সাগরে মাছ ধরার নৌযান বাড়ছে, অতি আহরণে কমছে ইলিশ
পটুয়াখালীর কলাপাড়ার মহিপুর মৎস্য বন্দরে এখন মাছ ধরার ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। ইলিশের মৌসুমে ছোট-বড় নৌযান একের পর এক সাগরের দিকে ছুটে যায়। সাত-আট বছর আগেও যেখানে আট শর মতো নৌযান মাছ ধরতে যেত, এখন সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় দেড় হাজারে।
গবেষকেরা বলছেন, সাগরে মাছ ধরার সক্ষমতা যত দ্রুত বেড়েছে, মাছ আহরণ ততটা বাড়েনি। অতিরিক্ত আহরণ ইলিশ কমে যাওয়ার একটি সম্ভাব্য কারণ। তবে সূক্ষ্ম ফাঁসের নিষিদ্ধ জাল, নদীতে চর পড়া, দূষণ, পানিপ্রবাহের পরিবর্তন, প্রতিকূল আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও খতিয়ে দেখতে হবে।
একসময় মহিপুরে বিদ্যুৎই ছিল না। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, তিন দশক আগে বিদ্যুৎ আসার পর একে একে গড়ে ওঠে বরফকল। মাছ সংরক্ষণ ও পরিবহনের সুযোগ বাড়ে। বাড়তে থাকে মাছের ব্যবসা। সেই সঙ্গে বাড়তে থাকে নৌযান ও জেলের সংখ্যা। সরকারি হিসাবে, এক দশকে সামুদ্রিক মাছ ধরার যান্ত্রিক ছোট নৌযান বেড়েছে ৫১ শতাংশ। অথচ একই সময়ে সমুদ্র থেকে মাছ আহরণ বেড়েছে ২৩ শতাংশ।
ইলিশের ক্ষেত্রে চিত্রটি আরও উদ্বেগের। দেশে ইলিশের উৎপাদন টানা দুই বছর কমেছে। ২০২২–২৩ অর্থবছরে রেকর্ড ৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৪২ টন ইলিশ আহরণের পর ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে ৫ লাখ ২৮৮ টনে। অর্থাৎ দুই বছরে কমেছে ৭১ হাজার ৫৪ টন। এই পতনের প্রায় পুরোটাই এসেছে সমুদ্র থেকে আহরণ কমে যাওয়ায়।
মহিপুরের এই পরিবর্তন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, উপকূল ও সমুদ্রে মাছ ধরার নৌযান দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু নৌযান যে হারে বেড়েছে, মাছ আহরণ সে হারে বাড়েনি। মৎস্য অধিদপ্তর এটিকে অতিরিক্ত মাছ ধরার চাপ ও প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিনিয়োগের লক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
২০১০–১১ অর্থবছরে দেশে সামুদ্রিক মাছ ধরার যান্ত্রিক ছোট নৌযান ছিল ২১ হাজার ৭২৬টি। ২০১৯–২০ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩২ হাজার ৮৫৯টি হয়। অর্থাৎ প্রায় এক দশকে যান্ত্রিক নৌযান বেড়েছে ১১ হাজার ১৩৩টি বা ৫১ শতাংশ। একই সময়ে যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক মিলিয়ে ছোট নৌযানের সংখ্যা ৪৫ হাজার ৫২৫ থেকে বেড়ে ৬৭ হাজার ৮৮৯টি হয়েছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, দেশে ইলিশের উৎপাদন অবশ্যই কমেছে, এটা সরকার জানে। এর পেছনে অতিরিক্ত আহরণ, যান্ত্রিক নৌযান, পরিবেশগত পরিবর্তন বা অন্য কোনো কারণ কতটা দায়ী, তা নির্ণয়ের চেষ্টা চলছে।
নৌযান বেড়েছে, আহরণ সেই হারে নয়
মৎস্য অধিদপ্তরের বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান: পার্ট–২—আর্টিসানাল অনুযায়ী, ২০১০–১১ অর্থবছরে দেশে সামুদ্রিক মাছ ধরার যান্ত্রিক ছোট নৌযান ছিল ২১ হাজার ৭২৬টি। ২০১৯–২০ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩২ হাজার ৮৫৯টি হয়। অর্থাৎ প্রায় এক দশকে যান্ত্রিক নৌযান বেড়েছে ১১ হাজার ১৩৩টি বা ৫১ শতাংশ। একই সময়ে যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক মিলিয়ে ছোট নৌযানের সংখ্যা ৪৫ হাজার ৫২৫ থেকে বেড়ে ৬৭ হাজার ৮৮৯টি হয়েছে।
কিন্তু মাছ আহরণ ততটা বাড়েনি। ২০১০–১১ অর্থবছরে সমুদ্র থেকে সব ধরনের মাছ আহরণ করা হয়েছিল ৫ লাখ ৪৬ হাজার ২৮৩ টন। ২০১৯–২০ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ৬ লাখ ৭১ হাজার ১০৪ টন। অর্থাৎ নৌবহর ৫১ শতাংশ বাড়লেও মাছ আহরণ বেড়েছে ২৩ শতাংশ।
মৎস্য অধিদপ্তরের পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, নৌবহর বছরে গড়ে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ হারে বাড়লেও মাছ আহরণ বেড়েছে গড়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০১৩–১৪ অর্থবছরের পর মাছ আহরণের প্রবৃদ্ধি অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়ে।
২০২২–২৩ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৪২ টন ইলিশ আহরণ হয়েছিল। এরপর টানা দুই বছর উৎপাদন কমেছে। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ কমে ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ টন হয়। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা আরও কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৮৮ টনে। পতনটি সবচেয়ে বেশি হয়েছে সমুদ্রে।
প্রযুক্তি বাড়িয়েছে মাছ ধরার সক্ষমতা
নৌযানের শুধু সংখ্যা বাড়েনি, মাছ খোঁজা ও ধরার সক্ষমতাও বেড়েছে। অনেক নৌযানে এখন সোনার, ইকো সাউন্ডার ও মাছের অবস্থান শনাক্ত করার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এসব যন্ত্র পানির নিচে মাছের ঝাঁকের অবস্থান, গভীরতা ও ঘনত্ব সম্পর্কে ধারণা দিতে পারে।
ইলিশ গবেষক আনিছুর রহমানের মতে, এই প্রযুক্তি ও অত্যন্ত কার্যকর জালের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মাছের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘অত্যাধুনিক নৌযানের মাছ সংগ্রহকারীরা বুঝতে পারেন পানির নিচে কোন অঞ্চলে ইলিশের দল কোন দিকে যাচ্ছ। সেই বরাবর জাল ফেলা হয়। মাছ সমূলে উঠে আসে। এভাবে মাছ ধরলে পরের বছর ডিম ছাড়ার বা বাচ্চা দেওয়ার মতো মাছ থাকে?’
তবে সমস্যাটি শুধু প্রযুক্তির ব্যবহার নয়। গবেষকদের মতে, সমস্যাটি হচ্ছে কোথায়, কখন, কী ধরনের জাল দিয়ে এবং কত পরিমাণ মাছ ধরা হচ্ছে—তার কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি না থাকা।
অন্যদিকে নদীসহ অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে ইলিশ আহরণ কমেনি। ২০২১–২২ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ২ লাখ ৪৫ হাজার টন ইলিশ পাওয়া গিয়েছিল। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা ছিল ২ লাখ ৪৯ হাজার টন। অর্থাৎ ইলিশের সাম্প্রতিক পতনের প্রায় পুরোটাই এসেছে সমুদ্র থেকে আহরণ কমে যাওয়ায়।
দুই বছরে ইলিশ কমেছে ৭১ হাজার টন
মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২২–২৩ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৪২ টন ইলিশ আহরণ হয়েছিল। এরপর টানা দুই বছর উৎপাদন কমেছে। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ কমে ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ টন হয়। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা আরও কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৮৮ টনে। দুই বছরে ইলিশ কমেছে ৭১ হাজার ৫৪ টন বা ১২ দশমিক ৪ শতাংশ।
পতনটি সবচেয়ে বেশি হয়েছে সমুদ্রে। ২০২১–২২ অর্থবছরে সমুদ্র থেকে ৩ লাখ ২২ হাজার টন ইলিশ আহরণ হয়েছিল। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা নেমে আসে ২ লাখ ৫১ হাজার টনে। তিন বছরে সামুদ্রিক ইলিশ কমেছে প্রায় ৭১ হাজার টন বা ২২ শতাংশ।
অন্যদিকে নদীসহ অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে ইলিশ আহরণ কমেনি। ২০২১–২২ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ২ লাখ ৪৫ হাজার টন ইলিশ পাওয়া গিয়েছিল। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তা ছিল ২ লাখ ৪৯ হাজার টন। অর্থাৎ ইলিশের সাম্প্রতিক পতনের প্রায় পুরোটাই এসেছে সমুদ্র থেকে আহরণ কমে যাওয়ায়।
ইলিশের মৌসুমে এ বন্দরকে কেন্দ্র করে ছোট-বড় প্রায় দেড় হাজার নৌযান মাছ ধরতে যায়। সাত-আট বছর আগেও এ সংখ্যা আট শর বেশি ছিল না।দিদার উদ্দিন আহমেদ মাসুম, সভাপতি, মহিপুর মৎস্য বন্দর ব্যবসায়ী সমিতি
সামুদ্রিক ইলিশের প্রায় ৯৮ শতাংশ ধরে ছোট নৌযান
সমুদ্রের ইলিশ ধরার ক্ষেত্রে ছোট ও মাঝারি বা আর্টিসানাল নৌযানের অংশ সবচেয়ে বেশি। মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২০–২১ অর্থবছরে সমুদ্র থেকে মোট ৩ লাখ ১৩ হাজার ৫৯৩ টন ইলিশ আহরণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ছোট ও মাঝারি নৌযান ধরেছিল ৩ লাখ ৫ হাজার ৮১২ টন। শিল্প ট্রলারের আহরণ ছিল ৭ হাজার ৭৮১ টন। অর্থাৎ, ওই বছর সামুদ্রিক ইলিশের প্রায় ৯৭ দশমিক ৫ শতাংশই ধরেছিল ছোট ও মাঝারি নৌযান।
মহিপুর মৎস্য বন্দর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি দিদার উদ্দিন আহমেদ মাসুম প্রথম আলোকে বলেন, ইলিশের মৌসুমে এ বন্দরকে কেন্দ্র করে ছোট-বড় প্রায় দেড় হাজার নৌযান মাছ ধরতে যায়। সাত-আট বছর আগেও এ সংখ্যা আট শর বেশি ছিল না।
তবে শিল্প ট্রলারের প্রভাবও উপেক্ষা করা যায় না। ছোট নৌযানের মালিকেরা গভীর সমুদ্রে চলা বড় ট্রলারকে দায়ী করেন। অন্যদিকে শিল্প ট্রলারের মালিকেরা নদী ও মোহনায় জাটকা এবং ডিমওয়ালা ইলিশ ধরাকে বড় সমস্যা হিসেবে দেখান।
বাংলাদেশ মেরিন ফিশারিজ অ্যাসোসিয়েশন শিল্প ট্রলার এবং সামুদ্রিক মাছ ও চিংড়ি আহরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন। সংগঠনটির সভাপতি এনাম চৌধুরী বলেন, ২০২৩ সালের পর গভীর সমুদ্রে ইলিশ খুবই কম পাওয়া যাচ্ছে। নদী ও মোহনায় জাটকা ধরা হচ্ছে। ইলিশ নদী ও সাগরের মধ্যে চলাচল করে। সেই চলাচলের পথেই মাছ ধরা পড়ছে।
অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিসহ শিল্প ট্রলারের সংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে এনাম চৌধুরী বলেন, ‘নৌযানের সংখ্যা অনেক বেড়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আমরা যে জাল ব্যবহার করি, সরকার তা পর্যবেক্ষণ করে। তবে কিছু লোক যে নিয়ম ভাঙে, সেটিও ঠিক।’
ডিমসহ বড় ইলিশের অনুপাত কমেছে
ইলিশের ভবিষ্যৎ উৎপাদন বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো প্রজননক্ষম বড় স্ত্রী ইলিশের উপস্থিতি। চলতি মৌসুমে ইলিশের আকার, সংখ্যা ও প্রজনন পরিস্থিতি জানতে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের চাঁদপুর নদীকেন্দ্রের কয়েকটি দল দেশের নয়টি মৎস্য বন্দরে তথ্য সংগ্রহ করেছে। ১ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা তায়েফা আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিনিধিদল যেসব এলাকায় গিয়েছে, প্রায় সব জায়গাতেই ইলিশের সংখ্যা ও আকার কম পাওয়া গেছে। আগে এই সময়ে আহরণ করা ইলিশের ৪৫ থেকে ৪৯ শতাংশের মধ্যে ডিম পাওয়া যেত। এবার বিভিন্ন বন্দরে এই হার ৯ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যে পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, সব জায়গাতেই ডিমসহ বড় ইলিশের উপস্থিতি কম। এটাই সবচেয়ে উদ্বেগজনক।