৩০০ টাকা কর উঠে গেলেও সিমের দাম কেন কমছে না

মুঠোফোনের সিমপ্রতীকী ছবি

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে মোবাইল সিমের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকার কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করেছে সরকার। এর ফলে সরকারের রাজস্বে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার ছাড় দিতে হচ্ছে।

বাজেট ঘোষণার পর গ্রাহকদের ধারণা ছিল, এখন থেকে সিম কিনতে খরচ কমে আসবে। তবে নতুন অর্থবছরের শুরুতে বাস্তবে সে চিত্র দেখা যাচ্ছে না।

নতুন প্রিপেইড সিম এখনো একেকটি ২০০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ৩০০ টাকার করছাড় পাওয়ার পরও সিম কেনার খরচ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে না কমা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কর প্রত্যাহারের পরও বাজারে আগের কিছু সিমের স্টক রয়ে গেছে। এসব সিম এখন আগের দামে বিক্রি হচ্ছে। আমরা গ্রাহকদের জন্য আরও সাশ্রয়ী দামে নতুন সিম আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে বাজারে আনার উদ্যোগ নিয়েছি।
শারফুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, গ্রামীণফোনের হেড অব কমিউনিকেশনস

দাম এখন কত

দেশে মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা দেয় চারটি অপারেটর। গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান টেলিটক।

অপারেটরগুলোর ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণফোন এখন সাতটি ক্যাটাগরিতে প্রিপেইড সিম বিক্রি করছে। সেগুলোর বেশির ভাগের দাম ৪০০ টাকা। তাদের একটি বিশেষ সিমের দাম ৪৯৭ টাকা। অপারেটরটি পোস্টপেইড সিম বিক্রি করছে ১ হাজার ৪৯৯ টাকায়।

রবির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, তাদের প্রিপেইড সিমের দাম ২০০ টাকা। বাংলালিংকের প্রিপেইড সিম একেকটি ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কয়েকটি ক্যাটাগরিতে টেলিটকের সিম বিক্রি হচ্ছে ১০০ থেকে ২৫০ টাকায়। তবে প্রতিটি অপারেটরের সিমের সঙ্গে ‘বান্ডেল প্যাকেজ’ (মিনিট ও ইন্টারনেট ডেটা) যুক্ত রয়েছে।

সিমের দামে কর প্রত্যাহারের সময় সরকারের মূল যুক্তি ছিল, মূল্য কমলে নতুন সংযোগ বাড়বে, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি বাড়বে এবং দীর্ঘ মেয়াদে অন্যান্য কর থেকে রাজস্ব বাড়তে পারে। তবে ব্যবহারকারীরা এর ফলে কতটুকু উপকার পাচ্ছেন, এমন প্রশ্ন অনেকেরই।

তৈরিতে খরচ কত

অনেকেই মনে করেন, সিমের দাম মানে প্লাস্টিকের ছোট একটি কার্ডের দাম। বাস্তবে বিষয়টি তেমন নয়।

মোবাইল অপারেটর সূত্রে জানা গেছে, একটি সিমের চিপ, প্লাস্টিক, প্যাকেজিং, পরিবহনসহ সরাসরি উৎপাদন ব্যয় সাধারণত ৬০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে থাকে। আন্তর্জাতিক বাজারে চিপের দাম বাড়লে এটি আরও কিছুটা বাড়তে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় ডিস্ট্রিবিউটর কমিশন, রিটেইলার কমিশন, গ্রাহক নিবন্ধন ব্যয়, বিপণন ব্যয়, নেটওয়ার্ক পরিচালনার ব্যয়, নম্বরপ্রতি লাইসেন্স ব্যয়সহ আনুষঙ্গিক নানা খরচ।

এর বাইরে অপারেটররা নতুন সিমের সঙ্গে নির্দিষ্ট পরিমাণ ডেটা, মিনিট ও এসএমএস বান্ডেল যুক্ত করে দিচ্ছে। তাতেও কিছু খরচ হয় অপারেটরদের।

দামে পার্থক্য হয় কেন

একই সময়ে কোনো অপারেটর একেকটি সিম ৪০০ টাকায় বিক্রি করছে। আবার একই সময়ে কোনো অপারেটরের সিমের দাম ২০০ টাকা। এমন তফাত কেন?

