বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ১১টি হল চালু রয়েছে। এবার সব বর্ষের শিক্ষার্থীকেই হলে থাকতে আবেদন করার কথা বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছিল। পরে ছাত্রদের সাতটি হলে ২ হাজার ৭২৫টি আসনের বিপরীতে আবেদন জমা পড়ে ১ হাজার ৬০টি। ছাত্রীদের চারটি হলে ২ হাজার ২৭০টি আসনের বিপরীতে আবেদন করেন ১ হাজার ৭২০ জন। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি আসনে থাকতে কোনো শিক্ষার্থী আবেদন করেননি।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, হলের আসন বরাদ্দের প্রক্রিয়া তিনটি ধাপে হয়। প্রথমে শিক্ষার্থীরা হল কার্যালয় থেকে ফরম সংগ্রহ করে আবেদন করেন। পরে হল প্রাধ্যক্ষ মৌখিক পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের আহ্বান করেন। এরপর শিক্ষার্থীদের আসন বরাদ্দ দেওয়া হয়।

নিয়ম মেনে সর্বশেষ ২০১৭ সালের জুনে হলগুলোতে আসন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। আসন বরাদ্দ না দিলেও শিক্ষার্থীরা যে হলে ছিলেন না, বিষয়টি এমন নয়। ছাত্রীরা হল কর্তৃপক্ষ থেকে সাময়িক অনুমতি নিয়ে ছিলেন। আর ছাত্রদের হলের আসন নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন শাখা ছাত্রলীগের নেতারা। তাঁরাই হলের কোন কক্ষে কে থাকবেন, তা ঠিক করে দেন। বর্তমানে সব হলের সব আসনেই ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা থাকছেন।

আলাওল হলের একটি কক্ষে থাকেন বাংলাদেশ স্টাডিজ বিভাগের ও পরিসংখ্যান বিভাগের প্রথম বর্ষের দুই ছাত্র। প্রথম আলোকে জানান, ছাত্রলীগের এক বড় ভাইয়ের মাধ্যমে তাঁরা দুজন হলে আসন পেয়েছিলেন।

কিন্তু এবার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর তাঁরা আবেদন করেননি। আবেদন না করার বিষয়ে দুই শিক্ষার্থী বলেন, ২০১৯ সালেও বরাদ্দের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে কাউকে আসন দেওয়া হয়নি। এবারও আসন বরাদ্দ হবে না ভেবে আবেদন করেননি।

হলে থাকছেন, কিন্তু আবেদন করেননি—এ শিক্ষার্থীদের বিষয়ে প্রক্টর রবিউল হাসান ভূঁইয়া বলেন, কিছুদিনের মধ্যেই হলে তল্লাশি করে অবৈধভাবে থাকা শিক্ষার্থীদের বের করে দেওয়া হবে। এরপর শুধু বরাদ্দ পাওয়া শিক্ষার্থীদেরই হলে তোলা হবে। আসন পাননি, এমন একজন শিক্ষার্থীও হলে থাকতে পারবেন না।

রবিউল হাসান ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, কোনো সংগঠনের প্রভাব তাঁদের ওপর নেই। কম আবেদন পড়ার বিষয়ে কোনো সমস্যা নেই। কারণ, ২০১৯ সালে একবার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। তখনো কিছু শিক্ষার্থী আবেদন করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই আসন পাবেন। অবশ্য ২০১৯ সালে কতজন আবেদন করেছিলেন, তা তিনি জানাতে পারেননি।

কোন হলে কত আবেদন

হল সূত্র জানায়, ছাত্রদের মাস্টারদা সূর্য সেন হলে ২১৬ আসনের বিপরীতে আবেদন জমা পড়ে ৪৫টি। এ ছাড়া আলাওলে ২৬০ আসন, আবেদন ৯৪টি; এ এফ রহমান হলে ২৫৮টি আসন, আবেদন ৭৮; শাহজালাল হলে ৪৭৫ আসন, আবেদন ১৫৫; শাহ আমানত হলে আসন ৬৩২, আবেদন ১৫৩; সোহরাওয়ার্দী হলে আসন ৩৭৫, আবেদন ৩৭০ এবং শহীদ আবদুর রব হলে আসন ৫০৯, আবেদন ১৬৫টি।

অন্যদিকে ছাত্রীদের শামসুন নাহার হলে ৪৮১ আসনের বিপরীতে আবেদন করেছেন ৪১০ জন, প্রীতিলতায় ৫৩১ আসনের বিপরীতে ৪৭৫ জন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ায় ৫০৮ আসনের বিপরীতে ৩৬৬ জন আর জননেত্রী শেখ হাসিনা হলে ৭৫০ আসনের বিপরীতে ৪৬৯ জন।

কর্তৃপক্ষের প্রতি অনাস্থা, ছাত্রলীগে ‘ভয়’

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে পারবে না হল কর্তৃপক্ষ। কারণ, এ ক্যাম্পাসের হলে কথায় কথায় মারামারি হয়। হলে কক্ষ দখল নিয়ে ছাত্রলীগের বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে গত পাঁচ বছরে ১৮ বার সংঘর্ষ হয়। কোনো শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হলে কর্তৃপক্ষ দায় নেবে না। সব দিক বিবেচনা করেই তাঁরা আবেদন করেননি। মূলত ছাত্রলীগভীতিটাই মুখ্য।

ভীতির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, আবেদন করতে কোনো শিক্ষার্থীকে বাধা দেওয়া হয়নি। আবেদন না করে এ ধরনের অভিযোগ করা ঠিক না।

দীর্ঘদিন আসন বরাদ্দ না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি জাকির হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পাঁচ বছর আসন বরাদ্দ না দিয়ে কর্তৃপক্ষ দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। এ কারণে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও হলের আসনের জন্য আবেদন করেননি। কারণ, এখন যাঁরা হলে থাকছেন তাঁদের বের করে দিয়ে বরাদ্দ পাওয়া শিক্ষার্থীদের তোলার সক্ষমতা কর্তৃপক্ষের আছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আবার হলে কোনো ঘটনা ঘটলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে পারবে না কর্তৃপক্ষ।