পেনিসিলিন: যে আবিষ্কার চিকিৎসায় বিপ্লব ঘটাল, সেটা নিয়ে কেন এখন উদ্বেগ

অ্যান্টিবায়োটিকপ্রতীকী ছবি: এএফপি

ঢাকার একটি হাসপাতালের করিডর। ছেলের সঙ্গে এসেছেন সত্তরোর্ধ্ব এক নারী। রক্ত ও প্রস্রাবের সংক্রমণে ভুগছেন তিনি। তীব্র জ্বর ছিল। সঙ্গে ডায়রিয়া। চিকিৎসক দেখিয়েছিলেন। নিয়ম মেনে অ্যান্টিবায়োটিক খেয়েছেন। কিন্তু পুরোপুরি সেরে উঠছেন না। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে আবার কিছু পরীক্ষা করিয়েছেন। সেই রিপোর্ট দেখাতে এসেছেন।

ঘণ্টা দেড়েক অপেক্ষার পর ডাক এল। ছেলের হাত ধরে চিকিৎসকের কক্ষে ঢুকলেন ওই নারী। মিনিট দশেক পর যখন বেরিয়ে এলেন, চোখমুখ থমথমে। জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ডাক্তার কী বললেন?’ হতাশ কণ্ঠে জবাব এল, ‘আগে যে অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েছিলেন, সেসব শরীরে কাজ করছে না। এখন ওষুধ বদলে দিলেন।’

এই নারী অনেক সময় ফার্মেসি থেকে নিজেই অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খেতেন। রিপোর্ট দেখে চিকিৎসক ওই নারীকে বলেছেন, তাঁর শরীরে সাত থেকে আট ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক রেজিট্যান্স হয়ে গেছে। অর্থাৎ এসব ওষুধ এখন আর তাঁর শরীরে কাজ করছে না। এ বয়সে এটা বড় বিপদের কারণ হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে তিনি ও তাঁর ছেলে—দুজনই বেশ চিন্তিত।

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিট্যান্স বা শরীরে কাজ না করার এমন সমস্যা আমাদের সমাজে মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। প্রবীণ থেকে শিশু—অনেকে ভুগছেন সমস্যাটিতে। যথেচ্ছ ও অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার থেকে সমস্যাটির সূচনা। এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা, সভা, সেমিনার, উদ্যোগ, পরামর্শ; কিন্তু সমাধান যেন অধরা।

অ্যান্টিবায়োটিক কী

অ্যান্টিবায়োটিক হলো অণুজীব থেকে তৈরি একধরনের রাসায়নিক যৌগ। এটি অন্য অণুজীবের জন্য বেশ ক্ষতিকর। সাধারণত মাটির মতো জটিল পরিবেশে নিজেদের প্রতিদ্বন্দ্বী অণুজীবের বৃদ্ধি ও বিকাশ ঠেকাতে এটা তৈরি হয়ে থাকে।

আলেকজান্ডার ফ্লেমিং তাঁর নোবেল পুরস্কার গ্রহণের অনুষ্ঠানেই জীবাণুর মাধ্যমে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ বা তা থেকে কী বিপদ হতে পারে, সেই সম্পর্কে বলে গেছেন। তাঁর ভাষ্য, অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে ওঠে ব্যাকটেরিয়া, মানুষ নয়। ফলে রোগীর শরীরে এমন ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ ঘটালে প্রচলিত ওষুধ আর আগের মতো কাজ না–ও করতে পারে।

ব্যাকটেরিয়া-ছত্রাকসহ বিভিন্ন অণুজীব রোগ প্রতিরোধ বা চিকিৎসায় ব্যবহারের উপযোগী অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করতে পারে। মানুষ বা প্রাণীর শরীরে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ধ্বংস করা কিংবা বৃদ্ধি ও বংশবিস্তার রোধ করতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়।

