default-image

ভারতবর্ষে চা-চাষের প্রারম্ভিক পর্যায়ে পদে পদে ছিল নানা বাধা ও প্রতিকূলতা। অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে চা-বাগানগুলোতে প্রচলিত সরকারি মুদ্রায় শ্রমিকদের মজুরি দেওয়াটা ছিল বাগান কর্তৃপক্ষের জন্য অলাভজনক। সে কারণে ব্রিটিশ আমলে ভারতবর্ষের অনেক চা-বাগানে তারা ধাতব টোকেনের ব্যবহার শুরু করে। মজুরি হিসেবে শ্রমিকদের এই টোকেন দেওয়া হতো। ইতিহাসে যা টি-টোকেন নামে পরিচিত।

default-image

নিউমিসম্যাটিক্স ইন্টারন্যাশনাল বুলেটিনের ভলিউম-২৫, নম্বর-২, ১৯৯০ সংখ্যায় সেকালে প্রচলিত বেশ কিছু টোকেনের ছবি সংবলিত বিবরণ খুঁজে পাওয়া যায়। এ ছাড়া বাংলাদেশের স্বনামধন্য টি-প্ল্যান্টার নাসিম আনোয়ারের লেখা ‘টি গার্ডেন টোকেনস মেথড অব পেমেন্ট (১৮৭২-১৯৩৮)’ নিবন্ধে টি-টোকেন সংস্কৃতির দেখা মেলে। ‘এ ফরগটেন স্টোরি-লেবার পেমেন্ট বাই গার্ডেন টোকেনস’ শিরোনামের প্রতিবেদনটিতে টোকেনের আকার-আয়তন, প্রকারভেদ এবং টোকেনে ব্যবহৃত লিপি ও টাঁকশাল সম্পর্কিত মূল্যবান তথ্যাদির সন্ধান পাওয়া যায়।

default-image

টাঁকশালের অবস্থান ছিল কলকাতায়। আসাম-বেঙ্গল রেলপথ চালু হওয়ার আগ পর্যন্ত কলকাতা থেকে এসব চা-বাগানে ধাতব মুদ্রা পরিবহন বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল ছিল। শ্রমিকদের মজুরি দেওয়ার জন্য প্রচুর পরিমাণে পাই, পয়সা ও আনার মতো ক্ষুদ্র মূল্যমানের মুদ্রার প্রয়োজন হতো। টাঁকশাল থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্ষুদ্র মূল্যমানের মুদ্রার সরবরাহ না থাকায়, মুদ্রা সংগ্রহের জন্য বাগান কর্তৃপক্ষকে অনেক ঝামেলা পোহাতে হতো এবং বড় অঙ্কের বাট্টা (কমিশন) গুনতে হতো। এই সংকট নিরসনে বড় বড় চা বাগানে তখন টি-টোকেনের ব্যবহার শুরু করে। টোকেন-পদ্ধতি চালুর পেছনে আরেকটি অন্তর্নিহিত কারণ ছিল। কঠোর পরিশ্রম, বৈরী পরিবেশ আর অতি নিম্ন মজুরির কারণে শ্রমিকেরা প্রায়ই বাগান থেকে পালিয়ে যেতে চাইতেন। অনেকে সময় স্বজনদের দেখতে মন চাইলেও যাওয়ার উপায় ছিল না। কারণ টোকেনের বিপরীতে বাগানের ভেতরের নির্ধারিত দোকান থেকেই শুধু পণ্য কেনা যেত। বিনিময়মূল্য হিসেবে সরকার প্রচলিত মুদ্রা প্রাপ্তির কোনো সুযোগ ছিল না। আর বাগানের বাইরে এসব টোকেনের কোনো মূল্য ছিল না। ফলে শ্রমিকেরা চাইলেও বাগান ত্যাগ করতে পারতেন না। ধাতব টি-টোকেন চালু হওয়ার পূর্বে মজুরি হিসেবে সহজে বহনযোগ্য রঙিন বোর্ডের টোকেন ব্যবহার করা হতো। বাগানের নাম ও মুদ্রার মূল্যমান উল্লেখ থাকত সেখানে।

