সেই পাঁচ শিশুর দুজন বেঁচে নেই, বাকি তিন শিশুকে নিয়েও দুশ্চিন্তা
পৃথিবীর আলো দেখার ১৯ দিনের মাথায় এক শিশুকে হারাতে হলো। ৩২ দিনের মাথায় মারা গেল আরেক শিশু। একসঙ্গে জন্ম নেওয়া বাকি তিন শিশুকে নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছে না মা–বাবার। এই তিন শিশুকে বাসায় না রেখে হাসপাতালে উন্নত চিকিৎসা দিতে চাইছেন তাঁরা। কিন্তু টাকার অভাবে সেই ব্যবস্থাও করতে পারছেন না।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) গত ১১ জুন একসঙ্গে ওই পাঁচ শিশুর জন্ম দেন সামরিনা আক্তার। শিশুদের বাবা মোস্তাকিম হোসেন। তাঁদের বাড়ি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলায়। শিশুদের জন্ম ও চিকিৎসার প্রয়োজনে তাঁরা এখন রাজধানীর আজিমপুরে একটি ভাড়া বাসায় থাকছেন।
সামরিন-মোস্তাকিমের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এখন তিন শিশুর মধ্যে একটি অসুস্থ। ফলে তাঁদের শঙ্কা কাটছে না। তাঁদের বাকি ৩টি শিশু যেন বেঁচে থাকে, এখন তাঁদের এটাই একমাত্র চাওয়া। ইতিমধ্যে দোকান বিক্রি ও ঋণ করে শিশুদের চিকিৎসায় ব্যয় করছেন ১৬ লাখ টাকা। বাবা মোস্তাকিমের নিয়মিত আয় নেই। প্রথম বিভাগে ক্রিকেট খেলেন। বেসরকারি হাসপাতালে দুটি সন্তানকে রাখার ক্ষেত্রে দুই লাখ টাকা অর্থসহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)।
মা সামরিনা প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, মারা যাওয়া ২টি শিশুর একটি ১ জুলাই ও আরেকটি ১৩ জুলাই মারা যায়। তিনি চান, তাঁর বাকি সন্তানদের হাসপাতালে ভর্তি নেওয়া হোক। এখন উন্নত চিকিৎসার জন্য টাকার ব্যবস্থাও করতে পারছেন না। দুশ্চিন্তায় অস্থির বোধ করছেন তাঁরা।
এর আগে গত ১৪ জুন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কথা হয়েছিল এই শিশুদের মা-বাবার সঙ্গে। জানিয়েছিলেন, শিশুদের গর্ভে টিকিয়ে রাখা ও জন্ম দেওয়ার সেই কষ্টকর যাত্রার কথা। স্বাভাবিক অবস্থায় ৩৯ সপ্তাহে শিশুর জন্ম হয়। তবে সামরিনার চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, অতিঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থা হওয়ায় ৩২ সপ্তাহে তাঁর সিজারিয়ান সেকশন (অস্ত্রোপচারে শিশুর জন্ম) করা হবে। তবে এর আগেই শারীরিক অবস্থা খারাপ হয়ে যাওয়ায় মাত্র ৩০ সপ্তাহে তাঁকে সিজারিয়ান সেকশন করা হয়েছে। জন্ম নেওয়া পাঁচ শিশুর মধ্যে তিনটি ছেলে, দুটি মেয়ে। মারা যাওয়া দুটি শিশুর একটি ছেলে, অপরটি মেয়ে। যে দুটো শিশু মারা গেছে, তারা শুরুতে ঢামেকের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) ভর্তি ছিল।
মা–বাবার দুশ্চিন্তা
মা সামরিনা জানান, অতিরিক্ত খরচের কারণে বেসরকারি হাসপাতাল থেকে একটি শিশুকে ঢামেকে নিয়ে যান। আরেকটি শিশুকে ২১ দিন পর বাসায় নিয়ে আসেন। এই দুটি শিশু তুলনামূলক সুস্থ আছে। তিনি বলেন, বেসরকারি হাসপাতাল থেকে ১২ দিন পর শিশুটিকে ঢামেকে নেওয়ার পর এনআইসিইউতে তাঁদের চারটি সন্তান ছিল। অপর আরেকটি সন্তান ছিল বাসায়। হাসপাতালে চারটি শিশুর মধ্যে একটি মেয়েশিশু ১ জুলাই মারা যায়। এরপর বাকি চারটি শিশুকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
বাবা মোস্তাকিম বলেন, যে ছেলেশিশুটি সবশেষ মারা গেছে, সেটি মুখে কিছু খেতে পারত না। নল দিয়ে খাওয়ানো হতো। হাসপাতাল থেকে নল খুলে দেওয়া হয়েছিল। বাসায় আনার পরদিনই (৪ জুলাই) ছেলেটি অসুস্থ হয়ে গেলে তাঁরা ঢামেকে যান, হাসপাতাল থেকে নাকে নল লাগিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বাসার আনার পরদিন ৫ জুলাই তাঁর সন্তান আবার অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁরা আবার ঢামেকে যান, কিন্তু এনআইসিইউতে আসন ফাঁকা নেই বলে তাঁদের জানানো হয়।
শিশুটির মা বলেন, পরে তাঁরা সেই বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান, সেখানে বলা হয়—শিশুটি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। ওই হাসপাতালে ১০ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৩ জুলাই শিশুটি মারা যায়।
মা সামরিনা মনে করেন, ঢামেকে এনআইসিইউতে থাকলে হয়তো দুই শিশুকে হারাতে হতো না। বাকি তিন শিশুও হয়তো সুস্থ হয়ে উঠত।
বিষয়টি নিয়ে আজ শনিবার মুঠোফোনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। এনআইসিউইতে শয্যা সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে পরিচালক বলেন, এখানে মাত্র ৩৮টি শয্যা। একটি ফাঁকা হলে তুলনামূলক গুরুতর অসুস্থ শিশুরা ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। সেটাও বিবেচনায় রাখতে হয়। তিনি আরও বলেন, জন্মের সময় কোনো শিশুর আড়াই কেজির নিচে ওজন হলে অপরিণত শিশু বলা হয়। এই পাঁচ শিশুরই ওজন ছিল এক কেজির নিচে। এ ধরনের কম ওজনের অপরিণত শিশুরা খুব ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার মধ্যে থাকে।
পরিচালক বলেন, এনআইসিইউতে চারটি শিশু রাখা হয়েছিল। প্রতিদিন হাসপাতালে ৩০-৩৫টি সন্তান প্রসব হয়। এর মধ্যে গড়ে অন্তত পাঁচটি শিশুকে এনআইসিইউতে ভর্তি করতে হয়। শারীরিক অবস্থা বুঝে শিশুদের ছাড়পত্র দেওয়া হয়। ওই শিশুদের নিশ্চয় ছাড়পত্র দেওয়ার মতো শারীরিক অবস্থা ছিল বলেই চিকিৎসকেরা ছাড়পত্র দিয়েছিলেন।
মা সামরিনার মন মানে না। তিনটি শিশুর মধ্যে একটি অসুস্থ হয়ে পড়ায় তিনি অসহায়বোধ করছেন। হাসপাতালে ভালো চিকিৎসা পেলে বাকি তিন শিশুকে হারাতে হবে না বলে তাঁর বিশ্বাস। বাবা মোস্তাকিম বলেন, শিশুদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারলে তাঁদের শঙ্কা কাটবে। দোকান বিক্রি ও ঋণ করে তিনি ১৬ লাখ টাকা খরচ করেছেন। এখন উন্নত চিকিৎসার জন্য টাকা জোগাড়ের কোনো কূলকিনারা করতে পারছেন না।