আরও পড়ুন

কে আবিষ্কার করেন

চিকিৎসাবিজ্ঞানে অ্যান্টিবায়োটিকের অগ্রযাত্রায় বড় ভূমিকা রাখে পেনিসিলিন আবিষ্কার। সময়টা ১৯২৮ সাল। স্কটল্যান্ডের বিজ্ঞানী স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং পেনিসিলিন আবিষ্কার করেন। ব্যাকটেরিয়া নিয়ে গবেষণার জন্য তিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন।

এই বিজ্ঞানীর জন্ম ১৮৮১ সালের ৬ আগস্ট, স্কটল্যান্ডের ডারভেলের পাশের একটি গ্রামে। সেখানেই বেড়ে ওঠা। বাবা ছিলেন কৃষক। আট ভাইবোনের মধ্যে ফ্লেমিং সপ্তম।

স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং
।ছবি: আলেকজান্ডার ফ্লেমিং ল্যাবরেটরি মিউজিয়ামের ওয়েবসাইট

স্কটিশ বিদ্যালয়ে ফ্লেমিংয়ের শিক্ষাজীবনের শুরু। ১৮৯৫ সালে চলে আসেন যুক্তরাজ্যের লন্ডনে। বড় ভাই টমাসের সঙ্গে বসবাস করতেন তিনি। ভর্তি হন রিজেন্ট স্ট্রিট পলিটেকনিকে। সেই সঙ্গে লন্ডনের একটি জাহাজ কোম্পানিতে ক্লার্কের কাজ নেন ফ্লেমিং।

বড় ভাইয়ের পরামর্শে ফ্লেমিংয়ের চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা শুরু হয়। সময়টা ১৯০১ সাল। লন্ডনের সেন্ট মেরি’স মেডিক্যাল স্কুলে ফ্লেমিং ভর্তি হন। বৃত্তিও পান। ঐতিহ্যবাহী লন্ডন ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯০৮ সালে সেরা শিক্ষার্থী হিসেবে স্বর্ণপদক জিতে নেন।

শুরুতে শল্যচিকিৎসক হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কপালে অন্য জিনিস লেখা ছিল। শেষমেশ থিতু হন সেন্ট মেরি’স-এর গবেষণাগারে। ব্যাকটেরিয়া নিয়ে গবেষণায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন তিনি। ১৯০৯ থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে ফ্লেমিংয়ের সুনাম ছড়ায়। ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখতেন তিনি।

ফ্লেমিং ছিলেন যুক্তরাজ্যের প্রথম দিককার চিকিৎসকদের একজন, যিনি সিফিলিসের চিকিৎসায় আর্সফেনামিন ব্যবহার করতেন। জার্মান বিজ্ঞানী পল এরলিখ ১৯১০ সালে এ ওষুধ আবিষ্কার করেন। সিফিলিসের চিকিৎসায় এটি বেশ কার্যকর ছিল।

১৯১৫ সালে ফ্লেমিং আইরিশ নার্স সারাহ ম্যারিয়ন ম্যাকএলরয়কে বিয়ে করেন। ১৯২৪ সালে তাঁদের ছেলে রবার্টের জন্ম হয়। পরে তিনিও বাবার পথ অনুসরণ করে চিকিৎসক হন।

শুধু মানবদেহ নয়, প্রাণীর শরীর, এমনকি কৃষিতে এর যথেচ্ছ ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। কৃষি, গবাদিপশু, মুরগি, ডিম ও মাছ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রণহীন ও অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার করছেন খামারিরা। খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রবেশ করছে এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর তার প্রভাব গিয়ে পড়ছে।

‘লাইসোজাইম’ আবিষ্কার

ইউরোপে তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজছে। রয়্যাল আর্মি মেডিক্যাল কোরে দায়িত্ব পান ফ্লেমিং। ছিলেন ফ্রান্সের বুলোন শহরের একটি সামরিক হাসপাতালে। সেখানে ব্যাকটেরিয়াবিদ হিসেবে কাজ করতেন। স্থানীয় একটি ক্যাসিনো ভবনে ছিল হাসপাতালটি। যুদ্ধে আহত সেনাদের ক্ষতস্থানে হওয়া সংক্রমণের চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা করতেন ফ্লেমিং।

ওই সময়ের গবেষণায় ফ্লেমিং দেখতে পান, ক্ষতস্থানে শক্তিশালী জীবাণুনাশক ব্যবহার করলে উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি হয়। তাঁর পরামর্শ ছিল, শক্তিশালী জীবাণুনাশক না দিয়ে হালকা লবণপানির দ্রবণ দিয়ে ক্ষত পরিষ্কার রাখা বেশ উপকার দেয়।

বিশ্বযুদ্ধ শেষে ফ্লেমিং সেন্ট মেরি’সে ফেরেন। যোগ দেন ইনোকুলেশন বিভাগে। পরে এ বিভাগের প্রধান হন। গবেষণা চালিয়ে যান।

১৯২১ সালের নভেম্বরে আলেকজান্ডার ফ্লেমিং ‘লাইসোজাইম’ আবিষ্কার করেন। এটি একধরনের এনজাইম। লালা ও চোখের পানির মতো শরীরের বিভিন্ন তরলে এটা থাকে। এর হালকা জীবাণুনাশক ক্ষমতা রয়েছে। এটাই ছিল ফ্লেমিংয়ের প্রথম বড় আবিষ্কার।

ঘটনাটি ঘটে বেশ অদ্ভুতভাবে। তখন ফ্লেমিং সর্দিতে ভুগছিলেন। হঠাৎ তাঁর নাকের শ্লেষ্মার এক ফোঁটা ব্যাকটেরিয়া রাখা কালচার প্লেটে পড়ে যায়। ফ্লেমিং ধারণা করেন, ওই শ্লেষ্মা হয়তো ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই তিনি শ্লেষ্মা ব্যাকটেরিয়ার কালচারে মিশিয়ে দেন। কয়েক সপ্তাহ পর তিনি দেখতে পান, ব্যাকটেরিয়ার কিছু অংশ যেন গলে গেছে।

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিট্যান্স বা শরীরে কাজ না করার এমন সমস্যা আমাদের সমাজে মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। প্রবীণ থেকে শিশু—অনেকে ভুগছেন সমস্যাটিতে। যথেচ্ছ ও অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার থেকে সমস্যাটির সূচনা। এ নিয়ে নানা বিস্তর আলোচনা, সভা, সেমিনার, উদ্যোগ, পরামর্শ—কিন্তু সমাধান যেন অধরা।

লাইসোজাইম নিয়ে ফ্লেমিংয়ের গবেষণা সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীর কীভাবে লড়াই করে, তা বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফ্লেমিং নিজেও এটাকে বিজ্ঞানী হিসেবে তাঁর সেরা কাজ বলে মনে করতেন। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, সবচেয়ে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লাইসোজাইম কার্যকর ছিল না।

‘পেনিসিলিন’ আবিষ্কার

১৯২৮ সাল। ফ্লেমিং তত দিনে ব্যাকটেরিওলজির অধ্যাপক হয়েছেন। তিনি তখন সেন্ট মেরি’স হাসপাতালে গবেষণায় ব্যস্ত। গ্রীষ্মের ছুটিতে যাওয়ার আগে ভুল করে গবেষণাগারের পেট্রি ডিশে (ল্যাবরেটরিতে ব্যবহৃত একধরনের ছোট গোল স্বচ্ছ পাত্র) ব্যাকটেরিয়ার কালচার ফেলে যান। ফিরে এসে দেখেন, একটি পেট্রি ডিশের ঢাকনা খোলা। তাতে নীলচে সবুজ ছত্রাক জন্মেছে।

গবেষণাগারে এমনটা হতেই পারে। কিন্তু ফ্লেমিংয়ের জহুরির চোখে ধরা পড়ে, ছত্রাকের চারপাশে ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব নেই। কিছুটা দূরে ব্যাকটেরিয়া স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠছে। তিনি বুঝতে পারেন, ছত্রাকটি এমন কোনো পদার্থ তৈরি করেছে, যা ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি থামিয়ে দিচ্ছে।

ফ্লেমিং এটা নিয়ে বিশদ গবেষণার সিদ্ধান্ত নেন। পরে ছত্রাকটিকে ‘পেনিসিলিয়াম নোটাটাম’ গোত্রের বলে শনাক্ত করেন তিনি। নাম দেন ‘পেনিসিলিন’। সম্ভবত ১৯২৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তিনি পেনিসিলিনের সন্ধান পান। তবে বিশদ গবেষণার পর ২৮ সেপ্টেম্বর আবিষ্কৃত হয় এটি। ফ্লেমিং পরে এক স্মৃতিচারণায় নিজেই এ তারিখের কথা বলে গেছেন।

১৯২৯ সালে ফ্লেমিং তাঁর এ আবিষ্কারের কথা প্রকাশ করেন। তাঁর গবেষণাপত্রটি চিকিৎসাশাস্ত্রে সাড়া ফেলে দেয়। কিন্তু তখনই ওষুধ হিসেবে পেনিসিলিন বাজারে আসেনি। এটা নিয়ে চলে দীর্ঘ গবেষণা। দেখা যায়, এটা মানবদেহে সংক্রমণ ঘটানো অনেক সাধারণ ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে পারে।

তত দিনে বিশ্ববাসী রক্তক্ষয়ী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছে। যুদ্ধের ব্যাপকতায় সবাই স্তব্ধ। আহত সেনাদের চিকিৎসায় জোরালোভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের দরকার হয়। ফ্লেমিংয়ের আবিষ্কার আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ওই সময়ে চিকিৎসায় পেনিসিলিনের ব্যবহারে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির হাওয়ার্ড ফ্লোরির নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী।

এ বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়ার বড় উপায়—সচেতনতা এবং অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে। রোগী, চিকিৎসক, চিকিৎসাকর্মী, সরকার—সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে সচেতন হয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।

পেনিসিলিনের আবিষ্কার ও বিকাশে গবেষণা করায় ১৯৪৫ সালে আলেকজান্ডার ফ্লেমিং, অস্ট্রেলিয়ার রোগতত্ত্ববিদ হাওয়ার্ড ফ্লোরি ও ব্রিটিশ জৈব রসায়নবিদ আর্নস্ট চেইন চিকিৎসাশাস্ত্রে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পান। তবে পেনিসিলিনের কৃতিত্ব কে বেশি পাবেন, তা নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিতর্ক ছিল।

এর আগের বছর (১৯৪৪ সাল) ফ্লেমিংকে সম্মানজনক ‘নাইটহুড’ উপাধি দেওয়া হয়। আর ১৯৪৩ সালে তিনি রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন।

১৯৪৯ সালে ফ্লেমিংয়ের স্ত্রী মারা যান। এরপর ১৯৫৩ সালে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে করেন। কনে গ্রিসের অণুজীববিজ্ঞানী অ্যামেলিয়া কুটসউরিস-ভুরেকা। সেন্ট মেরি’সে তিনি ফ্লেমিংয়ের সহকর্মী ছিলেন।

ফ্লেমিং ১৯৫৫ সালের ১১ মার্চ লন্ডনে মারা যান। সেন্ট পল’স গির্জায় তাঁকে সমাহিত করা হয়।

পেনিসিলিন আবিষ্কারের জন্য আজও এই নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীকে স্মরণ করা হয়। যুগান্তকারী এ আবিষ্কার তাঁকে বিশ্বের সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানীদের কাতারে এনেছে।

ফ্লেমিংয়ের সতর্কবার্তা

পেনিসিলিন—বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হওয়া অ্যান্টিবায়োটিক। বিশ শতকের চল্লিশের দশকের শুরু থেকেই চিকিৎসায় এর ব্যবহার হয়ে আসছে। আর ১৯৪৫ সালে সাধারণ মানুষের জন্য বাজারে আসে পেনিসিলিন।

পেনিসিলিন ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি কার্যকর অস্ত্র তৈরি করে দেয়। আগে যেসব সংক্রমণ প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারত, সেগুলোর চিকিৎসা করা সম্ভব হয়।

ক্ষতস্থানের সংক্রমণ, নিউমোনিয়া, রক্তের সংক্রমণসহ বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন যুগের সূচনা করে।

এর প্রভাব শুধু সংক্রমণের চিকিৎসায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; অস্ত্রোপচার, প্রসব ও নানা ধরনের চিকিৎসাপদ্ধতিও তুলনামূলক নিরাপদ হয়ে ওঠে। কারণ, চিকিৎসার পর ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ হলে তা মোকাবিলা করার কার্যকর ওষুধ চিকিৎসকেরা পান।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়া এ সাফল্যের মধ্যে লুকিয়ে ছিল একটি সতর্কতা। অ্যান্টিবায়োটিক যত বেশি ব্যবহার হতে থাকে, ততই কিছু ব্যাকটেরিয়া এসব ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে উঠতে শুরু করে। ফলে অ্যান্টিবায়োটিক আগের মতো আর কাজ করে না।

ফ্লেমিং তাঁর নোবেল পুরস্কার গ্রহণের অনুষ্ঠানেই জীবাণুর মাধ্যমে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ বা তা থেকে কী বিপদ হতে পারে, সে সম্পর্কে বলে গেছেন। তাঁর ভাষ্য, অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে ওঠে ব্যাকটেরিয়া; মানুষ নয়। ফলে রোগীর শরীরে এমন ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ ঘটালে প্রচলিত ওষুধ আর আগের মতো কাজ না–ও করতে পারে।

এখন এমনটাই ঘটছে। শুরুতে ঢাকার হাসপাতালের করিডরে যে বয়স্ক নারী রোগীর দেখা পাওয়ার কথা বলা হয়েছে, তিনি একই সমস্যায় পড়েছেন। এরই মধ্যে একাধিক অ্যান্টিবায়োটিক তাঁর শরীরে কার্যক্ষমতা হারিয়েছে। ফলে চিকিৎসক তাঁকে ওষুধ বদলে দিয়েছেন।

উদ্বেগ বিশ্বজুড়ে

অ্যান্টিবায়োটিকের কাজ না করার বড় কারণ—সামান্য কাটাছেঁড়া, সাধারণ কাশি, জ্বর, গলাব্যথা, ডায়রিয়া, সবকিছুতেই এর ব্যবহার। রোগীরা অনেক সময় চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করেন। এতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হাজার হাজার সেনার ক্ষত সারিয়ে জীবন বাঁচানো পেনিসিলিন অকার্যকর হওয়ার ঝুঁকি দেখা দেয়। প্রচুর অর্থ, মেধা ও পরিশ্রমের ফলে যদি নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কৃত হয়ও, তা আবার অকার্যকর হয়ে যায় মানুষের স্বেচ্ছাচারিতায়।

শুধু মানবদেহ নয়, প্রাণীর শরীর, এমনকি কৃষিতে এর যথেচ্ছ ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। কৃষি, গবাদিপশু, মুরগি, ডিম ও মাছ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রণহীন ও অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার করছেন খামারিরা। খাদ্যের মাধ্যমে মানুষের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রবেশ করছে এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর তার প্রভাব গিয়ে পড়ছে।

২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকা ‘শার্প গ্লোবাল রেইজ ইন অ্যান্টিবায়োটিক-রেজিস্ট্যান্ট ইনফেকশন ইন হসপিটালস, ডব্লিউএইচও ফাইন্ডস’ শীর্ষক এক উদ্বেগজনক সংবাদ প্রচার করে। বলা হয়, বিশ্বব্যাপী যেসব সাধারণ সংক্রামক রোগ প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকে সহজে সারানো যেত, তা এখন আর সারানো যাচ্ছে না।

চিকিৎসকেরা আতঙ্কের সঙ্গে বলছেন, সামনের দিনগুলোয় অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ সংক্রামক রোগের চিকিৎসায় মারাত্মক সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ২০৫০ সাল নাগাদ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ৭০ শতাংশে পৌঁছাবে।

