প্রবাসী শ্রমিকের মৃত্যু : দিনে গড়ে ১৪টির বেশি মরদেহ এসেছে, কোন দেশে বেশি

২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ভোরে কফিনে মোড়ানো অবস্থায় দেশে আসে খুলনার আবিরনের লাশ। প্রবাসী শ্রমিকের এমন মৃত্যু এখনো হচ্ছেছবি: প্রথম আলো

কম্বোডিয়ার টাইলস কারখানায় কাজ করতেন পাবনার আল আমিন। কাজের সময় শতাধিক টাইলসের নিচে চাপা পড়ে মারা যান তিনি। গত ২৭ সেপ্টেম্বর দেশে আসে তাঁর মরদেহ। তিনি মারা যান ২০২৫ সালের ১২ এপ্রিল। মরদেহ দেশে আসতে সময় লেগে যায় প্রায় দেড় বছর।

মৃত্যুর খবর পেয়ে ঢাকায় এসে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের সহায়তায় ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডে আবেদন করে আল আমিনের শ্যালক মাসুম খান।

তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কম্বোডিয়ায় দূতাবাস নেই। কল্যাণ বোর্ড থেকে আবেদনটি পাঠানো হয় থাইল্যান্ডে। মরদেহটি কোথায় আছে, তা খুঁজে বের করতে পারেনি দূতাবাস। এটি জানতে পেরে তিনি প্রবাসীদের মাধ্যমে দেশটির স্থানীয় পুলিশের নম্বর সংগ্রহ করে কল্যাণ বোর্ডকে সহায়তা করেন।

মরদেহ আনতে এমন হয়রানির ঘটনা অহরহ নয়। ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচি বলছে, বিদেশে প্রবাসী কর্মীর মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। সৌদি আরবে কিছু কর্মীকে দাফন করা হয় স্থানীয়ভাবে। তবে অধিকাংশ মরদেহ দেশে আনতে চায় পরিবার। নিয়মিত কর্মী হলে মরদেহ মোটামুটি সময়মতো দেশে আসে; কিন্তু কর্মী কোনো কারণে অনিয়মিত হয়ে গেলে (বৈধ কাগজ না থাকা) দীর্ঘ সময় লেগে যায় মরদেহ আনতে।

প্রবাসে কোনো কর্মী মারা গেলে তাঁর মরদেহ দেশে আনার দায়িত্ব নেয় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড। বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মরদেহ আনার আগে একাধিক দপ্তর থেকে অনুমোদন নিতে হয়। এতে কিছুটা সময় লেগে যায়। তবে এটি আগের চেয়ে কমেছে; আর যেসব দেশে দূতাবাস নেই, সেখান থেকে মরদেহ আনতে বেশি সময় লাগে।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০১৯ সালে ৩ হাজার ৬৫১ প্রবাসীর মরদেহ আসে দেশে। ২০২০ সালে এটি কমে হয় ৩ হাজার ১৪০ জন। মূলত করোনা মহামারির সময় অনেকে মরদেহ দেশে না এনে স্থানীয়ভাবে দাফন করেন। ২০২১ সাল থেকে দেশে আসা মরদেহ বাড়তে থাকে। করোনাকাল বাদ দিয়ে সাধারণ সময় মৃতের ১ শতাংশের কম দাফন হয় গন্তব্য দেশগুলোতে।

আরও পড়ুন

এ বছর জানুয়ারি থেকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত (মোট ২৭৩ দিন) ৯ মাসে দেশে এসেছে ৪ হাজার ৬০টি মরদেহ। এ হিসাবে দিনে মরদেহ এসেছে গড়ে ১৪টির বেশি। সবচেয়ে বেশি কর্মী মারা যান সৌদি আরবে। এ বছর দেশটিতে মারা গেছেন প্রায় ২ হাজার। যদিও বিদেশে বৃহত্তম কর্মসংস্থান হলো সৌদি আরব। এ বছরও সবচেয়ে বেশি কর্মী গেছেন দেশটিতে। এরপর সবচেয়ে বেশি কর্মী মারা গেছেন মালয়েশিয়ায়। দেশটিতে গত আড়াই বছর ধরে কর্মসংস্থান বন্ধ হয়ে আছে।

ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচি বলছে, বিদেশে প্রবাসী কর্মীর মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। সৌদি আরবে কিছু কর্মীকে দাফন করা হয় স্থানীয়ভাবে। তবে অধিকাংশ মরদেহ দেশে আনতে চায় পরিবার। নিয়মিত কর্মী হলে মরদেহ মোটামুটি সময়মতো দেশে আসে; কিন্তু কর্মী কোনো কারণে অনিয়মিত হয়ে গেলে (বৈধ কাগজ না থাকা) দীর্ঘ সময় লেগে যায় মরদেহ আনতে।

অভিবাসন খাত নিয়ে নিয়মিত কাজ করে, এমন বেসরকারি সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, কর্মী যে দেশে মারা যান, সেখান থেকে মৃত্যুর একটি কারণ লিখে পাঠানো হয়। রোগসহ স্বাভাবিক মৃত্যু দেখানো হয় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। কর্মক্ষেত্রে নির্যাতন, খুন, আত্মহত্যায় বাধ্য করার অভিযোগ আছে; কিন্তু বিদেশে কর্মীদের মৃত্যুর কোনো কারণ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যাচাই করা হয় না। এভাবে দায়সারাভাবে মৃত্যুর কারণ বলে দেওয়াটা পরিবারের জন্য অসম্মানজনক।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী ১ অক্টোবর প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রবাসীদের চিকিৎসাসহায়তা বাড়ানো হয়েছে। মৃতদেহ দ্রুত দেশে আনতে কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। যাঁরা অনিয়মিত কর্মী, তাঁদের মরদেহ আনতেও সরকার যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। বিদেশে মৃত্যুর কারণ যাচাই করতে করণীয় ঠিক করা হবে।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড বলছে, মৃত্যুর পর কর্মীর পরিবার থেকে আবেদন করতে হয়। কর্মী যদি দেশ থেকে বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র নিয়ে বিদেশে গিয়ে থাকেন বা বিদেশে যাওয়ার পর দূতাবাস থেকে সদস্য নিবন্ধন নেন; তাহলে তাঁর মরদেহ আনার খরচ কল্যাণ বোর্ডের। এর কোনোটি না থাকলেও বোর্ডে আবেদন করতে পারে পরিবার। সে ক্ষেত্রে বোর্ড থেকে প্রস্তাব পাঠানো হয় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয় থেকে মরদেহ দেশে আনতে খরচ দেওয়া হয়, এটি প্রতিবছর বাজেটে বরাদ্দ থাকে।

সবচেয়ে বেশি মারা গেছেন সড়ক দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৪৯ জন। সব মিলিয়ে ২০ শতাংশের বেশি প্রবাসী মারা যান কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন দুর্ঘটনায়। কর্মক্ষেত্রে আসা–যাওয়া ও কাজের সময় এসব দুর্ঘটনা ঘটে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

দুর্ঘটনায় মৃত্যু ১৬ শতাংশের বেশি

দক্ষিণ আফ্রিকায় সুপারশপে আগুনে নিহত মো. ফয়সালের স্বজনদের আহাজারি। সদর উপজেলার আলীরটেক এলাকায়, ২৯ জুলাই
ছবি: প্রথম আলো

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, আগে প্রায় ৭০ শতাংশ মরদেহের সঙ্গে আসা কাগজপত্রে কারণ হিসেবে স্বাভাবিক মৃত্যু লেখা থাকত। এ বছর প্রথম ৯ মাসে ৬৬ শতাংশের মৃত্যুর কারণ স্বাভাবিক উল্লেখ করা হয়েছে; আর দুর্ঘটনাসহ নানা কারণে বাকি ৩৪ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে।

মোট মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনা, কাজের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, আগুনে পোড়া, ভবন থেকে পরে যাওয়া ও বিদ্যুতায়িত হয়ে এ বছর মারা গেছেন ১৬ শতাংশের বেশি।

এর আগে ২০২৩ সালে প্রবাসে মৃত কর্মীদের পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে ওয়েজ আর্নাস কল্যাণ বোর্ড। ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে ১৮ হাজার ১৬৬টি মরদেহ দেশে আসে। এর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা, কর্মস্থলে দুর্ঘটনা, আগুনে পোড়া, ভবন থেকে পড়ে যাওয়া ও বৈদ্যুতিক শকে মারা গেছেন ৩ হাজার ৬৯৮ জন। সবচেয়ে বেশি মারা গেছেন সড়ক দুর্ঘটনায় ২ হাজার ৬৪৯ জন। সব মিলিয়ে ২০ শতাংশের বেশি প্রবাসী মারা যান কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন দুর্ঘটনায়। কর্মক্ষেত্রে আসা–যাওয়া ও কাজের সময় এসব দুর্ঘটনা ঘটে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

নোয়াখালীর ফয়েজ আহম্মেদ ১০ বছর ধরে সৌদি আরবে কাজ করতেন। সাত মাস ধরে তাঁর সঙ্গে কাজে যোগ দিয়েছিলেন ছোট ভাই সুজন আহম্মেদ। দুজন মিলে একই গাড়িতে করে খেজুর পরিবহনের কাজ করতেন। গত ১৬ জুলাই এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান দুই ভাই। ২৮ জুলাই দেশে আসে মরদেহ। তাঁদের বাবা আবদুল মালেক প্রথম আলোকে বলেন, হঠা সব শেষ হয়ে গেল। মরদেহ দাফনে ৩৫ হাজার টাকা করে ৭০ হাজার টাকা দিয়েছে কল্যাণ বোর্ড।

