ফোন করলেই স্বাস্থ্যসেবা, অথচ এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম
টেলি স্বাস্থ্যসেবা ‘স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩’ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছে না সেবা পরিচালন প্রতিষ্ঠান। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের আন্তরিকতার অভাবে গুরুত্বপূর্ণ সেবাটি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
দিন–রাত যেকোনো সময় ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন করে মানুষ স্বাস্থ্য বিষয়ে পরামর্শ পেতে পারেন। এই সেবা বিনা মূল্যের। ১০০ জন এমবিবিএস ডিগ্রিধারী চিকিৎসক ও ২৫ জন হেলথ ইনফরমেশন কর্মকর্তা পালাক্রমে স্বাস্থ্য বাতায়নে সেবা দেন। বেতন না পেলে তাঁরা কাজ ছেড়ে দেবেন এবং সেবাটি বন্ধ হয়ে যাবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীন ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের (এমআইএস) ই-হেলথ কার্যপরিকল্পনার অধীনে ২০১৫ সালে স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ সেবা চালু হয়। চুক্তির মাধ্যমে এই সেবা পরিচালনের দায়িত্ব পায় সিনেসিস আইটি লিমিটেড নামের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহরাব আহমেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন আসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে। ১৭ মাস মন্ত্রণালয় অর্থ ছাড় করছে না। চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের ধরে রাখা যাচ্ছে না। আমাদের পক্ষে সেবা অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।’
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে সিনেসিস আইটির পাওনা আছে ১১ কোটি ২৪ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়কে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় চিঠির উত্তরও দিচ্ছে না, টাকাও দিচ্ছে না।
প্রথম আলোর পক্ষ থেকে বারবার চেষ্টা করেও স্বাস্থ্যসচিব মো. সাঈদুর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা যায়নি। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক মো. আবু জাফর প্রথম আলোকে বলেন, কিছু জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে।
প্রয়োজনে সামান্য টোল নিয়ে হলেও ১৬২৬৩ চালু রাখা দরকার। মন্ত্রণালয়ের উচিত বিষয়টির দিকে নজর দেওয়া।আবু জামিল ফয়সাল, জনস্বাস্থ্যবিদ
ফোন করলেই স্বাস্থ্যসেবা
স্বাস্থ্য বাতায়নের চিকিৎসাসেবার মধ্যে আছে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা; কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক পরিবর্তন ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে চিকিৎসা ও পরামর্শ; পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে চিকিৎসা ও পরামর্শ এবং মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পরামর্শ ও রেফারেন্স। অ্যাম্বুলেন্স, রক্ত, দুর্ঘটনায় জরুরি সেবার তথ্য এখান থেকে দেওয়া হয়।
এখানে আসা প্রতিটি কল স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেকর্ড করা হয়। রোগীর প্রয়োজন অনুসারে ই-প্রেসক্রিপশন রোগীর মুঠোফোনে এসএমএস আকারে পাঠানো হয়। প্রয়োজনে ভিডিও কলের মাধ্যমে রোগীর চিকিৎসা হয়।
স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ থেকে যে সেবা দেওয়া হয়, প্রতিদিন তা সরকারকে জানিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া মাসিক, ত্রৈমাসিক ও বার্ষিক প্রতিবেদনও তারা দেয়।
সিনেসিস আইটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দৈনিক সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে সাড়ে ছয় হাজার কল আসে। ২০২৫ সালে কল এসেছে ২৩ লাখ ৪৬ হাজার ৭৭৩টি। করোনা মহামারির প্রথম বছরে অর্থাৎ ২০২০ সালে কল আসে ১ কোটির বেশি। যাত্রা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ২ কোটি ৭০ লাখের বেশি কল পেয়েছে স্বাস্থ্য বাতায়ন।
কোনো কারণে সেবাটি বন্ধ হয়ে গেলে টেলি স্বাস্থ্যসেবায় ছেদ পড়বে। এ ধরনের বিকল্প সেবাও নেই।
অনেক মানুষের কাছে ১৬২৬৩ একটি পরিচিত নম্বর। মানুষ প্রয়োজনের সময় এখানে ফোন করে বিভিন্ন সমস্যার কথা বলতে পারেন, চিকিৎসা নেন, পরামর্শ নেন। কোনো কারণে সেবাটি বন্ধ হয়ে গেলে টেলি স্বাস্থ্যসেবায় ছেদ পড়বে। এ ধরনের বিকল্প সেবাও নেই।
এই টেলি স্বাস্থ্যসেবার সমস্যার কথা জেনে প্রথম আলোর কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল। তিনি বলেন, ‘বড় বড় হাসপাতালে যেসব সমস্যার কথা বলা যায় না, এমন ছোট ছোট সমস্যার সমাধান পাওয়া যায় ১৬২৬৩-তে ফোন করে। শহর এলাকায় এই সেবাটি খুবই জরুরি। কারণ, শহরে কমিউনিটি ক্লিনিক বা ইউনিয়ন সাবসেন্টার নেই। এ ছাড়া স্বাস্থ্য বাতায়ন থেকে এমন সব তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়, যা স্বাস্থ্যের পরিকল্পনা প্রণয়নের সহায়ক। প্রয়োজনে সামান্য টোল নিয়ে হলেও ১৬২৬৩ চালু রাখা দরকার। মন্ত্রণালয়ের উচিত বিষয়টির দিকে নজর দেওয়া।’