সাক্ষাৎকার

অব্যবস্থাপনা রেখে পয়সা কামানো সমর্থন করি না

ঢাকার পরিবহন খাতের মালিকদের বড় সংগঠন ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। এ সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম। তিনি সারা দেশের পরিবহন খাতের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিবও। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাইফুল আলম এই খাতের গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে উঠেছেন। ঢাকার পরিবহন খাতের বিশৃঙ্খলা নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আনোয়ার হোসেন

প্রথম আলো:

পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রণ পুনরায় আপনাদের, অর্থাৎ বিএনপিপন্থীদের হাতে এসেছে। এতে এই খাতে কোনো বদল এসেছে, নাকি শুধু রাজনৈতিক পক্ষ বদলেছে?

সাইফুল আলম: তেমন পরিবর্তন আমরা এখনো দৃশ্যমান করতে পারিনি। তবে আমরা গবেষণা করেছি, সেই অনুযায়ী উদ্যোগ নিয়েছি, চেষ্টা করছি এবং তা করে যাব। পরিবহন খাতের সঙ্গে ব্যবস্থাপনা, রাস্তাঘাট ও সরকার জড়িত। সরকারের মধ্যে প্রশাসন ও পুলিশ রয়েছে। এর বাইরে পরিবহন মালিক-শ্রমিকের আছেন। সবার মধ্যে একটা শৃঙ্খলা ও নিয়ম থাকা দরকার। গত ১৫ বছরে সেটা ভেঙে দেওয়া হয়েছিল।
একটা উদাহরণ দিই। নিয়ম হলো বাসের মালিক লাভ–লোকসানের ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসাটা করবেন। চালকেরা নিয়মিত বেতন পাবেন। দৈনিক, মাসিক হোক কিংবা সাপ্তাহিকভাবে। এখান বাস্তবতা এমন হয়েছে যে চালকের কাছে গাড়িটা কন্ট্রাক্ট (চুক্তি) দিয়ে দিয়েছেন মালিক। অর্থাৎ চালক দিন শেষে এসে মালিককে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেন। তাঁর লক্ষ্য থাকে জমার টাকা ওঠানোর পর আয় করা। এর ফলে চালক এবং হেলপার-কন্ডাক্টর মিলে কোনো আইন মানছেন না। এটা হওয়া উচিত ছিল না। চালকদের নিয়মিত বেতনের আওতায় আনতে হবে। তারা সুশৃঙ্খলভাবে বাস চালাবেন, এটা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রথম আলো:

এই ব্যবস্থা পরিবর্তনে আপনাদের কোনো চেষ্টা আছে, নাকি বক্তব্য দিয়েই দায়িত্ব সারছেন?

সাইফুল আলম: আমরা সড়ক মন্ত্রণালয়কে করণীয় সম্পর্কে অবহিত করেছি। ঢাকা মহানগর পুলিশ ও মালিক-শ্রমিক নেতাদের নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। একটা সমাধান হচ্ছে বাসরুট ফ্র্যাঞ্চাইজির ব্যবস্থা। ঢাকার প্রতিটি রুটে তিন থেকে পাঁচটি কোম্পানির বাস চলে। এতে পাঁচটি কোম্পানির বাস একই সময়ে রাস্তায় নেমে পাল্লাপাল্লি করছে। যদি একটি কোম্পানির অধীনে আনা যায়, তাহলে একটার পর একটা সিরিয়াল করে চলতে পারবে। গাড়িতে অটো ডোর (স্বয়ংক্রিয় দরজা) হতে হবে এবং সব কটির রং এক হবে। ফিটনেস হালনাগাদ কি না, কিংবা যাত্রীদের আসন সঠিকভাবে আছে কি না, সব দেখা যাবে।

আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

ঢাকায় এখনো মেয়াদোত্তীর্ণ ও ফিটনেসবিহীন বাস চলাচল করছে। দায় কার? লক্কড়ঝক্কড় বাস কি সড়কে চলাচল করতেই থাকবে?

সাইফুল আলম: সরকার ২০ বছরের বেশি বয়সী বাস এবং ২৫ বছরের বেশি বয়সী ট্রাক চলাচল নিষিদ্ধ করেছে। আমাদের গরিব দেশ। বয়সের চেয়ে সেটি ফিট কি না, তা যেন দেখা হয়। অনেক সময় পাঁচ বছরের পুরোনো বাসও দেখলে মনে হবে মেয়াদোত্তীর্ণ। শৃঙ্খলা না থাকার কারণে পাল্লাপাল্লি করতে গিয়ে বাসগুলোর বাহ্যিক অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। গাড়ির বয়স থাকলেও অব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মনে হয় সেটি মেয়াদোত্তীর্ণ।

আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

বাসে নির্ধারিত আসনের চেয়ে অতিরিক্ত আসন বসিয়ে যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য নষ্ট। যখন-তখন সিটিং সার্ভিসের নাম দিয়ে বাড়তি ভাড়া আদায়। এটা কি মালিকদের ইচ্ছাকৃত অনিয়ম?

সাইফুল আলম: এগুলো অব্যবস্থাপনা। ওই যে বললাম মালিক তাঁর বাসটি চুক্তিতে চালকের কাছে দিয়ে দেন। অথচ মালিকের নিজের সঠিকভাবে দেখাশোনা করার কথা। শুধু এই অব্যবস্থাপনা রেখে তিনি শুধু দুই পয়সা কামাইতে চান, এটা আমি সমর্থন করি না। সঠিক সংখ্যার আসন থাকতে হবে। আইনে বলা আছে, নগরে প্রয়োজনে ১০ থেকে ১৫ জন দাঁড় করিয়ে নেওয়া যেতে পারে। আমরা আরটিসির (আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি) মাধ্যমে নতুন করে যেসব রুট পারমিট দিচ্ছি, সেখানে বাসগুলো প্রদর্শন করতে হয়। পারমিট অনুযায়ী আসনসংখ্যা সঠিক কি না, আমরা দেখছি। গাড়ির আসনের রেক্সিন ঠিক আছে কি না, সেটাও দেখা হচ্ছে। এটা করা হচ্ছে এ জন্য যে কদিন পরে পুলিশ অভিযানে যাবে।

প্রথম আলো:

ঢাকার ৮৪ শতাংশ বাস কালো ধোঁয়া ছাড়ে—এমনটাই গবেষণায় এসেছে। পরিবেশদূষণের দায় আপনারা কীভাবে নেবেন?

সাইফুল আলম: কালো ধোঁয়া নিয়ে কিছু বিষয় আছে। সরকার একটা অভিযানে গিয়ে পেয়েছে যে পরিত্যক্ত মবিল কেমিক্যাল দিয়ে, কোটাতে ভরে বাজারজাত করা হয়েছে। এগুলো নতুন মনে করে কিনছেন বাসমালিকেরা। এটা একদিকে কালো ধোঁয়া ছড়াচ্ছে। অন্যদিকে বাসের ইঞ্জিন নষ্ট করে দিচ্ছে। এ ব্যাপারে সরকারকে আরও তৎপর হতে হবে। অনেক সময় জ্বালানির কারণেও কালো ধোয়া হয়। কারণ, আমাদের জ্বালানির মান নিয়েও প্রশ্ন আছে। অনেক সময় পরিবহনমালিকের গাফিলতিতে সময়মতো বাসের রক্ষণাবেক্ষণ হয় না। নিম্নমানের খুচরা যন্ত্রাংশ ব্যবহার করেন। এগুলোও কালো ধোঁয়ার কারণ হয়। এর বাইরে পুরোনো যানবাহন তো আছে।

প্রথম আলো:

বাস থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ আছে। এই টাকা কারা নেয়? বন্ধের উপায় কী?

সাইফুল আলম: সংকট কিংবা কোম্পানি চালাতে হলে কিছু ন্যায্য খরচ আছে। সেগুলো পরিবহনমালিকদেরই বহন করতে হয়। যেমন, অফিস পরিচালনা, কর্মচারীর বেতন, টিকিট ছাপানোসহ আরও অনেক কিছু রয়েছে। দেশে বড় বড় অনেক কোম্পানি আছে, যার মালিক একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। তাদের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই। তারা খরচ বাদ দিয়ে আয় ঘরে নিয়ে যায়।

অন্যদিকে একাধিক ব্যক্তির বাস কোনো একটা কোম্পানির নামে চলাচল করে। এ ক্ষেত্রে কোম্পানির উদ্যোক্তাদের সঙ্গে চুক্তি করে মালিক বাস সরবরাহ করে। দিন শেষে চুক্তি অনুযায়ী আয় নিয়ে যান মালিক। কিন্তু কোম্পানির খরচ যেমন, অফিস, কর্মচারী খরচ, ঘরভাড়া, আপ্যায়ন, দুর্ঘটনা হলে খরচ করতে হয়। এ ছাড়া গ্যারেজ ভাড়া থাকে। এ জন্য বাসের মালিকের দৈনিক আয় থেকে একটা অংশ জিপি বা গেটপাস হিসেবে কেটে নেন কোম্পানির উদ্যোক্তারা। তবে এই খরচের একটা সীমা থাকা উচিত। মানে কত খরচ আর নিচ্ছে কত—এর কোনো বালাই ছিল না। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলেছি তোমরা ইচ্ছেমতো জিপি নিতে পারো না। কোম্পানির সঙ্গে বাসের মালিকের লিখিত চুক্তি থাকতে হবে। কত টাকা উঠল আর কত খরচ হলো এর নিরীক্ষা থাকতে হবে।

আরেকটা চাঁদাবাজি হলো সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা পর্যায়ে। টার্মিনালের টোলের নামে তারা পরিবহনমালিকদের কাছ থেকে চাঁদা নেয়। স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনীতিকেরা টার্মিনাল ইজারা নেয়। চাঁদা নির্ধারণ করে একটা। নেয় এর দ্বিগুণ বা তারও বেশি। অথচ টার্মিনালে বাস রাখার জায়গা থাকে না। দোকানপাটে ভরে যায়। টয়লেট বা অন্য কোনো সুবিধা পাওয়া যায় না।

এর বাইরে সারা দেশেই বিভিন্ন নামে কোথাও কোথাও ব্যক্তির নাম কোথাও কোথাও এলাকায় প্রভাবশালী লোকের নামে, কোথাও কোথাও অবৈধ শ্রমিক কমিটির নামে চাঁদা তোলা হয়। এগুলোর ব্যাপারে চিঠি দিয়েছি। যেখান থেকে বাস ছাড়বে, সেখান থেকেই সমিতির পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা নিতে পারবে। মাঝপথে কেউ টাকা তুলতে পারবে না।

প্রথম আলো:

নতুন সরকারের কাছে পরিবহন খাতের শৃঙ্খলা ফেরাতে আপনারা নির্দিষ্টভাবে কী পদক্ষেপ দেখতে চান?

সাইফুল আলম: বাসরুট ফ্র্যাঞ্চাইজি আমাদের মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে অনুরোধ জানাব। সরকার মেট্রোরেলে ভর্তুকি দিচ্ছে। এ জন্য মেট্রোরেলের যাতায়াত আরামদায়ক ও সুশৃঙ্খল। বাস খাতে ভর্তুকি না দিক নীতিসহায়তা দিতে পারে। নতুন নতুন বাস আমদানির শুল্ক কমাতে পারে সরকার। এখন ইলেকট্রিক গাড়ি আমরা আনতে পারি।

প্রথম আলো:

আপনারা কখনোই সেবা দিতে পারেননি। সরকার কেন নীতিসহায়তা দেবে?\B\B

সাইফুল আলম: সরকারি পরিবহন সংস্থা বিআরটিসিকে শত শত কোটি টাকার বাস কিনে দিয়েছে সরকার। এখন পর্যন্ত তারা না সেবা দিতে পেরেছে, না লাভজনক হয়েছে। বেসরকারি খাতের মালিকেরা সরকারি সহায়তা ছাড়া যতটুকু সম্ভব সেবা দিচ্ছেন। সরকারি সহায়তা পেলে এই খাতের চেহারা পাল্টে যাবে।