খলিলুরের নেতৃত্বে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ আস্থা ফেরাতে পারবে, আশা গুতেরেসের
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) নতুন সভাপতি খলিলুর রহমানের নেতৃত্বে ভূরাজনীতিতে বর্তমানে হারিয়ে যাওয়া আস্থা ও সদিচ্ছা পুনর্গঠন করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের নেতৃত্বকে স্বাগত জানিয়ে গুতেরেস বলেন, কূটনীতি, সংলাপ ও সহযোগিতার মাধ্যমে সাধারণ পরিষদ এই আস্থা ও সদিচ্ছা ফিরিয়ে আনতে পারে। একই সঙ্গে বিশ্বের মানুষের জন্য আরও ভালো, স্বাস্থ্যকর ও শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।
খলিলুর রহমান গত মঙ্গলবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে শপথ নিয়ে অধিবেশনের কাজ শুরু করেন। জাতিসংঘে বাংলাদেশের জন্য এটি একটি ‘ঐতিহাসিক ঘটনা’।
খলিলুর রহমান এর আগে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও রোহিঙ্গা বিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতিসংঘেও তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। ঢাকার ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজনও তিনি।
জাতিসংঘের ৮০তম অধিবেশনের সভাপতি জার্মানির আনালেনা বেয়ারবকের নেতৃত্বের প্রশংসা করেন গুতেরেস। একই সঙ্গে খলিলুর রহমানকে নতুন দায়িত্বের জন্য স্বাগত জানিয়েছেন তিনি। ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পেল।
দায়িত্ব গ্রহণের পর খলিলুর রহমান বলেন, ‘৮০তম সাধারণ পরিষদ থেকে ৮১তম সাধারণ পরিষদের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়ার এই সময়ে সংলাপ, সহযোগিতা ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি অভিন্ন অঙ্গীকারের মাধ্যমে অগ্রগতি সম্ভব করতে যাঁরা ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।’
যুদ্ধ, মানবিক সংকট ও ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তনের সময়ে জাতিসংঘের ওপর মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকারও করেন তিনি।
বিদায়ী সভাপতি আনালেনা বেয়ারবকের কাছ থেকে আইসল্যান্ডের তৈরি ঐতিহ্যবাহী কাঠের হাতুড়ি গ্রহণের পর খলিলুর রহমান তাঁর এক বছরের অগ্রাধিকারের কথা তুলে ধরেন। তাঁর মূল প্রতিপাদ্য—‘আস্থা পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা: এমন একটি জাতিসংঘ, যা সবার জন্য কাজ করে।’
খলিলুর রহমান বলেন, ‘আমাদের জাতিসংঘকে ভবিষ্যতের উপযোগী করে তুলতে হবে।’ এ ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজের কণ্ঠস্বর শোনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এমন এক পরিস্থিতিতে আছি, যেখানে আস্থার ঘাটতি রয়েছে। এটি ১৯৪৫ সাল নয়। এটি ৮১তম অধিবেশন। বিশ্ব এগিয়ে গেছে। এই সংস্থাকেও এগিয়ে যেতে হবে এবং আমি সেই প্রক্রিয়ায় সহায়তা করব।’
‘আস্থা পুনর্গঠনই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ’
খলিলুর রহমানের দায়িত্ব গ্রহণের সময় বিশ্ব নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন মহাসচিব গুতেরেস। এর মধ্যে রয়েছে সংঘাত, ভূরাজনৈতিক বিভাজন, পারমাণবিক সংঘাতের ঝুঁকি, দীর্ঘস্থায়ী দারিদ্র্য ও বৈষম্য এবং আরও খারাপ হয়ে ওঠা জলবায়ু সংকট।
গুতেরেস বলেন, ‘বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার ওপর আস্থা পুনর্গঠন করাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই অস্থির সময়ে বৈশ্বিক সমস্যার সমাধানের ব্যবস্থা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
তবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ থেকে শুরু করে বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থা পর্যন্ত বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষমতা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জাতিসংঘকে অপ্রাসঙ্গিক বলার সমালোচনা
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনের শেষ বৈঠকে বিদায়ী সভাপতি আনালেনা বেয়ারবক বলেন, জাতিসংঘের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অনুভব করছেন তিনি।
বেয়ারবক বলেন, নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও এমন কোনো দিন বা এমন কোনো দেশ নেই, যা জাতিসংঘ ছাড়া আরও ভালো অবস্থায় থাকবে।
যাঁরা জাতিসংঘকে অপ্রাসঙ্গিক বা ব্যর্থ বলে মনে করেন, বিশেষ করে বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায়, তাঁদের জাতিসংঘবিহীন একটি বিশ্বের বিকল্পটি বিবেচনা করার আহ্বান জানান বেয়ারবক।
সাধারণ পরিষদের বিদায়ী সভাপতি বলেন, জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) না থাকলে লাখো শিশু বিদ্যালয়ে যেতে পারত না। আবার জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীরা কাছাকাছি মোতায়েন থাকায় নারীরা ধর্ষণের ভয় ছাড়াই ঘর থেকে বের হওয়ার সাহস পান।