২০২০ সালের মার্চে দেশে করোনা সংক্রমণ শুরুর পরই চালের দাম বাড়তে থাকে। এরপর সরকার দাম কমাতে কিছু উদ্যোগ নেয়। তার সুফল পাওয়া যায়নি। এ বছর বোরোর ভরা মৌসুমে চালের দাম বাড়তে শুরু করলে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। সরকারও গত মাসে চালের আড়ত ও বাজারে অভিযান চালায়। এরপর গত ২৫ জুন চাল আমদানির শুল্ককর সাড়ে ৬২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনে। অবশ্য শর্ত ছিল যে আমদানির ক্ষেত্রে আগাম অনুমতি নিতে হবে।

খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৯ লাখ ৮৩ হাজার টন চাল আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। অনুমতির পর দুই সপ্তাহের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মাত্র ১ হাজার টন চাল আমদানি হয়েছে। বাজারে এই নগণ্য আমদানির প্রভাব পড়েনি।

জানতে চাইলে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, দেশে চালের যথেষ্ট মজুত আছে। বাজারে সরবরাহ বাড়াতে সরকার শুল্ক কমিয়ে চাল আমদানি সহজ করেছে। তারপরও যদি চালের দাম না কমে তাহলে সরকার এ ব্যাপারে আরও কঠোর হবে।

অবশ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের বক্তব্য আগেও এসেছে। কিন্তু বাজারে চালের দাম কমেনি। চালসহ প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় জুন মাস শেষে মূল্যস্ফীতির হার ৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠেছে।

আমদানি কম কেন

চাল আমদানির অনুমতি দেওয়ার পরও কেন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আমদানি হচ্ছে, তা জানতে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে দেশের চারজন শীর্ষ চাল আমদানিকারকদের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা সবাই বলেছেন, ভারতে চালের দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে। ফলে আমদানিতে দাম বেশি পড়ছে। যেমন, ভারত থেকে আমদানি করে মোটা চাল দেশে আনা পর্যন্ত প্রতি কেজি ৩৮ টাকা পর্যন্ত দাম পড়ছে। এর সঙ্গে পরিবহন খরচ ও শুল্ক যোগ হবে। ফলে দাম দাঁড়ায় দেশীয় চালের দরের প্রায় সমান। যে কারণে ব্যবসায়ীরা মোটা চাল আমদানি থেকে বিরত রয়েছেন। যতটুকু চাল আসছে, তা মূলত সরু চাল।

দেশের প্রতিষ্ঠান মজুমদার ব্রাদার্স এবারও সবচেয়ে বেশি পরিমাণে চাল আমদানির অনুমতি পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি এক লাখ টনের অনুমতির বিপরীতে দেশে এনেছে ৩০০ টনের মতো সরু চাল।

মজুমদার ব্রাদার্সের মালিকদের একজন চিত্ত মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, চাল আমদানি করে পোষাচ্ছে না।

অবশ্য চাল আমদানি আরও সময় রয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় সর্বশেষ যে অনুমতি দিয়েছে, সেখানে আমদানির জন্য ১০ আগস্ট পর্যন্ত চাল দেশে আনার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে সরকারের গুদামে এখন ১৬ লাখ টনের বেশি খাদ্য মজুত রয়েছে। এর মধ্যে চাল প্রায় ১৪ লাখ টন। সরকারি মজুত স্বস্তিকর অবস্থানে থাকলেও ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতি স্বস্তিজনক নয় বলেই দাম কমছে না।

পুরান ঢাকার বাবুবাজার-বাদামতলীর চালের আড়ত শিল্পী রাইস এজেন্সির মালিক কাওসার রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বাজারে সামান্য কিছু ভারতীয় সরু চাল এসেছে। কেজিপ্রতি দর ৬৫ টাকার মতো। একই মানের দেশীয় চালের দাম প্রতি কেজি ৬৬ থেকে ৬৭ টাকা। তিনি বলেন, চাল বাড়তি পরিমাণে এলে দাম কমবে। সরবরাহ পরিস্থিতিতে মনে হয় চালের ঘাটতি আছে।

আমদানি করতে হবে ৭ লাখ টন

সরকারের পূর্বাভাস হলো, গত বছরের তুলনায় এবার চালের উৎপাদন বাড়বে। হাওরে হঠাৎ বন্যা, অতিবৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে কিছু ফসল নষ্ট হয়েছে। তবে উৎপাদন গত বছরের চেয়ে কমবে না।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিবিষয়ক সংস্থা ইউএসডিএ থেকে চলতি সপ্তাহে প্রকাশ করা বৈশ্বিক কৃষি উৎপাদন পরিস্থিতি প্রতিবেদন বলছে, এ বছর বাংলাদেশে ৩ কোটি ৬০ লাখ টন চাল উৎপাদিত হবে, যা গত বছরের চেয়ে প্রায় দেড় লাখ টন বেশি। আর এ বছর বাংলাদেশের চালের চাহিদা রয়েছে ৩ কোটি ৬৮ লাখ টন। চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্য আনতে বাংলাদেশকে এ বছর কমপক্ষে ৭ লাখ টন চাল আমদানি করতে হবে।

সাবেক কৃষিসচিব এ এম এম শওকত আলী প্রথম আলোকে বলেন, ডলারের সংকট ও জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে চালের দাম সামনে আরও বাড়তে পারে। ফলে বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ উদ্যোগ নিয়ে দ্রুত প্রয়োজনীয় চাল আমদানির উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, খাদ্য নিয়ে বিশ্ব কী ধরনের সংকটে আছে, তা খাদ্য মন্ত্রণালয় অনুধাবন করতে পারছে না। এখন আমদানি না হলে পরে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না।

বাংলাদেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন