default-image

নয়টি স্থানে লাগানো হয়েছে উচ্চক্ষমতার ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা। পাশাপাশি স্থানীয় ফাঁড়িতে বসে নজর রাখছে পুলিশ। এ ছাড়া বিভাগীয় কার্যালয় এবং নৌ পুলিশের ঢাকার ডিআইজি কার্যালয় থেকেও ওই ক্যামেরা দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয় ১০ কিলোমিটার এলাকা। ক্যামেরায় সন্দেহজনক কার্যক্রম নজরে পড়লেই সঙ্গে সঙ্গে অভিযান চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে ব্যবস্থা।

সম্প্রতি দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ হালদা নদীতে মা মাছ রক্ষায় এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি একটি নদীর জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষায় নৌ পুলিশের উদ্যোগ।

সরকার ২০০৭ সালে হালদা নদীর কর্ণফুলীর মোহনা থেকে ফটিকছড়ি নাজিরহাট পর্যন্ত এলাকাকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করে।

ক্যামেরার মাধ্যমে নদীটির গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন এলাকা মদুনাঘাট থেকে আমতুয়া এলাকা পর্যবেক্ষণে রেখেছে চট্টগ্রাম সদরঘাট নৌ পুলিশ। মার্চ মাস থেকে মাছের প্রজনন মৌসুম শুরু হয়েছে। তাই ফেব্রুয়ারিতেই এই ব্যবস্থা চালু করা হয়। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার সিসি ক্যামেরায় অবৈধ জাল পাতার দৃশ্য দেখে অভিযানে চালিয়ে বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ৭ হাজার মিটার অবৈধ ঘের জাল জব্দ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম সদরঘাট থানা নৌ পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অবৈধ জাল পেতে মা মাছ নিধন রোধ ও অতি বিপন্ন জলজ প্রাণী ডলফিনসহ নদীর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালাচল বন্ধ, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ ও নদীর শতভাগ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আগে সদরঘাট নৌ থানার আওতায় নদীপাড়ের হাটহাজারী উপজেলার উত্তর মাদার্শা ইউনিয়নের রামদাশ মুন্সির হাটে স্থাপন করা হয়েছে অস্থায়ী নৌ পুলিশ ফাঁড়ি। এই ফাঁড়িতে কর্মরত আছেন আট পুলিশ সদস্য। নদীতে অনিয়ম দেখলেই ব্যবস্থা নেন তাঁরা।

বিজ্ঞাপন

নদী বিশেষজ্ঞ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, হালদা দিয়েই আমাদের দেশে নদীতে প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ শুরু করেছে সরকার। এই ব্যবস্থা সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর। তাই এই দিকটাতে গুরুত্ব দিলেই নদী রক্ষা সহজ হবে বলে মনে করেন তিনি।

default-image

মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত বছর হালদায় কার্প জাতীয় মা মাছের ২৫ হাজার ৫৩৬ কেজি নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করেছিল সংগ্রহকারীরা, যা গত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ রেকর্ড হয়েছিল।

default-image

সরকার ২০০৭ সালে হালদা নদীর কর্ণফুলীর মোহনা থেকে ফটিকছড়ি নাজিরহাট পর্যন্ত এলাকাকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করে। ২০১৮ সালে সরকার নদীর সব স্থানে বালুর ইজারা মহাল তুলে নিয়ে বালু উত্তোলন, বালুবাহী ড্রেজার, যান্ত্রিক নৌ চলাচল ও জাল পাতার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এরপরও অভিযোগ ছিল, এসব নিষেধাজ্ঞা ঠিকমতো কার্যকর হয় না। ফলে আঘাতজনিত কারণে একের পর এক ডলফিন ও মা মাছ মরে ভেসে ওঠার ঘটনা ঘটতে থাকে।

হালদা নদী বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) লাল তালিকাভুক্ত (অতি বিপন্ন প্রজাতি) একটি জলজ প্রাণী এখানকার ডলফিন। বিশ্বের বিভিন্ন নদীতে অতি বিপন্ন প্রজাতির ডলফিন আছে মাত্র ১ হাজার ১০০টি। এর মধ্যে শুধু হালদাতেই ছিল ১৭০টি। গত বছর ২০২০ সালে মরে ভেসে উঠেছিল ৩টি ডলফিন ও ৩টি মা মাছ। ২০১৭ থেকে ২০২০ পর্যন্ত তিন বছরে এই নদীতে মারা গেছে ২৮টি ডলফিন। এর মধ্যে তিনটিকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনজুরুল কিবরিয়া প্রথম আলোকে বলেন, হালদা এখন বঙ্গবন্ধু হেরিটেজ। দেশের জাতীয় সম্পদ। তিনি বলেন, সিসি ক্যামেরার মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে নদী পর্যবেক্ষণ দারুণ একটি বিষয়। এতে হালদা নদীর জীববৈচিত্র্য রক্ষা আরও সহজ হয়ে গেল। পাশাপাশি নৌ থানা ফাঁড়ি স্থাপনের উদ্যোগও প্রশংসনীয়। তিনি বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন হালদা রক্ষায় যে আন্দোলন করছি, তার ফল পেতে যাচ্ছি এখন।’

default-image

চট্টগ্রাম সদরঘাট নৌ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ বি এম মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, প্রজনন মৌসুম শুরু হওয়ায় মা মাছ যাতে নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে বিচরণকরতে পারে, তাই এই প্রদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নয়টি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরার মাধ্যমে নদীর মদুনাঘাট থেকে আমতোয়া পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে। নৌ পুলিশের ঢাকার ডিআইজি কার্যালয়, চট্টগ্রাম সদরঘাট থানাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে স্মার্টফোন এবং একাধিক ডিভাইসে এখানকার সিসি ক্যামেরার আওতাধীন এলাকায় নজর রাখা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন