বাংলাদেশে গুমের অভিযোগ বেড়েছে

জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এনফোর্সড অর ইনভলান্টারি ডিজঅ্যাপিয়ারেন্সের প্রতিবেদন।

নিখোঁজ বাবা পারভেজ হোসেনের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে মেয়ে আদিবা ইসলাম। গুম হওয়া ব্যক্তিদের ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে তাঁদের স্বজনেরা ‘মায়ের ডাক’-এর ব্যানারে মানববন্ধন করেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে।
প্রথম আলো ফাইল ছবি

জাতিসংঘের গুমবিষয়ক বিশেষজ্ঞ কমিটির কাছে বাংলাদেশে গুমের অভিযোগ বেড়েছে। কমিটির সর্ব সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের ২২ মে থেকে এ বছরের ১৩ মে পর্যন্ত এক বছরে কমিটির কাছে আসা বাংলাদেশে গুমের অভিযোগের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৮, যা আগে ছিল ৭৬।

ওই সময় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কমিটিকে আটজনের বিষয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে তথ্য দেওয়া হয়েছে। এখনো ৮১ জনের গুমের অভিযোগের কোনো সুরাহা হয়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক গুম-খুন দিবস উপলক্ষে রাজধানীর নয়া পল্টন বিএনপি কার্যালয়ের সামনে কর্মসূচি। গত ৩০ আগস্ট
প্রথম আলো ফাইল ছবি

জাতিসংঘের ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এনফোর্সড অর ইনভলান্টারি ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স’ নামে পরিচিতি গুমবিষয়ক বিশেষজ্ঞ কমিটি গত শুক্রবার এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আগামী মঙ্গলবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় মানবাধিকার পরিষদে প্রতিবেদনটি পেশ করা হবে।

এর আগে আগামীকাল সোমবার কমিটির ১২৮তম সভা শুরু হবে। সভায় ২১টি দেশের ৬৯৬টি গুমের অভিযোগ পর্যালোচনা করা হবে। এসব অভিযোগের মধ্যে অন্তত চারটির বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে প্রতিবেদনের বিবেচ্য সময়ে কমিটি যোগাযোগ করেছিল বলে দেখা যাচ্ছে।

ফাইল ছবি প্রথম আলো

প্রতিবেদনে কমিটি বিভিন্ন দেশের গুমের অভিযোগ, নিষ্পত্তি হওয়া ও অনিষ্পন্ন অভিযোগের যে পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যায়, বাংলাদেশ নির্ধারিত ছয় মাসের মধ্যে আটজনের বিষয়ে কমিটিকে তথ্য দিয়েছে। বাংলাদেশে যে ৮৮ জনের গুমের অভিযোগ কমিটি পেয়েছে, তাঁদের মধ্যে ২ জন ছিলেন নারী। এখন অনিষ্পন্ন হিসেবে যে ৮১ জনকে পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছে, তার মধ্যেও ১ জন নারী রয়েছেন। ওই হিসাবে দেখা যায়, তিনজন এখন মুক্ত এবং চারজন আটক আছেন।

আটজনের বিষয়ে তথ্য প্রদানকে স্বাগত জানিয়ে কমিটি বলেছে, এসব তথ্যের কারণে ওই আটজনের সম্পর্কে ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে। কমিটির ১২৫তম সভার পর থেকে যেসব অভিযোগের কথা সরকারকে জানানো হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে অতিরিক্ত তথ্য দেওয়ার জন্য সরকারকে আরও তৎপর হওয়ার জন্যও আহ্বান জানানো হয়েছে।

গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে ‘মায়ের ডাক’ ব্যানারে স্বজনহারাদের মানববন্ধন। শাহবাগ, ৩০ আগস্ট, ২০২২।
প্রথম আলো ফাইল ছবি

কমিটি গুমের অভিযোগগুলো ও তাতে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) ভূমিকার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তেরও আহ্বান জানিয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিবেচ্য সময়ে কমিটি তিনবার সভায় মিলিত হয়েছে। এর মধ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সভায় (১২৬তম) বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেছিল।

গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার, মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সংগঠনগুলোকে যেকোনো হুমকি থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্বের বিষয়েও জোর দিয়েছে কমিটি। কমিটির এ প্রতিবেদনে গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে কাজ করা মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের নিবন্ধন নবায়ন না করার সরকারি সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এ প্রসঙ্গে গুমবিষয়ক সনদের ১৩ নম্বর ঘোষণাটির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলা হয়, অভিযোগকারী, তাঁর আইনজীবী, সাক্ষী এবং অভিযোগের তদন্তে জড়িত সবাইকে সব ধরনের প্রতিশোধ, হুমকি ও হয়রানি থেকে অবশ্যই সুরক্ষা দিতে হবে।

মিশেল ব্যাশেলেত

গত মাসে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সাবেক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাশেলেত তাঁর দায়িত্ব ছাড়ার আগে শেষ সফরে ঢাকায় গিয়ে গুম ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো তদন্তে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। কমিশনের পক্ষ থেকে সহায়তা দেওয়ারও প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে গুমের অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে কোনো স্বাধীন তদন্তের ব্যবস্থা করার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করা হয়। এরপর ১২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের ৫১তম অধিবেশনে ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার নাদা আল নাশিফ তাঁর বক্তব্যে একই আহ্বান জানান। তবে সরকার নাদা আল নাশিফের আহ্বানের কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

৪৭ সদস্যের এই মানবাধিকার পরিষদের সদস্য হওয়ার জন্য বাংলাদেশ নির্বাচন করছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ওই পরিষদের কয়েকটি শূন্য হতে যাওয়া পদের জন্য ভোট হওয়ার কথা রয়েছে। ভোটের বিষয়ে প্রচার চালাতে দুই দিন আগে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ইথিওপিয়া সফর করে টুইট করেছিলেন।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন