হামে মৃত্যুর ৫২ শতাংশ ৯ মাসের কম বয়সী

হামে আক্রান্ত ১১ মাস বয়সী জেরিনকে নেবুলাইজ করছেন মা। ভোলায় ৪ দিন চিকিৎসার পর গত শুক্রবার শিশুটিকে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে আনা হয়। গতকাল দুপুরেছবি: মীর হোসেন

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে হাম নিয়ে ভর্তি রোগীদের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৮০ শতাংশ শিশু হামের টিকা পায়নি। অন্য অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হামে মারা যাওয়া শিশুদের ৫২ শতাংশের বয়স ছিল ৯ মাসের কম। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে হাম ও টিকা নিয়ে আরও গভীর অনুসন্ধান হওয়া দরকার।

গত এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিতে আসা ৩৪১ শিশুকে নিয়ে গবেষণাটি করা হয়েছে। এসব শিশুর বয়স ছিল ১৪ বছরের মধ্যে। গবেষণাটি করেছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) ও শিশু হাসপাতালের ১৯ জন গবেষকের একটি দল।

গতকাল রোববার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সেমিনারে আইসিডিডিআরবির সংক্রামক রোগ বিভাগের জ্যেষ্ঠ পরিচালক ও ভাইরোলজি ল্যাবরেটরি অ্যান্ড জেনম সেন্টারের প্রধান মোস্তাফিজুর রহমান গবেষণার তথ্য উপস্থাপন করেন। দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ও করণীয় নিয়ে সেমিনারের আয়োজন করে মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ।

এই তিন বিশেষজ্ঞ বলেন, হাম, টিকার কার্যকারিতা, শিশুদের পুষ্টি পরিস্থিতি নিয়ে আরও গবেষণা হওয়া দরকার। মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গর্ভবতী মায়েদের হামের টিকার আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।

সেমিনারে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান নিজস্ব অনুসন্ধান উপস্থাপন করেন। শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে বক্তব্য দেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাও অংশ নেন সেমিনারে।

৪ থেকে ৬ মাসের মধ্যে টিকা দিলে ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ শিশুর শরীরে সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, ৯ মাস বয়সে টিকা দিলে এই হার বেড়ে যায়। ৯ থেকে ১২ মাসের মধ্যে টিকা দিলে ৮৮ থেকে ৯০ শতাংশ শিশু সুরক্ষা পায়।

টিকা পায়নি ৮০% শিশু

হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসছে শিশু
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ৮০ শতাংশ শিশু হামের টিকাই পায়নি। তাদের মধ্যে ৪৩ শতাংশের টিকা পাওয়ার বয়সই হয়নি, এদের বয়স ছিল ছয় মাসের কম। ৯ মাসের বেশি বয়স হলেও ৩৭ শতাংশ শিশু কোনো টিকা পায়নি। বাকিদের ১৪ শতাংশ হামের টিকার এক ডোজ পেয়েছে। অবশিষ্ট ৬ শতাংশ হামের টিকার দুই ডোজ পেয়েছে।

আরও পড়ুন

শিশুদের ৯ মাস বয়স থেকে কেন হামের টিকা দেওয়া হয় তার কারণ ব্যাখ্যা করেন মোস্তাফিজুর রহমান। রাজধানীর কমলাপুরে ২০০ মা ও ২০০ শিশুর ওপর করা পৃথক গবেষণা ফলাফল উদ্ধৃত করে এই বিজ্ঞানী বলেন, শিশুরা মায়ের কাছ থেকে যে সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি পায়, তা ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে মিলিয়ে যায়। শিশুর বয়স যত কম হয়, টিকা তত কম কার্যকর হতে দেখা যায়। ৪ থেকে ৬ মাসের মধ্যে টিকা দিলে ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ শিশুর শরীরে সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, ৯ মাস বয়সে টিকা দিলে এই হার বেড়ে যায়। ৯ থেকে ১২ মাসের মধ্যে টিকা দিলে ৮৮ থেকে ৯০ শতাংশ শিশু সুরক্ষা পায়।

দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ নিউমোনিয়া। হামে আক্রান্ত শিশুদের একটি পর্যায়ে নিউমোনিয়া দেখা দেয়, নিউমোনিয়ায় মারা যায়। তিনি বলেন, টিকা ছাড়াও পুষ্টি, মায়ের বুকের দুধ শিশুকে সুরক্ষা দেয়।
শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা

মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, হামের টিকাদান কর্মসূচি আরও ১০ মাস আগে হলে প্রাদুর্ভাব এত তীব্র না–ও হতে পারত।

সেমিনারে প্রথম উপস্থাপনায় আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, হামে মারা যাওয়া ৩৩৭ শিশুর মধ্যে ৯১ শতাংশ কোনো টিকা পায়নি। মারা যাওয়া ৩৩৭ জনের মধ্যে ২২ শতাংশের বয়স ৬ মাসের নিচে, ৩০ শতাংশের বয়স ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে, ২৫ শতাংশের বয়স ৯ থেকে ১১ মাস। এক বছর থেকে চার বছরের মধ্যে ১৭ শতাংশ। বাকি ৬ শতাংশের বয়স ৫ থেকে ১০ বছর বা তার বেশি।

আরও পড়ুন

শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ নিউমোনিয়া। হামে আক্রান্ত শিশুদের একটি পর্যায়ে নিউমোনিয়া দেখা দেয়, নিউমোনিয়ায় মারা যায়। তিনি বলেন, টিকা ছাড়াও পুষ্টি, মায়ের বুকের দুধ শিশুকে সুরক্ষা দেয়।

ডিএনসিসি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুরা। সেখানে এক শিশুকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

এই তিন বিশেষজ্ঞ বলেন, হাম, টিকার কার্যকারিতা, শিশুদের পুষ্টি পরিস্থিতি নিয়ে আরও গবেষণা হওয়া দরকার। মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গর্ভবতী মায়েদের হামের টিকার আওতায় আনার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।

সেমিনারে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ–উপাচার্য অধ্যাপক আরশাদ মাহমুদ চৌধুরী, লাইফ সায়েন্স অনুষদের সহকারী ডিন অপর্ণা ইসলাম ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের প্রধান নাদিয়া সুলতানা।

আরও ৪ শিশুর মৃত্যু

হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে আরও চার শিশু মারা গেছে। সারা দেশে আরও ৯৩৮ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। এ ছাড়া নতুন করে হাম শনাক্ত হয়েছে ১১৩টি শিশুর।

এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গে দেশে ৬৯৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে আরও ৯৫ শিশু। অর্থাৎ একই সময়ে হাম ও হামের উপসর্গে মোট ৭৮৮টি শিশু মারা গেছে।