জিয়াউল আহসান ছিলেন ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে’, জেরায় বললেন ইকবাল করিম ভূঁইয়া
নিজের একসময়ের সহকর্মী জিয়াউল আহসানকে ‘সিরিয়াল কিলার’ আখ্যায়িত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া। অধস্তন কর্মকর্তা হিসেবে তাহলে কেন বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি, জেরায় এই প্রশ্ন করা হয় তাঁকে। জবাবে তিনি বললেন, জিয়াউল আহসান ছিলেন তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে শতাধিক মানুষকে গুম ও খুনের ঘটনায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় আজ সোমবার দ্বিতীয় দিনের মতো জেরার মুখোমুখি হন অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ইকবাল করিম। এই মামলায় প্রথম সাক্ষী হিসেবে তিনি ৮ ও ৯ ফেব্রুয়ারি জবানবন্দি দিয়েছিলেন তিনি। ৯ ফেব্রুয়ারি জবানবন্দি দেওয়ার পর তাঁকে জেরা শুরু হয়। এরপর ১৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় দিন জেরা চলে। আজ তৃতীয় দিন তাঁকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী আমিনুল গনি।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ এই মামলার বিচার চলছে। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের এই ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। আদালত আগামী রোববার শুনানির পরবর্তী দিন নির্ধারণ করেছেন। সেদিনও ইকবাল করিম ভূঁইয়াকে জেরা করা হবে।
এই মামলার একমাত্র আসামি সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে এদিন কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তাঁর উপস্থিতিতেই সাক্ষী ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জেরা চলে।
জিয়াউল আহসানকে ‘সিরিয়াল কিলার’ বলার ভিত্তি কী—আসামিপক্ষের আইনজীবী জানতে চাইলে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘আমি জিয়াউল আহসান সম্পর্কে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিবেচনাক্রমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে উনি একজন সিরিয়াল কিলার। এই বিভিন্ন মাধ্যমের কোনো একটি তথ্য লিখিত নয়।’
মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স (এমআই) এবং পার্সোনাল সার্ভিসে (পিএস) জিয়াউল আহসান ‘সিরিয়াল কিলার’ মর্মে উল্লেখ ছিল কি না, প্রশ্নে সাবেক এই সেনাপ্রধান বলেন, ‘আমার মনে নেই। আমার অধস্তনরা আমার মৌখিক নির্দেশের প্রেক্ষিতে নির্দেশ পালন সম্পর্কে আমাকে মৌখিকভাবে জানাতেন।’
প্রথম দিনের জেরায় ইকবাল করিম বলেছিলেন, ‘আমি মেজর জেনারেল মোমেনকে (আনোয়ারুল মোমেন) ডেকে বলেছি যে জিয়াউল আহসান একজন সিরিয়াল কিলার। আমি তাকে পদোন্নতি দেওয়ার পক্ষে নই।’
সাবেক এই সেনাপ্রধান আজ জেরায় বলেন, ‘জিয়াউল আহসান সিরিয়াল কিলার জানার পর আমি লিখিত কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করিনি। কারণ, সে আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল।’
ইকবাল করিম ভূঁইয়া আওয়ামী লীগ আমলে ২০১২ সালের ২৫ জুন থেকে ২০১৫ সালের ২৫ জুন পর্যন্ত সেনাবাহিনী প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি যখন সেনাপ্রধান ছিলেন, তখন জিয়াউল আহসান র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের পদে ছিলেন।
২০১৬ সালে তাঁকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল করে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক করা হয়। পরের বছর তাঁকে টেলিযোগাযোগ নজরদারির জাতীয় সংস্থা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) পরিচালক করা হয়। ২০২২ সালে তাকে পদোন্নতি দিয়ে মেজর জেনারেল করে এনটিএমসির মহাপরিচালক করা হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র–গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সেনাবাহিনীর চাকরি হারান জিয়াউল আহসান। ওই মাসেই রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে।
কোনো ব্যবস্থা নিতে না পারলেও জিয়াউল আহসানকে অপকর্ম থেকে বিরত রাখতে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন দাবি করে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘ডিএমআই জগলুল (জগলুল আহমেদ, পরিচালক মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স) এবং সিওএএসইউ (কমান্ড্যান্ট, আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলকে (আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ) দায়িত্ব দিয়েছিলাম তাঁকে অপকর্ম থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়ার জন্য। প্রশাসনিক আদেশ মৌখিকভাবে, লিখিতভাবে, বৈঠকের মাধ্যমে এবং ব্যক্তিগতভাবে ডেকে এনে দেওয়া হয়। আমি জিয়াউল আহসানকে ব্যক্তিগতভাবে কখনো ডাকিনি। তিনি আমার সাথে একবার বা দুবার দেখা করতে এসেছিলেন।’
সেনাপ্রধান থাকার সময় জিয়াউল আহসানের কোনো বিষয় নিয়ে কোনো ধরনের তদন্তের নির্দেশ দেননি বলেও জানান ইকবাল করিম। তিনি বলেন, তিনি জিয়াউল আহসানকে সেনাবাহিনীতে ফেরত আনার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু পারেননি।
ছিলেন জিয়াউল আহসানের পদোন্নতি বোর্ডে
জেনারেল মোহাম্মদ আব্দুল মুবীনের উত্তরসূরি হিসেবে ২০১২ সালে ইকবাল করিম ভূঁইয়াকে নিয়োগের সময় তাঁর চেয়ে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সেনাবাহিনীতে ছিলেন। তবে তাঁকে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি বলে মনে করেন তিনি।
জেরায় আইনজীবীর প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমার সিনিয়র থাকা সত্ত্বেও আমাকে সেনাপ্রধান করাকে আমি নিয়মের ব্যত্যয় মনে করি না। কারণ, পদোন্নতির ক্ষেত্রে কেবলমাত্র সিনিয়রিটি বিবেচ্য নয়। পদোন্নতির বিবেচনার ক্ষেত্রে স্টাফ কলেজ অথবা ইউসিএসসির (ইউনিট কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কোর্স) বিষয় বিবেচনার কথা বলা আছে।’
স্টাফ কলেজে না পড়ে শুধু ইউসিএসসি করেও কিছু কর্মকর্তা পদোন্নতি পেয়েছেন বলেও জানান ইকবাল করিম ভূঁইয়া। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, জিয়াউল আহসান ইউসিএসসি করেছিলেন কি না, তা তাঁর মনে নেই।
‘জিয়াউল আহসান মেজর থেকে লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে পদোন্নতির সময় পদোন্নতি বোর্ডে আমি একজন সদস্য ছিলাম। পদোন্নতি বোর্ডে সংশ্লিষ্ট অফিসারদের এসিআর উপস্থাপন করা হয় না। কেবল এসিআরের টোটাল নম্বর এবং পজিটিভ বা নেগিটিভ মন্তব্যগুলো উপস্থাপন করা হয়,’ বলেন তিনি।
২০০৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন পদে থাকা অবস্থায় প্রায় ২৬টি পদোন্নতি বোর্ডে ছিলেন ইকবাল করিম ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ‘এই বোর্ডগুলোতে আমি কয়েক হাজার অফিসার সম্পর্কে ব্রিফ পেয়েছি। এমতাবস্থায় জিয়াউল আহসান সাহেব সম্পর্কে ভালো বা খারাপ কী মন্তব্য ছিল, আমার মনে নেই। প্রমোশন ব্রিফের মধ্যে এমআই রিপোর্ট এবং পিএস রিপোর্ট থাকে। এগুলো ব্যতীত কোনো অফিসার সম্পর্কে নেগেটিভ কোনো তথ্য বা মন্তব্য যদি থাকে, তবে ডিজি ডিজিএফআই সেটি প্রমোশন বোর্ডে উপস্থাপন করে। উক্ত রিপোর্টগুলোতে জিয়াউল আহসান সম্পর্কে কোনো নেগেটিভ মন্তব্য ছিল কি না, মনে নেই। তবে ডিজিএফআই এবং র্যাব পারস্পরিক যোগসাজশে অপকর্ম করে বিধায় ডিজিএফআই খুব সম্ভব সে কারণে কোনো নেতিবাচক মন্তব্য করা থেকে বিরত ছিল।’
‘জগলুলকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে পোস্টিং’
প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের ওপর সেনাপ্রধানের কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ না থাকার কথা জানিয়ে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘ডিজিএফআই প্রতিরক্ষা মন্ত্রাণালয়ের অধীনে ছিল। তখন প্রধানমন্ত্রী প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। তিন বাহিনীর সমন্বয়ে ডিজিএফআই পরিচালিত হয়। সামরিক অফিসাররা ডিজিএফআইয়ে প্রেষণে যোগদানের পর সেনাপ্রধানের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে না। মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স (এমআই) সরাসরি সেনাপ্রধানের নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে।’
তবে তিনি সেনাপ্রধান থাকাকালীন এমআইয়ের ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি জানিয়ে সাবেক এই সেনাপ্রধান বলেন, ‘জিয়াউল আহসানের প্রভাবে আমার ডিএমআই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুলকে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে অন্যত্র পোস্টিং করা হয়েছে।’
তবে এই ঘটনার সময়কাল স্মরণ করতে না পারার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মাঝে মাঝে নিজের জন্মতারিখও মনে থাকে না।’
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুলকে নৈতিক স্খলনজনিত কারণে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে কি না, এই প্রশ্নে ইকবাল করিম বলেন, তা তাঁর জানা নেই। কারণ, তিনি অবসর নেওয়ার পর এই ঘটনা ঘটে।