খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে গিয়ে বাবার মৃত্যু, জুলাই যোদ্ধা এখন নতুন জীবনযুদ্ধে

সিআরপিতে চিকিৎসাধীন তাহসিন হোসেনের সঙ্গে মা তাহেরা নয়নফাইল ছবি: মানসুরা হোসাইন

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগের দিন ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে গুলিবিদ্ধ হয় তাহসিন হোসেন নাহিয়ান (১৫)। তখন সে মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

তাহসিনের ছোট বোন নাফিজা জাহান এবার নবম শ্রেণিতে উঠল। দুই ভাই-বোন সদ্যই তাদের বাবাকে হারিয়েছে। তাদের বাবা নীরব হোসেন গত ৩১ ডিসেম্বর বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে মারা যান।

নীরব হোসেন (৫৬) একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করতেন। কয়েক বছর আগে স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর দুই সন্তানকে নিয়ে ঢাকার মোহাম্মদপুরে একটি বাসা ভাড়া করে থাকতেন তিনি। ওই বাসায় তাঁর এক বোনও থাকতেন। বাবার মৃত্যুর পর তাহসিন ও নাফিজা এখন কার কাছে থাকবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

নিরব হোসেন
ছবি: সংগৃহীত

তাহসিনদের মা তাহেরা নয়ন আবার বিয়ে করেছেন। তিনি এখন থাকেন কেরানীগঞ্জে। তাহেরা প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওদের বাবা যেদিন মারা গেলেন, মেয়েটা তার ভাইকে ফোন করে বলেছে, “বাবা তো নেই, এখন আমরা কার কাছে থাকব?”’

বিএনপির পক্ষ থেকে এরই মধ্যে নীরব হোসেনের পরিবারের পাশে থাকার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তাহেরা নয়ন চান, যেটুকু সহায়তা পাওয়া যায়, তা যেন তাঁর সন্তানেরাই পান।

নীরব হোসেনের বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের বড়ডালিমা গ্রামে। তাঁকে স্থানীয় বড় ডালিমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

হুইলচেয়ারে বাবার জানাজায়

কিশোর তাহসিন হুইলচেয়ারে চড়ে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে গিয়ে বাবার জানাজায় অংশ নেয়। জুলাই অভ্যুত্থানের সময় পিঠের মেরুরজ্জুতে (স্পাইনাল কর্ড) গুলি লেগেছিল তাঁর। অস্ত্রোপচার করে তাহসিনের গুলি বের করা হলেও গুলিতে তার মেরুরজ্জু থেতলে যায়। তার পেটের নিচ থেকে দুই পা তখন থেকে পুরোপুরি অবশ।

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট গুলি লাগার পর ২১ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল তাহসিন। সেখানে অস্ত্রোপচারের পর ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ), সাভারের পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র (সিআরপি) এবং সরকারিভাবে থাইল্যান্ডেও তাহসিনকে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়। বর্তমানে সে ঢাকা সিএমএইচে চিকিৎসাধীন। বাবার জানাজায় অংশ নিয়ে আবার এই হাসপাতালেই ফিরেছে সে।

তাহেরা নয়ন প্রথম আলোকে বলেন, ছেলেকে নিয়ে তিনিও তাঁর সাবেক স্বামীর জানাজায় অংশ নিতে বাউফল গিয়েছিলেন। ফেরার পর থেকে মেয়ে তাঁর সঙ্গেই আছে। আর আগের মতোই ছেলের সঙ্গে হাসপাতালে থাকছেন তিনি। তাহসিনের এ অবস্থায় তা সঙ্গে কাউকে না কাউকে হাসপাতালে থাকতেই হয়।

পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায় তাহসিন

গুলির ক্ষত থেকে আবার উঠে দাঁড়াতে চায় তাহসিন, চালিয়ে যেতে চায় পড়াশোনা। মা তাহেরা নয়ন বলেন, ‘তাহসিন আবার পড়াশোনা শুরু করতে চাচ্ছে বলে ওর বাবা মোহাম্মদপুরে একটি বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন। ১ জানুয়ারি থেকে নতুন বাসায় ওঠার কথা ছিল। তবে তার আগেই তো দুর্ঘটনা ঘটে গেল।’

নীরব হোসেন কোনো সঞ্চয় রেখে যেতে পেরেছিলেন কি না, সে বিষয়ে কিছু জানেন না তাহেরা। জুলাই যোদ্ধা হিসেবে তাহসিন জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে যে সহায়তা পেয়েছে, যে ভাতা পাচ্ছে, তার পরিমাণ কত, তা–ও তাহেরা বা তাহসিন ঠিক বলতে পারে না। নীরব হোসেন বেঁচে থাকতে এসব জানার প্রয়োজনও তাঁদের ছিল না। কিন্তু এখন বিষয়গুলো সামনে আসছে।

মায়ের সঙ্গে তাহসিন ও নাফিজা
ছবি: পরিবার সূত্রে পাওয়া

জুলাই যোদ্ধা তাহসিন গুরুতর আহত হওয়ায় সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এককালীন ৫ লাখ টাকা এবং প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা পাবে।

তাহসিনের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয় প্রথম আলোর। সে বলে, ‘আমরা আম্মুর কাছে থাকব। আবার পড়াশোনা শুরু করব। আমার কাছে এটাই বেটার অপশন (ভালো সিদ্ধান্ত) মনে হচ্ছে।’

মেয়েকে এরই মধ্যে নিজের কাছে এনে রেখেছেন তাহেরা। তিনি বলেন, আগের ঘরের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে রাখার কথা জানালে তাঁর বর্তমান স্বামী কোনো আপত্তি করেননি।

তবে তাহসিন ও নাফিজা কার কাছে থাকবে, সেই সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি বলে জানান নীরব হোসেনের বড় ভাই বাহাদুর হোসেন।

আরও পড়ুন

বিএনপির আশ্বাস

নীরব হোসেন মারা যাওয়ার পর ১ জানুয়ারি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একটি শোকবার্তায় পরিবারটির প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন। নীরব হোসেনের জানাজায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে বিএনপির নির্বাহী কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান, পটুয়াখালী-২ (বাউফল) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য শহিদুল আলম তালুকদার, জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ও দলটির মনোনীত প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মাসুদও অংশ নেন।

বিএনপি নেতা আকন কুদ্দুসুর রহমান জানাজায় অংশ নিয়ে বলেন, তিনি তারেক রহমানের নির্দেশে জেলা বিএনপির নেতাদের নিয়ে এসেছেন নিহতের পরিবারের খোঁজখবর নেওয়ার জন্য। বিএনপি ও তারেক রহমান সব সময় নীরব হোসেন ও জুলাই যোদ্ধা তাহসিন হোসেনের পরিবারের পাশে থাকবেন।

আরও পড়ুন
পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বড়ডালিমা গ্রামে জানাজা শেষে নিরব হোসেনকে সমাহিত করা হয় পারিবারিক কবরস্থানে
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

তাহসিনের মা তাহেরা নয়ন বিএনপির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে প্রথম আলোকে বলেন, ‘কেউ যদি সাহায্য করতে চান, তাঁরা যদি এমনভাবে করেন যে সেই সহায়তা সরাসরি আমার ছেলেমেয়েরা পাবে, তাহলে ভালো হয়।’

বিএনপির পক্ষ থেকে সহায়তার আশ্বাস দেওয়ার পাশাপাশি জানাজার দিন তাহসিন কিছু আর্থিক সহায়তা পেয়েছে বলে জানান তাঁর চাচা বাহাদুর হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভাই নেই, আমাদের এখন একটাই চাওয়া, আমাদের বংশের ছেলে–মেয়ে দুজন মানুষ হোক।’

আরও পড়ুন