ঢাকার পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রণ আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপি–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে গেছে। কিন্তু বিশৃঙ্খলা, চাঁদাবাজি ও নৈরাজ্য আগের মতোই আছে। এর কারণ কী?
সামছুল হক: ১৯৮৩ সালে মোটর ভেহিকেল অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ (বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ) গঠিত হয়। এর জন্মটাই ছিল একটি আন্দোলনের ফল। সেই আন্দোলনে শাজাহান খানদের (পরিবহন খাতের নেতা ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য) শ্রমিক ও মালিক সংগঠনের নেতারা সরাসরি ভূমিকা রাখেন। আন্দোলনের ফসল হওয়ায় রুট পারমিটসহ গণপরিবহন সম্পর্কিত যতগুলো কমিটি আছে, সবগুলোতেই মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নেতারা ঢুকে গেলেন। পৃথিবীর কোথাও পেশাদারি কমিটিতে সেবাদানকারী থাকে না। এ ছাড়া মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত। ফলে বিআরটিএ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে না। সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে অপেশাদার ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট লোকজন যুক্ত হয়ে পড়েছেন। এর ফলে বাসের রুট পারমিট হয়ে গেছে একধরনের বাণিজ্য। পুলিশও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা থেকে নেতৃত্বের ভূমিকায় চলে এসেছে। এখান থেকেই একটি সিন্ডিকেট সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। মূলত এই কাঠামোগত ভুল এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই পরিবহনব্যবস্থা বিশৃঙ্খল।
ঢাকায় চলাচলকারী প্রায় ৩০ শতাংশ বাস-মিনিবাস মেয়াদোত্তীর্ণ। অর্ধেকের ফিটনেস সনদ নেই। এটি কি শুধু আইন প্রয়োগের ব্যর্থতা, নাকি পুরো নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাই অকার্যকর হয়ে গেছে?
সামছুল হক: এটি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতার প্রতিফলন। আইন থাকলেই হয় না, সেটি প্রয়োগযোগ্য পরিবেশও থাকতে হয়। আমাদের পরিকল্পনা এমনভাবে করা হয়নি যে ব্যবস্থা নিজে নিজে নিয়ন্ত্রিত থাকবে। বরং বিশৃঙ্খলা তৈরি করে পুলিশ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। অথচ আধুনিক ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পনাটাই এমন হয়, যাতে ভুল বা অনিয়ম করার সুযোগ না থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, হাতিরঝিলের বাস সার্ভিসে পুলিশ ছাড়াই শৃঙ্খলা বজায় রেখে চলছে। কারণ সেখানে পরিকল্পনা সঠিক। কিন্তু ঢাকায় রুট পারমিট দেওয়ার আগে কোনো বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা করা হয় না। চাহিদা কত, অবকাঠামো আছে কি না, টার্মিনাল আছে কি না—এসব না দেখে শুধু অনুমতি দেওয়া হয়। ফলে শুরুতেই বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, যা পরে আর নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
মিনিবাসে নির্ধারিত আসনের বাইরে বাড়তি আসন বসানো হচ্ছে। এতে বাসের আসনে বসতেই কষ্ট হয়। আপনি এর জন্য কাকে দায়ী করবেন?
সামছুল হক: এর মূল কারণ জবাবদিহির অভাব এবং ফিটনেস সনদ দেওয়ার প্রক্রিয়ার দুর্বলতা। একটি গাড়ির ব্লু–বুকে নির্ধারিত আসনসংখ্যা উল্লেখ থাকে। কিন্তু বাস্তবে মালিকেরা সেটি পরিবর্তন করে ফেলেন। বিআরটিএ কার্যকর ব্যবস্থা নেয় না। পরিবহনমালিকেরা জানেন যে যথাযথ পরীক্ষা ছাড়াই ফিটনেস সনদ পাওয়া সম্ভব। ঘুষ দিলেই চলে। ফলে যানবাহনের মডিফিকেশন, লাইটিং সিস্টেমের অভাব ও নিম্নমানের নির্মাণ—সবকিছুই চলতে থাকে। দুর্ঘটনায় এসব অনিয়ম প্রাণহানির কারণ হয়। বিআরটিএ তাদের প্রতিটি কার্যালয়ে সিসিটিভি (ক্লোজড সার্কিট) ক্যামেরা লাগাক। তাহলেই দেখতে পারবে কী অনিয়মটা হয়। গাড়ি না এনেই কীভাবে ফিটনেস সনদ দেওয়া হয়, তা স্পষ্ট হয়ে যাবে।
আপনি বলছেন, বিআরটিএ কাজ করছে না। তাদের একটা বক্তব্য হচ্ছে—২০০০ সালে দেশে যানবাহন ছিল দুই লাখ। আর বিআরটিএর লোকবল ছিল আড়াই শ এর বেশি। এখন যানবাহন ৬৫ লাখের বেশি। কিন্তু লোকবল হয়েছে সাড়ে ৭০০। তাহলে কীভাবে আইনের প্রয়োগ করবে?
সামছুল হক: লোকবলের অভাব বলে তো আমি অচল গাড়ি সচল বলে চালাতে পারি না। এটা তো মানুষের জীবন–মরণের প্রশ্ন। লোক না থাকলে কী করতে হয়, সেটা তো জানতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এসব কাজ বেসরকারি খাতে দেওয়া হয়েছে। দেখভাল করে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ফিটনেস সনদ দেওয়ার প্রস্তাব ২০ থেকে ২৫ বছরে তিনবার সরকারের উচ্চ মহল থেকে ফিরে এসেছে। কারণ, সরকারের নিয়ন্ত্রণ মানেই কিছু ব্যক্তির আয়ের পথ খোলা রাখা।
মেট্রোরেল, উড়ালসড়কসহ বিপুল ব্যয়ের বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে, হচ্ছে। কিন্তু ঢাকার বাসব্যবস্থার উন্নতি হয়নি। এটা কি বাসব্যবস্থাকে উপেক্ষা করার ফল?
সামছুল হক: একটি শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থার ভিত্তি হলো বাস। কিন্তু আমরা ভিত্তি শক্ত না করে সরাসরি সর্বোচ্চ স্তরের প্রকল্পে চলে গেছি। এসটিপিতে (২০ বছরের কৌশলগত পরিকল্পনা) স্পষ্ট বলা ছিল, মেট্রোরেলের আগে বাসকে সুশৃঙ্খল করতে হবে। কিন্তু সেটি করা হয়নি। ফলে বড় বিনিয়োগের পরও সামগ্রিক উন্নয়ন হয়নি। এটি পরিকল্পনার একটি মৌলিক ভুল। যেমন দক্ষিণবঙ্গে যাতায়াতের ক্ষেত্রে ৪৫ হাজার কোটি টাকা খরচ করে পদ্মা সেতু ও এক্সপ্রেসওয়ে বানানো হয়েছে। চার-পাঁচ ঘণ্টার যাত্রা দেড় ঘণ্টায় নামিয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু ঢাকায় এসে মেয়র হানিফ উড়ালসড়কে আটকে যেতে হচ্ছে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন করা হচ্ছে ১৬ হাজার কোটি টাকায়। এই সড়কের গাড়িও হানিফ উড়ালসড়কে এসে আটকাবে। উচিত ছিল এগুলো করার আগেই ঢাকার বাইরে সার্কুলার সড়ক, ভেতরে ইনার সার্কুলার সড়ক তৈরি করা। এটা এসটিপিতে স্পষ্ট বলা আছে; কিন্তু মানা হয়নি।
এর মানে কী, আমাদের উন্নয়ন কি ব্যাকরণ মেনে হয়নি?
সামছুল হক: অবশ্যই ব্যাকরণ মেনে হয়নি। পূর্বশর্তে বলা ছিল বাসকে আগে সুশৃঙ্খল করো। বাস ৪০ শতাংশ মানুষের চাহিদা পূরণ করবে। ৩৬ বিলিয়ন (৩ হাজার ৬০০ কোটি) ডলার খরচ করে ছয়টা মেট্রোরেল নির্মাণের পর ১৭ শতাংশ চাহিদা পূরণ করতে পারবে। আমাদের সরকার ও আমলাতন্ত্রের মেগা প্রকল্পে ঝোঁক বেশি। বাসের জন্য পয়সা লাগার কথা নয়। লাগলেও সেটা খুবই সামান্য। সেটা না করে হঠাৎ করেই মইয়ের টপে উঠে গেছি।
স্বল্প মেয়াদে যাত্রীদের স্বস্তি ও গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে জরুরি এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ কী হতে পারে?
সামছুল হক: প্রথমত, ছোট গাড়িকে নিরুৎসাহিত করতে হবে এবং গণপরিবহনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজ চালু করতে হবে, যেখানে সীমিতসংখ্যক কোম্পানি নির্দিষ্ট রুটে সেবা দেবে। এতে শৃঙ্খলা আসবে এবং প্রতিযোগিতা হবে নিয়ন্ত্রিত। তৃতীয়ত, ফিডার সার্ভিস (সংযোগকারী পরিবহন) হিসেবে রাইড শেয়ারিং, সিএনজি বা মোটরসাইকেলকে ফ্র্যাঞ্চাইজের আওতায় আনতে হবে। এতে মূল সড়কে চাপ কমবে। পাশাপাশি এলিভেটেড বাস বা মনোরেলের মতো বিকল্প ব্যবস্থাও বিবেচনায় আনা যেতে পারে, যা দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য এবং তুলনামূলক সস্তা।
নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। তাদের উদ্দেশে কী বলবেন?
সামছুল হক: সমাধান একটাই, পেশাদারত্ব ও সুশাসন। বর্তমান খণ্ডিত, অপেশাদার কাঠামো বাদ দিয়ে আধুনিক, সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সরকারকে সরাসরি সেবা প্রদান না করে নিয়ন্ত্রণকের ভূমিকা নিতে হবে। সেবা দেবে বেসরকারি খাত; কিন্তু কঠোর নীতিমালার মধ্যে। বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজ, স্বচ্ছ ফিটনেস ব্যবস্থা, বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা—এই তিনটি বাস্তবায়ন করতে পারলেই ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।
বর্তমান সরকারের প্রধান যিনি, তারেক রহমান ১৭ বছর লন্ডনে ছিলেন। তিনি ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা শহরে একটা পাইলটিং (পরীক্ষামূলক প্রকল্প) করতে চাচ্ছেন। আমার মনে হয়, এটাকে যদি কাজে লাগানো যায়, তাহলে সমাধানের পথে যেতে পারব। কারণ, পরিবহন খাতের বিশৃঙ্খল ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগীরা নীতি তৈরি করছেন। চাঁদাবাজি, মাস্তানি, পদপদবি—এসব তাঁরা কখনো ছাড়তে চাইবেন না। বাসব্যবস্থাটা তিন-চারটা কোম্পানির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। তখন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আসবে। বিএনপির ইশতেহারে আছে গণপরিবহনকে সংস্কারের মাধ্যমে আধুনিক করা হবে। গণপরিবহন তথা বাসব্যবস্থা যদি আকর্ষণীয় করা যায়, তাহলে ছোট যানবাহন, ব্যাটারিচালিত রিকশা এমনিতেই উঠে যাবে। বাস ঠিক না করে তুলতে গেলে বিপদ হবে।