রাখাইন রাজ্য থেকে সেনাবাহিনীর অত্যাচারে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মিয়ানমারের তদন্ত কমিশনের সদস্যরা কথা বলেছেন। আজ রোববার তাঁরা কথা বলেছেন কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং অনিবন্ধিত শিবিরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সঙ্গে। তবে তদন্ত কমিশনের সদস্যরা রোহিঙ্গাদের মুখে নির্যাতনের কথা শুনলেও তা মেনে নেননি। 

আজ বেলা তিনটায় কমিশনের সেক্রেটারি জ্য মিন্ট পের নেতৃত্বে ১১ সদস্যবিশিষ্ট মিয়ানমার প্রতিনিধিদলটি কক্সবাজার শহর থেকে সড়কপথে উখিয়ার কুতুপালং অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শিবিরে পৌঁছায়। এরপর সেখানকার একটি মক্তবের উঠানে বসে মিয়ানমার কমিশনের সদস্যরা রোহিঙ্গা নারী-পুরুষের সঙ্গে কথা বলেন। উপস্থিত রোহিঙ্গাদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন সেখানকার সেনাবাহিনীর নির্যাতনে হাত-পা ভাঙা ও গুরুতর আহত।
কুতুপালং এই অনিবন্ধিত শিবিরে অবস্থান করছে অন্তত ৯৭ হাজার রোহিঙ্গা। এর মধ্যে রাখাইন রাজ্য থেকে সম্প্রতি পালিয়ে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার।
প্রথমে কমিশনের একজন সদস্য উপস্থিত রোহিঙ্গাদের উদ্দেশে প্রশ্ন করেন, কেন তোমরা বাংলাদেশে এসেছ?
জবাবে এক রোহিঙ্গা আক্রমণাত্মক ভাষায় বলেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, পুলিশ, মগ সম্প্রদায়ের যুবকেরা রোহিঙ্গাদের খুন-জখম করেছে। ঘরবাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছে। মেয়েদের ধর্ষণ করেছে। মালামাল লুট করেছে। তাই রোহিঙ্গারা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
এ সময় আরও কয়েকজন রোহিঙ্গা রাখাইন রাজ্যে সে দেশের সেনাবাহিনী কর্তৃক ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, গুলি, হত্যা, ধর্ষণসহ দমন-পীড়নের অভিযোগ তুলে ধরেন। এ সময় মিয়ানমার তদন্ত কমিশনের প্রধান জ্য মিন্ট পে রোহিঙ্গাদের উদ্দেশে বলেন, তোমাদের অভিযোগ সত্য নয়। ঘটনার পর এই তদন্ত কমিশনের সদস্যরা রাখাইন রাজ্যের মংডু এলাকা সফর করেছে। যেখান থেকে তোমরা পালিয়ে এসেছ। সেখানে এমনকি হয়েছে যে তোমরা ঘরবাড়ি ফেলে বাংলাদেশ পালিয়ে এসেছ?
এ সময় মো. রফিক নামে আরেক রোহিঙ্গা তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, আপনি ঠিক বলছেন না। ৯ অক্টোবর রাখাইন রাজ্যের তিনটি পুলিশ ফাঁড়িতে সন্ত্রাসী হামলার পর সেখানকার সেনাবাহিনী সন্ত্রাস দমন অভিযানের নামে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ দমন-পীড়ন চালাতে থাকে। এ সময় সেনাবাহিনীর গুলিতে অন্তত পাঁচ শতাধিক রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন। ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অসংখ্য রোহিঙ্গা নারী। দমন-পীড়ন সহ্য করতে না পেরেই রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ পালিয়ে আসেন।
রোহিঙ্গা নেতা আবু ছিদ্দিক বলেন, ছোট ছোট শিশু কী অন্যায় করেছে? তাদের কেন আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে? কেন ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়া হলো? গৃহহীন রোহিঙ্গারা জীবন বাঁচাতে জন্মভূমি ত্যাগ করে বাংলাদেশ পালিয়ে এসেছেন।
একই অভিযোগ তুলে ধরেন এই শিবিরে আশ্রয় নেওয়া রাখাইন রাজ্যের গজরবিল ও খেয়ারিপ্রাং গ্রামের মোহাম্মদ নুর, সখিনা বেগম, কামাল উদ্দিন ও নবী হোসেন। তাঁরা বলেন, মিয়ানমার সরকার নাগরিকত্ব ও শান্তিতে বসবাসের সুযোগ নিশ্চিত করলে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারে ফিরে যাবে।
কিন্তু মিয়ানমার কমিশন সদস্যরা রোহিঙ্গাদের এ অভিযোগ কিছুতেই মানতে রাজি হচ্ছিলেন না। রোহিঙ্গাদের প্রশ্নেরও জবাব দেননি।
মিয়ানমার তদন্ত কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেন অ্যং তুন থেট, থুন মিনথ, নায়েট সোয়ে, থেথ জিন, কায়েন নেগাই, নায়ান থুন, অ্যং মিনথ, মংছিং থোয়াই, শাদুল্লাহ শাহ ও মায়েন্ট হ্লাইন।
সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উখিয়া সার্কেল) চাইলাউ মারমা, উখিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নুরুদ্দিন মো. শিবলী নোমান, উখিয়া থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আবুল খায়ের। বিকেল পাঁচটার দিকে কমিশনের সদস্যরা শিবির থেকে কক্সবাজার শহরে ফিরে আসেন।
কমিশনের সদস্যরা কুতুপালং শিবিরের পৌঁছালে রোহিঙ্গারা ইংরেজি ভাষায় লেখা ব্যানারে রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নির্যাতনের ছবি প্রদর্শন এবং মানববন্ধন করে বিক্ষোভ করেন। এ সময় স্লোগান দিয়ে তাঁরা রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের ওপর দমন-পীড়ন, হত্যা-ধর্ষণ ও অত্যাচার বন্ধের দাবি জানান।
কাল সোমবার বেলা ১১টায় মিয়ানমারের তদন্ত কমিশনের প্রতিনিধিদলটি উখিয়ার অনিবন্ধিত বালুখালী রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করবে। বেলা দুইটার দিকে সেখান থেকে যাবে টেকনাফের লেদা অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শিবিরে। কমিশনের সদস্যরা শিবির দুটিতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলবেন। মঙ্গলবার সকালে কমিশনের সদস্যরা ঢাকায় ফিরে যাবেন।
আজ বেলা সাড়ে ১১টায় কমিশনের সদস্যরা ঢাকা থেকে কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছালে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) কর্মকর্তা তাঁদের স্বাগত জানান। এরপর মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলটি কক্সবাজার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে গিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) সাইফুল ইসলাম মজুমদার, সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (ডিএসবি) কাজি হুমায়ুন রশিদ, জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার মো. সেলিম শেখ।
এ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক মো. আলী হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে দুই পক্ষ আলোচনা করেছি। মিয়ানমারের কমিশনের সদস্যরা তাঁকে জানান, রাখাইন রাজ্য থেকে বহু রোহিঙ্গা ঘরবাড়ি ফেলে বাংলাদেশ পালিয়ে এসেছেন। কেন এসেছেন, তাঁরা কোথায় থাকছেন, খাচ্ছেন কী, সহযোগিতা করছেন কারা—এসব সরেজমিন দেখতে তাঁরা বাংলাদেশ এসেছেন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন