গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট দূর করতে সময় লাগতে পারে, চুরি-লুটপাট বন্ধে নয়: ক্যাব সভাপতি
দেশের বিদ্যমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকট দূর করতে সময় লাগতে পারে, তবে চুরি-লুটপাট বন্ধ করতে সময় লাগার কথা নয় বলে মন্তব্য করেছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান।
ক্যাবের সভাপতি বলেছেন, বিদ্যুতের দাম গড়ে প্রায় ২০ শতাংশ বাড়লেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অনেক গ্রাহকের বিল দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। অথচ লোডশেডিংয়ের কারণে তাঁরা আগের তুলনায় কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন। ‘এটা তো লুটপাট। আগে এই অনিয়ম ও চুরি বন্ধ করা দরকার,’ বলেন তিনি।
আজ বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ক্যাব মিলনায়তনে ‘বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অপ্রাপ্ততা এবং অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে’ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, ব্যক্তি বা কোনো গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে আমদানিনির্ভরতা বাড়ানো হচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা দরকার। সংকট ঘনীভূত হওয়ার পর স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার বদলে সরাসরি জ্বালানি কেনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
ক্যাব সভাপতি বলেন, সরাসরি জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঝুঁকি থাকে। তাই সংকটের প্রকৃত তথ্য জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে চুরি-লুটপাট বন্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন
বাজারে সংকট তৈরি করে কয়েকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে দাম বাড়ানোর সুযোগ দেওয়ারও সমালোচনা করেন এ এইচ এম সফিকুজ্জামান।
সফিকুজ্জামান বলেন, কোনো পণ্যের বাজারের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকলে তারা সরবরাহ কমিয়ে বাজার অস্থির করে তুলতে পারে। পোলাও চালের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও সরবরাহ–সংকট দেখিয়ে দাম বাড়ানো হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি পণ্য মজুত করে বাজার অস্থির করা হলে সংশ্লিষ্ট গুদামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি। তাঁর প্রশ্ন, ‘সংকট তৈরি করে যারা জনগণকে জিম্মি করছে, সরকার তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে, নাকি তাদেরই সুবিধা দেবে?’
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বাতিলের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও বড় ওষুধ কোম্পানির স্বার্থ প্রাধান্য পেয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন তোলেন ক্যাব সভাপতি। তাঁর মতে, জনগণকে বাদ দিয়ে কোনো নীতি করা যাবে না। ভোক্তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা করতে হবে।
‘গ্যাস-সংকট দীর্ঘায়িত হলে অর্থনীতিতে বড় বিপর্যয়’
এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, গ্যাস-সংকট দীর্ঘায়িত হলে দেশের অর্থনীতি বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। ইতিমধ্যে প্রায় ৪০০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সংকটে পড়েছে। রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে এমন শিল্প খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হওয়ার আশঙ্কা আছে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব পরিবহন খরচের তুলনায় অনেক বেশি হারে পণ্যের দামে পড়ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, একটি পণ্য পরিবহনের খরচ সামান্য বাড়লেও বাজারে সেই পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
সরকার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসে যদি দুই বছর ধরে এ ধরনের সংকট চলবে বলে বার্তা দেয়, তাহলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কীভাবে আস্থা পাবে—এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।
‘অপ্রতুলতা বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই’
বাংলাদেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকটকে ‘অপ্রতুলতা’ বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স।
রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, দেশের মাটির নিচে এবং সমুদ্রে গ্যাসসহ নিজস্ব জ্বালানিসম্পদ আছে। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ, পানি ও বায়ু থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনেরও সুযোগ আছে। এসব সম্পদের যথাযথ অনুসন্ধান, উত্তোলন ও ব্যবহার না করার দায় অতীতে যারা ক্ষমতায় ছিল, তাদের নিতে হবে।
রুহিন হোসেন প্রিন্সের অভিযোগ, গ্যাস উন্নয়ন তহবিলে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হলেও সেই অর্থ দেশীয় গ্যাস উত্তোলনের পরিবর্তে এলএনজি আমদানি ও অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছে।
যেখানে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে না, সেখানে বিল নেওয়া বন্ধের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ভুলনীতি ও দুর্নীতির দায় জনগণের ওপর চাপিয়ে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো যাবে না।
অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বাতিলের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, সরকারকে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের তালিকা ও যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। নকল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বন্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আরও বলেন, চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যয় মেটাতে গিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ আর্থিক সংকটে পড়ছেন। তাই সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত জনগণের স্বার্থ রক্ষা, কোনো ব্যবসায়ী বা ব্যক্তিগোষ্ঠীর স্বার্থ নয়। সংকটকে কেন্দ্র করে নতুন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সুযোগ নেওয়া বন্ধ করারও আহ্বান জানান তিনি।
দেশীয় গ্যাস উত্তোলনে জোর দেওয়ার দাবি
বাংলাদেশ সাধারণ নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ–সংকটকে কেবল আগের সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে দেখলে চলবে না। সংকট তৈরির কারণ অনুসন্ধানে স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন।
মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশে গ্যাস উত্তোলনের বিদ্যমান সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে না লাগিয়ে এলএনজি আমদানির দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অথচ বাপেক্সসহ দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে দ্রুত সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব।
গ্যাস সরবরাহ না থাকলেও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পুরো বিল নেওয়া এবং এলপিজি ব্যবসাকে সুবিধা দেওয়ার নীতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত দেশের নিজস্ব জ্বালানি সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে স্বনির্ভরতা বাড়ানো।
ওষুধের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্তেরও বিরোধিতা করে মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, উৎপাদনকারীরা মূল্য নির্ধারণের প্রস্তাব দিতে পারে; তবে চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণের দায়িত্ব স্বাধীন ও অংশীজনদের নিয়ে গঠিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারেরই থাকা উচিত।
আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন ক্যাবের উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়া, কোষাধ্যক্ষ শওকত আলী খান ও সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ।