তো!’ গাড়ি টানা ঘোড়ার নাকি নামকরণ চলে না।

ঘোড়ার অসহযোগ, মানুষের জয়

বাঁধাছাঁদার শেষে জুয়েলের সাহায্যে ছামিদুল ঠেলাগাড়ি সোজা করেন। টমেটো উঠেছে ১০ মণ, যা কিনা ঘোড়াটি টেনে নেবে গ্রামের ওপারে আনন্দবাজারে সেতুপথে আসা পাইকারের ট্রাকের কাছে।

আলমগীর ঘোড়াটি টেনে আনলে তিন ভাই মিলে তাকে গাড়িতে জোতে। পিঠের ওপর বসানো গাড়ির আংটায় দড়াদড়ি কষে বাঁধা হতে থাকলে ঘোড়া ঘাড় বেঁকিয়ে ঝাঁকি দিয়ে ওঠে।

আলমগীর বলে, ‘জাম্প করব, অ্যাই, অ্যাই, রশি দে!’ জুয়েল তার হাতে লিকলিকে চাবুকটা তুলে দেয়। একটু পরই অবশ্য বোঝা গেল, গাজরের লোভও দেখাতে হতো।
সিঁথিপথে উঠতে হলে গাড়ির মোড় ঘোরাতে হবে। ছামিদুল পেছন থেকে ঠেলেন। দুই পাশ থেকে ঠেলে আলমগীর আর জুয়েল। তিনজনের ঠেলাগুঁতায় ঘোড়া টলমল কদম ফেলে।

১০ মণ বোঝা নিয়ে গাড়িটি ঘোরে। এবং তৎক্ষণাৎ কাত হয়ে পড়ে। ঘোড়া ঘাড় বেঁকিয়ে বালুতে পা গেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। আলমগীর তার পায়ে ছপাৎ ছপাৎ চাবুক মারে। গাড়ি তো কুপোকাত, ঘোড়ার লাগাম ছুটিয়ে দিলে সে নির্বিকার চিত্তে ঘাস খুঁটে খুঁটে চরে বেড়ায়।

default-image

পথচলতি দু-একজন দাঁড়ান, কেউ হেঁটে চলে যান। তিন ভাই আর জুলেখাসহ আটজন নারী-পুরুষ একযোগে ‘ও-ও-ও’ ধ্বনি তুলে গাড়িটি খাড়া করানোর যুদ্ধে নামেন। গাড়ির গ-ও নড়ে না।

সুনসান চরে ঠেলুড়েদের ‘ও আল্লা রে’ এবং ‘উঠে না’ রবের সঙ্গে যুক্ত হয় ঢাকার অতিথিদের ‘এক-দুই-তিন করে করতে হবে!’ ‘টমেটোগুলি পড়ে যাচ্ছে!’ ইত্যাদি উত্তেজিত বাণী। তাঁরা ভিডিও-ও করেন।

default-image

লম্বা স্কেল, কাঁচি-পেনসিল হাতে দাঁড়িয়ে পড়ে এক কিশোরী। নাম তার বিউটি। ২৯ নম্বর মধ্য গজারিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস এইটে পড়ে। এ বেলায় গিয়েছিল ‘দরজিগিরি’ শিখতে।

ওদিকে জুলেখা সাহায্যের জন্য ডাক ছাড়ছেন। ঝাঁকার মুখের কাপড় ছুটে হড়হড়িয়ে কিছু টমেটো পড়ে গেল। হেনকালে ওয়ালটন ফ্রিজের বাক্স বাঁশে ঝুলিয়ে সিনে ঢুকলেন দুজন। তাঁরা এসে হাত লাগালেন। কে একজন বলেন, ‘হায় রে! এত্তগুলি মানুষ!’

বাজারফেরতা অভিভাবক ঠেলা উদ্ধারে নেমে পড়েছেন, লিকলিকে রোগা খালি-গা বালকটি ছোট একটি পলিব্যাগ আঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাতে অল্প কিছু গরুর মাংস (কেজি ৪৫০ টাকা)। উদ্ধারকর্তা শেষতক দাঁড়ালেন ১০ পুরুষ আর ৩ নারী।

রব উঠল, ‘নিচে ধরা লাগব, নিচে।’ শুরু হলো মালকোঁচা মেরে গাড়ি তোলা। সম্মিলিত গলায় হাঁক উঠল ‘ওও-ইই...,’ ‘ওও-ইই...!’ আর তারপর ‘উঠছে!’ ‘উঠছে!!!’

default-image

কার অতিথিরা তালি দেন। ওয়ালটনওয়ালারা ফ্রিজ ঝোলানো বাঁশটি কাঁধে তুলে গ্রামের পথে ঢুকে যান গহিন চরের কোনো এক সচ্ছল বাড়ির উদ্দেশে।

গড়িয়ে পড়া টমেটো কিছু আবার ঝাঁকায় ঢোকে। অতঃপর ঘোড়াকে আবার জোতার পালা। সে পা বেঁকিয়ে ঘাড় ত্যাড়া করলে আলমগীরের হাতের চাবুক উঠতে যায়। এক নারী বলেন, ‘মাইরো না, মাইরো না, মারো ক্যা? হাতায়া হাতায়া নিয়া যাও।’

ঘোড়া ঘাড় বেঁকিয়ে পায়ে গোত্তা মেরে পিছিয়ে যেতে নেয়। জুয়েল লাগাম শক্ত করে। তারপর আলমগীর তার পিঠে একটা হালকা চাপড় দেয়। ঘোড়া টলমল পায়ে মাথা ঝাঁকিয়ে স্টার্ট নেয়। পেছনে ধুলা ওড়ে।

default-image

জুলেখা বলেন, আগের ঘোড়াটি চোট খেয়ে কোমর ভাঙে। তাকে বিক্রি করে এবার ঋণ করে একে কিনেছেন। টমেটোর মৌসুম শেষে আবার বিক্রি করে দেবেন, তাই হয়তো নামের বালাই নেই। তবে চরের বালুতে মাল টানতে ঘোড়া বড় সহায়।

লোকমুখে আরও শুনি, কয়েকটা ছেলেসন্তান না থাকলে চরে টেকা কঠিন। তবে সেই বিকেলে ঠেলা উদ্ধারপর্বে মেয়েদের কীর্তি দেখে মনে ভরসা জাগল।

default-image

করোনা পেরিয়ে টমেটোকাল

ঘোড়াকাণ্ডের আগে মা আর ছেলের সঙ্গে করোনাকালের সুখ-দুঃখ নিয়ে কথা হয়েছিল। জুলেখা বলেছিলেন, ‘মালিকের দোয়ায়’ চরে করোনা ঢোকেনি। তবে রোজগারের সমস্যা ছিল, ‘বাড়িঘর থে বারান যায় নাই, কোনো কাজ করার পাই নাই।’

পরিস্থিতি কিছু স্বাভাবিক হলে কৃষি ব্যাংক থেকে তিন লাখ টাকা ঋণ নিয়ে টমেটোর আবাদ করেছেন, ‘জমিনের কাগজ দিয়া টিপ দিসি আর ট্যাহা দিসে ব্যাংকের ব্যাটারা।’

ছামিদুল রঙ্গ করে বলেন, ‘বাজারবুজার যাইলে মাস্ক লাগায়া দম বন্ধ কইরা থাহা নাগত—এডা একটা সমস্যা।’ গোড়ায় মাস তিনেক বাজার বসেছে এক বেলা। অনেক কৃষক তখন ভাতের জন্য গরুবাছুর বিক্রি করেছেন।

বড় কথা হচ্ছে এই যে এবার ব্যাপারীরা ‘ফল’ অর্থাৎ টমেটোর দাম কম দিচ্ছেন, বলছেন মোকাম খারাপ। ছামিদুলেরা তাই টাকাপয়সার দিক দিয়ে ‘টানপড়েনে’ আছেন, ‘শুধু আমরা না, সব কৃষকই সবজি আবাদে ইবার একটু লসে আছে।’

চরে ৩০ শতাংশ জমিকে এক পাকি বলে। তাঁদের নিজেদের জমি আছে ১২০ শতাংশ। তিন মাস আগে এক লাখ টাকা দিয়ে বন্ধকি চুক্তিতে জমি নিয়েছেন আরও ৩০ শতাংশ।

default-image

ছামিদুলের হিসাবে এই মোট দেড় একর জমিতে চারা রোপণ থেকে ‘ফল’ পাওয়া পর্যন্ত ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা যাবে। বীজ, কীটনাশক, সার, মাচা, কামলা মিলিয়ে খরচ অনেক। প্রতি সপ্তাহে কীটনাশকেই যায় ৪ হাজার টাকার বেশি।

টমেটো তাঁরা বেচা শুরু করেছেন জানুয়ারির গোড়া থেকে। আগাম ফল ওঠে কম, কিন্তু দাম থাকে বেশি। তারপর ফল বাড়তে থাকে, দাম কমে। এবার আগাগোড়াই দরটা কম।

গত বছর আগাম টমেটোর মণ ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকাতেও উঠেছিল, মৌসুমের মাঝামাঝি তা হাজার-বারো শ টাকায় নামে। এবার আগাম বেচেছেন ৮০০ থেকে ১২০০ টাকায়, আর এখন মাঝমৌসুমে দর ৫০০ টাকার নিচে চলে যাচ্ছে।

ছামিদুলের কথায়, ‘আগের বছর ১০০-র মধ্যে ৮০ থেকে ৯০ পার্সেন্ট মুনাফা পাইছি আমরা। কিন্তু ওই তুলনায় এইবার এই বৎসরে, টোয়েন্টি পার্সেন্টে নাইমা আসছে।’ মৌসুমের গড় হিসাব করলে খরচ ওঠা কঠিনও হতে পারে।’

বিজ্ঞাপন

এখন সপ্তাহে পাঁচ-ছয় দিন টমেটো তুলছেন। দিনে গড়ে উঠছে ১০ মণ। গাড়ি-ঘোড়া নিজের, কিন্তু প্রতিদিন টমেটো তোলানি ‘মহিলা’দের মজুরিসহ নগদ খরচ আছে, সংসারখরচা আছে। এযাবৎ তাঁর হাতে জমেছে মোট ৪০ হাজার টাকার মতো। তবে আশা আছে, মার্চের শেষভাগ পর্যন্ত টমেটো বিক্রি করতে পারবেন।

চরের কৃষকদের হাইব্রিড টমেটো যায় ঢাকায়, ভৈরবে, চট্টগ্রামে। পরে মুঠোফোনে ছামিদুল বলেন, সেদিন মণে ৪২০ টাকা দর পেয়েছিলেন। অর্থাৎ কেজিতে এসেছে ১০ টাকা ৫০ পয়সা।

স্থানীয় বাজারে টমেটোর কেজি ১৫ থেকে ২০ টাকা, ঢাকায় ধানমন্ডিতে আমার পাড়ার ভ্যানওয়ালা বিক্রি করেন ৫০ টাকায়। কারওয়ান বাজারে তাঁর পাইকারি কেনা দর কেজিতে দাঁড়ায় ৩০ টাকা।

মধ্যগজারিয়ার মাঠের দায়িত্বে আছেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. ইব্রাহীম আলী। মুঠোফোনে তিনি বললেন, গত এক-দেড় দশকে ব্রহ্মপুত্রের চরে হাইব্রিড টমেটোর আবাদ জমে উঠেছে। এ বছর তাঁর আওতাধীন তিনটি ওয়ার্ডে ৩৫০ হেক্টর জমিতে টমেটো হয়েছে। আরও হচ্ছে নিটোল সবুজ বেগুন।

একসময় এসব চরে সবজি বলতে কেবল মিষ্টি আলু হতো। ইব্রাহীম বলছেন, উন্নত জাতের সবজি আসায় কৃষকের অবস্থা ফিরেছে। টাকা ঢালতে পারলে শেষতক ‘টমেটোর মধ্যে লস নাই।’ তবে মড়ক লাগলে দুর্দশার একশেষ।

ইব্রাহীমের হিসাবে, এমনিতে এক বিঘা অর্থাৎ ৩৩ শতাংশ জমিতে হাইব্রিড টমেটো আবাদে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ পড়তে পারে। আর মৌসুমজুড়ে টমেটো বেচা যায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকার। গতবার মড়ক লেগেছিল। এবার দাম যদিও কম, ফলন বেশি।

ছামিদুল কিন্তু বলছেন, এবার কুয়াশার কারণে মৌসুমের শুরুতে ফলের জোয়ার সেভাবে আসেনি। আরেক সমস্যা ছিল ভারী ও টানা বর্ষা। তাতে প্রস্তুতিপর্বে দেরি হয়েছে।

সাধারণত আষাঢ়ের শুরু থেকে নিচু চরে পানি উঠতে থাকে। পাট কাটার পর শ্রাবণের মাঝামাঝি ফসলি জমি পুরো ডুবে যায়, বাড়ির চতুর্দিকে পানি থই থই করে। নামে আশ্বিনের গোড়া নাগাদ।

কিন্তু এবার পানি উঠেছে বেশ আগে, নেমেছে দেরিতে। তাঁর লাভ-ক্ষতির আসল হিসাবটা হয় দুই-আবাদি বছরজুড়ে, পাট-টমেটোর চক্রে। অনেক কৃষকের মতো ছামিদুল পাটও কাটতে পারেননি।

টমেটোর সঙ্গে তিনি সাথি ফসল করেছেন অল্প কিছু মুলা, কলাই আর মটরশুঁটি। টমেটোর শেষে করবেন পাট। এঁটেল জমির কৃষকেরা করবেন ধান। কেউ করেছেন ভুট্টা আর শর্ষে। ছামিদুল বলেন, করোনাকালেও কৃষক বসে থাকেননি, যদিও যথার্থ দাম পাচ্ছেন না।

default-image

গরু চুরির মামলার লম্বা গড়ান

নান্দিনার কাছে মহেশপুর-কালীবাড়ি বাজার থেকে গত ১২ ডিসেম্বর পড়ন্ত বেলায় পুলিশ ছামিদুলের বাবা মো. হজরত আলীকে গ্রেপ্তার করে। তাঁর বিরুদ্ধে গরু চুরির মামলা হয়েছিল ২০০৫ সালে। পরিবারটি তখন শেরপুর জেলার চর খাসচরে থাকত।

ছামিদুলের ভাষায়, সেটা ছিল এক ‘চক্রান্ত মামলা’। মধ্যগজারিয়ার জমি নদীতে গ্রাস করলে হজরত ২০০০ সালের দিকে জামালপুরের সীমান্ত-লাগোয়া ওই চরে জমি কিনে বাস উঠিয়ে নিয়েছিলেন। জমি নিয়ে ঝামেলা বাধে। তাঁদের সেচযন্ত্রটি চুরি যায়।

সেটা এক জায়গায় পুঁতে রাখা আছে শুনে সেখানে গেলে লোকজন জড়ো হয়ে হজরতকে ‘গরুচোর’ বলে পুলিশে ধরিয়ে দেয়, মতান্তরে, দুটি গরুসহ। ঘটনাস্থল ছিল জামালপুর সদর উপজেলায়। মামলাও সে থানাতেই হয়।

শেরপুরে জমি নিয়ে ঝামেলা হলে ২০০৬ সালে পরিবারটি আবার মধ্যগজারিয়ায় ফেরে। হজরত জামিনে থেকে মামলায় হাজিরা দিতে থাকেন। ২০১৫ সালে নিম্ন আদালত তাঁকে ৯ মাসের কারাদণ্ড দিলে তিনি আপিল করেন।

প্রায় এক বছর পর সে আপিল নামঞ্জুর হয়ে সাজা বহাল থাকে। ছামিদুল বলছেন, এ খবর তাঁরা পাননি। আপিলকারী উকিলের (এখন মৃত) মুহুরি নাকি বাবাকে বলেছিলেন, মামলা খারিজ হয়ে গেছে।

গ্রাম পুলিশ রূপচান রবিদাস মুঠোফোনে আমাকে বলেন, হজরত এ কয় বছর বাড়িতেই ছিলেন, ‘হঠাৎ কইরা লইয়া গেল।’ মানুষ তিনি ভালোই ছিলেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শহীদুল্লাহও হজরতকে ‘মাঝেমধ্যে’ এলাকায় দেখেছেন।

কিন্তু দণ্ডিত আসামি কেন এত বছর পরে গ্রেপ্তার হলেন? জামালপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রেজাউল ইসলাম ঘটনাটির হদিস করতে পারলেন না। তবে মুঠোফোনে তিনি বললেন, হয়তো আদালতের পরোয়ানা আসতে দেরি হয়েছে, নয়তো আসামি পলাতক ছিলেন।

ওসি আরও বললেন, থানায় ১৬-১৭ শ পরোয়ানা আছে, পুলিশের সংখ্যা তো অত নয়। একেক পরোয়ানায় পুলিশ মাসে দু-তিনবার যায়। আগাম খবর ছাড়া দুর্গম চরে যাওয়া হয়তো হয়ে ওঠে না। আবার এমনও হতে পারে, সাম্প্রতিক কোনো গরু চুরির ঘটনায় পুরোনো মামলার খোঁজ পড়েছে।

হজরত জেলে গেলে গত ৩ জানুয়ারি ছামিদুলরা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে প্রায় পাঁচ বছর পর আপিল রিভিশনের আবেদন করেন। তাঁদের উকিল ফজলুল হক মুঠোফোনে বলেন, ২ ফেব্রুয়ারি সে আবেদন নামঞ্জুর হয়। আর পরিবারটির ১৫ হাজার টাকা পানিতে যায়।

শেষ-অশেষের কথা

default-image

লাভ-ক্ষতি-আপদ-বিপদ সব ছাপিয়ে ছামিদুল বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। তিনি গরু-মহিষের খামার দিতে চান, যেটা কি না একটি ‘প্রতিষ্ঠান’ হয়ে দাঁড়াবে। মাটিবালু কেটে তিনি ঘর ওঠাচ্ছেন। বাবার নামে থাকা দুই একর জমির ভিত্তিতে ঋণের নাগাল খুঁজছেন।

মুঠোফোনে ছামিদুল বলেন, কৃষি ব্যাংকের নরুন্দি শাখার কাছে ৩৮ হাজার টাকার ঋণ তাঁরা গত বছর সুদে-আসলে শোধ দিয়েছেন। ছয় মাস আগে বাবা জমির কাগজের ওপর দেড় বছর মেয়াদি ৩ লাখ টাকার নতুন ঋণ তোলেন।

সে ঋণ শোধ হলে ছামিদুল ২০ লাখ টাকার একটি ‘বড়’ ঋণ পেতে চান। প্রতিষ্ঠান তিনি গড়বেনই। সুদে-আসলে ঋণও শুধবেন। তাঁর গলায় আকুতি আর আত্মবিশ্বাস মিলেমিশে থাকে।

৪ ফেব্রুয়ারি যখন আলগির চর ছেড়েছিলাম, তখন সূর্য পাটে বসছে। উল্টোদিকের পাড়ে দূরে দূরে বসা মাছ শিকারিদের সারি। বড়শিতে চ্যাপা শুঁটকির টোপ গেঁথে নদের গভীরে ফেলে তাঁরা সুতো ধরে বসে আছেন আইড়-বোয়াল মাছের আশায়।

চরে যাওয়ার কালেও তাঁদের এমনই দেখেছি—সজাগ, লক্ষ্যে স্থির, অপেক্ষায় অবিচল।

default-image


qurratul.tahmina@gmail.com

মন্তব্য করুন