default-image

টোকেনগুলোর মুদ্রামান ছিল দুই, তিন, চার বা আট আনা। তখন হিসাব ছিল ৪ পয়সায় এক আনা, আর ১৬ আনায় এক রুপি। হরেক গড়ন আর আকারের টোকেন ছিল; যেমন-গোল, তিনকোণা বা বর্গাকার। তবে অধিকাংশ টোকেনে ছিদ্র থাকত। এইগুলো ছিল দস্তা, টিন, তামা অথবা ব্রোঞ্জের তৈরি। এ সব টোকেনের কোনো কোনটিতে মুদ্রামান লেখা থাকত না। শুধু চা-বাগানের নাম লেখা থাকত। বাগানের সবাই মুদ্রাগুলোর মূল্যমান সম্পর্কে সম্যকভাবে জ্ঞাত থাকায় এই ধরনের টোকেন নিয়ে কোনো সমস্যা সৃষ্টি হতো না। সাধারণত এ টোকেন দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতেন নিয়োগকারী সর্দাররা, যাঁদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে শ্রমিকেরা কাজ করতেন। মাঝেমধ্যে ইউরোপিয়ান বাগানবাবুরাও শ্রমিকদের মজুরি দেওয়ার কাজটি করতেন। অধিকাংশ বাগানেই দৈনিক ভিত্তিতে মজুরি দেওয়া হতো। সকালের শুরুতেই আগের দিনের মজুরি বাবদ পাওনা টোকেন বিলি করা হতো। তবে কিছু কিছু বাগানে সাপ্তাহিক ও মাসিক ভিত্তিতেও মজুরির ব্যবস্থা ছিল।

default-image

বাগান কর্তৃপক্ষের নিয়োজিত এজেন্ট সপ্তাহে একবার বিনিময়মূল্য পরিশোধ করে দোকানদারদের নিকট থেকে টোকেনগুলো সংগ্রহ করে নিত। টাঁকশালে প্রয়োজনীয় মুদ্রা প্রস্তুতের অর্ডার থেকে শুরু করে টোকেন সরবরাহের যাবতীয় দায়দায়িত্ব পালন করত এই এজেন্ট। টি-টোকেনের ইতিহাসে এমনি একটা নাম ‘অক্টাভিয়াস স্টিল অ্যান্ড কোং’। মোট ২৮টি বাগানে তারা টোকেন সরবরাহ করত। এটি ডানকান ব্রাদার্সের সহযোগী প্রতিষ্ঠান। তৎকালীন সিলেট বিভাগ এবং আসামের কাছাড় অঞ্চলের চা-বাগানগুলোতে টোকেনের চল ছিল। কিন্তু আপার আসাম, ডুয়ার্স, দার্জিলিং বা তেরাইয়ের চা-বাগানগুলোতে টোকেনের চল ছিল না। কলকাতা মিন্ট (টাঁকশাল) ছাড়াও গ্রেট ব্রিটেনের বার্মিংহাম টাঁকশালে টোকেনগুলো প্রস্তুত হতো। নাসিম আনোয়ারের তথ্য মোতাবেক, প্রথম ধাতব টি টোকেনের প্রচলন ঘটে ১৮৭০ সালে। সর্বশেষ টোকেন লটের অর্ডার দেওয়া হয়েছিল ১৯৩০ সালে। টোকেন প্রথা টিকে ছিল ১৯৫০ অবধি। দেশভাগের পর সরকারি মুদ্রার ব্যাপক প্রচলনে টি-টোকেন প্রথার ইতি ঘটে।

*হোসাইন মোহাম্মদ জাকি: গবেষক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন