ঢাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু টাকাই খরচ, ফল শূন্য

গতকাল মঙ্গলবার ৪৭ মিলিমিটারের বৃষ্টিতে রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকা অচল হয়ে পড়ে। ছবি: প্রথম আলো
গতকাল মঙ্গলবার ৪৭ মিলিমিটারের বৃষ্টিতে রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকা অচল হয়ে পড়ে। ছবি: প্রথম আলো

ভারী বৃষ্টি হলেও যাতে জলাবদ্ধতা না হয়, সে জন্য গত অর্থবছরে সরকারের কাছ থেকে ঢাকা ওয়াসা বরাদ্দ পেয়েছিল ৪০ কোটি টাকা। আর চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই (জুলাই–সেপ্টেম্বর) সরকার ওয়াসাকে দিয়েছে আরও ৫ কোটি টাকা। ১৫ মাসে মোট ৪৫ কোটি টাকা খরচের ফল কী, তা গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সোয়া ঘণ্টার বৃষ্টিতেই নগরবাসী বুঝে গেছে। বেলা দেড়টা থেকে রাত সাড় সাতটা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টা ওয়াসা ভবনের সামনের সড়ক এবং এর আশপাশের এলাকায় পানি জমে ছিল।

বৃষ্টি হলেই রাজধানীর বড় অংশ জলাবদ্ধ হয়ে পড়ার ঘটনা নতুন নয়। গত ১০ বছরে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে। এই সময়ে (২০০৯ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) ঢাকা ওয়াসা জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় অন্তত ৫২৩ কোটি টাকা খরচ করেছে। এর মধ্যে তিনটি পাম্পস্টেশনের (পানিনিষ্কাশনের জন্য) জন্য ব্যয় করেছে ৩৩৮ কোটি টাকা। কিন্তু সমস্যা না কমে আরও বেড়েছে।

গতকাল দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ৪৭ মিলিমিটারের বৃষ্টিতে রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকা অচল হয়ে পড়ার দায় অবশ্য একা ঢাকা ওয়াসা নিতে রাজি নয়। সংস্থার দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নালা দিয়ে বৃষ্টির পানি বিভিন্ন খালে যায়। নালা ভরাট হয়ে থাকায় পানিনিষ্কাশন হতে পারে না। ভূ–উপরিভাগের নালা পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের।

অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আসাদুজ্জামানের বক্তব্য হচ্ছে, ওয়াসার পাম্পের নিষ্কাশনক্ষমতা কম হওয়ায় জলাবদ্ধতা হচ্ছে।

রাজধানীর রামপুরা, কল্যাণপুর ও গোপীবাগে ওয়াসার তিনটি পাম্পস্টেশন রয়েছে। এ ছাড়া গোড়ান চটবাড়ি এলাকায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডেরও পাম্পস্টেশন রয়েছে। এসব স্টেশনের কাজ হচ্ছে বৃষ্টির পানি সেচের মাধ্যমে খালে–নদীতে ফেলা। সিটি করপোরেশনের প্রকৌশলীরা বলছেন, ওয়াসার পাম্পের পরিমাণ যথেষ্ট নয়। আবার এসব পাম্পের ক্ষমতাও (পানি সেচ) কম।

>

ঢাকা ওয়াসা জলাবদ্ধতা দূর করতে গত ১০ বছরে অন্তত ৫২৩ কোটি টাকা খরচ করেছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. মুজিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, টাকা খরচ হচ্ছে, কিন্তু সুষ্ঠু পরিকল্পনা অনুযায়ী তা হচ্ছে না। বাসাবাড়ি থেকে খাল ও নদী পর্যন্ত পানিনিষ্কাশনের বিষয়টি পরিপূর্ণভাবে না বুঝে শুধু রাস্তা কেটে পাইপ বসালে কিংবা কালভার্ট নির্মাণ করলে টাকাটা পানিতেই যাবে। তিনি বলেন, সব সময় নালা পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি খালগুলো দখলমুক্ত এবং খনন করে প্রবহমান রাখতে হবে। যাতে বৃষ্টির পানি খাল হয়ে নদী পর্যন্ত যেতে পারে। সে জন্য ঢাকা ও চারপাশের নদীরও খনন দরকার।

রাজধানীর ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যান অনুযায়ী, রাজধানীর মোট আয়তনের ১২ শতাংশ জলাধার থাকার কথা। কিন্তু ওয়াসার কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, রাজধানীতে জলাধারের পরিমাণ ২ শতাংশের মতো। বৃষ্টির পানি দ্রুত না সরার এটিও অন্যতম কারণ।

ঢাকা ওয়াসার গভীর নর্দমা রয়েছে ৩৮৫ কিলোমিটার, বক্স কালভার্ট ১০ কিলোমিটার এবং খাল রয়েছে ৮০ কিলোমিটার। ওয়াসার ড্রেনেজ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সরকারের কাছ থেকে নেওয়া ৪০ কোটি টাকায় রাজধানীর ২৬টি খালের মধ্যে ১৯টি খাল খনন ও পরিষ্কার করা হয়। এ ছাড়া ৮ দশমিক ৮০ কিলোমিটার বক্স কালভার্ট, ২৮০ কিলোমিটার গভীর নর্দমা পরিষ্কার করার কথা জানিয়েছে ওয়াসা। এর বাইরে গভীর নর্দমায় বৃষ্টির পানি যাওয়ার জন্য ১ হাজার ৩০০টি ক্যাচপিট (সড়কের পাশে বৃষ্টির পানি প্রবেশের পথ) বসানো হয় ওই টাকায়। যেসব খাল খনন ও পরিষ্কার করার কথা বলেছে ওয়াসা, সেগুলোর মধ্যে ধোলাইখাল, দেবধোলাইখাল, ডিএনডি খাল, সুতিখোলা খাল, কল্যাণপুর প্রধান ও ‘খ’ খাল, কল্যাণপুর পাম্পস্টেশনের পাশে বাঁধসংলগ্ন খাল, রূপনগর প্রধান খাল, মোহাম্মদপুরের রামচন্দ্রপুর খাল, বেগুনবাড়ি খাল, উত্তরার কসাইবাড়ি খাল অন্যতম।