২০১৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর অ্যান্টিবায়োটিক সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একইভাবে উদ্বেগজনক সংবাদ প্রচার করেছিল। ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ রানিং আউট অব অ্যান্টিবায়োটিকস’ শিরোনামের খবরে বলা হয়, অতি দ্রুত পৃথিবী থেকে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক নিঃশেষ হচ্ছে। আর ‘অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এজেন্টস ইন ক্লিনিক্যাল ডেভেলপমেন্ট পাইপলাইন ইনক্লুডিং টিউবারকিউলোসিস’ শীর্ষক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক রিপোর্টে বলা হয়, বাজারে নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আসাও স্থবির হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ পরিস্থিতি

উন্নত দেশের তুলনায় বাংলাদেশের মতো দেশগুলোয় এ সমস্যার মাত্রা অনেক বিস্তৃত ও গভীর। ২০২১ সালের ২৩ নভেম্বর প্রথম আলোয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক সানিয়া তহমিনার লেখা একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। শিরোনাম ‘অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার: ফ্লেমিংয়ের সতর্কবার্তা ও ভবিষ্যৎ মহামারির আশঙ্কা’।

এ লেখায় বলা হয়েছে, ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর ভেতর ওষুধপ্রতিরোধী বহু ব্যাকটেরিয়া বা ‘সুপারবাগ’ (যে জীবাণু একাধিক অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী) ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে এবং ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৯ সাল পর্যন্ত তা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিট্যান্স এখন বৈশ্বিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে
প্রতীকী ছবি: এএফপি

অন্যদিকে ঢাকা শহরের একটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের মার্চ পর্যন্ত এক গবেষণায় দেখা যায়, হাসপাতালে ব্যবহৃত ১৪টি অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতিটি কোনো না কোনো মাত্রায় অকার্যকর। এর মধ্যে একটি অ্যান্টিবায়োটিক ৯৪ শতাংশ অকার্যকর।

সানিয়া তহমিনা প্রশ্ন তুলেছেন, তাহলে মানুষ কি অ্যান্টিবায়োটিক-উত্তর বা ‘পোস্ট–অ্যান্টিবায়োটিক এরা’ নামের দুঃস্বপ্নের যুগে প্রবেশ করবে?

আরও পড়ুন

করণীয় কী

জনস্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ ও গবেষকেরা বাংলাদেশে পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার জন্য কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ব্যাপারে ধারণা না থাকা; চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি ও ব্যবহার; পরিপূর্ণ মাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক না খাওয়া; দুর্বল সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা; হাসপাতালে রোগীর চাপ; বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশের অভাব রয়েছে।

এ ছাড়া হাসপাতাল, ওষুধশিল্পের কারখানা ও পরীক্ষাগারের অপরিশোধিত বর্জ্য নিষ্কাশন; মানুষ, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির মলমূত্রের সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক বা তার অংশ মাটি ও পানিতে মেশা; রোগ শনাক্তে ভালো পরীক্ষাগারের অভাব; আইনের অভাব ও দুর্বলতা, তদারকির অভাব কারণ হিসেবে রয়েছে।

আরও পড়ুন

অধ্যাপক তহমিনা লিখেছেন, বাংলাদেশ সরকার ২০১৬ সালে ‘জাতীয় ঔষধ নীতি ২০১৬’ প্রণয়ন করে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ‘জাতীয় অ্যান্টিবায়োটিক নীতিমালা’ তৈরি হয়নি।

কাজেই এ বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়ার বড় উপায়—সচেতনতা এবং অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে। রোগী, চিকিৎসক, চিকিৎসাকর্মী, সরকার—সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে সচেতন হয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে।

তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি, এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), সেন্টারস ফর ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি), নোবেল পুরস্কার এবং আলেকজান্ডার ফ্লেমিং ল্যাবরেটরি মিউজিয়ামের ওয়েবসাইট।

  • অনিন্দ্য সাইমুম: প্রথম আলোর সহসম্পাদক

  • ইমেইল: [email protected]

আরও পড়ুন