প্রশিক্ষণসামগ্রী, নাশতা, জায়গাভাড়া

লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প ২০১৪ সালে শুরু হয়। শেষ হচ্ছে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে। এতে মোট বরাদ্দ ৩১৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় ২০২০ সালে প্রফেশনাল আউটসোর্সিং ট্রেনিং অ্যান্ড এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস ফর আই/আইটিএস ইন্ডাস্ট্রি’ শীর্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়। এর আওতায় জেলা–উপজেলা পর্যায়ে ৪০ হাজার ব্যক্তিকে ৫০ দিনব্যাপী ২০০ ঘণ্টা সশরীর ল্যাবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা ছিল। এ জন্য ১৫ লটে ১৫টি প্রতিষ্ঠানকে বাছাই করা হয়। তবে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অনলাইনে চালানো হয়।

সিএজির নিরীক্ষায় প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে চারটি ভাগে ২ কোটি ১ লাখ ৭৫ হাজার ৩২৪ টাকার আর্থিক অনিয়ম ধরা পড়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রশিক্ষণের জন্য বই, নোট প্যাড, কলম, লেকচারশিটসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনার কথা ছিল। কিন্তু প্রশিক্ষণ হয়েছে অনলাইনে। প্রশিক্ষণ শেষে প্রশিক্ষণদাতা প্রতিষ্ঠান চুক্তিমূল্যের ৪০ শতাংশ বিল দাখিল করে। এতে উল্লিখিত উপকরণের জন্য ৮৭ লাখ ২৩ হাজার ৮২৫ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়।

চুক্তিপত্রে প্রশিক্ষণের জন্য ভেন্ডারদের সঙ্গে বিভিন্ন প্রশিক্ষণসামগ্রী সরবরাহ বাবদ মূল্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। এরপরও প্রকল্প পরিচালক চুক্তির বাইরে প্রতিটি ভাউচারে ৪ লাখ ৯৫ হাজার টাকা করে ১১টি বিলের মাধ্যমে ৫৪ লাখ ৪৫ হাজার টাকার অতিরিক্ত সামগ্রী কেনেন।

সিএজির নিরীক্ষার অবশ্যই গুরুত্ব আছে। তবে এ ধরনের প্রতিবেদন যেন শুধু কাগজে–কলমে না থাকে। এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যেন যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এখানে জনগণের অর্থের অপচয় হয়েছে।
ইফতেখারুজ্জামান, সার্বিক বিষয়ে ট্রান্সপারেসি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রধান নির্বাহী

প্রশিক্ষণের জন্য ভেন্যু বা ল্যাব বাবদ খরচ ধরা হয়েছে। অথচ ভেন্যু বা ল্যাব লাগেনি। কিন্তু প্রশিক্ষণদাতা প্রতিষ্ঠানকে এ বাবদ ৫৩ লাখ ৭৭ হাজার ২৭ টাকার বিলসহ ৪০ শতাংশ বিল দেওয়া হয়েছে। আবার প্রশিক্ষণার্থীদের নাশতার বিল বাবদ ১৫ লাখ ২৯ হাজার ৮৭২ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

সিএজি প্রতিবেদনে এসব বিলকে বাস্তবতা বিবর্জিত বলা হয়। তবে প্রকল্পের কর্মকর্তারা বলছেন, ডিপিপি অনুসারে কোনো ব্যাচের ১০০ ঘণ্টা প্রশিক্ষণ হলেই মোট বিলের ৪০ শতাংশ দেওয়ার বিধান আছে। সে অনুযায়ী ৪০ শতাংশ বিল দেওয়া হয়েছে। বাকি ৬০ শতাংশ বিল বাকি আছে। চূড়ান্ত বিল পরিশোধের সময় প্রশিক্ষণসামগ্রীর জন্য বরাদ্দ অর্থসহ অনলাইনে প্রয়োজন হয়নি, এমন বিল কেটে দেওয়া হবে। এ ছাড়া অতিরিক্ত যে সামগ্রী কেনা হয়েছে, তা আইসিটি বিভাগের করিডরে মজুত আছে।

