গত বছর যত কর্মী বিদেশে গেছেন, তার ৯০ শতাংশ গেছেন ৫ দেশে: রামরু

এআইয়ের সহায়তায় তৈরি

সরকারি তথ্য অনুসারে গত বছর বাংলাদেশ থেকে কর্মীরা ১৪১টি দেশে গেছেন। এর মধ্যে ৯০ শতাংশ কর্মী গেছেন মাত্র ৫টি দেশে। একজন করে কর্মী গেছেন ১৩টি দেশে। ৩৪টি দেশে ২ থেকে ১০ জন করে কর্মী গেছেন। যেসব দেশে ১০০ জনের কম অভিবাসী কর্মী যান, সেসব দেশকে অভিবাসনের দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা শোভন নয়।

‘বাংলাদেশ থেকে শ্রম অভিবাসনের গতি-প্রকৃতি ২০২৫: অর্জন ও চ্যালেঞ্জসমূহ’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। আজ বুধবার রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরু। এতে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে এক দেশকেন্দ্রিক শ্রমবাজার। অন্তত ৮-১০টি বাজারে নিয়মিত কর্মী পাঠানোর অবস্থা থাকা উচিত।

রামরুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭৫৭ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। আগের বছরের তুলনায় এবার অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে। মোট অভিবাসীর ৬৭ শতাংশ গেছেন সৌদি আরবে। এ সংখ্যা ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৩৬৯ জন। এরপর কাতারে ১০ শতাংশ, ৬ শতাংশ সিঙ্গাপুরে, কুয়েতে ৪ শতাংশ এবং মালদ্বীপে ৪ শতাংশ কর্মী গেছেন।

তবে ১৯৭৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত কতজন কর্মী বিদেশে গেছেন, তার হিসাব থাকলেও ফিরে আসা কর্মীর হিসাব নেই। তাই বিদেশে মোট কতজন কর্মী আছেন, তা জানা যায় না।

বাংলাদেশ থেকে শ্রম অভিবাসনের গতি-প্রকৃতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রামরু। ঢাকা, ৭ জানুয়ারি
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর ৬২ হাজার ৩১৭ জন নারী কর্মী বিদেশে গেছেন। এই সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। ২০১৬ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত প্রতিবছর লাখের বেশি নারী বিদেশে গেছেন। করোনার প্রভাবে ২ বছর কমলেও ২০২২ সালে আবার এ সংখ্যা লাখ ছাড়ায়। এরপর থেকে আবার কমছে।

কাতার, ব্রুনেই, সংযুক্ত আরব আমিরাত, দক্ষিণ কোরিয়া, কুয়েত, হংকং ও জাপানেও নারী অভিবাসন ঘটেছে। তবে হংকং ও জাপানের মতো গন্তব্যে নারী অভিবাসীর সংখ্যা খুব কম ছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। শোভন কর্মক্ষেত্রের অনিশ্চয়তা, ঘরের মধ্যে নারীর প্রতি সহিংসতা নারী অভিবাসনকে ক্রমাগত নিরুৎসাহিত করছে। তবে রক্ষণশীল পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা নারীকে ঘরের বাইরের কাজে অংশগ্রহণকে পুনরায় সীমিত করছে কি না, তা গবেষণা করে দেখা প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানে আলোকচিত্রী শহীদুল আলম বলেন, বিদেশে যাওয়া কর্মীদের সংখ্যা হিসেবে দেখার চেয়ে মানুষ হিসেবে দেখাটা জরুরি। এ খাতে বিনিয়োগ বলতে গেলে নেই। অথচ নিয়মিত বিদেশ থেকে টাকা আসছে। আর সেই টাকার একটি অংশ চুরি করে কেউ কেউ বিদেশে বাড়ি বানাচ্ছে। যে অভিবাসীদের কাছ থেকে এত আয়, তাদের জীবন সহজ করতে কিছু করা হচ্ছে না।

রামরু বলছে, প্রতিবছরেই প্রায় ১০ শতাংশ হারে প্রবাসী আয় বেড়েছে। গত বছর এসেছে ৩ হাজার ২৮২ কোটি ডলার, যা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে সৌদি আরব থেকে সবচেয়ে বেশি প্রবাসী আয় এসেছে ১৫ দশমিক ৫২ শতাংশ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ১২ দশমিক ৫৮ শতাংশ। এমন একটি খাতের জন্য গত অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ ছিল শূন্য দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ, যা খুবই দুঃখজনক। এ সরকার বরাদ্দ আরও কমিয়েছে।

প্রথমবারের মতো অভিবাসী বাংলাদেশিরা বিদেশে অবস্থানরত অবস্থায় ভোট দেওয়ার সুযোগ পেতে যাচ্ছেন। এটিকে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছে রামরু।

প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন রামরুর ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক তাসনিম সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ২৫২টি নতুন রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, আরও ৩০০ প্রক্রিয়াধীন। আগে তো দুর্নীতি করে লাইসেন্স দেওয়া হতো, এখন তাহলে দেওয়া হলো কেন?

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, দক্ষতা বাড়াতে পারছে না বলেই নতুন শ্রমবাজার তৈরি হচ্ছে না। দক্ষ কর্মী তৈরি করতে পারলে বাজার খুঁজতে হবে না।

রামরুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে রাশিয়া বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন শ্রমবাজার। গত বছর ৪ হাজার ৬৬৩ জন দেশটিতে গেছেন। আগের বছর যান ৯৯৩ জন। ভালো বেতন ও রাশিয়ার নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে অভিবাসী সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে একটি চক্র। এই চক্রের একাংশ রাশিয়ার অসাধু চক্রের সঙ্গে মিলে বাংলাদেশি কর্মীদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য পাঠাচ্ছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ হাজার ৭৬ জন বাংলাদেশি অভিবাসী সমুদ্রপথে ইতালির উপকূলে পৌঁছেছেন। এই সংখ্যা গত বছর ইতালিতে আগত দেশগুলোর অভিবাসীদের মধ্যে সর্বোচ্চ। এই সংখ্যাটি আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

আরও পড়ুন

সম্প্রতি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার কার্যক্রম শুরু হয়েছে উল্লেখ করে রামরুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরোনো সিন্ডিকেটের হোতাদের শাস্তির আওতায় না এনে পুনরায় তাদের মাধ্যমে বাজার খোলার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। গত বছর ওমান, বাহরাইনসহ বেশ কিছু বন্ধ বাজার উন্মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাজার এখনো সেভাবে খোলেনি। তবে শ্রমবাজার সম্প্রসারণে এই সরকারের সময়ে ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও সৌদি আরবের সঙ্গে মোট ৭টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতে রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা ১৯২টি, পাকিস্তানে ৪৬৪টি, নেপালে ৪১৬টি ও শ্রীলঙ্কায় ২৪৮টি। এটি নজরদারি করা সহজ। বাংলাদেশে আগে এজেন্সির সংখ্যা ৮৫০ থেকে ৯০০–এর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। বিগত সরকার এটি বাড়িয়ে ২ হাজার ৩০০ করেছে। গত বছর নতুন করে ২৫২টি এজেন্সির লাইসেন্স অনুমোদন করা হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে কমিয়ে আনা। পরিবারের সদস্যদের একের অধিক লাইসেন্স থাকলে সেগুলো বাজেয়াপ্ত করা। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় জালিয়াতির আশ্রয়গ্রহণকারীদের লাইসেন্স বাজেয়াপ্ত করা। অভিবাসন খাতে জাতীয় বাজেটের ১ শতাংশ অথবা বার্ষিক প্রবাসী আয়ের ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে রামরু।

আরও পড়ুন