ডাকসুর সংগ্রহশালায় আব্দুল মালেকের ছবি, কে ছিলেন তিনি, কীভাবে নিহত হন

আব্দুল মালেকছবি: ছাত্রশিবিরের ওয়েবসাইট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালা সংস্কার শেষে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি যুক্ত করা হয়েছে। বাদ দেওয়া হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একক ছবি।

আরও যোগ করা হয়েছে আব্দুল মালেকের ছবি, যিনি ছিলেন ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা। সংগ্রহশালায় তাঁর একটি ছবি এবং মৃত্যুর পরের একটি ছবি রাখা হয়েছে।

আব্দুল মালেকের ছবির নিচে ডাকসুর দেওয়া ক্যাপশনে বলা হয়েছে, ‘শিক্ষা সেমিনারে বক্তব্য দেওয়া শেষে ফেরার পথে বিরোধীদের হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন এবং পরবর্তীতে মৃত্যুবরণ করেন।’

১৪ সেপ্টেম্বর ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে যেসব ব্যক্তি ও শিক্ষার্থী সামষ্টিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন, তাঁদের ইতিহাস সংগ্রহশালায় তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘এটা ইতিহাসের প্রতি দায়।’

সমসাময়িক সংবাদপত্রে সংঘর্ষ, আহত হওয়া এবং আব্দুল মালেকের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। তবে তাঁকে কে বা কারা প্রাণঘাতী আঘাত করেছিল, তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার মতো তথ্য পাওয়া যায় না।

আরও পড়ুন
ছাত্রশিবিরের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, আব্দুল মালেকের বাড়ি বগুড়ায়। তিনি মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ১৯৬৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগে ভর্তি হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তিনি ইসলামী ছাত্রসংঘে যোগ দেন। তিনি থাকতেন ফজলুল হক মুসলিম হলে।

কে ছিলেন আব্দুল মালেক

ছাত্রশিবিরের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, আব্দুল মালেকের বাড়ি বগুড়ায়। তিনি মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ১৯৬৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগে ভর্তি হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তিনি ইসলামী ছাত্রসংঘে যোগ দেন। তিনি থাকতেন ফজলুল হক মুসলিম হলে।

ছাত্রসংঘ ছিল জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের অনুগত একটি ছাত্রসংগঠন। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে। আলবদর গঠিত হয়েছিল ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা-কর্মীদের দিয়ে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলে ছাত্রসংঘ কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ হারায়।

জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। তখন জামায়াতে ইসলামী পুনর্গঠিত হয় এবং ছাত্রশিবির আত্মপ্রকাশ করে। অনেকেই বলেন, শিবির হলো ছাত্রসংঘের উত্তরসূরি। অবশ্য শিবির কখনোই তা স্বীকার করে না।

১৯৬৯ সালে পাকিস্তান সরকারের প্রস্তাবিত নতুন শিক্ষানীতি নিয়ে ছাত্ররাজনীতিতে তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়। এয়ার মার্শাল এম নূর খানের কমিশন এই শিক্ষানীতির সুপারিশ করেছিল।

ড. মোহাম্মদ হাননানের লেখা ‘বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস (১৮৩০-১৯৭১)’। এই বইয়ে ঘটনার বর্ণনা রয়েছে।

১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে (টিএসসি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) একটি মুক্ত আলোচনার আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) তোফায়েল আহমেদ।

ড. মোহাম্মদ হাননানের ‘লেখা বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস (১৮৩০-১৯৭১)’ বইয়ে সেদিনের ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। বইয়ে লেখা হয়েছে, মুক্ত আলোচনায় প্রথমে বক্তব্য দেন ছাত্র ইউনিয়নের (মতিয়া) সভাপতি সামসুদ্দোহা। তিনি ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থার ওপর অভিমত রাখছিলেন। তাঁর বক্তৃতার এক পর্যায়ে পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের একদল কর্মী সভাকক্ষে ঢুকে হট্টগোল শুরু করে দেন এবং ‘ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা কায়েম করো’, ‘ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা চাই না’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকেন।

মোহাম্মদ হাননান লিখেছেন, একপর্যায়ে ইসলামী ছাত্রসংঘের কর্মীরা মঞ্চে পর্যন্ত উঠে পড়েন এবং এ অবস্থায় দুই দল পরস্পর চেয়ার ছুড়তে থাকে। ডাকসু নেতা তোফায়েল আহমেদ দাঁড়িয়ে মাইকে বারবার বিক্ষোভকারীদের শান্ত হওয়ার আবেদন জানাতে থাকেন। কিন্তু এতে কোনো শুভ ফল হয়নি। এ সময় একদল ছাত্রসংঘ কর্মী লাঠিসোঁটা নিয়ে সভাকক্ষে ঢুকে পড়েন এবং এক অনাহূত সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়।

দৈনিক আজাদের ১৩ আগস্টের (১৯৬৯) প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংঘর্ষের পর কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে মালেকের অবস্থা ছিল সবচেয়ে গুরুতর। তিন দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৫ আগস্ট মারা যান আব্দুল মালেক। তাঁর বয়স হয়েছিল ২২ বছর।

তৎকালীন ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন—উভয় দলের কর্মীরা এ সময় সংঘবদ্ধ হয়ে বাধা দিতে আসেন এবং প্রচণ্ড সংঘর্ষের পর ছাত্রসংঘের কর্মীরা রেসকোর্সের (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) দিকে পালাতে থাকেন বলে উল্লেখ করে মোহাম্মদ হাননান লিখেছেন, সংঘর্ষে ঢাকা শহর ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি আব্দুল মালেক, আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্র ইদরিস আলী, ছাত্রলীগ নেতা নাসিরুল ইসলাম বাচ্চু প্রমুখ গুরুতরভাবে আহত হন।

এ সময় কলাভবনের ডিনের নেতৃত্বে একদল শিক্ষক সংঘর্ষস্থলে পৌঁছালে পরিস্থিতি শান্ত হয়ে ওঠে এবং আবারও আলোচনা সভা শুরু হয়। এতে ছাত্রনেতারা ‘গুন্ডা’দের সভা পণ্ড করার চক্রান্তের তীব্র নিন্দা করেন এবং গণতন্ত্রের দুশমন এসব ব্যক্তিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পবিত্র আসন থেকে উচ্ছেদ করার শপথ নেওয়ার আহ্বান জানান।

দৈনিক আজাদের ১৩ আগস্টের (১৯৬৯) প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংঘর্ষের পর কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে মালেকের অবস্থা ছিল সবচেয়ে গুরুতর। তিন দিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৫ আগস্ট মারা যান আব্দুল মালেক। তাঁর বয়স হয়েছিল ২২ বছর।

দৈনিক আজাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, ডাকসুর সভায় বিপুলসংখ্যক ছাত্রছাত্রী উপস্থিত ছিলেন। শুরুতে পরিবেশ শান্ত ছিল। প্রথম বক্তা ছিলেন সামসুদ্দোহা। তিনি খসড়া শিক্ষানীতি ব্যাখ্যা করছিলেন। একপর্যায়ে কয়েকজন ছাত্র দাঁড়িয়ে তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন। সভাপতি সবাইকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানান এবং প্রতিবাদকারী ছাত্রদের বক্তব্যের সুযোগ দেওয়া হবে বলে জানান। এরপর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

ছাত্রসংঘ ছিল জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের অনুগত একটি ছাত্রসংগঠন। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে। আলবদর গঠিত হয়েছিল ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা-কর্মীদের দিয়ে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হলে ছাত্রসংঘ কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ হারায়।

আজাদের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কয়েকজন ছাত্র মঞ্চে উঠে চেয়ার-টেবিল ভাঙচুর করেন। শুরু হয় চেয়ার ছোড়াছুড়ি ও ছোটাছুটি। প্রায় আধা ঘণ্টা পর দুই পক্ষ হলের বাইরে চলে আসে। সেখানে সংঘর্ষ আরও বেড়ে যায়। চেয়ার ও ভাঙা কাঠ দিয়ে আঘাতের ঘটনা ঘটে। কয়েকজন আহত হন। পরে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া রেসকোর্স ময়দান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।

দৈনিক আজাদের প্রতিবেদনে আব্দুল মালেককে কে বা কারা আঘাত করেছিলেন, তাঁদের নাম উল্লেখ করা হয়নি।

এদিকে ছাত্রশিবিরের ওয়েবসাইটে বলা আছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে বক্তব্য দেওয়ার পর বামপন্থী ছাত্রসংগঠনের নেতা–কর্মীদের হামলায় আব্দুল মালেক গুরুতর আহত হন। পরে ১৫ আগস্ট ঢাকা মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তাঁর।

মোহাম্মদ হাননান বাংলাদেশের ‘ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস (১৮৩০-১৯৭১)’ বইয়ে লিখেছেন, ডাকসু আয়োজিত মুক্ত আলোচনায় ইসলামী ছাত্রসংঘ যে হট্টগোলের সৃষ্টি করে, তা তারা তাদের দেওয়া বিবৃতিতে প্রকারান্তরে স্বীকার করে নেয়। ইসলামী ছাত্রসংঘের প্রাদেশিক শাখার সভাপতি মতিউর রহমান নিজামী এক বিবৃতিতে বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খসড়া শিক্ষানীতি–সম্পর্কিত আলোচনা সভায় অংশগ্রহণের দাবি জানানোর ফলে ছাত্র ইউনিয়ন ও সমাজতন্ত্রী গুন্ডাদের আক্রমণে ইসলামী ছাত্রসংঘের ১০ জন কর্মী আহত হয়েছেন। বিবৃতিতে তিনি আরও বলেন, একজন বক্তার ইসলামের প্রতি আপত্তিকর মন্তব্যের বিরুদ্ধে ইসলামী ছাত্রসংঘের কর্মীরা প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন।

তোফায়েল আহমেদ ১৯৬৭ থেকে ৬৯ সাল পর্যন্ত ডাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) ছিলেন
ছবি: সংগৃহীত

১৭ আগস্ট (১৯৬৯) পূর্ব পাকিস্তানের ছয় ছাত্রনেতা মোস্তফা জামাল হায়দার ও মাহবুবউল্লাহ (ছাত্র ইউনিয়ন-মেনন), সামসুদ্দোহা ও নুরুল ইসলাম (ছাত্র ইউনিয়ন-মতিয়া), তোফায়েল আহমেদ ও আ স ম আবদুর রব (ছাত্রলীগ-তোফায়েল) এক বিবৃতিতে আব্দুল মালেকের মৃত্যুতে শোক জানান। তাঁরা বলেন, একটি বিশেষ মহলের ইঙ্গিতে কিছুসংখ্যক ছাত্র গোলযোগ সৃষ্টি করলে তাঁর দুঃখজনক পরিণতি হিসেবে আব্দুল মালেকের মৃত্যু ঘটেছে।

ডাকসুর পক্ষ থেকেও এক বিবৃতিতে শোক জানানো হয়।

তৎকালীন আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান আব্দুল মালেকের মৃত্যুতে একটি শোকবাণী দিয়েছিলেন এবং আওয়ামী লীগ দলীয় কার্যালয়ে একটি শোকসভার আয়োজন করেছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে ‘বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস (১৮৩০-১৯৭১)’ বইয়ে।

ড. মোহাম্মদ হাননানের ‘লেখা বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস (১৮৩০-১৯৭১)’ বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, একপর্যায়ে ইসলামী ছাত্রসংঘের কর্মীরা মঞ্চে পর্যন্ত উঠে পড়েন এবং এ অবস্থায় দুই দল পরস্পর চেয়ার ছুড়তে থাকে। ডাকসু নেতা তোফায়েল আহমেদ দাঁড়িয়ে মাইকে বারবার বিক্ষোভকারীদের শান্ত হওয়ার আবেদন জানাতে থাকেন। কিন্তু এতে কোনো শুভ ফল হয়নি। এ সময়ে একদল ছাত্রসংঘ কর্মী লাঠিসোঁটা নিয়ে সভাকক্ষে ঢুকে পড়েন এবং এক অনাহূত সংঘর্ষ শুরু হয়ে যায়।

যে শিক্ষানীতি ঘিরে সংঘর্ষ

আব্দুল মালেকের মৃত্যুর ঘটনা বুঝতে হলে ফিরে যেতে হয় ১৯৬৯ সালের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে।

তখন পাকিস্তানে আইয়ুব খানের শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন তীব্র। পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলন ও রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন একপর্যায়ে গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ২৫ মার্চ আইয়ুব খান ক্ষমতা ছাড়লে সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। দেশে আবার সামরিক শাসন জারি হয়।

একই সময়ে শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগ নেয় পাকিস্তান সরকার। এয়ার মার্শাল নূর খানকে নতুন শিক্ষানীতি তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১৯৬৯ সালের জুলাইয়ে ‘প্রপোজালস ফর আ নিউ এডুকেশনাল পলিসি’ নামে একটি প্রস্তাব প্রকাশ করা হয়।

প্রস্তাবটি তখনো চূড়ান্ত শিক্ষানীতি ছিল না। জনমত নেওয়ার জন্য এটি প্রকাশ করা হয়েছিল। পরে সংশোধিত নীতি ১৯৭০ সালের মার্চে পাকিস্তানের মন্ত্রিসভায় গৃহীত হয়। তবে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ায় পূর্ব পাকিস্তানে তা কার্যকর করার সুযোগ হয়নি।

ডাকসু সংগ্রহশালায় টাঙানো পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি। ১৪ সেপ্টেম্বর সকালে
ছবি: প্রথম আলো

নূর খান প্রস্তাবে যা ছিল

নূর খান প্রস্তাবে শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো, ঝরে পড়া কমানো, বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, উচ্চশিক্ষায় গবেষণা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের মতো বিষয় ছিল।

তবে সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে শিক্ষার আদর্শিক ভিত্তি নিয়ে প্রস্তাবের অংশটি।

প্রস্তাবে পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থাকে ইসলামের ধারণা ও নীতির ভিত্তিতে পরিচালনার কথা বলা হয়। অভিন্ন সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ এবং পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য দশম শ্রেণি পর্যন্ত ইসলামিয়াত বা দ্বীনিয়াত বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব ছিল। অমুসলিম শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ ধর্ম সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল।

এ বিষয়গুলো নিয়েই পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্ররাজনীতিতে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়।

আরও পড়ুন

ছাত্রসংগঠনগুলোর অবস্থান

নূর খান প্রস্তাবের প্রতিটি বিষয়ে ছাত্রসংগঠনগুলোর অবস্থান এক ছিল না। শিক্ষার আদর্শিক ভিত্তি নিয়ে বিভাজন ছিল স্পষ্ট। ইসলামী ছাত্রসংঘ এবং ইসলামপন্থী ছাত্র ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো শিক্ষায় ইসলামি মূল্যবোধের গুরুত্বকে সমর্থন করে।

তাদের যুক্তি ছিল, পাকিস্তান একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র এবং শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলামি আদর্শের প্রতিফলন থাকা উচিত। শিক্ষা শুধু চাকরি বা পেশাগত দক্ষতা তৈরির বিষয় নয়; নৈতিক চরিত্র ও ধর্মীয় মূল্যবোধ তৈরিও শিক্ষার দায়িত্ব—এমন অবস্থান ছিল তাদের।

অন্যদিকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন অংশ এবং বাম ও প্রগতিশীল ছাত্রগোষ্ঠী এ অবস্থানের বিরোধিতা করে। তারা গণমুখী ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা, মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসনের ওপর জোর দেয়।

তাদের আশঙ্কা ছিল, পাকিস্তানি রাষ্ট্রীয় আদর্শ ও ধর্মীয় পরিচয়কে শিক্ষার প্রধান ভিত্তি করা হলে বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয় আরও পিছিয়ে পড়বে।

ফলে নূর খান প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক শুধু শিক্ষার বিষয় হয়ে থাকেনি; এর সঙ্গে যুক্ত হয় ধর্ম, ভাষা, জাতীয় পরিচয়, পাকিস্তানি রাষ্ট্রচিন্তা ও বাঙালির রাজনৈতিক অধিকারের প্রশ্ন।

এই বিতর্কের মধ্যেই ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট ডাকসুর উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষানীতি নিয়ে আলোচনা সভা হয়।

আরও পড়ুন

১৯৭১-এর পরের ইতিহাস

আব্দুল মালেকের মৃত্যুর পর ইসলামী ছাত্রসংঘ তাঁকে ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে আন্দোলনের শহীদ হিসেবে স্মরণ করতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরও তাঁর স্মৃতিকে সংগঠনের রাজনৈতিক ও আদর্শিক ইতিহাসের অংশ করে নেয়। ১৫ আগস্টকে তারা ‘ইসলামী শিক্ষা দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে।

ডাকসুর সংগ্রহশালায় আব্দুল মালেকের ছবি যুক্ত হওয়ায় এখন সেই পুরোনো ইতিহাসই নতুন করে সামনে এসেছে।

ডাকসু সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি লাগানোর পর তা ছিঁড়ে ফেলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী
ছবি: প্রথম আলো

যে ছবি ঘিরে বিতর্ক

ডাকসুর সংগ্রহশালা সংস্কারের পর সেখানে বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের ছবি ও নিদর্শনের বিন্যাসে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আগের কয়েকটি ছবি বাদ পড়েছে। যুক্ত হয়েছে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি। একটি ছবির সঙ্গে ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে তাঁর দেওয়া বক্তব্যের তথ্যও রাখা হয়েছে।

সংগ্রহশালা সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত ডাকসুর নেতাদের বক্তব্য, জিন্নাহকে গৌরবান্বিত করার জন্য তাঁর ছবি রাখা হয়নি; বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত ঘটনাগুলো তুলে ধরতেই ছবিগুলো রাখা হয়েছে।

আরও পড়ুন

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিষয়টি গ্রহণ করেনি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংগ্রহশালায় জিন্নাহ এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়।

এর মধ্যেই ১৪ সেপ্টেম্বর এক শিক্ষার্থী সংগ্রহশালায় থাকা জিন্নাহর তিনটি ছবি ছিঁড়ে প্রতিবাদ জানান। পরে বিষয়টি তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

আরও পড়ুন