সাক্ষাৎকার: চিত্রনায়িকা ববিতা

গাড়ি কিনে মাকে দেখাতে গিয়ে দেখি তিনি সাদা চাদরে ঢাকা

ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো অনুষ্ঠানের এবারের আয়োজনে অতিথি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেত্রী ববিতা। সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ চলচ্চিত্রে অভিনয় তাঁকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক আনিসুল হককে দেওয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে নিজের শৈশব, বেড়ে ওঠা, চলচ্চিত্রে জড়িয়ে পড়াসহ জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন তিনি।

আনিসুল হক:

 প্রথম আলোর বিশেষ আয়োজন অভিজ্ঞতার আলোয় আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি। আমি বিশেষভাবে রোমাঞ্চিত, আজ আমরা এসেছি বাংলাদেশের একজন কিংবদন্তি, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের এবং আমাদের সংস্কৃতি জগতের একজন প্রধান ব্যক্তিত্ব আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্র অভিনেত্রী ববিতার কাছে। ববিতা আপা, আপনাকে স্বাগত জানাই।

ববিতা: ধন্যবাদ। আমি খুব খুশি হয়েছি আপনি এসেছেন। কথা বলতে চাইছি আমিও।

আনিসুল হক:

 ৩০ জুলাই আপনার জন্মদিন। আপনাকে শুভ জন্মদিন বাংলাদেশের সবার পক্ষ থেকে।

ববিতা: জি, থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ।

আনিসুল হক:

 ১৯৫৩ সালে আপনার জন্ম।

ববিতা: জি।

আনিসুল হক:

জন্ম হয়েছিল বাগেরহাটে।

ববিতা: বাগেরহাট।

আনিসুল হক:

আপনার আব্বা এ এস এম নিজান উদ্দিন আতাউব।

ববিতা: আতাউব।

আনিসুল হক:

 আতাউব।

ববিতা: আতাউব।

আনিসুল হক:

উনি সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন।

ববিতা: ছিলেন, জি।

আনিসুল হক:

 এবং আপনার আম্মা জাহানারা, উনি হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারি করতেন এবং কলকাতার লেডি ব্রেবোর্ন কলেজে পড়েছেন। একটু আগে আপনি একটা গল্প বলছিলেন, আপনি যখন ‘অশনি সংকেত’–এর শুটিং করতে কলকাতায় গ্র্যান্ড হোটেলে থাকতেন, আপনার আব্বাও আপনার সঙ্গে কলকাতায় যেতেন।

ববিতা: হ্যাঁ।

আনিসুল হক:

 এবং একদিন আপনাকে গ্র্যান্ড হোটেলের পেছনে একটা রেস্টুরেন্টে নিয়ে গিয়েছিলেন। ওই গল্পটা একটু করেন।

ববিতা: বাবা তো আমার সঙ্গে যেতেন। তো আমার আব্বা বললেন কি, মা, চলো একটু বেড়িয়ে আসি। আমি বলছি, আচ্ছা, আব্বা চলেন। কোথায় যাব? চলো না, চলো। তারপরে দেখি কি, গ্র্যান্ড হোটেলের পেছনে একটা চায়নিজ রেস্টুরেন্ট এবং সেটা খুব পুরানা–টুরানা, ওরা বোধ হয় ওইটাকে কোনো রিপেয়ার করে নাই, মডার্ন করে নাই। যে রকম অনেক বছর এবং ওটা নাকি আমি শুনেছি কলকাতার প্রথম চায়নিজ রেস্টুরেন্ট এবং সেই রেস্টুরেন্ট যে রকম ছিল সেই রকমই। তো ওখানে ঢুকেছি আমি, বলছি, আব্বা, আপনি কোথায় নিয়ে এলেন? কত সুন্দর সুন্দর রেস্টুরেন্ট আছে। ওইখানে চলেন। (আব্বা) বলেন, না মা, আসো আসো। বড় বড় পর্দা বড় বড় গ্লাস বড় বড় প্লেট, তারপরে আব্বা অর্ডার দিলেন ফ্রায়েড রাইস, এই ওই সেই। তো দেখি যে আব্বা বসে আমার দিকে মিটমিট করে হাসছেন। আমি বলছি, আব্বা কী ব্যাপার? আব্বা বলেন, শোনো মা, আমি আর তোমার মা যখন এখানে পড়াশোনা করতাম, তখন আমরা ফাঁকে ফাঁকে এখানে আসতাম এবং আমরা দুজন গল্প করতাম, খেতাম। তাই আমার খুব ইচ্ছা যে আমার মেয়েকে আমি এখানে নিয়ে আসব।

আনিসুল হক:

সেই আমলে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের শিক্ষিত, সরকারি চাকরি করছেন, মা শিক্ষিত ব্রেবোর্ন কলেজের। এ জন্য আপনারা সব ভাই–বোনে অনেক খ্যাতিমান হয়েছেন, মানুষও হয়েছেন।

ববিতা: হয়েছি, তো আমার আম্মা যখন, আমরা পরে যশোরে ছিলাম, আম্মা খুব সংস্কৃতিমনা। তো আম্মা তখন একটা কথা আমাদের বলতেন, মা দেখো, আমাদের ভাই–বোন সবাইকে বলতেন, তোমরা যতই লেখাপড়া করো তোমাদের আলাদা গুণ থাকতে হবে।

হ্যাঁ, আম্মা কী রকম, আমরা তো ছোট। তো বলতেন যে হ্যাঁ, তোমাদের কবিতা আবৃত্তি, নাচ, গান—এগুলো জানতে হবে। শুধু লেখাপড়া প্রয়োজন; কিন্তু লেখাপড়াই সব নয়। তারপরে আমাদের ওস্তাদ রেখে দিয়েছিলেন। …গান শিখতাম, নাচ শিখতাম। তো এক দিন যদি নাচ ফাঁকি দিতাম মা ভীষণ রেগে যেতেন। তো এই জিনিসগুলো ছোট থেকে আমরা পেয়েছি, সে জন্যই বোধ হয় একটু …।

আনিসুল হক:

নিশ্চয়ই। আমি কিছুদিন আগে সুচন্দা আপারও একই ইন্টারভিউ করেছি।

ববিতা: জি।

আনিসুল হক:

 উনি বলছিলেন কলেজে থাকতেই উনি স্কুলে মঞ্চ নাটক করতেন।

ববিতা: হ্যাঁ, নাটক নাচ এসব করতেন সুচন্দা আপা, আবার সুচিত্রা সেনের খুব ভক্ত ছিলেন।

আনিসুল হক:

 ওনার সঙ্গে চেহারার, একটা অভিব্যক্তির মিল আছে।

ববিতা: অভিব্যক্তির মিল আছে। সুচিত্রা সেনের সিনেমা মানেই হলে যেতে হবে, দেখতে হবে। তো সুচন্দা আপা ওই সিনেমা–টিনেমা দেখে এসে বাড়িতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে; উনি আবার খুব সুন্দর সুচিত্রা সেনের মতো ঘাড় কাত করে, বাঁকা করে উনি অভিনয়টা করছেন। এগুলো আমি আবার পেছন থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম, বাবা! আপা কী সুন্দর কী করছে।

আনিসুল হক:

আপনার ভালো নাম হচ্ছে ফরিদা আক্তার, ডাকনাম পপি।

ববিতা: ডাকনাম পপি।

আনিসুল হক:

 হ্যাঁ, সুচন্দা আপা আপনাকে পপি বলে ডাকে? চম্পা আপাও আপনাকে পপি বলে ডাকে?

ববিতা: পপি বলে। আমার বাসার পরিবারের সবাই আমাকে পপি বলেই ডাকে। তবে চলচ্চিত্রে আবার একটু অন্য রকম। যেমন রাজ্জাক ভাই আমাকে কোনো দিন ববিতা ডাকেন নাই। উনি আমাকে পপ বলে ডাকতেন, পপ। মোস্তফা ভাই, গোলাম মোস্তফা ভাই বলতেন পপিনজে । এ রকম একেকজন একেকভাবে আমাকে ডাকতেন। এবং আমার কিন্তু বেশ অনেকগুলো নাম হয়েছিল। পপির পরে সুবর্ণা, সুবর্ণা নামও দেওয়া হয়েছিল।

আনিসুল হক:

 সুবর্ণার নাম দিয়ে আপনি প্রথম ছবিটা করেছিলেন, যেটা মুক্তি পায় নাই, না? ‘সংসার’।

ববিতা: হ্যাঁ, মুক্তি পেয়েছে ‘সংসার’ নামে। তো ওই ছবিতে জহির ভাই আমার নাম দিলেন সুবর্ণা।

আনিসুল হক:

 সুবর্ণা।

ববিতা: সুবর্ণা এবং ওই ছবিটি আমি তখন…

আনিসুল হক:

 সুচন্দা বা সুবর্ণা খারাপ হয় নাই।

ববিতা: না, ঠিক আছে; কিন্তু ওই ছবিটি করার পরে, আনফরচুনেটলি ওটা চলে নাই।

আরও পড়ুন
আনিসুল হক:

 চলে নাই।

ববিতা: চলে নাই। আর আমারও না সিনেমা–টিনেমা করতে ভালো লাগত না। আমি মনে করতাম, সিনেমা খুব কষ্টের একটা জিনিস।

আনিসুল হক:

 শুটিং করা তো খুবই কষ্টের।

ববিতা: খুবই কষ্টের, সুচন্দা আপাকে দেখতাম, সুচন্দা আপার সঙ্গে যেতাম, ওই যে কক্সবাজার এখানে–ওখানে। তো দেখতাম, ডাইরেক্টর বলছে, ম্যাডাম আপনি খালি পায়ে এই বালুর মধ্যে দৌড়ান। আপনি এই পাহাড়ের দিকে উঠছেন। আপনি আত্মহত্যা করতে সমুদ্রে যাচ্ছেন। আবার হয় নাই, কাট কাট কাট, ট্রলি হয় নাই, কী হয় নাই বলে–টলে। আমি শুনে বলি, আমার বোনকে এত কষ্ট দিচ্ছে? এটা কোনো কথা হলো নাকি!

আনিসুল হক:

 তখন তো আপনি স্কুলের ছাত্রী।

ববিতা: স্কুলের ছাত্রী। ক্লাস ফাইভে পড়ি আমি। তো আমি বললাম যে না; আমি সুচন্দা আপাকে বুজি বলে ডাকি। তো আমি বললাম, বুজি যত যা–ই বলো, তুমি কষ্ট করো করো। আমাকে যদি কেউ বলে সিনেমা করতে, আমি কোনো দিন করব না।

জহির রায়হান ও বড় বোন সুচন্দার সঙ্গে ববিতা (বাঁয়ে)
ছবি: সংগৃহীত
আনিসুল হক:

 কিন্তু আপনার দুলাভাই জহির রায়হানের অনুরোধে আপনি করলেন।

ববিতা: আমার করতে হলো, কারণ তখন জহির ভাই বললেন যে আমাদের একটা মেয়ে লাগবে, একটা বাচ্চা কিশোরী মেয়ে। তো আমি বললাম যে না, আমি সিনেমা করব না, ভালো লাগে না। তো আম্মা বললেন, সুচন্দা আপা বললেন, দেখো, তুমি যদি না করো, সবাই বলবে দুলাভাই রিকোয়েস্ট করেছে, তুমি কথাটা রাখো নাই। তো তুমি করো। তো আমি খেলার ছলে খুব রাগ লাগে কী উল্টাপাল্টা ডায়ালগ বলছি, কী করছি ভালো লাগছে না এ রকম। করার পরে ওই ছবিটি যাই হোক, ওটা গল্পটা বোধ হয় কোনো প্রবলেম ছিল নাকি চলে নাই। তো জহির ভাই তখন মনে করলেন যে, ছবিটিতে আমি পপিকে নিলাম।… আচ্ছা, ওকে এবার নায়িকা বানিয়ে একটা সিনেমা করব। তো ওই সময় ক্যামেরাম্যান আফজাল চৌধুরী একটা ছবি প্রডিউস করবেন। ‘জ্বলতে সুরাজ কে নিচে’ নামে উর্দু ছবি। তৎকালীন উর্দু ছবি। সেই ছবিটি, বড় বড় সব আর্টিস্টরা থাকবেন, নাদিম তারপরে সাবিহা সন্তোষ, পাকিস্তানের রোজিনা এইসব। তো শবনম ম্যাডাম ছিলেন, কিন্তু উনি শিডিউল দিতে পারেননি। তো তখন কী হবে, সবার শিডিউল মিস হয়ে যাবে, শবনম দিতে পারছে না। তো বললেন যে কী করা যায়? জহির ভাই চিন্তায় পড়ে গেলেন। আফজাল ভাই বললেন, জহির, তুমি ভাবছ কেন? তোমার তো ঘরেই নায়িকা আছে। কী রকম? তোমার ওয়াইফের বোন, ওকে আমি টেলিভিশনে একটা নাটকে দেখেছি। আমি ‘একটি কলম’ নামে একটা নাটক করেছিলাম। সেই নাটকে, ওটা দেখে বলে কি, মেয়েটার তো ক্যামেরা ফেস সুন্দর, ভয়েস–টয়েস সুন্দর। আমরা একটু ট্রাই করতে পারি। তারপরে তখন ওনারা আমার টেস্ট নেবে। আমার ওই ছবিটি রঙিন হবে। কালারে কেমন লাগে, আমার ভয়েস কেমন, এই–ওই। দেখে–টেখে বললেন, না, এই মেয়েটা ভালো হবে, একেই আমরা নায়িকা বানাব। …নাম সুবর্ণা নাম দেব না আমরা। নতুন নাম দেব। তো ক্যামেরাম্যান আফজাল চৌধুরীর বউ বললেন, আমরা এর নাম দেব ববিতা। তো ববিতা, কেউ কেউ বললেন যে ভারতে একজন ববিতা নামে আর্টিস্ট আছে, এটা কি ঠিক হবে? বলে তাতে কী আছে? আমাদের বাংলা, এই দেশে ববিতা। তো কোনো অসুবিধা নাই, এটাই আমরা দেব। এই তারপরে ওই ছবিটি করলাম।

আনিসুল হক:

এটা কি ১৪ আগস্টে মুক্তি পেয়েছিল?

ববিতা: ছবিটি বোধ হয় তখন রিলিজ হতে পারে নাই। ওটা শেষমেশ, ওটা পরে বাংলায় ডাবিং হয়ে রিলিজ হয়েছে।

আনিসুল হক:

আপনার প্রথম বাংলা ছবি যেটা।

ববিতা: প্রথম বাংলা ছবি ছিল ‘শেষ পর্যন্ত’।

আরও পড়ুন
আনিসুল হক:

 ‘শেষ পর্যন্ত’ দিয়ে শুরু।

ববিতা: শুরু হ্যাঁ। ‘শেষ পর্যন্ত’ ছবিটি।

আনিসুল হক:

 আপনার বিপরীতে নায়ক কে ছিলেন?

সহশিল্পী রাজ্জাকের সঙ্গে সিনেমার দৃশ্যে ববিতা
ছবি: সংগৃহীত

ববিতা: রাজ্জাক ভাই ছিলেন। তো রাজ্জাক ভাইয়ের সঙ্গে শট–টট দিতে গিয়ে…বললেন যে রাজ্জাক তোমাকে জড়িয়ে ধরবে, তোমরা রোমান্টিক ডায়ালগ বলবে। তো আমি বলছি, ও মা, এ আবার কী কথা? কদিন আগে বাবা ডাকলাম। এখন আবার, প্রেমিকা–প্রেমিক, এর সঙ্গে অভিনয় করতে হবে প্রেমের! না না না, আমি পারব না।

তো জহির ভাই দিলেন বকা। এই মেয়ে, এটা কি সত্যি নাকি? এটা তো অভিনয়। যাই হোক এইভাবে শুরু হলো। তো শেষ পর্যন্ত ছবিটি ১৪ আগস্ট ১৯৬৯। ১৪ আগস্ট ওই দিন বোধ হয়, হ্যাঁ, ওই দিন পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস। তো ওই দিন ছবিটি মুক্তি পায়। তো আমার মায়ের একটু হার্টের সমস্যা ছিল। মা একটু ক্লিনিকে ছিলেন, নিরাময় ক্লিনিক। আমি করলাম কি, গেন্ডরিয়াতে থাকি আমরা; আমি আবার ওই ছবিতে অভিনয় করে ১২ হাজার টাকা পারিশ্রমিক পেলাম। আমি ওই ১২ হাজার টাকা দিয়ে একটা টয়োটা গাড়ি কিনলাম। কিনে আমি ভাবলাম যে গাড়িটি নিয়ে যাই মায়ের কাছে, গিয়ে মাকে দেখাই, মা দেখো, আমার জীবনের প্রথম ইনকাম। আমার গাড়িটা দেখো। তো আমি গেছি। আবার ওদিকে জহির ভাই আসবেন, রাজ্জাক ভাই আসবেন, সুচন্দা আপা আসবেন। সব মায়ের ওখানে, আমরা সবাই মিট করব। তারপরে আমরা ওই সিনেমা রিলিজ হচ্ছে। ওই দিন দেখব যে হলের সামনে ছবিটি কেমন চলছে। ববিতাকে সবাই অ্যাকসেপ্ট করল কি না দেখার জন্য, সব ওখানে টাইম ঠিক হলো। তো আমি যখন গেছি, যাওয়ার পরে গাড়ি থেকে কেবল এক পা নেমেছি। তখন একটা ছোট ছেলে এসে বলছে, আপনি তাড়াতাড়ি আসেন, তাড়াতাড়ি আসেন। আমি বলছি কেন তাড়াতাড়ি কেন? আসেন না, আসেন। তারপরে আমাকে নিয়ে গেল, আমি গেলাম এক রুমে। রুমে গিয়ে দেখি যে আমার মাকে সাদা চাদর দিয়ে ঢাকা হয়েছে, মানে মা আর নাই।…তো আমি আমি আর কথা বলতে পারলাম না। সেন্সলেস হয়ে পড়ে গেলাম।

আনিসুল হক:

 ১৬ বছর বয়সে আপনি মাতৃহারা হলেন।

ববিতা: হ্যাঁ।

আনিসুল হক:

 এবং আপনাদের বড় বোন সুচন্দা।

ববিতা: তখন কিন্তু ১৬ না, আরও কম।

আনিসুল হক:

 আরও কম?

ববিতা: বয়স কিন্তু আরও কম। জোর করে আমাকে নায়িকা বানিয়েছে। অনেক পাতলা–ছাতলা ছিলাম তো, মোটা মোটা কাপড় পরিয়ে আমাকে নায়িকা বানানো হয়েছিল। তো যা–ই হোক, ওই দিন আর যাওয়া হলো না। মাকেও গাড়িটি দেখানো হলো না, এটা একটা দুঃখ আজও, সেই দুঃখটা রয়ে গেছে। আর এর পরের ছবি তো সুপার ডুপার হিট হলো। ইয়াং জেনারেশনের ছেলেপেলেরা ববিতাকে খুব লাইক করল।… এই নতুন নায়িকা ববিতা এত সুন্দর দেখতে লাগে, এত সুন্দর অভিনয়, এই–সেই।

ববিতা অভিনয় করেছেন প্রায় ২৭৫টি চলচ্চিত্রে
ছবি: খালেদ সরকার
আনিসুল হক:

নিশ্চয়ই।

ববিতা: এরপরে একটার পর একটা ছবি আসতেই থাকল। এবং তখন আর আমি বলতে পারলাম না যে আমি আর সিনেমা করব না। তখন মেনেই নিলাম যে এটাই আমার চলার পথ, এটাই আমাকে করতে হবে। এইভাবে এগিয়ে গেলাম এবং তারপরে ছবির পরে ছবি। এই আরকি!

আরও পড়ুন
আনিসুল হক:

 স্টপ জেনোসাইডে আপনি অংশ নিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধের আগে এবং পরে?

ববিতা: হ্যাঁ। স্টপ জেনোসাইডটা, এটা একটা দুঃখের বিষয়, সেটা হচ্ছে জহির ভাই সব সময় কেন যে এই কথাটি বলতেন যে আমার জীবনে এটা শেষ ছবি। ছবিটা কিন্তু ইংলিশে হচ্ছিল। এবং ছবিটির সবকিছু… জহির ভাই নিজেই ক্যামেরা চালাতেন, নিজেই লাইট করতেন, নিজেই কিছু স্ক্রিপ্ট… আর এটার স্ক্রিপ্ট ছিল না। সবকিছু ওনার ব্রেনে।

আনিসুল হক:

 ব্রেনে, তো ’৭১ সালে সুচন্দা আপা তো ইন্ডিয়াতে গিয়েছিলেন। আপনি যান নাই?

ববিতা: না না, আমি যাইনি। আমি যেতে পারিনি।

আনিসুল হক:

 এরপরে আপনার ’৭২ সালের পরে তো আপনার যুগ শুরু হয়ে গেল, ববিতার যুগ। রাজ্জাক–ববিতা এ ছাড়া পরের দিকে এসে নাদিমের সঙ্গে আপনি অভিনয় করেছেন।

ববিতা: হ্যাঁ, ওই যে ‘জ্বালতে সুরাজ কে নিচে’।

আনিসুল হক:

এর পরে আর করেন নাই।

ববিতা: ওটা করেছি, আরেকটি কানাডায় একটা মুভি হয়েছিল। ওটার নাম ‘গেহেরি চোট’। এই দেশে ‘দূরদেশ’ নামে রিলিজ হয়েছে।

আনিসুল হক:

 হ্যাঁ।

ববিতা: ওটাতে নাদিম ছিল।

আনিসুল হক:

 এটা তো পরের দিকে আমরা দেখেছি।

ববিতা: হ্যাঁ। ওটাতে ভারতীয় আর্টিস্টরা ছিলের, শর্মিলা ঠাকুর, রাজ বাব্বর, তারপরে পারভিন ববি, নাদিম আমরা সব ওটা কানাডাতেই করেছিলাম। এই।

আনিসুল হক:

 আপনার অনেক চলচ্চিত্র, আপনার বিপরীতে নায়করা অভিনয় করেছেন। আপনার সবচেয়ে প্রিয় কে?

ববিতা: আমার সবচেয়ে প্রিয়… বলব, রাজ্জাক ভাই।

আনিসুল হক:

রাজ্জাক–ববিতাই বেশি পপুলার হয়েছিল।

ববিতা: বেশি পপুলার।

আনিসুল হক:

 রাজ্জাক–ববিতা।

ববিতা: ভালো ভালো ছবি করেছি। অনেক ছবি করেছি একসঙ্গে। আরও সব নায়করা ছিল।

আনিসুল হক:

 ‘অনন্ত প্রেম’ তো।

আরও পড়ুন

ববিতা: ‘অনন্ত প্রেম’। এত সুন্দর ছবি এবং ওনার প্রথম পরিচালিত ছবি ছিল। খুব সুন্দর ছবি ছিল। তো রাজ্জাক ভাইকে বেশি পছন্দ করতাম। আর ওদিকে যদি বলেন যে একটু রোমান্টিক, একটু অন্য ধরনের, তাহলে আমি বলব জাফর ইকবাল।

আনিসুল হক:

জাফর ইকবাল, হ্যাঁ।

ববিতা ও জাফর ইকবাল
ছবি: সংগৃহীত

ববিতা: হ্যাঁ, ওর সঙ্গে আমাকে, আমার ছবি অনেক দর্শক খুব পছন্দ করত।

আনিসুল হক:

আমরা তো তখন ‘চিত্রালী’ আর ‘পূর্বাণী’ পড়তাম। নানা ধরনের ওই যে হাওয়া থেকে পাওয়া।

ববিতা: হাওয়া থেকে পাওয়া অনেক কিছু। এদের মধ্যে অনেক প্রেম চলছে, এই চলছে।

আনিসুল হক:

হা হা হা। এগুলো সব আমরা শুনতাম।

ববিতা: হা হা হা।

আনিসুল হক:

 সোহেল রানার সঙ্গে একটা ছবি আছে আপনার ‘নাগ পূর্ণিমা’।

ববিতা: সোহেল রানার সঙ্গে ‘নাগ পূর্ণিমা’।

আনিসুল হক:

‘তুমি যেখানে, আমি সেখানে’ খুব সুন্দর গান আছে।

ববিতা: সুন্দর। গানটা খুব সুন্দর।

আনিসুল হক:

 এরপরে বলেন যে সত্যজিৎ রায় আপনাকে কীভাবে, তাঁর চোখে আপনি কীভাবে পড়লেন?

ববিতা: আমি তাঁর চোখে পড়লাম মানে আমি আসলে ওই সময় আমার বয়সটা মনে হয় প্রায় ১৬ বছরের মতো হবে। হ্যাঁ, ১৬, ১৭ এ রকম হবে। আমি গেন্ডারিয়ার বাড়িতে থাকি। একদিন দেখি যে একটা চিঠি এসেছে। চিঠিতে লিখেছে যে ভারতের বিখ্যাত পরিচালক সত্যজিৎ রায় আপনাকে ছবিতে নিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আপনি যদি একটু কলকাতায় আসেন ভালো হয়, উনি দেখবেন সামনাসামনি আপনাকে। তো এটা পড়ে আমি একদম চেয়ার থেকে হাসতে হাসতে পড়েই গেলাম। না, পড়ে গেলাম এ জন্য যে এটা কি সম্ভব নাকি! ভারতে কত বিখ্যাত, শুনেছি বড় বড় নায়িকারা আছে। ওরা থাকতে আমি কোথায় কোন বাংলাদেশে, কোথায় ববিতা নামে আমাকে নেবে এটা হয় নাকি! এ রকম এ রকম। আচ্ছা, তারপরে কী হলো? এ রকম করতে করতে ইন্ডিয়ান হাইকমিশন থেকে ফোন এল।…তো ল্যান্ডফোনে ফোন করেছে যে আপনারা কি এটা সিরিয়াসলি নিচ্ছেন না? এটা কিন্তু সত্যি। …সত্যি সত্যজিৎ বাবু আপনাদের কোনো রেসপন্স না পেয়ে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তারপরে সুচন্দা আপা বললেন যে এটা নিশ্চয়ই সত্যি, আমাদের যাওয়া উচিত। …এর আগে একটু বলে নিই, একবার…এফডিসিতে এক ভদ্রলোক আমার বোধ হয় ২০০, ৩০০ ছবি তুলছে।

আনিসুল হক:

 কলকাতা থেকে এসেছে?

ববিতা: কলকাতা থেকে এসেছে। তো আমি ভাবি, কী ব্যাপার? এত ছবি তোলে কেন? পরে ভাবলাম, ও, পাশের দেশ তো। এখানকার নায়ক–নায়িকারা কে কেমন, এ জন্য ছবি তুলছে। কিন্তু আমি আর জানি না যে ছবিগুলো মানিকদা মানে সত্যজিৎ রায়ের জন্য। তাঁকে আমরা সবাই মানিকদা বলেই ডাকি। মানিকদা দেখে বলেন, ‘বাহ, মেয়েটাকে তো বেশ ভালোই লাগল। ক্যামেরা ফেস ভালো।’ ওনার ছবিতে তো একটা ব্যাপার যে যত যা–ই হোক, ওনার ছবির কাহিনির চরিত্রের সাথে সেই আর্টিস্টের মিল থাকতে হবে। মিল না থাকলে হবে না।

আনিসুল হক:

নিশ্চয়ই।

ববিতা: তারপর আমি আর সুচন্দা আপা গেলাম। মানিকদার বাসায় আমাদের যেতে হবে সন্ধ্যার সময়। তো আমি করলাম কি, ভাবলাম, সত্যজিৎ বাবু আমাকে দেখবেন। এত বড় পরিচালক, আমাকে তো একটু সুন্দর হতে হবে। মেকআপ বক্সের ভেতর যত মেকআপ ছিল, সেই সব দিয়ে সেজেগুঁজে আমি গেছি। গিয়ে দরজায় নক করে দেখি, লম্বা ভদ্রলোক। ওনার দিকে একবার তাকিয়ে ভয়ে আমি আর তাকাতে পারি না। তিনি আমাকে বললেন, ‘তুমি এত সেজেগুঁজে এসেছ কেন? আমি তো এত মেকআপে তোমাকে দেখতে চাইনি। তুমি মেকআপ ছাড়া আসতে; বুঝতে পারতাম।’ এটা বলাতে আমি আরও ভয় পেয়ে বসে থাকলাম। সুচন্দা আপাকে তিনি বললেন, ‘ও কি অনেক লাজুক? অভিনয়–টভিনয় পারবে?’ আপা বলল, ‘দাদা, ও দুই–একটা ছবি করেছে তো। ওর কিন্তু সবাই খুব প্রশংসা করেছে।’ ‘তা–ই বুঝি?’ ‘হ্যাঁ, দাদা।’ ‘আচ্ছা, ঠিক আছে। তুমি কাল ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে আসবে। কোনো মেকআপ থাকবে না।’ তারপর তিনি আমাকে কয়েকটা স্ক্রিপ্ট দিলেন। সেগুলোতে দুই–তিন রকমের অভিনয় ছিল—বেশ রোমান্টিক, বেশ সাধারণ বা দুঃখের। সাথে বলে দিলেন, ‘এগুলো তুমি মুখস্থ করে কাল চলে এসো।’ পরদিন গেলাম। আমি আর সুচন্দা আপা। সেদিন আর মেকআপ করিনি। মানিকদা বললেন, ‘বাহ, আজকেই তো তোমাকে বেশি সুন্দর লাগছে।’ তারপর মেকআপম্যানকে বললেন, ‘তুমি যাও। ওকে সাজিয়ে দাও। …করে শাড়ি পরবে। একটা টিপ থাকবে, আর কিচ্ছু না।’ আমি স্টুডিওর ভেতরে গেলাম। লাইট অন হলো। দাদা ক্যামেরায় লুক থ্রু করছেন। তাঁকে দেখে মনে হলো, আমাকে বেশ পছন্দ করেছেন। আমি তখন নিজের ডায়ালগগুলো চর্চা করছিলাম, এটা দেখতে যে ঠিকমতো পারি কি না অভিনয় করতে। সেটাও বোধ হয় তিনি দেখেছেন যে মেয়েটার মধ্যে অনেক চেষ্টা আছে। যাহোক, সেদিন তো টেস্ট ছিল। এটা মাদ্রাজ যাবে, আসবে। তারপরে তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন যে এই মেয়ে চলবে কি চলবে না। কিন্তু তার আগেই তিনি বলে ফেললেন, ‘ইউরেকা! আমি পেয়ে গেছি। আমার অনঙ্গ বউকে পেয়ে গেছি।’

আনিসুল হক:

 অশনি সংকেতের?

সত্যাজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ সিনেমায় ববিতা
ছবি: সংগৃহীত

ববিতা: হ্যাঁ। তিনি বলতে থাকলেন, ‘অশনি সংকেতের এ–ই হবে আমাদের নায়িকা। সুচন্দা, এদিকে এসো, এদিকে এসো।’ প্রযোজককে বললেন, ‘আপনি ওর সাথে যা বাকি কথাবার্তা, বলে নেন।’ তারপর তিনি আমাকে স্ক্রিপ্ট দিলেন। পুরো ছবির স্ক্রিপ্ট। বললেন, ‘এটা তুমি বাসায়, ঢাকায় গিয়ে পড়বে। খালি পড়বে, পড়বে, পড়বে। আর অমুক সময় আমাদের শুটিং হবে। আমাদের অশনি সংকেতের শুটিং হবে বীরভূমে। হ্যাঁ, শান্তিনিকেতনে।’ এর মধ্যে তিনি খুব চিঠি লিখতেন আমাকে। আর বাবাকেও লিখতেন। আমরা জবাব দিতাম, এই–ওই। তো আমি একটা চিঠিতে লিখলাম, দাদা, আমি না বেশি শুকনা–পাতলা তো। তো আমাদের বাংলাদেশের ডিরেক্টররা বলে কি, ববিতা তো অনেক বেশি হ্যাংলা। একটু মোটা হওয়া দরকার। দাদা, আমি না পান্তা ভাত খাচ্ছি সকালে মোটা হওয়ার জন্যে।’ তিনি বললেন, ‘খবরদার, তুই এটা করিস না। তুই যা আছিস, খুব সুন্দর আছিস।’ হ্যাঁ, এ রকম, এই–সেই ব্যাপারগুলো হলো।

আনিসুল হক:

 এরপর তো বীরভূমে। শুটিং কত দিন হয়েছিল?

ববিতা: আমরা দুই–তিন মাস ছিলাম। ওখানে গিয়ে শুটিং–টুটিং করলাম।

আনিসুল হক:

‘অশনি সংকেত’ তো খুব ভালো ছবি। আন্তর্জাতিক খ্যাতি পেয়েছে। এখনো আছে।

ববিতা: হ্যাঁ।

আনিসুল হক:

 বাংলাদেশে আমজাদ হোসেনের অনেক ছবি আপনি পরপর করেছেন।

ববিতা: আমজাদ হোসেন আমার খুব প্রিয় পরিচালক। কারণ, তিনি গ্রামভিত্তিক ছবি এত সুন্দর বানাতেন!

আনিসুল হক:

 ‘নয়নমণি’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’।

ববিতা: গ্রাম নিয়ে সেই ‘নয়নমণি’; ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ তো মাইলস্টোন। এটা আমরা মস্কো ফেস্টিভ্যালে নিয়ে গিয়েছিলাম। মৃণাল সেন দেখেছেন এবং বলেছেন, ‘তোদের দেশে এত সুন্দর ছবি হয়? ভারি সুন্দর বানিয়েছিস রে।’ এ ছাড়া ‘কসাই’, ‘সুন্দরী’, ‘বড় বাড়ির মেয়ে’—এসব ছবিও আছে।

আনিসুল হক:

 ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’…

ববিতা: ‘জন্ম থেকে জ্বলছি’…এমন অসংখ্য ছবি।

আনিসুল হক:

 ‘লাঠিয়াল’–এও আপনি ছিলেন তো?

ববিতা: ‘লাঠিয়াল’ নারায়ণ ঘোষ মিতার ছবি ছিল। ওটাতেও ছিলাম।

আনিসুল হক:

 হুম। সেই যে ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’তে ট্রেনে চড়ে আপনারা সব চাল নিয়ে ময়মনসিংহ থেকে আসছেন। এ সময় একজন বলে, ‘এই, তোরা নেমে যা, এটা তো ফার্স্ট ক্লাস।’

ববিতা: ফার্স্ট ক্লাস।

আনিসুল হক:

আপনি একটা জবাব দিয়েছিলেন, মনে আছে?

ববিতা: ফার্স্ট ক্লাস? কিয়ের ফার্স্ট ক্লাস? আমরা হক্কলেই এক ক্লাসের মানুষ। এইখানে কোনো ফার্স্ট ক্লাস নাই।

আনিসুল হক:

 বাংলাদেশের একটা কথা।

ববিতা: হ্যাঁ, এই কথাটা।

আনিসুল হক:

কথাটা খুব জনপ্রিয় হয়েছিল।

ববিতা: হ্যাঁ, ওটা এখনো আমার মনে আছে। দেখেন, কত দিন আগে দেখেছেন।

আনিসুল হক:

কত আগের!

ববিতা: হ্যাঁ! কত আগের।

আনিসুল হক:

 পরবর্তীকালে তো আপনি যা করেছেন, তা–ই পুরস্কৃত হয়েছে। আপনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বহুবার পেয়েছেন। বাচসাস পুরস্কার পেয়েছেন। আবার প্রযোজক–পরিচালক হিসেবেও তো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন, তা–ই না?

ববিতা: হ্যাঁ।

আনিসুল হক:

 আপনি পরিচালনা কোনটা করলেন?

ববিতা: পরিচালনা আমি করিনি।

আনিসুল হক:

প্রযোজনা করেছেন।

ববিতা: প্রযোজনা করেছি। ছয়–সাতটা মুভি করেছি। এর মধ্যে শেষ ছবিটা ছিল ‘পোকা মাকড়ের ঘর বসতি’।

আনিসুল হক:

 সেলিনা হোসেনের লেখা।

ববিতা: হ্যাঁ, সেলিনা হোসেনের।

আনিসুল হক:

 উপন্যাস।

ববিতা: আমাদের পরিচালক আক্তারুজ্জামান একটা ভুল করেছিলেন। ছবিটা খুব সুন্দর হয়েছিল সব দিক দিয়ে। তবে তিনি একটু চট্টগ্রামের ভাষাটা রেখেছিলেন।

আনিসুল হক:

 আচ্ছা আচ্ছা।

ববিতা: আমরা বলেছিলাম যে দেখেন, চট্টগ্রামের ভাষাটা সবাই বোঝে না। এটাকে আমাদের সাধারণ ভাষায় দেন। তিনি বলেন, ‘না না, যেহেতু এটা আমার ওই এলাকার ছবি। হ্যাঁ, ছেঁড়াদ্বীপ, এই–ওই–সেই। তো আমাদের এটা–ওইটাই করতে হবে।’ এ কারণে ছবিটি কিন্তু একেবারেই চলে নাই।

আনিসুল হক:

 কমিউনিকেট করতে পারে নাই?

ববিতা: হ্যাঁ, কমিউনিকেট করতে পারে নাই। যদিও পুরস্কার পেয়েছে। সব পুরস্কার এই ছবি থেকেই আমরা পেয়েছি।

আনিসুল হক:

 আপনি উজ্জ্বলের সঙ্গে ছবি করেছিলেন?

ববিতা: হ্যাঁ, প্রথম দিকে ‘পায়ে চলার পথ’। তারপর বহু ছবি করেছি। ‘অপরাধ’, ‘অপবাদ’।

আনিসুল হক:

আলমগীর ভাইয়ের সঙ্গে?

ববিতা: আলমগীর ভাইয়ের সাথে ৩০টা ছবি করেছি।

কসাই সিনেমার দৃশ্যে আলমগীর ও ববিতা
ছবি: সংগৃহীত
আনিসুল হক:

 মোট কতটা ছবি তার মানে?

ববিতা: আমার ২৭৫–এর মতো হবে।

আনিসুল হক:

 সেকালে তো লেখক–সাংবাদিকদের সঙ্গেও আপনাদের যোগাযোগ থাকত, সুসম্পর্ক থাকত।

ববিতা: হ্যাঁ, আমি একজনের কথা আজও ভুলতে পারি না। ‘চিত্রালী’র সম্পাদক হয়েছিল। পারভেজ ভাই তো প্রথম দিকে ছিল। খোকা জামান; খোকা জামান তো খুব ভালো লেখকও ছিলেন। গল্প লিখতেন। ওনার নিজের প্রযোজনায় একটা ছবি ছিল, ‘বাদি থেকে বেগম’। তিনি বললেন, ‘ববিতা, তোমাকে কিন্তু আমার ছবিতে অভিনয় করতে হবে।’ আমি বললাম, অবশ্যই। এত সুন্দর গল্প! ওই ছবিতে আমি জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলাম। রাজ্জাক ভাইও পেয়েছিলেন।

আনিসুল হক:

 ‘বাদি থেকে বেগম’ তো অনেক সুপারহিট ছবি।

ববিতা: ওখানে আমার বিভিন্ন ধরনের চরিত্র ছিল। কখনো নর্তকী, কখনো চাকরানি, বাঁদি, কখনো বেগম।

আনিসুল হক:

 বেগম।

ববিতা: হ্যাঁ।

আনিসুল হক:

 বৈচিত্র্য।

ববিতা: হ্যাঁ, বৈচিত্র্য ছিল, বৈচিত্র্যময় ছবি।

আনিসুল হক:

 ‘বিচিত্রা’র সম্পাদক শাহাদাত চৌধুরীর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল?

ববিতা: খুব ভালো ছিল। শাহাদাত ভাই তো প্রথম দিকে, আমি যখন নায়িকা হয়েছি, আমার মনে পড়ে, গেন্ডারিয়ার বাড়িতে তিনি ক্যামেরা নিয়ে প্রচুর ছবি তুলেছেন এবং ‘বিচিত্রা’র ‘ববিতা অ্যালবাম’ও বানিয়েছেন। শাহাদাত ভাই নানা ধরনের ভালো ছবি তুলতেন। ‘পূর্বাণী’তেও যাঁরা ছিলেন, সবার সাথে আমাদের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। ভালো ইন্টারভিউ হলে খুব খুশি হতাম। খুব সুন্দর করে লিখবে, আমি জানি। এ রকম একটা ব্যাপার ছিল আরকি!

আনিসুল হক:

 অনেক দেশ তো ভ্রমণ করেছেন।

ববিতা: আমি দেশ–বিদেশে ঘুরতে চাই। আমি অনেক ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পার্টিসিপেট করতে পেরেছি। সেটা হয়েছে সত্যজিৎবাবুর ‘অশনি সংকেত’ করার পরে। তাতে হয়েছে কি, যাঁরা চলচ্চিত্রপ্রেমী, চলচ্চিত্র দেখতে পছন্দ করেন, জানেন, তাঁরা বিভিন্ন ফেস্টিভ্যালে আমাকে ইনভাইট করতেন। সত্যজিৎ রায়ের নায়িকা হিসেবে ইনভাইট করতেন। এভাবে আমি তাসখন্দ, মস্কো, তারপর কার্লোভি ভ্যারি, বেলগ্রেড, ইন্দোনেশিয়া, দিল্লি ফেস্টিভ্যাল—বিভিন্ন জায়গায় উৎসবে গেছি। আর শুটিংয়ের জন্য তো অনেক দেশেই গেছি। ইউএসএতেও শুটিং করেছি। লন্ডন, এদিক–ওদিকে অনেক গেছি।

আনিসুল হক:

 ব্যক্তিগত জীবনে আপনার এক ছেলে, অনীক। তিনি কানাডায় থাকেন।

ববিতা: হ্যাঁ, কানাডায় থাকে।

আনিসুল হক:

 আপনার বিয়ে হয়েছিল কত সালে?

ববিতা: বিয়ে হয়েছিল আশির দিকে।

আনিসুল হক:

আশির দিকে বিয়ে। তারপর অনীকের বাবা…?

ববিতা: অনীকের বাবা মারা গেলেন, যখন অনীক মোটে তিন বছরের।

ছেলে অনিকের সঙ্গে ববিতা
ছবি : ববিতার সৌজন্যে
আনিসুল হক:

তিন বছর?

ববিতা: তিন বছর। তখন তিনি মারা গেলেন। ওনার একটু সমস্যা ছিল।

আনিসুল হক:

 তিনি তো ব্যবসায়ী ছিলেন।

ববিতা: ব্যবসায়ী ছিলেন। হার্টে এটা–ওটা, আর কিডনিতেও সমস্যা ছিল, এই আরকি!

আনিসুল হক:

 সেই সব সোনালি দিন, আপনি খ্যাতির চূড়ায় ছিলেন! এখনো তা–ই আছেন।

ববিতা: না, এখন নেই।

আনিসুল হক:

একা ছেলেকে নিয়ে বিদেশে। যদিও আপনারা বোনেরা মিলে কিছুদিন আগে যশোরে দাদাবাড়ি–নানাবাড়িতে গেলেন। কেমন লাগে জীবনটা?

সম্প্রতি যশোর বেড়ানোর এক ফাঁকে তিন বোন ববিতা, সুচন্দা ও চম্পা (বাঁ থেকে)
ছবি: সুচন্দার সৌজন্যে

ববিতা: যখন আমি ছবি করেছি, শুটিং করেছি, সারা দিন ব্যস্ত থাকতাম। সকাল থেকে দুই শিফট, তিন শিফট। শুক্রবার ছুটির দিন ছিল। কিন্তু শুক্রবারেও আমাদের কাজ করতে হতো। এত ছবি ছিল যে শিডিউল ম্যানেজ করা যায় না। তখন তো শুধু বাড়ি আর এফডিসি। আর ওই আউটডোর—কক্সবাজার, মানিকগঞ্জ, ঝিটকা, নবগ্রাম…এই সব। তখন এত ব্যস্ত ছিলাম যে ব্যক্তিগতভাবে মানুষ যেমন বাইরে যায়, দোকানপাটে যায়, ঘুরতে যায়, চাইনিজ খায়, রেস্টুরেন্টে যায়…এসব করার সুযোগ আমার হয়নি। বেড়াতে যাওয়া, ড্রেস কিনতে যাওয়া, পোশাক, শাড়ি, গয়নাগাটি…। মনে হতো যে এগুলো তো আমার কাজ না। আমি তো শুটিং করব খালি। তো, শুটিংই করেছি। এখন সময় পাচ্ছি যেহেতু…। তা ছাড়া এখন তো ছবি করি না। করি না, কারণ, এখন যে ধরনের গল্প হচ্ছে, যা হচ্ছে সেগুলো...এখন যেসব গল্প আসে, এগুলো আমার মোটেই ভালো লাগে না। শুনতেই ভালো লাগে না। তখনকার প্রযোজকেরা বেছে নিতেন ভালো ভালো পরিচালক। একজন জহির রায়হান, একজন সুভাষ দত্ত, একজন নারায়ণ ঘোষ মিতা, একজন কাজী জহির, হ্যাঁ, আমজাদ হোসেন…। এসব পরিচালক তো এখন নেই। এখন যারা আছে, তারাও ছবি করছে। খারাপ বলব না, কিন্তু ওনাদের মতো না এবং এখন তো আরও না। এখন তো এফডিসিতে মনে হয় সিনেমাই হয় না।

আনিসুল হক:

 এখন এফডিসিতে ছবি হয় না!

ববিতা: বরং অল্টারনেটিভ মিডিয়া প্রধান হয়ে উঠছে। নাটক করে, শুটিং করে এখানে।

আনিসুল হক:

এখন কিছু বিচিত্র ধরনের, নতুন ধরনের ছেলেমেয়েরা এসেছে, যারা নতুন ছবি করার চেষ্টা করছে। ভালোই হচ্ছে, খারাপ না।

ববিতা: খারাপ না, হ্যাঁ। একদম নতুন যারা। হ্যাঁ। তো আমার কাছে এলে আমি বলি, ‘দেখো, আমাকে যে তুমি নেবে, আমার কি করণীয় কিছু আছে? ববিতা যেসব ছবি করেছে, একসময় সুনাম অর্জন করেছে, হাততালি পেয়েছে, পুরস্কৃত হয়েছে, সেগুলো কি আমি এখন তোমাদের ছবিতে দেখাতে পারব?’ আমি এ জন্য করিও না।

আনিসুল হক:

 ঠিক আছে, তাহলে এখন আমাদের বাংলাদেশের দর্শকদের উদ্দেশে যদি আপনি কিছু বলতে চান, একটু বলবেন।

ববিতা: আমি ববিতা হয়েছি আমার প্রিয় দর্শকবৃন্দের জন্য। ওরা আমাকে এত ভালোবাসে, আপনারা আমাকে এত ভালোবাসেন, আমার ছবি দেখেন, সেই জন্য আমি হয়তো একটা পর্যায়ে পৌঁছেছি। আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন। আমি যত দিন থাকি, যেন সুস্থ থাকতে পারি, ভালো থাকতে পারি। আর আগে যেটা পেয়েছি, সেটাই যেন ধরে রাখতে পারি। আপনারা দোয়া করবেন আর ভালোবেসে যাবেন। এখন ভালো ছবি হচ্ছে। ছবি আপনারা দেখবেন। সিনেমা হলে গিয়ে দেখবেন। ওই যে বসে বসে, বাড়িতে বসে, সেটা হবে না। যদি আমি কোনো সময় ভালো গল্প পাই, ভালো চরিত্র পাই, অবশ্যই করব। কারণ, আমি মনে করি, একজন শিল্পীর শেষ বলে কোনো কথা নেই। নিশ্চয়ই আমি কাজ করব। ভালো থাকবেন।

আনিসুল হক:

 অনেক ধন্যবাদ, ববিতা আপা। অনেক সময় দিলেন। আমরা অনেক উপকৃত হলাম।

ববিতা: আমারও ভালো লেগেছে। খুব ভালো।

আনিসুল হক:

দর্শকমণ্ডলী আপনাদের সবাইকে প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানিয়ে ববিতা আপার, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রজগতের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র ববিতার অভিজ্ঞতার গল্প শুনলাম। এ পথচলা আমাদের ঋদ্ধ করবে। তিনি শুরুতেই বলেছিলেন তাঁর মায়ের কথা। তিনি বলতেন যে পড়াশোনা তো করতেই হবে, পড়াশোনার পাশাপাশি কবিতা আবৃত্তি, গান, নাটক, শিল্প, সংস্কৃতি—এগুলোর চর্চাও করতে হবে। আমরাও সব সময়ই সবাইকে বলি। আমরা নতুন প্রজন্মকে বলি, পড়াশোনা করতে হবে, সাথে অনেক কালচারের অ্যাক্টিভিটিস করতে হবে, কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিস করতে হবে। আপনারা যে যেখানে থাকেন, ভালো থাকবেন।