২০২২ সালে রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স পাওয়া ভালুকা ওভারসিজ গত ২৩ আগস্ট পর্যন্ত ২৩৫ জন কর্মী পাঠানোর ছাড়পত্র নিয়েছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়া যাওয়ার কোনো কর্মী নেই। অথচ মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য নির্বাচিত ২৫টি এজেন্সির তালিকায় আছে এই প্রতিষ্ঠান।
ভালুকা ওভারসিজের স্বত্বাধিকারী মো. আবু সোহাগ খান প্রথম আলোকে বলেন, আগে মালয়েশিয়ায় এক হাজারের বেশি কর্মী তিনি পাঠিয়েছেন বিভিন্ন এজেন্সির নামে। একইভাবে সৌদি আরবেও পাঠিয়েছেন। এবার সরাসরি কর্মী পাঠানোর সুযোগ পেয়েছেন। মালয়েশিয়া থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। এর জন্য কাউকে কোনো টাকা দিতে হয়নি।
ভালুকা ওভারসিজসহ মোট ২৫টি এজেন্সি এবার মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর সুযোগ পেয়েছে। রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকদের সংগঠন বায়রার কয়েকজন সদস্য বলছেন, এবার আগের এজেন্সিগুলোর নাম নেই। আগের মতো মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যের প্রতিষ্ঠানের নামও নেই সরাসরি। তবে অপরিচিত এজেন্সির আড়ালে আছে চক্র (সিন্ডিকেট) তৈরির পুরোনো হোতারাই। এবার ভিন্ন কৌশলে চক্র তৈরি করেছে তারা। ফলে এবার মালয়েশিয়া যেতে ৬-৭ লাখ টাকা খরচ করতে হতে পারে কর্মীদের। আগেরবার প্রত্যেক কর্মীর গড়ে ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা খরচ হয়েছে বলে জানা যায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ভেরিটে ইনকরপোরেটেডসহ পাঁচটি সংস্থার এক গবেষণায়।
অভিযোগ আছে, মালয়েশিয়া থেকে আমিন নূর কর্মী পাঠানোর পুরো বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করেন। বাংলাদেশে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকদের সংগঠন বায়রার সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন ওরফে স্বপন। তাঁরা দুজন মিলে নির্ধারণ করেছেন, চক্রে কারা থাকবে।
নির্বাচিত ২৫টি এজেন্সির প্রায় ২৩ বছরের (জানুয়ারি ২০০৪ থেকে গত ২৩ আগস্ট পর্যন্ত) তথ্য সংগ্রহ করেছে প্রথম আলো। বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমই) এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২৫টির মধ্যে ১৭ এজেন্সির মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর কোনো অভিজ্ঞতা নেই। বাকি ৮টি এজেন্সি মিলে কর্মী পাঠিয়েছে ১ হাজার ৬১২ জন। যার মধ্যে ৫টি এজেন্সির নামে কর্মী গেছে ১১, ৭৪, ১০০, ১৫০ ও ২০২ জন করে। অন্য ৩টি থেকে গেছে ৪৩৬, ৩৩৩ ও ৩০৬ জন করে।
এজেন্সি চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে এবারও মালয়েশিয়া কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ডের কথা বলেনি। সুযোগটি নিয়েছে মালয়েশিয়ার কর্মী নিয়োগের ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (এফডব্লিউসিএমএস) সফটওয়্যার মাইগ্রামের মালিক প্রতিষ্ঠান বেস্টিনেট। এটির মালিকানায় রয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমিনুল ইসলাম বিন আবদুল নূর। তিনি মালয়েশিয়ার নাগরিক, আমিন নূর নামে পরিচিত।
অভিযোগ আছে, মালয়েশিয়া থেকে আমিন নূর কর্মী পাঠানোর পুরো বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করেন। বাংলাদেশে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকদের সংগঠন বায়রার সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন ওরফে স্বপন। তাঁরা দুজন মিলে নির্ধারণ করেছেন, চক্রে কারা থাকবে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকে বিদেশে আত্মগোপন করে আছেন স্বপন। তাঁর এজেন্সির লাইসেন্স প্রত্যাহার হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে মামলা চলমান, দুদকও তদন্ত করছে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ৪২৩টি এজেন্সির তালিকা অন্তর্বর্তী সরকার পাঠিয়েছে। তা থেকে মালয়েশিয়া তাদের মতো বাছাই করে ২৫টিকে চূড়ান্ত করেছে। এর সঙ্গে সরকারের অনুরোধে সহযোগী হিসেবে ৩৩৮টি এজেন্সিকে সুযোগ দিয়েছে মালয়েশিয়া। সব মিলে এটা আগের চেয়ে ইতিবাচক হয়েছে। কম খরচে কর্মী পাঠাতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। আর যদি পাচার বা দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত কোনো এজেন্সি তালিকায় থাকে, সেটি মালয়েশিয়াকে জানানো হবে। তাদের লাইসেন্সও প্রত্যাহার করা হবে।
আগের মতো এবারও সিন্ডিকেট হয়েছে, একটু নতুন কৌশলে। এতে কর্মীর খরচ বাড়বে। যাচাই-বাছাই হলে এসব অখ্যাত এজেন্সির নাম থাকত না।রিয়াজুল ইসলাম, বায়রার সদ্য সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি
মামলায় অভিযুক্তরাও তালিকায়
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা নেই, এমন ১৭টি এজেন্সি হচ্ছে তানিয়া ট্রেড, সাতক্ষীরা ইন্টারন্যাশনাল, এ-প্লাস, আল হায়াত ওভারসিজ, ভেলী ট্রেড, খান জাহান আলী ওভারসিজ, বেঙ্গল হিউম্যান রিসোর্স, আর্থ স্মার্ট, আত তাকওয়া, মাদারল্যান্ড, ম্যানগ্রোভ, জুয়েল রিংকু এন্টারপ্রাইজ, বাংলাদেশ ওয়ান ওভারসিজ, অন্বেষা এয়ার, চাঁদপুর ইন্টারন্যাশনাল, গডনেস সার্ভিসেস ও ভালুকা ওভারসিজ।
দি অ্যাংকর কেয়ার গ্লোবাল মাইগ্রেশন অ্যান্ড কনসালট্যান্ট নামের এজেন্সি সব মিলে মাত্র ৩৭১ জন কর্মী পাঠানোর ছাড়পত্র নিয়েছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়ার ১১ জন। আর বাংলাদেশ ওয়ান ওভারসিজ লিমিটেড মোট ছাড়পত্র নিয়েছে ৭৯৫ জনের। এর মধ্যে মালয়েশিয়ায় কোনো কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা নেই। এ দুটো এজেন্সিও আছে এবারের ২৫ এজেন্সির তালিকায়।
ইউনাইটেড গালফ সার্ভিসেস নামের একটি এজেন্সি আছে তালিকায়। এটির মালিকানায় আছে লায়লা আরজুমান বানু। এর আগেরবার চক্রের সদস্য ছিল তাঁর স্বামী আবদুল হাইয়ের প্রতিষ্ঠান গ্রিনল্যান্ড ওভারসিজ। যেটি এখন পরিচালনা করছেন তাঁদের মেয়ে রেহানা আরজুমান হাই। এ বিষয়ে জানতে লায়লা আরজুমান বানুকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ধরেননি। তাঁর মেয়েও ফোন ধরেননি।
বায়রা সদস্যরা বলছেন, এবার সিন্ডিকেট ফি দিতে হবে সাড়ে ৫ হাজার মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত (১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা)। এর বাইরে প্রতিটি ভিসা কিনতে অর্থাৎ কর্মীর চাহিদাপত্র আনতে ৮-৯ হাজার রিঙ্গিত দিতে হবে (২ লাখ ৬৫-৭৫ হাজার টাকা)। এভাবে কর্মীপ্রতি ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকার বেশি পাচার হয়ে যাবে মালয়েশিয়ায়।
মামলা তদন্তে ৫৭টি এজেন্সির তথ্য চেয়ে গত ২৩ জুলাই বিএমইটির কাছে চিঠি দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এতে বলা হয়, বিএমইটির অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে নারীদের বিদেশে পাচার করার মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের দায়ে ৫টি এজেন্সির বিরুদ্ধে গত বছরের জুনে একটি মামলা করে দুদক। ওই মামলার তদন্তে আরও ৫২টি এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আছে এবার মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য নির্বাচিত তিনটি এজেন্সি—গডনেস সার্ভিস লিমিটেড, জেনারেল ট্রেডিং কোম্পানি ও রিফা ইন্টারন্যাশনাল। গডনেসের মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর কোনো অভিজ্ঞতা নেই, অন্য দুটি কিছু কর্মী পাঠিয়েছে। এই তিনটি এজেন্সির মালিকদের আলাদা করে ফোন দিলেও ধরেনি।
বায়রা সদস্যরা বলছেন, এবার সিন্ডিকেট ফি দিতে হবে সাড়ে ৫ হাজার মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত (১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা)। এর বাইরে প্রতিটি ভিসা কিনতে অর্থাৎ কর্মীর চাহিদাপত্র আনতে ৮-৯ হাজার রিঙ্গিত দিতে হবে (২ লাখ ৬৫-৭৫ হাজার টাকা)। এভাবে কর্মীপ্রতি ৪ লাখ ৩০ হাজার টাকার বেশি পাচার হয়ে যাবে মালয়েশিয়ায়।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশসহ ১১টি দেশ কর্মী পাঠানোর তালিকায় আছে। তবে বাংলাদেশ ছাড়া কোনো দেশে এমন চক্র-ব্যবস্থা নেই।
এজেন্সি বাছাই করেছে মালয়েশিয়া
গত ২৮ আগস্ট এক বিজ্ঞপ্তিতে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বলেছে, এজেন্সি যাচাই-বাছাইয়ের কাজটি করেছে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের যৌথ কমিটি। এতে বাংলাদেশ সরকারের ন্যূনতম কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এতে রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাই করার দায়িত্ব এককভাবে মালয়েশিয়া সরকারের ওপর ন্যস্ত করা হয়। এটি আওয়ামী লীগ সরকারের নতজানু পররাষ্ট্রনীতির বহিঃপ্রকাশ। আগামী ৩১ ডিসেম্বর এ চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। তাই চুক্তির শর্ত বাংলাদেশের পক্ষে পরিবর্তন করা সহজ নয়। তবে এ বিষয়ে সমঝোতার চেষ্টা করেছে সরকার। মেয়াদ শেষে নতুন সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী রিক্রুটিং এজেন্সি অনুমোদনে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা হবে বলে আশাবাদী সরকার।
এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও বলা হয়, এজেন্সি বাছাই করেছে মালয়েশিয়া। এমনকি বাজার বন্ধের পর ১০০ এজেন্সির পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করেও একই দাবি করা হয়েছিল।
মালয়েশিয়া শ্রমবাজার চালু করতে দেশটির সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এজেন্সির তালিকা তৈরি করতে ১০টি শর্ত দেয় মালয়েশিয়া। এ শর্তের ভিত্তিতে এজেন্সির কাছ থেকে আবেদন গ্রহণ করা হয়। এতে প্রথমে ১৬৩টি এজেন্সি যোগ্য বলে বিবেচিত হয়। এরপর বাংলাদেশের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রথমে তিনটি শর্ত শিথিল করে, এরপর আরেকটি শিথিল করে। শেষ পর্যন্ত ৪২৩টি এজেন্সির তালিকা চূড়ান্ত করে মালয়েশিয়ায় পাঠায় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়।
মালয়েশিয়া চক্র হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে দেশের সব রিক্রুটিং এজেন্সিকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হয় না। সুযোগটি পায় অল্পসংখ্যক এজেন্সি।
আরেক কৌশল: সহযোগী এজেন্সি
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশসহ ১১টি দেশ কর্মী পাঠানোর তালিকায় আছে। তবে বাংলাদেশ ছাড়া কোনো দেশে এমন চক্র-ব্যবস্থা নেই। যদিও এবার নেপাল ও বাংলাদেশের ২৫টি করে এবং ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের জন্য ১০টি করে রিক্রুটিং এজেন্সির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে চারটি দেশের রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকদের সংগঠনের পক্ষ থেকে যৌথ বিবৃতি দিয়ে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। কর্মী নিয়োগ ব্যবস্থায় সিন্ডিকেট, একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও সীমিতসংখ্যক এজেন্সিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বদলে সবার জন্য উন্মুক্ত রাখার দাবি করেছে তারা। অবশ্য শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো থেকে পাঠানো তালিকার সবাইকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ২৫ এজেন্সির তালিকা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে নেপাল।
মালয়েশিয়া চক্র হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে দেশের সব রিক্রুটিং এজেন্সিকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হয় না। সুযোগটি পায় অল্পসংখ্যক এজেন্সি। গতবার শুরুতে চক্রের সদস্য ছিল ২৫টি এজেন্সি। পরে তিন ধাপে বেড়ে ১০০টি হয়েছে। চক্রে নাম ঢোকাতে প্রতিটি এজেন্সির কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে চক্রের হোতাদের বিরুদ্ধে। আর চক্রে থাকা এজেন্সিগুলো বসে বসে প্রত্যেক কর্মীর বিপরীতে অন্তত দেড় লাখ টাকা ‘চক্র ফি’ নিয়েছে। এ অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তদন্ত চলছে। এ ছাড়া একটি মামলায় অভিযোগ দায়ের হওয়ায় বর্তমান সরকারের সময় ৪৯টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স প্রত্যাহার করে নিয়েছে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় বলছে, অনুমোদিত ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকার অন্তর্ভুক্ত। মালয়েশিয়ার মন্ত্রিসভা ওই তালিকা থেকে ২৫টি চূড়ান্ত করেছে। এরপর বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে আরও ৩১২টি এজেন্সিকে ‘অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটিং এজেন্সি’ হিসেবে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দিচ্ছে।
তালিকায় না থাকা রিক্রুটিং এজেন্সি আগেও মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠিয়েছে। এমন চারটি এজেন্সির মালিকেরা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ব্যবসা দীর্ঘদিনের। তাই সেখানকার কোম্পানি থেকে তাঁদের কাছে চাহিদাপত্র আসে। তখন তাঁরা চক্রে থাকা এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রত্যেক কর্মীর জন্য ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা ‘চক্র ফি’ দিয়ে কর্মী পাঠাতে হয়েছে গতবার। সহযোগী এজেন্সির কাজটিও একই হবে। তারা সরাসরি কর্মী পাঠাতে পারবে না। আর যারা অভিজ্ঞতা ছাড়াই অনুমোদন পেয়েছে, তাদের মালয়েশিয়ার নিয়োগকর্তারাও চেনেন না। তাই তারা অভিজ্ঞ এজেন্সির মাধ্যমেই কর্মী পাঠাবে এবং বিনিময়ে চক্র ফি নেবে।
বায়রার সদ্য সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি রিয়াজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, আগের মতো এবারও সিন্ডিকেট হয়েছে, একটু নতুন কৌশলে। এতে কর্মীর খরচ বাড়বে। যাচাই-বাছাই হলে এসব অখ্যাত এজেন্সির নাম থাকত না। আর সহযোগী এজেন্সি হতে কেউ আবেদন করেনি, তাদের সহযোগী বানিয়ে দিয়েছে। সহযোগীর নামে সরাসরি কাজ আসবে না, আসবে ২৫টি এজেন্সির নামে। এর আগেও এমন অন্তত ৮১৭ এজেন্সি ‘চক্র ফি’ দিয়ে কর্মী পাঠিয়েছে। এবার বরং সহযোগী কমিয়েছে।
বায়রার সদস্যরা বলছেন, এবার মূল ২৫টি এজেন্সির সবার বিপরীতে ১০টি করে সহযোগী ও সরকারি বোয়েসেলের অধীনে ৬২টি এজেন্সিকে সহযোগী রাখা হয়েছে। এটি সিন্ডিকেটমুক্ত ব্যবস্থা নয়; পুরোনো ব্যবস্থাকে নতুন কাঠামোয় উপস্থাপনের কৌশল মাত্র। অতীতে প্রায় ১ হাজার ৪০০ এজেন্সি এফডব্লিইসিএমএসে তালিকাভুক্ত ছিল। কিন্তু ২০১৬ সালে ১০টি ও ২০২২ সালে প্রথমে ২৫টি দিয়ে শুরু করে শেষ পর্যন্ত ১০০টি অনুমোদন পায়।
মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে দালাল ও প্রতারক চক্র থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় বলেছে, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়নি। এটি প্রক্রিয়াধীন আছে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় যথাসময়ে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানাবে। তার আগে কোনো ধরনের লেনদেন না করতে সতর্ক করা হয়েছে।
বিনা পয়সায় কর্মী পাঠানোর সুযোগ
প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দুই দেশের মন্ত্রিপর্যায়ে একাধিক বৈঠকের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও রাজা সুলতান ইব্রাহিম ইস্কান্দারের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। এরপর শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণের বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে মালয়েশিয়া ১০ হাজার কর্মীকে বিনা মূল্যে নেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত পোষণ করেছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর মাধ্যমেই আবার শুরু হবে এই শ্রমবাজার।
এর আগে ২০২২ সালেও মালয়েশিয়ায় ১০ হাজারের বেশি কর্মী পাঠানোর চাহিদা পেয়েছিল সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বোয়েসেল। তবে তারা কর্মী পাঠিয়েছে দেড় হাজারের মতো। বোয়েসেলের দুজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, বোয়েসেলের মাধ্যমে কর্মী গেছেন বিনা পয়সায়, নিয়োগকর্তার খরচে। তাই নানাভাবে বাধা এসেছে। এ কারণে বেশি কর্মী পাঠানো যায়নি। এ ছাড়া নিয়োগকর্তার খরচে কর্মী পাঠানোর চাহিদাপত্র পেতে খরচ করতে হয়েছে বোয়েসেলকে।
মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে দালাল ও প্রতারক চক্র থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় বলেছে, মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়নি। এটি প্রক্রিয়াধীন আছে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় যথাসময়ে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানাবে। তার আগে কোনো ধরনের লেনদেন না করতে সতর্ক করা হয়েছে।
২৫ এজেন্সি বাছাই করার মাধ্যমে প্রমাণ হলো, দুই দেশের সরকারের চেয়ে সিন্ডিকেট বেশি শক্তিশালী। যে কারণে দুর্নীতি, অনিয়ম, কর্মী ঠকানো, বারবার বাজার বন্ধ হওয়া; কর্মী নিয়োগের সেই ব্যবস্থা বন্ধ হয়নি।শরিফুল হাসান, ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক ও অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান
বারবার চক্র, প্রতারিত হয় কর্মী
প্রায় চার বছর বন্ধ থাকার পর ২০২২ সালের জুলাইয়ে যখন মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলে, তখন কর্মী পাঠানোর জন্য রিক্রুটিং এজেন্সি নির্বাচনের দায়িত্ব পায় মালয়েশিয়া। তাদের কাছে ১ হাজার ৫২০টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা পাঠিয়েছিল প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। ওই তালিকা থেকে এজেন্সি বাছাই করে মালয়েশিয়া। আওয়ামী লীগ আমলের তিন সংসদ সদস্য ও একজন সংসদ সদস্যের পরিবারের সদস্যের এজেন্সির পাশাপাশি আওয়ামী লীগ নেতা, সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরের এজেন্সি চক্রে ঢুকে বাণিজ্য করে। তারা নিজেরাই প্রকাশ্যে বলেছিল, তারা কোনো কর্মী পাঠায়নি। তাদের নামে অন্য এজেন্সিগুলো কর্মী পাঠিয়েছে।
আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে তিন দফায় বন্ধ হয়েছে মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার। প্রতিবারই শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে চক্র বা সিন্ডিকেট গঠনের বিষয়টি সামনে এসেছে। এরপর চক্রের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষের অভিযোগ ওঠে। ২০০৯ সালে প্রথম দফায় বন্ধ হয় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। এরপর ২০১৬ সালের শেষে খোলা হয় বাজারটি। দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে আবার বন্ধ হয়ে যায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। ২০২২ সালের আগস্টে আবার চক্র গড়ে বাজার খোলা হয়। ২০২৪ সালের জুন থেকে এটি বন্ধ হয়ে যায়।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক ও অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ২৫ এজেন্সি বাছাই করার মাধ্যমে প্রমাণ হলো, দুই দেশের সরকারের চেয়ে সিন্ডিকেট বেশি শক্তিশালী। যে কারণে দুর্নীতি, অনিয়ম, কর্মী ঠকানো, বারবার বাজার বন্ধ হওয়া; কর্মী নিয়োগের সেই ব্যবস্থা বন্ধ হয়নি। আমিন নূরের সিস্টেমেই আবারও কর্মী নিয়োগ হচ্ছে, এটি দুই সরকারের বড় ব্যর্থতা। চুক্তি সংশোধন করা যেত, কিংবা নতুন চুক্তি করে আগামী বছর থেকে কর্মী পাঠানো হোক। না হলে লাখো কর্মী প্রতারিত হওয়ার পর আবার বন্ধের জন্য শ্রমবাজার চালু করার কোনো মানে হয় না।
