বকেয়া পরিশোধের আশ্বাসে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে খাবার সরবরাহ চালু
বকেয়া বিল পরিশোধের আশ্বাসে সরকারি ২০টি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে খাদ্য সরবরাহ চালু রাখছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। আজ বুধবার দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বৈঠক করে এ আশ্বাস দেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আজ ২০টি দিবাযত্ন কেন্দ্র পরিদর্শন করেছেন মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের ‘২০টি শিশু দিবাযত্ন স্থাপন’ প্রকল্পের আওতায় এই দিবাযত্ন কেন্দ্রগুলো পরিচালিত হচ্ছে। ৯ মাসের সোয়া কোটি টাকা বকেয়া বিলের কারণে আজ থেকে এসব শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে খাবার সরবরাহ বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছিল দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দিবাযত্ন কেন্দ্রগুলো থেকে গতকাল মঙ্গলবার হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে অভিভাবকদের নোটিশ দিয়ে বলা হয়, ১ এপ্রিল বুধবার থেকে পরবর্তী নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে শিশুখাদ্য সরবরাহ বন্ধ থাকবে। অভিভাবকেরা যেন বুধবার থেকে নিজ দায়িত্বে শিশুদের খাবার ব্যাগে গুছিয়ে দেন।
২০টি দিবাযত্ন কেন্দ্রের মধ্যে ১৫টি কেন্দ্রে ঢালী এন্টারপ্রাইজ ও ৫টি কেন্দ্রে তামান্না ট্রেডিং করপোরেশন খাবার সরবরাহ করে। বকেয়া বিল পরিশোধের আশ্বাসে খাবার সরবরাহ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার হলেও অন্তত ৮টি কেন্দ্রে আজ খাবার দেওয়া হয়নি। সেখানে কেন্দ্রগুলো থেকে খাবার কিনে আনা হয়। আবার কোনো কোনোটিতে খাবার সরবরাহ চালু হলেও অভিভাবকেরা না জানার কারণে শিশুর সঙ্গে খাবার দিয়ে দিয়েছিলেন।
কর্মকর্তা–কর্মচারীদের পাঁচ মাসের বকেয়া বেতন, বাড়িভাড়া ও বিদ্যুৎ বিল বকেয়া, ঠিকাদারদের সরবরাহ করা শিশুখাদ্যের বিল বকেয়ার কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে দুই দিন ধরে প্রথম আলো প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। গতকাল প্রথম আলোতে এ সংবাদ প্রকাশের পর মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন সমস্যা দ্রুত সমাধানের নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশে আগামীকাল বৃহস্পতিবার প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) সভা ডাকা হয়েছে। পিএসসির প্রধান হচ্ছেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের জুন মাসে প্রকল্পের মেয়াদ শেষের পর ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত এ প্রকল্পের এক বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়। মেয়াদ বাড়ানোর পর ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) সুপারিশ করে। তবে ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত সভায় পিএসসি তা অনুমোদন করেনি। ফলে ঠিকাদারেরা খাবার সরবরাহ করলেও ৯ মাস ধরে বিল পাচ্ছেন না।
২০টি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের প্রতিটিতে আসনসংখ্যা ৬০। ৪ মাস থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুদের সেখানে সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত রাখা হয়। মা-বাবার আয়ের ওপর ভিত্তি করে মাসিক খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে। শিশুর বয়স অনুসারে, মাসিক সেবামূল্য সর্বনিম্ন এক হাজার, সর্বোচ্চ ২ হাজার টাকা।
প্রকল্পটি চলছে ঢাকায় কর্ম কমিশন সচিবালয়, ভূমি ভবন, মতিঝিল, পর্যটন করপোরেশন, পানি ভবন, জাতীয় গ্রন্থাগার, লালমাটিয়া, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি), সড়ক ভবন, সমবায় ভবনে। ঢাকার বাইরে রয়েছে আশুলিয়া, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, গোপালগঞ্জ, নওগাঁ, গাইবান্ধা, রংপুর, কক্সবাজার, নোয়াখালী ও চাঁদপুরে। এ প্রকল্পে জনবল ২৪৯ জন। এর মধ্যে ১৮৫ জন চতুর্থ শ্রেণির, তাঁদের আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
আজকের পরিস্থিতি
ভূমি ভবন, জাতীয় গ্রন্থাগার, সমবায় ভবন, লালমাটিয়া ও স্পেশাল ব্র্যাঞ্চ (এসবি) কার্যালয়—এ পাঁচটি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে খাবার সরবরাহ করে তামান্না ট্রেডিং করপোরেশন। বকেয়া বিল পরিশোধে মন্ত্রণালয়ের আশ্বাসে এই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আজ সকাল থেকে খাবার সরবরাহ অব্যাহত রাখে।
তেজগাঁওয়ে ভূমি ভবনে স্থাপিত দিবাযত্ন কেন্দ্রের ‘দিবাযত্ন কর্মকর্তা’ মাহিয়া তাসনুভ আজ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানে খাবার সরবরাহ বন্ধ থাকার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। পরে সকালে সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তবে সেটা না জানার কারণে কয়েকজন অভিভাবক সকালে শিশুর সঙ্গে খাবার নিয়ে এসেছিলেন।
অপর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ঢালী এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক মুরাদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, আজ সকালে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর থেকে তাঁদের ডেকে নেওয়া হয়। দুই জায়গায় তাঁদের সঙ্গে কর্মকর্তারা বৈঠক করেন ও বকেয়া বিল আগামী সপ্তাহের মধ্যে পরিশোধের আশ্বাস দেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা খাবার সরবরাহ বন্ধের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
মুরাদ হোসেন বলেন, তাঁর প্রতিষ্ঠান থেকে ১৫টি কেন্দ্রে খাবার সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে আজ অন্তত ৮টিতে খাবার দিতে পারেননি। বাকিগুলোতে আগের সরবরাহ করা বাজার থেকে খাবার ব্যবস্থাপনা করেছেন কেন্দ্রের কর্মকর্তারা। যেসব কেন্দ্রে খাবার সরবরাহ ছিল না সেসব কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের তিনি বলেছেন, বাজার করে আজকের দিনটি চালিয়ে নিতে। তিনি বাজারের টাকা দিয়ে দেবেন। আর আগামীকাল বৃহস্পতিবার থেকে সব কেন্দ্রে খাদ্য সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে।
পান্থপথে পানি ভবনে স্থাপিত দিবাযত্ন কেন্দ্রের শিক্ষক হাবিবা আফরোজ বলেন, তাঁদের কেন্দ্রে আজ তাঁরা নিজেদের মতো খাবার ব্যবস্থাপনা করে নিয়েছেন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আগামীকাল থেকে খাদ্য সরবরাহ করবে বলে জানিয়েছে। তিনি বলেন, সকালে বেশ কিছু অভিভাবক খাবার নিয়ে এসেছিলেন।
‘প্রথম আলোকে ধন্যবাদ’
বাংলাদেশ জাতীয় গ্রন্থাগারে স্থাপিত শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে নিজের ৬ বছর বয়সী ছেলে ও ১৪ মাস বয়সী মেয়েকে রাখেন জাতীয় গ্রন্থাগারের ক্যাটালগার নাজনীন আখতার। আজ প্রথম আলোকে তিনি বলেন, খাবার সরবরাহ থাকবে না—গতকাল এ নোটিশ পাওয়ার কারণে তিনি আজ সন্তানদের সঙ্গে খাবার নিয়ে গিয়েছিলেন। পরে গিয়ে শুনেছেন খাবার কেন্দ্র থেকে দেওয়া হবে।
প্রথম আলোতে সংবাদ প্রকাশের জন্য সমস্যার দ্রুত সমাধান হলো মন্তব্য করে নাজনীন বলেন, ‘প্রথম আলোকে ধন্যবাদ। খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম। আশা করি, কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেতন–ভাতা সমস্যারও সমাধান হবে।’ তিনি বলেন, এই ২০টি কেন্দ্র সরকারি অন্য সব দিবাযত্ন কেন্দ্রের মতো না। এগুলো ভালো মানের। শিশুদের যত্নের সঙ্গে রাখা হয়। তাই সন্তানদের রেখে স্বস্তি পান।
নাজনীন আরও বলেন, কর্মজীবী মায়েদের কথা চিন্তা করে সরকার যেন যথাযথভাবে দিবাযত্ন কেন্দ্রগুলো চালু রাখে। পাশাপাশি ৬ বছরের বেশি বয়সী সন্তানদেরও যেন রাখা যায়, সেই ব্যবস্থাও যেন করা হয়। কারণ, এই বয়সী শিশুরাও ছোট, তাদের বাসায় একা রাখা সম্ভব নয়।