নিউমুরিং টার্মিনাল ইজারার চুক্তির সঙ্গে জড়িতরা যেন দেশ থেকে বের হতে না পারে: আনু মুহাম্মদ
সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর পরিচালনাকারী কোম্পানি ডিপিওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় দীর্ঘমেয়াদি কনসেশন চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘জাতীয় স্বার্থবিরোধী তৎপরতার দায়ে’ অভিযুক্ত করেছেন অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ। তাঁর অভিযোগ, যে চুক্তিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজ ৩০, ৪০, ৫০ বা ৬০ বছরের জন্য বাঁধা পড়ে যাবে, সে ধরনের চুক্তি করার কোনো অধিকার বা এখতিয়ার একটা অন্তর্বর্তী সরকারের না থাকলেও বর্তমান সরকার জোরজবরদস্তি ও তড়িঘড়ি করে তা করতে যাচ্ছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, ‘১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের (ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন) মাধ্যমে যারা ক্ষমতায় আসবে, তাদের দায়িত্ব হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার কেন ও কিসের বিনিময়ে জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তিগুলো করছে, তার একটা শ্বেতপত্র প্রকাশ করা এবং এর মধ্যে যারা দায়ী, তাদের বিচারের সম্মুখীন করা। সেটা করার জন্য এই সরকারের মধ্যে যারা এসব তৎপরতা চালাচ্ছে, তারা যেন দেশ থেকে বের হতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’
আজ মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে এক সমাবেশে আনু মুহাম্মদ এ কথা বলেন। ডিপিওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে ও বন্দর শ্রমিকদের কর্মবিরতির সমর্থনে এ সংহতি সমাবেশের আয়োজন করে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি।
অন্তর্বর্তী সরকার সম্পূর্ণ অনিয়ম, অস্বচ্ছতা এবং জনস্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে এনসিটি ইজারার চুক্তি স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, ‘বিদেশি কোম্পানির হাতে দেওয়ার পর নিউমুরিং টার্মিনাল থেকে আয় ও মাশুল কমবে। এই চুক্তি করার জন্য কিছুদিন আগে সব পণ্যের ওপর মাশুল বাড়ানো হয়েছে। ফলে আমদানি ব্যয় ও রপ্তানি খরচ বাড়বে। এটার ফলে পুরো অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সম্পূর্ণ অস্বচ্ছতা, অযৌক্তিকতা এবং নিয়মনীতিবহির্ভূতভাবে বিভিন্ন ধরনের চুক্তি করা হচ্ছে। উপদেষ্টা ও বিশেষ সহকারীর মুখোশ পরিয়ে এই সরকারে ইউনূস সাহেব (প্রধান উপদেষ্টা) প্রকৃতপক্ষে বিদেশি কোম্পানি এবং বিদেশি রাষ্ট্রের লবিস্টদের নিয়োগ করেছেন।’
আনু মুহাম্মদ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ছিল হাসিনা আমলে হওয়া জনস্বার্থবিরোধী চুক্তি থেকে বের হওয়ার রাস্তা বের করা এবং এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনা। এই সরকার সেটা না করে উল্টো দিকে গিয়ে সেই চুক্তিগুলো বহাল রেখেছে এবং অতিরিক্ত আরও চুক্তি করতে যাচ্ছে। যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়; বরং রাজনৈতিক ও ভূকৌশলগত ঝুঁকির মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। সরকার যেসব চুক্তি করতে যাচ্ছে, তার সঙ্গে বাংলাদেশের প্রয়োজনের কোনো সম্পর্ক নেই।
আনু মুহাম্মদ বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের প্রধান বন্দর। দেশের শতকরা ৯০ ভাগ আমদানি-রপ্তানি হয় এই বন্দর দিয়ে। সেই বন্দর যখন একটা বিদেশি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বে যাবে, তখন পুরো বাংলাদেশই জিম্মি হয়ে পড়বে যুক্তরাষ্ট্রের একটা পকেট রাষ্ট্রের কোম্পানির হাতে। এর মানে হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী একটা বিশ্বব্যবস্থার মধ্যে বাংলাদেশ একটা বড় ধরনের নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়বে।
সরকারের কী ঠেকা পড়ল
জাতীয় নির্বাচনের কয়েক দিন আগে এনসিটি ইজারার চুক্তি স্বাক্ষর করতে অন্তর্বর্তী সরকারের কী ঠেকা পড়ল—সেই প্রশ্ন তুলে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, জনগণ প্রতিবাদ করছে, শ্রমিকেরা প্রতিবাদ করছেন, বিশেষজ্ঞরা প্রতিবাদ করছেন। এমনকি বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীদেরও বিরোধিতা আছে। তাহলে কার স্বার্থে চুক্তিটা হচ্ছে এবং এই চুক্তি না করলে সরকারের কী সমস্যা হবে?
এরপর আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘বিষয়টা কি এ রকম যে বিদেশিরা সরকারের মধ্যে থেকেই চুক্তি করার জন্য লম্ফঝম্ফ করছে? তাদের কি চাকরি চলে যাবে, নাকি বড় কন্ট্রাক্ট চলে যাবে, নাকি তারা যে দেশের নাগরিক, সেই দেশে ঢুকতে পারবে না, নাকি তারা একটা আগাম কমিশন খেয়েছে, যার জন্য তাদের এটা করতেই হবে। আর নাকি তাদের কোনো অঙ্গীকার বা কারও কাছে দাসখত দেওয়া ছিল যে এই চুক্তি তাদের করতেই হবে? নইলে কী কারণে একটা ভয়ংকর বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করছে এই সরকার?’
এনসিটি ইজারার চুক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলনরত শ্রমিকদের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান এই অধ্যাপক। বড় রাজনৈতিক দলগুলো কেন সরকারের জাতীয় স্বার্থবিরোধী এই চুক্তির বিরুদ্ধে কথা বলছে না—সেই প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, এসব চুক্তির বিরোধিতা যারা করছে না, তারা কী করে ক্ষমতায় গিয়ে বাংলাদেশকে একটা স্বাধীন, সার্বভৌম, ভারতের আধিপত্যবিরোধী কিংবা গণতান্ত্রিক রূপান্তরের অবস্থা নিশ্চিত করতে পারবে?
বর্তমান সরকারের শেষ সময়ের এই ‘ভয়াবহ তৎপরতার’ বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান আনু মুহাম্মদ। সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এই চুক্তি করার জন্য বিদেশ সফর কিংবা বিদেশে পালানোর চেষ্টা করবেন না। এই চুক্তির কোনো বৈধতা থাকবে না। আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার আসবে, তার প্রথম কাজ হবে এই চুক্তি বাতিল করা।’
‘ইকোনমিক হিটম্যান’
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নন–ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (গোপনীয়তার চুক্তি) নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অধিকার কমিটির সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা। অন্তর্বর্তী সরকারে থেকে বিদেশিদের সঙ্গে এনসিটি ইজারাসহ বিভিন্ন চুক্তির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ‘ইকোনমিক হিটম্যান’ বলে আখ্যা দেন তিনি। এই শিক্ষক বলেন, ‘জনগণের মতামত মূল্যায়ন না করে বা কোনো পর্যালোচনা না করে সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক উপায়ে এনসিটি ইজারার চুক্তি করা হচ্ছে। আমরা এই চুক্তির নিন্দা জানাই এবং এর বিরুদ্ধে বন্দরে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে পূর্ণ সংহতি জানাচ্ছি।’
মব সন্ত্রাস, নারীদের ওপর হামলাসহ বিভিন্ন জরুরি কাজে বর্তমান সরকারের গতি শ্লথ হলেও দেশকে বিক্রির ক্ষেত্রে তাদের গতি সুপারম্যানের মতো বলে মন্তব্য করেন অধিকার কমিটির সদস্য মাহতাব উদ্দীন। তিনি বলেন, ইউনূস সরকারের প্রত্যেক উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারী ও ব্যক্তিগত সহকারীদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা উচিত, যাতে তাঁরা দেশ ছেড়ে পালাতে না পারেন।
শ্রমিকনেতা সত্যজিৎ বিশ্বাস এ সমাবেশ সঞ্চালনা করেন। আরও বক্তব্য দেন অধিকার কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক হারুন-অর-রশিদ, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক দীপা দত্ত এবং বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রীর কেন্দ্রীয় সভাপতি দিলীপ রায়।