default-image

তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি সইয়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার আশ্বাস দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিস্তার ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মানুষের স্বার্থ সুরক্ষা করে চুক্তিটি সই করার কথাও মমতা জানান। 
গতকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে সৌজন্য সাক্ষাতের সময় অভিন্ন নদীটির পানিবণ্টন নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ আশাবাদের কথা শোনান।
গতকাল দুপুরে গণভবনে পৌঁছার পর ফুল দিয়ে মমতাকে বুকে টেনে নেন শেখ হাসিনা। পরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর হাতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একটি নৌকা তুলে দেন। শেখ হাসিনা এ সময় বলেন, ‘নৌকা যেন চলতে পারে, খেয়াল রাখবেন।’
জবাবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বললেন, ‘আপনি নিশ্চিত থাকুন। পানি যাতে যায়, সে জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখব। চিন্তা করবেন না।’
পানি নিয়ে যখন কথা হয়, ইলিশের প্রসঙ্গ আসাটাই স্বাভাবিক। কথা বলার একপর্যায়ে ইলিশ কম পাওয়ার অনুযোগ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শেখ হাসিনা তখন বললেন, পানি এলে ইলিশও যাবে।
উষ্ণতা আর আন্তরিকতা নিয়ে এভাবে চলেছে শেখ হাসিনা ও মমতার আলাপচারিতা। এতে যে মমতা যথেষ্ট আবেগপ্রবণ হয়েছেন, সেটি স্পষ্ট তাঁর টুইট অ্যাকাউন্টে। মমতা টুইটারে লিখেন, ‘তাঁর উষ্ণতা ও আন্তরিকতা আমাকে আবেগপ্রবণ করে তুলেছিল। মানছি, বাংলাদেশের আতিথেয়তা উষ্ণ, অসাধারণ এবং বিশেষ কিছু। সফরটি গঠনমূলক, ইতিবাচক ও ঐতিহাসিক। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে পশ্চিমবঙ্গ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছি।’
সব মিলিয়ে সৌজন্য সাক্ষাতের ব্যাপ্তি ছিল ৪৫ মিনিটের। প্রথম ১৫ মিনিট মমতার সফরসঙ্গী ও প্রধানমন্ত্রীর কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেই তাঁদের কথা হয়।
পরে ৩০ মিনিট একান্তে কথা হয় শেখ হাসিনার সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। শেখ হাসিনাকে তিস্তা চুক্তি নিয়ে আশার কথা শোনালেও এ নিয়ে কিছু কারিগরি সমস্যা শেষ করার কথাও উল্লেখ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
এ বিষয়ে সন্ধ্যায় ভারতীয় হাইকমিশন এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, তিস্তা নিয়ে কারিগরি সমস্যা মিটিয়ে ফেলতে হবে। যাতে করে নদীটির ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মানুষের স্বার্থ ও কল্যাণ সুরক্ষিত হয়। কারিগরি সমস্যার এ দিকটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী।
প্রসঙ্গত, ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের তখনকার প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সফরে তিস্তা চুক্তি সই হয়নি মমতার আপত্তিতে। পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ প্রস্তাবিত তিস্তা চুক্তিতে সুরক্ষিত হয়নি, এ অভিযোগে শেষ মুহূর্তে মমতা চুক্তিতে সায় দেননি।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মমতার আলোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ সরকারের জ্যেষ্ঠ দুই কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, কারিগরি সমস্যা মেটানোর কথা বলা হলে চুক্তি সইয়ে দীর্ঘসূত্রতা হতে পারে। কারণ, ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে চুক্তির খসড়া চূড়ান্ত হয়েছিল। পানি কে কতটা পাবে, সেটি ছাড়া অন্য বিষয়গুলোর সুরাহা তখনই হয়েছিল। এখন কারিগরি সমস্যা সমাধান করার মানে চুক্তির খসড়ায় পরিবর্তন আনা।
গণভবনের আলোচনা: প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর আলোচনার পর গণমাধ্যমকর্মীদের ব্রিফ করেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী। তিস্তার পানি চুক্তি নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী প্রথমে বিষয়টি উত্থাপন করেন এবং আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন না হতে পরামর্শ দেন। মমতা বলেন, পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশ উভয়ের স্বার্থেই এই চুক্তি হবে।’
ইকবাল সোবহান চৌধুরী আরও জানান, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুনির্দিষ্ট করে বলেছেন যে তিস্তা চুক্তি নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা নেই। এটি ইতিবাচকই হবে। তিনি বাংলাদেশকে ভালোবাসেন এবং বাংলাদেশের স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করেন।
ইকবাল সোবহান চৌধুরী জানান, আলোচনায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্থলসীমানা চুক্তি সম্পর্কে বলেছেন, ২৩ ফেব্রুয়ারি লোকসভার অধিবেশন শুরু হচ্ছে। এই অধিবেশনেই বিলটি পাস হবে। ইতিমধ্যে বিলটি লোকসভায় পেশ করা হয়েছে। যদিও বিষয়টি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যকার, তবু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে ইতিবাচক ভূমিকা তিনি রাখবেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বলেছেন, ‘এ বিষয়ে আমরা মতৈক্যে পৌঁছেছি এবং লোকসভার আসন্ন অধিবেশনে বিলটি পাস করানোর জন্য আমরা আমাদের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছি। ফলে এ মুহূর্তে চুক্তি অনুমোদনের কোনো প্রয়োজন নেই এবং লোকসভার আসন্ন অধিবেশনে এটি বাস্তবায়িত হবে।’
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা অনেক আগেই স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুমোদন করেছি।’ এ সময় তিনি ভারত স্থলসীমান্ত চুক্তি অনুমোদন না করায় ছিটমহলবাসীর দুর্দশার কথা তুলে ধরেন। জবাবে মমতা জানান, ছিটমহলের বিষয়টি তিনি জানেন।
বৈঠকে জঙ্গিবাদের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, জঙ্গি তৎপরতা কোনো দেশের জন্য মঙ্গলের নয়—এ বিষয়ে দুজনেই একমত প্রকাশ করেছেন।
বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সম্পর্ক আরও হৃদ্যতাপূর্ণ করার ওপর জোর দিয়ে মমতা জানান, এই সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে যে ভূমিকা রাখার দরকার, তিনি তা করবেন। বাংলাদেশে অমর একুশের অনুষ্ঠানে অতিথি করায় নিজেকে ধন্য মনে করছেন বলে মমতা উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিষয়গুলোও নিয়ে তাঁদের আলোচনা হয়। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন মমতা। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে সাংস্কৃতিক উৎসবের জন্য একটি কমিটি করে দেওয়ার কথাও বলেন তিনি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরকে এ জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান ইকবাল সোবহান চৌধুরী।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সোনারগাঁও হোটেলে ব্যবসায়ীদের একটি সমাবেশে মতবিনিময় করেন। এরপর সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহ্রিয়ার আলমের সঙ্গে বৈঠক করেন। শাহ্রিয়ার আলম তাঁকে জানান, বিমানের শিডিউল বিলম্বিত হওয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী ওয়াশিংটন থেকে ঢাকায় ফিরতে পারেননি। পরে যমুনায় তাঁর সম্মানে অর্থমন্ত্রীর দেওয়া এক চা-চক্রে যোগ দেন।
রাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতায় ফিরে গেছেন।
প্রসঙ্গত, পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আমন্ত্রণে অমর একুশে অনুষ্ঠানের অতিথি হিসেবে তিন দিনের সফরে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ১৯ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকায় আসেন।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন