চট্টগ্রামে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে যেতে দেখা গেল আরেকজনকে
চট্টগ্রামে আবারও প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে যেতে দেখা গেল আরেকজনকে। ১৯ জানুয়ারি জেলার সাতকানিয়া উপজেলায় অস্ত্র হাতে এক যুবককে হেঁটে যেতে দেখা যায় ক্লোজড সার্কিট টেলিভিশন (সিসি) ক্যামেরার ফুটেজে। ওই ব্যক্তির নাম শহীদুল ইসলাম। তাঁকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন জানান, শহীদুল স্থানীয় একটি ‘কিশোর গ্যাং’–এ জড়িত। হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজির ১০ মামলার আসামি মো. মিজান ওরফে পিচ্চি মিজানের দলের হয়ে কাজ করেন তিনি। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাতকানিয়ায় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে প্রকাশ্যে অস্ত্রবাজির পর র্যাব মিজানকে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার করে জানিয়েছিল, তিনি একজন ভাড়াটে শুটার।
সাতকানিয়ার নলুয়া ইউনিয়নের হাঙ্গরমুখ বাজারের পেছনে মসজিদ–সংলগ্ন এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরায় দেখা যায়, ১৯ জানুয়ারি রাত ১১টা ২৭ মিনিটে কালো প্যান্ট ও কালো সোয়েটার পরিহিত শহীদুল ইসলাম একটি একনলা বন্দুক নিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। তাঁর সঙ্গে আরেক যুবক রয়েছেন। তবে তাঁর পরিচয় জানা যায়নি।
শহীদুল অস্ত্র নিয়ে হেঁটে যাওয়ার পরদিন ২০ জানুয়ারি দুপুরে উপজেলার কেওচিয়া ইউনিয়নের মাদারবাড়ি এলাকায় সাবেক ইউপি সদস্য আবদুল মান্নানকে গুলি করতে যাওয়া চারজনকে ধরে পুলিশে দেন স্থানীয় লোকজন। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে একটি বন্দুক উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় আবদুল মান্নান বাদী হয়ে ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন। আসামিদের মধ্যে মিজানও রয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, ইউপি সদস্যকে গুলি করার আগে মিজানকে বন্দুকটি পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেন শহীদুল। তাঁকে অস্ত্র হাতে নলুয়ার হাঙ্গরমুখ এলাকায় দেখা গেলেও সেখান থেকে কেওচিয়ার মাদারবাড়ির দূরত্ব প্রায় পাঁচ কিলোমিটার।
সাবেক ইউপি সদস্য আবদুল মান্নান আজ বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, গরুর খামারের কিছু দূরে গরুর জন্য এক একর জায়গায় ঘাসের চাষ করেছেন। কয়েক দিন ধরে কে বা কারা জমির ঘাসগুলো কেটে নিয়ে যাচ্ছে। ২০ জানুয়ারি ১০ থেকে ১৫ জন যুবক ঘাসগুলো কেটে নিয়ে যাওয়ার সময় বাধা দিলে তাঁরা গুলি করতে ধাওয়া করেন। এ সময় তিনি দৌড়ে প্রাণে বেঁচে যান। পরে স্থানীয় লোকজন চারজনকে ধরে ফেলেন। বাকিরা পালিয়ে যান। তাঁদের হাতেও অস্ত্র ছিল।
জানতে চাইলে নলুয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. মোরশেদুল আলম আজ বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, শহীদুল ও মিজানের অত্যাচারে এলাকার লোকজন অতিষ্ঠ। তাঁরা প্রায়ই প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ঘোরাঘুরি করেন। এতে স্থানীয় লোকজন আতঙ্কিত। অস্ত্র হাতে শহীদুলের একটি ভিডিও নিয়ে লোকজন বলাবলি করছেন।
প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে হেঁটে যাওয়া শহীদুলকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে বলে সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রিটন সরকার জানিয়েছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অস্ত্রধারী যে–ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। শহীদুলের নেতা মিজানকেও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাতকানিয়ার নলুয়া ইউনিয়নের মরফলায় পুরোনো বোর্ড অফিসের সামনে গোলাগুলিতে মো. তৌসিফ নামের এক কিশোর নিহত হয়। এই মামলার আসামি মিজান। র্যাব তাঁকে এই মামলায় গ্রেপ্তার করলেও সাত মাস আগে জামিনে বেরিয়ে আসেন। তাঁর বিরুদ্ধে সাতকানিয়ায় ২০১৪ সালে গোলতাজ বেগম হত্যা, সাত মাস আগে ইটভাটা দখল করতে গিয়ে গোলাগুলির মামলা, গত বছরের সেপ্টেম্বরে হাসমত আলী, অক্টোবরে মো. আব্বাস, ডিসেম্বরে পশ্চিম ঢেমশা ইউপি চেয়ারম্যান রিদুয়ানুল ইসলামের বাড়িতে গুলি করার মামলা রয়েছে।
চেয়ারম্যানের বাড়িতে গুলি করার মামলার আরেক আসামি রিয়াজ উদ্দিন সন্ত্রাসী মিজান ও শহীদুলকে আশ্রয়–প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন বলে অভিযোগ। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে রিয়াজ উদ্দিন আজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে মিজানের সঙ্গে দেখা হয়েছে কয়েকবার। তাঁর সঙ্গে আমার অন্য কোনো সম্পর্ক নেই। রাজনীতি করার কারণে আমার নামে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।’ নিজেকে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য দাবি করেন রিয়াজ।
চলতি মাসেই আরও দুই অস্ত্রবাজির ঘটনা
চট্টগ্রাম নগরে চলতি মাসে প্রকাশ্যে আরও দুই অস্ত্রবাজির ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ১২ জানুয়ারি বায়েজিদ বোস্তামী থানার হিলভিউ আবাসিক এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জেরে অস্ত্রের মহড়া দেয় স্থানীয় সন্ত্রাসীরা। পরে এই ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা যায়, জাহিদ নামের একজন অস্ত্র হাতে প্রতিপক্ষকে তাড়া করছেন। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে অস্ত্রধারী জাহিদসহ ১৮ জনকে গ্রেপ্তার করে।
এর আগে ৭ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন চট্টগ্রাম-১০ আসনের খুলশীর পাহাড়তলী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ কেন্দ্রে নৌকা ও ফুলকপি প্রতীকের অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তখন শামীম আজাদ নামের একজনকে প্রকাশ্যে পিস্তল উঁচিয়ে গুলি ছুড়তে দেখা যায়। ওই সংঘর্ষের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হন দুজন। পরদিন র্যাব শামীমকে গ্রেপ্তার করে। তিনি নগরের ১৩ নম্বর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ওয়াসিম উদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
চলতি মাসের এই দুই ঘটনাসহ ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ছয় বছরে চট্টগ্রামে প্রকাশ্যে অস্ত্রবাজির ঘটনা ঘটেছে ১৪টি। এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে পেশাদার সন্ত্রাসীর পাশাপাশি যুবলীগ ও ছাত্রলীগের পদধারী নেতা রয়েছেন। সর্বশেষ সাতকানিয়ায় প্রকাশ্যে অস্ত্রবাজির ঘটনা ছাড়া আগের ১৩টির মধ্যে ১১টির ক্ষেত্রে মামলা হয়েছে। সর্বশেষ চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের দিন পিস্তল উঁচিয়ে প্রতিপক্ষকে গুলি করা নগর ছাত্রলীগের সেই নেতাকে এখনো ধরতে পারেনি পুলিশ। যে দুটি ক্ষেত্রে মামলা হয়নি, সেসব ঘটনার অস্ত্র উদ্ধারও হয়নি। দুর্বৃত্তদের প্রদর্শিত অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে পিস্তল, শটগান, এলজি (লাইটগান) ও বন্দুক।