গত ২০ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ীসংলগ্ন দেবধোলাইখাল ও সুতিখোলা খাল পরিদর্শন করেন এই প্রতিবেদক। সে সময় আবর্জনায় খাল দুটি পূর্ণ ছিল। এর আগে গত আগস্ট মাসে রূপনগর ও মিরপুর সাংবাদিক কলোনিসংলগ্ন কালশী খাল এলাকায় গিয়েও একই অবস্থা দেখা গেছে। রামপুরা সেতুসংলগ্ন বেগুনবাড়ি খালে প্রায় সারা বছরই আবর্জনা জমে থাকে।

ওয়াসার কার্যক্রম নিয়ে গত ২১ আগস্ট ও ১৮ সেপ্টেম্বর দুই দফায় প্রথম আলো কথা বলে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা রোধ তথা ড্রেনেজ ব্যবস্থার অন্যতম অনুষঙ্গ হচ্ছে কঠিন বর্জ্য। সিটি করপোরেশনের কঠিন বর্জ্য ওয়াসার পরিষ্কার করা খাল ও গভীর নর্দমাকে আবার অপরিষ্কার করে ফেলে। অথচ কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ১০০ শতাংশ দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের।

জলাবদ্ধতা রোধে দুই সিটি করপোরেশন কী করে

ঢাকায় দুই সিটি করপোরেশনের অধীনে ২ হাজার কিলোমিটারের বেশি নর্দমা রয়েছে। এর মধ্যে পানিনিষ্কাশনের জন্য ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন রয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার। এর ৫০০ কিলোমিটার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি), বাকিটা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি)। দুই সিটি করপোরেশনের ভূ–উপরিস্থ (সারফেস) নর্দমা রয়েছে প্রায় ১৮ কিলোমিটার। বক্স কালভার্ট রয়েছে সাড়ে চার কিলোমিটার। সিটি করপোরেশনের ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন ওয়াসার গভীর নর্দমার সঙ্গে যুক্ত।

ওয়াসার পাশাপাশি পানিনিষ্কাশনে (ড্রেনেজ ব্যবস্থা) টাকা খরচ করেছে দুই সিটি করপোরেশনও। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন পানিনিষ্কাশনের জন্য গত ১০ বছরে গভীর নর্দমা (পাইপলাইন) নির্মাণ ও সংস্কারে ব্যয় করেছে ১ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটির খরচ ৬৭৩ কোটি টাকা এবং উত্তর সিটি খরচ করেছে ৪৪০ কোটি টাকা। এই তথ্য সংস্থাগুলোর বিভিন্ন প্রকল্পের নথি পর্যালোচনা এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কাছ থেকে পাওয়া।

এসব গভীর নর্দমা ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানিনিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করেন ওয়াসার প্রকৌশলীরা। তাঁরা বলছেন, বৃষ্টি হলে দ্রুত পানি না নামার এটিও বড় কারণ।

এ বিষয়ে ডিএসসিসির মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, বৃষ্টির পানি সরানোর মূল দায়িত্ব ওয়াসার। এরপরও জলাবদ্ধতা যাতে দীর্ঘ সময় না থাকে, সেদিকে লক্ষ রেখে শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য কাজ করে সিটি করপোরেশন। শান্তিনগরের জলাবদ্ধতার সমস্যা ওয়াসা নয়, সিটি করপোরেশনই দূর করেছে।

তবে মেয়র এই দাবি করলেও গতকাল দুপুরে শান্তিনগরে প্রায় এক ঘণ্টা পানি জমে ছিল। তা ছাড়া আশপাশের এলাকা রাজারবাগ, নয়াপল্টন, ফকিরাপুল, বিজয়নগরে হাঁটুপানি জমে ছিল প্রায় সন্ধ্যা পর্যন্ত। অথচ শান্তিনগর ও আশপাশের এলাকার পানিনিষ্কাশনের জন্য তিন ধাপে দুই বছর আগে প্রায় ৭০ কোটি টাকা খরচ করেছিল দক্ষিণ সিটি।

সার্বিক বিষয়ে নগর বিশ্লেষক ও স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, নালা পরিষ্কারের কাজটি শুধু বর্ষার আগে করা হয়, কিন্তু এটি সারা বছরের কাজ। ওয়াসা ও সিটি করপোরেশন জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য কী করছে, তা নিয়মিত তদারকি দরকার। ঢাকা ওয়াসা ও সিটি করপোরেশন একে অন্যকে দোষ দিয়েই দায়িত্ব শেষ করে। তাদের কাজে সমন্বয় না হলে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে রাজধানীর মানুষ মুক্তি পাবে না।