তখন, ‘২০টা টাকা বেশি দিয়েন’, এখন, ‘৫০০ টাকার কম হবে না’

রাজধানীর পান্থপথের বিপণিবিতান বসুন্ধরা সিটি থেকে বেরিয়ে অটোরিকশার অপেক্ষা করছিলেন সাইদুর রহমান। তখন পবিত্র রমজান মাস। ইফতারের সময় হওয়ার আগে।

সাইদুরের সঙ্গে স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তান। যাবেন বনানী ১১ নম্বর সড়কে। ঢাকায় এই পথে সরাসরি কোনো বাস চলাচল করে না। ভরসা শরিকি যাত্রা বা রাইড শেয়ারিংয়ের গাড়ি অথবা অটোরিকশা।

মুঠোফোনে সাইদুর দেখলেন, রাইড শেয়ারিংয়ের গাড়ি আসতে অনেক দেরি। তবে রাস্তায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকটি অটোরিকশার চালককে জিজ্ঞাসা করার পর একটির চালক যেতে রাজি হন। কিন্তু তিনি ভাড়া হাঁকেন ৫০০ টাকা, এক টাকাও কম হবে না। তাড়া থাকায় যেতে বাধ্য হন সাইদুর।

সিএনজিচালিত অটোরিকশা
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

গুগল বলছে, বসুন্ধরা সিটি থেকে বনানীর দূরত্ব সাত কিলোমিটার। অটোরিকশার বর্তমান সর্বনিম্ন (প্রথম দুই কিলোমিটার) ভাড়া ৪০ টাকা। দুই কিলোমিটারের পরের প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ১২ টাকা নির্ধারিত। আর যানজট ও সিগন্যালে সময়ক্ষেপণে প্রতি মিনিটের জন্য (ওয়েটিং) বাড়তি ভাড়া দুই টাকা। সে হিসাবে, বনানী পর্যন্ত ভাড়া হতে পারে ১০০ টাকা। ওয়েটিং ১৫ মিনিট ধরলে আরও ৩০ টাকা যোগ হতে পারে। কিন্তু সাইদুরকে দিতে হয়েছে পৌনে চার গুণ টাকা।

রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামের গণপরিবহনে সিএনজিচালিত অটোরিকশা যুক্ত হয় ২০০৩ সালে। তখন চালকেরা সাধারণত মিটারে ওঠা ভাড়ায় চলাচল করতেন। তবে ২০ টাকা বেশি চাইতেন। সেটা অবশ্য বেশি দিন থাকেনি। মিটারের বদলে চুক্তিতে যেতে বাধ্য করা হতো যাত্রীদের। এখন চালকেরা ইচ্ছেমতো ভাড়া হেঁকে বসে থাকেন।

এই নৈরাজ্য চলছে দুই দশকের বেশি সময় ধরে। বিএনপি সরকারের সময় শুরু হয়ে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গেছে, আওয়ামী লীগের তিনটি মেয়াদ গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার গেছে—কেউ এ খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে পারেনি।

আরও পড়ুন

দুই দশকে সিএনজিচালিত অটোরিকশার মালিক ও চালকদের দাবির মুখে অন্তত পাঁচবার ভাড়া ও দৈনিক জমা বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু একবারও বিআরটিএ (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ) নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর করতে পারেনি।

বর্তমানে অটোরিকশার মালিকের জন্য দৈনিক নির্ধারিত জমা ৯০০ টাকা। তবে চালকেরা বলছেন, মালিকেরা দিনে দুই বেলায় চালকের কাছে অটোরিকশা ভাড়া দিয়ে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করেন। এর প্রভাব পড়ছে যাত্রীদের ওপর।

এখন দেড় শ টাকার নিচে স্বল্প দূরত্বের পথে যাওয়া যায় না। একটু বেশি দূরত্ব হলেই ভাড়া চাওয়া হয় আড়াই শ টাকা বা তার বেশি। বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন অথবা লঞ্চঘাটের মতো জায়গা থেকে কোথাও যেতে চাইলে অনেক বেশি ভাড়া হাঁকা হয়। সকালে অফিস শুরুর সময় এবং বিকেলে ছুটির সময় ভাড়া বাড়িয়ে দেন চালকেরা।

শাস্তি প্রয়োগ করতে গেলেই বাধা

সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর ধারা ৩৫ (৩) অনুযায়ী, কোনো কন্ট্রাক্ট ক্যারিজের মালিক বা চালক রুট পারমিট এলাকার মধ্যে যেকোনো গন্তব্যে যেতে বাধ্য থাকবেন এবং মিটারে প্রদর্শিত ভাড়ার অতিরিক্ত অর্থ দাবি বা আদায় করতে পারবেন না। এর ব্যত্যয় হলে আইনের ধারা ৮১ অনুযায়ী অনধিক ৬ মাসের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হিসেবে দোষসূচক ১ পয়েন্ট কর্তন করার বিধান রয়েছে।

ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে চলাচলকারী প্রায় ২৮ হাজার অটোরিকশার জন্য পৃথক নীতিমালা রয়েছে। এসব অটোরিকশাকে কন্ট্রাক্ট ক্যারিজ বা ভাড়ায় চালিত যান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নীতিমালা অনুসারে, সিএনজি ও পেট্রলচালিত অটোরিকশার ভাড়া ও মালিকের দৈনিক জমা নির্ধারিত রয়েছে। নীতিমালায় বলা হয়েছে, যাত্রীর চাওয়া গন্তব্যে মিটার অনুযায়ী ভাড়ায় চালক যেতে বাধ্য। এর ব্যত্যয় হলে অটোরিকশার চলাচলের অনুমতি বাতিল করার কথা বলা হয়েছে। এখন ঢাকা ও চট্টগ্রামের অটোরিকশায় মিটার কার্যকর নেই। সবাই চুক্তিতে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছে।

মালিকদের বাড়তি জমা আদায় বন্ধ করতে সড়ক আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য গত বছর ২৬ জানুয়ারি ঢাকা মহানগর পুলিশকে (ডিএমপি) চিঠি দেয় বিআরটিএ। ১০ ফেব্রুয়ারি চিঠি দেওয়া হয় অটোরিকশার চালকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে। এর পর থেকেই ঢাকা ও চট্টগ্রামের অটোরিকশাচালকদের সংগঠনগুলো বিক্ষোভ মিছিলসহ নানা কর্মসূচি পালন শুরু করে। ভেতরে-ভেতরে এ কর্মসূচিতে মালিকপক্ষও সমর্থন দেয়।

আরও পড়ুন

জরিমানা ও মামলা করা ঠেকাতে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার রামপুরার বনশ্রী, মিরপুর, মিরপুরে বিআরটিএ কার্যালয়ের সামনে, গাবতলী, আগারগাঁও, তেজগাঁও, শনির আখড়া, দোলাইরপাড়সহ বিভিন্ন জায়গায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকেরা সড়ক অবরোধ করেন। এতে ওই সব সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ভোগান্তিতে পড়েন মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে চালক ও মালিকদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পুলিশকে দেওয়া চিঠি প্রত্যাহার করে বিআরটিএ।

অটোরিকশার সংখ্যা কম, নৈরাজ্যের সুযোগ

২০০৩ সালে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালুর আগে ঢাকা ও চট্টগ্রামে এক লাখের মতো মিশুক-বেবিট্যাক্সি চলাচল করত। সেগুলো তুলে দিয়ে দুই শহরে ২৭ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা নামানো হয়। তখন অটোরিকশার অনুমতিপত্র বিতরণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।

ঢাকা ও চট্টগ্রামে প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা অবাধে বাড়ছে। কোনো সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। শুধু অটোরিকশার ক্ষেত্রে এ সীমা রয়েছে। আর অটোরিকশার মেয়াদ (১৫ বছর) শেষ হয়ে গেলে পুরোনো মালিকেরাই নতুন অটোরিকশা নামানোর সুযোগ পান। সংকটের সুযোগে এ বাহনের মালিকেরা নিবন্ধন হাতবদল করে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা আয় করছেন।

বাজারে ভারতের বাজাজ কোম্পানির তৈরি একটি অটোরিকশার দাম এখন সাড়ে পাঁচ লাখ থেকে পৌনে ছয় লাখ টাকা। অথচ বিআরটিএর নিবন্ধন পাওয়া প্রতিটি অটোরিকশা এখন হাতবদল হয় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকায়। মালিক ও চালক সূত্র বলছে, একটি অটোরিকশা থেকে দিনে অন্তত দেড় হাজার টাকা ও মাসে ৪৫ হাজার টাকা আয়ের সুযোগ আছে। এ কারণেই নিবন্ধিত অটোরিকশার দাম এত বেশি।

অটোরিকশার চালক ও মালিকদের সূত্র বলছে, শুরুতে বরাদ্দ বিতরণে অনিয়মে যুক্ত ছিল বিএনপির তৎকালীন নেতারা। পরে হাতবদল হয়ে নানা ব্যবসায়ীর হাতে চলে গেছে এসব অটোরিকশা। এর মধ্যে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের স্থানীয় নেতা, পুলিশের কর্মকর্তা ও তাঁদের স্বজন, সাংবাদিকসহ অনেকেই অটোরিকশার মালিক হয়েছেন।

আরও পড়ুন

‘কেন পারেনি, জবাব দরকার’

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহনবিশেষজ্ঞ সামছুল হক \Iপ্রথম আলো\Iকে বলেন, বিআরটিএ নির্ধারিত ভাড়া কার্যকর করতে পারছে না। এর কারণ বাসের মতো অটোরিকশাকেও তারা খুচরা পণ্যের মতো বাজারে ছেড়ে দিয়েছে। হাজারো মালিক-শ্রমিক জন্ম দিয়েছে, যা নিয়ন্ত্রণযোগ্য নয়। তিনি আরও বলেন, অটোরিকশার চাহিদা থাকলে আরও বেশি করে নামানো যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বড় কোনো কোম্পানির অধীন শক্ত নীতিমালার আওতায় নামানো উচিত। বিদ্যমান ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা যাবে না।

সামছুল হক বলেন, ২০১৮ সালে সড়ক আইন করার পরই অটোরিকশার চালক ও মালিকদের বিরুদ্ধে তা প্রয়োগ করা উচিত ছিল। এত দিন বিআরটিএ ও পুলিশ কেন পারেনি, এর জবাব দরকার।