সিএজির নিরীক্ষা মন্তব্যে বলা হয়, যোগসাজশ করে এসব বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এ ছাড়া সরকারি টাকায় সামগ্রী কিনে তা ফেলে রাখা অর্থের অপচয়।

লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রকল্পের পরিচালক মো. হুমায়ুন কবীর প্রথম আলোকে বলেন, প্রশিক্ষণ ও অডিট শেষ হওয়ার পর তিনি যোগ দিয়েছেন। করোনার কারণে খাত পরিবর্তন হয়েছে এবং সেভাবেই অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জেনেছেন।

পরামর্শককে বাড়তি টাকা

মোবাইল গেম ও অ্যাপ্লিকেশনের দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্পটি ২০১৬ সালের জুলাই মাসে শুরু হয়। শেষ হবে ২০২৩ সালের জুনে। এতে মোট বরাদ্দ ৩৩০ কোটি টাকা। প্রকল্পের ২০১৯–২০ অর্থবছরে ১৩টি লটে ৪৮ জনকে ৫ মাসের প্রশিক্ষণ দিতে একটি কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়।

সিএজির প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পের দুজন প্রধান কোচ পরামর্শকের সম্মানী বাবদ সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ আইটি ইনস্টিটিউট ও লজিক্যাল ট্রায়াঙ্গেল লিমিটেডকে আরডিপিপি অনুযায়ী ২৯ লাখ টাকার পরিবর্তে ৪৬ লাখ ৪৩ হাজার ৫০০ টাকা পরিশোধ করা হয়। আরেকটি বিলের মাধ্যমে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ওলিভাইন লিমিটেড ও শিজি স্টুডিওকে ২৯ লাখ টাকার পরিবর্তে ৪৩ লাখ ৮৭ হাজার ৭৫০ টাকা পরিশোধ করা হয়। এই ৪ পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত টাকা দেওয়ায় ৩২ লাখ ৩১ হাজার ২৫০ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

করোনা মহামারিতে অনলাইন প্রশিক্ষণের জন্য প্রশিক্ষণ ভেন্যু ভাড়া, নাশতা ও দুপুরের খাবার, লজিস্টিক ও ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি ব্যয় বাবদ অনিয়মিতভাবে ১৩ লাখ ৯৪ হাজার ৯৩৬ টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে।

প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, আপত্তি ওঠা প্রশিক্ষণের পর তিনি দায়িত্ব পেয়েছেন। তবে আপত্তিগুলোর নিষ্পত্তি হয়েছে বলে শুনেছেন।

সিএজির প্রতিবেদনে বলা হয়, নিরীক্ষার সময়ে বেশ কিছু আর্থিক অনিয়ম ও বিধিবিধানের লঙ্ঘন ধরা পড়েছে। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতা ও আর্থিক বিধিবিধান না মানায় এসব অনিয়ম হয়েছে। খরচ না হলেও যোগসাজশের মাধ্যমে বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এই অর্থ আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া আবশ্যক।

সিএজির প্রতিবেদনে বলা হয়, নিরীক্ষার সময়ে বেশ কিছু আর্থিক অনিয়ম ও বিধিবিধানের লঙ্ঘন ধরা পড়েছে। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতা ও আর্থিক বিধিবিধান না মানায় এসব অনিয়ম হয়েছে। খরচ না হলেও যোগসাজশের মাধ্যমে বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এই অর্থ আদায় করে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া আবশ্যক।

সার্বিক বিষয়ে ট্রান্সপারেসি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রধান নির্বাহী ইফতেখারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, সিএজির নিরীক্ষার অবশ্যই গুরুত্ব আছে। তবে এ ধরনের প্রতিবেদন যেন শুধু কাগজে–কলমে না থাকে। এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যেন যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এখানে জনগণের অর্থের অপচয় হয়েছে।