আরও পড়ুন

দেশে আসা প্রতিটি মৃতদেহ দাফনে ৩৫ হাজার টাকা নগদ সহায়তা দেয় কল্যাণ বোর্ড। এরপর তিন লাখ টাকা করে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। এর বাইরে এখন জীবন বিমার সুবিধা পায় কর্মীর পরিবার; আর বিদেশে কোনো ক্ষতিপূরণ দাবি থাকলে তা দূতাবাসের মাধ্যমে আদায় করে দেওয়া হয়। মৃত কর্মীর বকেয়া থাকলে তা-ও আদায়ের উদ্যোগ নেয় দূতাবাস। কল্যাণ বোর্ডের তথ্য বলছে, এ বছর প্রথম ৬ মাসে মরদেহ দাফনে ৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে; আর আর্থিক অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়েছে ৬১ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। কর্মীদের বিমাসুবিধা দেওয়া হয়েছে ৪৪ কোটি টাকার বেশি। বিদেশ থেকে ক্ষতিপূরণ, বকেয়া ও বিমা আদায় করে দেওয়া হয়েছে প্রায় ৭৫ কোটি টাকা।

কর্মীদের আর্থিক অনুদান, ক্ষতিপূরণ, বিমাসুবিধা আদায় নিয়ে নানা অভিযোগ আছে। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আবেদন করার পর দিনের পর দিন কল্যাণ বোর্ডে ঘুরতে হয়। কারও কারও সহায়তা পেতে পেতে পরিবারের অবস্থা শোচনীয় হয়ে যায়; আর বিদেশ থেকে সব হারিয়ে ফিরে আসা অনিয়মিত কর্মীরা সরকারের এসব সুবিধা পান না।

প্রতিবছর মৃত্যু বাড়ছে। ২৫ থেকে ৩০ বছরের যুবকেরাও মারা যাচ্ছেন। ৭০ শতাংশের বেশি মরদেহ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, সৌদি থেকেই বেশি।
ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান

কারণ জানা গেলে কমতে পারে মৃত্যু

অভিবাসন খাতের গবেষণা সংস্থাগুলো বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি শ্রমিকদের বড় অংশ কাজ করে মূলত অবকাঠামো নির্মাণ খাতে। দিনের বেলায় প্রচণ্ড তাপের মধ্যে তাঁদের কাজ করতে হয়। এতে তাপজনিত নানা রোগে শুধু কিডনি নয়, মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে শরীরের সব অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব দেশে তাপ আরও বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসীদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়াচ্ছে অতিরিক্ত তাপ। প্রচণ্ড তাপ ও সূর্যালোকে দীর্ঘ সময় কাজ করার কারণে তাঁদের দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। যে জন্য আজীবন চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। দিনে ও রাতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি শরীরে ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করে এবং শ্বাসতন্ত্র, হৃদ্‌রোগ, বহুমূত্র ও কিডনি রোগের প্রভাবকে বাড়িয়ে তুলতে পারে। এতে অকালমৃত্যুও ঘটে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব মৃত্যুর কারণ জানা গেলে প্রতিরোধে নানা ব্যবস্থা নিতে পারবে সরকার।

প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশে কর্মী পাঠানোর আগে বিএমইটি প্রশিক্ষণ দেয়। এতে গন্তব্য দেশের নিয়মকানুন, আচার-আচরণসহ নিরাপত্তা সচেতনতা বিষয়ে বিদেশগামী কর্মীদের ধারণা দেওয়া হয়। এটি মাত্র তিন দিনের কর্মশালা, যাতে কোনো কিছুই ভালো করে শেখানো হয় না। যে দেশে কাজে যাচ্ছেন, সে দেশের কাজের ধরন, পরিবেশ ও চাপ সামলানোর কৌশল, কর্মঘণ্টা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণাসহ কীভাবে ভিন্ন পরিবেশে নিজেকে সুস্থ রাখা যায়, তার প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার।

ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিবছর মৃত্যু বাড়ছে। ২৫ থেকে ৩০ বছরের যুবকেরাও মারা যাচ্ছেন। ৭০ শতাংশের বেশি মরদেহ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, সৌদি থেকেই বেশি। প্রতিটি মৃত্যুর কারণ খতিয়ে দেখা উচিত। কারণ জানা গেলে মৃত্যু কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে সরকার; আর জীবনযুদ্ধে লড়াই করা নারীরা বিদেশে যান। তাঁদের আত্মহত্যার কারণগুলো অবশ্যই জোরালোভাবে খতিয়ে দেখা উচিত। তিনি আরও বলেন, মরদেহ দেশে আনতে কোনোভাবেই কালক্ষেপণ করা যাবে না। অনিয়মিত কর্মী হলেও তাঁর মরদেহ আনার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে।