সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীদের হামলা ও অগ্নিসংযোগে দগ্ধ প্রথম আলো ভবনে চলছে ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘আলো’। গতকাল বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দিনে সকাল ও বিকেলে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা, বয়সের প্রচুর দর্শক আসেন প্রদর্শনী দেখতে।
দর্শকেরা এই শিল্প-আয়োজনে দেখছেন পুড়ে যাওয়া কম্পিউটার, যন্ত্রাংশ, টেবিল, চেয়ার, বই, নথিপত্র ও সেখান থেকে জেগে ওঠার প্রাণশক্তি। ধ্বংসের ভয়াবহতা দেখে তাঁরা একই সঙ্গে বিস্ময় ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি এমন উগ্রবাদী হামলা যেন আর না হয়, দোষীদের বিচার এবং সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তাঁরা।
বিকেলে প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, প্রথম আলোতে হামলার এ ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ঘটনা একটি গহিন ক্ষত সৃষ্টি করেছে। এ রকম ঘটনা নিয়ে এমন একটি প্রদর্শনী খুবই গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে স্মৃতিগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জানা জরুরি। দেশ ও জাতির জন্য এ ধরনের ঘটনার স্মৃতিকে ইতিহাসের উপকরণ হিসেবে ধরে রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন। সেই প্রয়োজন পূরণের কারণেও প্রদর্শনীটি তাৎপর্যপূর্ণ।
হোসেন জিল্লুর বলেন, প্রথম আলোর ওপর হামলার ক্ষেত্রে দুটো ঘটনা রয়েছে। প্রথমত, প্রতিষ্ঠানটি মব সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় বিস্ময়করভাবে রাষ্ট্রীয় নিস্পৃহতা দেখা গেছে। তিনি বলেন, ‘এই দুই ঘটনার ওপর ভিত্তি করে এখন আমরা এর ব্যাখ্যা পেতে চাই। কারণ, ওই ঘটনা কোনো সুস্থতার ইঙ্গিতবাহী ছিল না। এর পুনরাবৃত্তি যেন আর কখনোই না ঘটে, তার জন্যই প্রশ্নগুলোর সমাধান দরকার। আশা করি, এখন যে অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে, সেই সময়ে প্রথম আলোর ওপর আসা সীমাহীন নির্মমতার কারণ অনুসন্ধান হবে।’
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে প্রতিহিংসায় উন্মত্ত একদল উগ্রবাদী প্রথম আলো কার্যালয়ে হামলা চালায়। তারা ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাটের পর প্রথম আলো ভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। হামলার শিকার ভবনটিতে শিল্পকর্ম করেছেন বিশিষ্ট শিল্পী মাহ্বুবুর রহমান। ‘আলো’ নামের এই শিল্পকর্ম প্রদর্শনী শুরু হয়েছে ১৮ ফেব্রুয়ারি। ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা ও বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য প্রদর্শনী খোলা থাকবে।
বিকেলে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার প্রদর্শনী দেখে বললেন, এটি শুধুই প্রদর্শনী নয়। উগ্রবাদী তাণ্ডব, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হামলা, পরিবেশ ধ্বংস করা—এমন সবকিছুর বিরুদ্ধেই এটি একটি দারুণ শৈল্পিক প্রতিবাদ। এই প্রদর্শনীর বিষয়বস্তু সম্পর্কে দর্শকদের কিছু বলে দিতে হবে না। তাঁরা নিজেরাই বুঝতে পারবেন কী হয়েছে আর এখন কী করণীয়। শিল্পীর ভাষা অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে এই প্রদর্শনীতে প্রকাশিত হয়েছে।
প্রদর্শনী দেখে বিস্ময় প্রকাশ করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের কারুশিল্প বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শিল্পী ফারহানা ফেরদৌসী। বললেন, ‘এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। শিল্পী মাহ্বুবুর রহমানের কাজ সম্পর্কে আমরা অনেক দিন থেকেই জানি। এমন একটি পরিবেশে এত বিশাল কাজ তাঁর পক্ষেই করা সম্ভব।’ তিনি বলেন, ভিন্নমত থাকতে পারে, কিন্তু প্রত্যেকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে। এর জন্যই তো এত আন্দোলন-সংগ্রাম, এত আত্মদান। প্রত্যাশা থাকবে নতুন সরকার গণতন্ত্রকে প্রকৃতপক্ষেই অর্থবহ করতে সংবাদপত্র ও মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
ডয়চে ভেলের বাংলাদেশ প্রতিনিধি হারুন-উর রশিদ এসেছিলেন প্রদর্শনীর ওপর রিপোর্ট তৈরি করতে। তিনি বললেন, এই প্রদর্শনী একদিকে যেমন যন্ত্রণাময়, তেমনি অন্যদিকে অনুপ্রেরণাদায়ক।
অনেক তরুণ শিক্ষার্থী এসেছিলেন প্রদর্শনী দেখতে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির স্থাপত্য বিভাগের ছাত্র শুআইব ত্বাসীন, বিইউপির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের হুমায়রা তাবাসসুম, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির পরিবেশবিজ্ঞানের রাহাত এহসান। তাঁরা প্রদর্শনী নিয়ে তাঁদের মুগ্ধতার কথা বলেন। পাশাপাশি দেশে একটি মুক্ত স্বাধীন পরিবেশ সৃষ্টির জন্য উগ্রপন্থা, মব সন্ত্রাস এবং উসকানিমূলক বিদ্বেষ ছড়ানো বন্ধ করতে সরকারের দৃঢ় অবস্থানের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।
মিঠুন কাজী চাকরি করেন বনানীতে আকিজ বশির গ্রুপে। বিকেলে বাসায় ফেরার পথে এসেছিলে প্রদর্শনীতে। ভবনের ভেতরে এসে এর ভয়াবহতা দেখে বিস্মিত হয়ে তিনি বললেন, হামলার ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু লোক তাদের হীনস্বার্থে সাধারণ মানুষকে উসকানি দিয়ে অনেক নাশকতামূলক কাজ করিয়েছে। তারই নগ্ন প্রকাশ ঘটেছে সংবাদপত্র অফিসের ওপর এমন হামলায়।
প্রদর্শনী দেখতে আরও এসেছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) গোলাম কাদের, নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আসা ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধি আগনেস দোকা প্রমুখ।
বেলা ১১টায় প্রদর্শনী খোলার পর থেকেই দর্শক সমাগম হতে থাকে। সকালে প্রদর্শনী দেখতে আসেন ঢাকায় নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রোর স্ত্রী পাওলা বেলফিউরে। পাওলা আড়াই বছর ধরে বাংলাদেশে আছেন। তিনি ব্যতিক্রমী প্রদর্শনীর স্থাপত্য ও পুড়ে অঙ্গার বিভিন্ন জিনিসের ছবি তোলেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, গত বছরের ডিসেম্বরে যা ঘটেছিল, তা স্মরণে রাখা, স্মৃতিকে ধরে রাখার খুব সুন্দর উপায় এই প্রদর্শনী।
ছেলেকে নিয়ে এই শিল্প-আয়োজন দেখতে আসেন ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এর সাংবাদিক এনামুল হক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এটি একটি বীভৎস ও ধ্বংসাত্মক ঘটনা। দেশের ইতিহাসে সংবাদপত্রের ওপর এ ধরনের ঘটনা আগে ঘটেনি। এটি প্রতিরোধে সে সময়ের সরকার যথাযথ পদক্ষেপ নেয়নি।