মোবাইল অপারেটর সূত্রে জানা গেছে, এর পেছনে রয়েছে ব্যবসায়িক কৌশল। বাজারের শীর্ষ অপারেটরের গ্রাহকের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় তারা মোবাইল সিমে তুলনামূলক বেশি খরচ করে থাকেন—এমন গ্রাহককে লক্ষ্য করে সিম বিক্রি করে থাকে। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত কম গ্রাহ সংখ্যার অপারেটররা নতুন গ্রাহক টানতে সিমের দাম কম রাখে।

বিপুল অঙ্কের কর ছাড় দিয়েও যদি সেটার সুফল ভোক্তা না পান, তাহলে সেটা বড় ধরনের ক্ষতি। সরকার মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছে।
রেহান আসিফ আসাদ, প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা

ফুটপাতে দাম কম কেন

রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশেই মাঝেমধ্যেই ফুটপাত বা কিছু খুচরা দোকানে খুব কম দামে সিম বিক্রি হতে দেখা যায়। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এটি সাধারণ বাজারমূল্য নয়। অনেক ক্ষেত্রে মাসিক বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে এটা করা হয়।

সাধারণত ডিস্ট্রিবিউটররা অতিরিক্ত কমিশনের অংশ থেকে এ ছাড় দেন বা তুলনামূলক কম দামে সিম বিক্রি করেন। আবার কিছু ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট এলাকায় নতুন গ্রাহক বাড়ানোর কৌশল হিসেবে সিমের এমন মূল্যছাড় দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন

অপারেটররা যা বলছে

সরকারের করছাড়ের পুরোটা সুফল ভোক্তার কাছে মূল্যছাড় হিসেবে পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ ব্যবহারকারীদের। এর বিপরীতে মোবাইল অপারেটররা বলছে, দীর্ঘদিন ধরে সিম বিক্রিতে ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। যখন ৩০০ টাকার সিম কর কার্যকর ছিল, তখন নতুন সিম চালু করতে তাদের মোট খরচ হতো ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা।

কর উঠে যাওয়ার পরও দাম কমল না কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে অপারেটরগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, ৩০০ টাকার কর প্রত্যাহার মানেই তাঁদের হাতে অতিরিক্ত ৩০০ টাকা চলে আসেনি। কর উঠে যাওয়ায় এত দিন যে অংশটি নিজেরা ভর্তুকি হিসেবে বহন করছিল, এখন সেই ভর্তুকির পরিমাণ কমে এসেছে। তবে উৎপাদন, কমিশন, বিপণন ও নেটওয়ার্ক পরিচালনার খরচ আগের মতোই রয়ে গেছে।

গ্রামীণফোনের হেড অব কমিউনিকেশনস শারফুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘কর প্রত্যাহারের পরও বাজারে আগের কিছু সিমের স্টক রয়ে গেছে। এসব সিম এখন আগের দামে বিক্রি হচ্ছে। আমরা গ্রাহকদের জন্য আরও সাশ্রয়ী দামে নতুন সিম আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে বাজারে আনার উদ্যোগ নিয়েছি।’

রবির চিফ করপোরেট ও রেগুলেটরি কর্মকর্তা সাহেদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, সিমের চূড়ান্ত বিক্রয়মূল্য শুধু সিম ট্যাক্সের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে সিমের চিপস, ডিস্ট্রিবিউটর কমিশন, রিটেইলার কমিশন, লজিস্টিকস, পরিচালন ব্যয় এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক খরচ যুক্ত থাকে। সেগুলো কিন্তু অপরিবর্তিত আছে।

অন্যদিকে কিছুটা ‘কৌশলী’ অবস্থান নিয়েছে বাংলালিংক। তরুণদের জন্য বানানো একটি সিমের দাম কমিয়েছে তারা। বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স কর্মকর্তা তাইমুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তরুণদের জন্য এআইভিত্তিক ডিজিটাল অভিজ্ঞতা আরও সহজলভ্য করতে বাংলালিংক ‘রাইজ’ সিমের দাম ৩৩ শতাংশ কমিয়ে এনেছে।

আরও পড়ুন

দাম কি কমবে

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে মুঠোফোন গ্রাহক এখন ১৯ কোটির (সচল সিমের সংখ্যা) কাছাকাছি। গত ৩ মাসে ২৮ লাখ নতুন গ্রাহক এ তালিকায় যুক্ত হয়েছেন। পরিসংখ্যানটি থেকে সিম কেনাবেচার চিত্র পাওয়া যায়।

সিমের দামে কর প্রত্যাহারের সময় সরকারের মূল যুক্তি ছিল, মূল্য কমলে নতুন সংযোগ বাড়বে, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি বাড়বে এবং দীর্ঘ মেয়াদে অন্যান্য কর থেকে রাজস্ব বাড়তে পারে। তবে ব্যবহারকারীরা এর ফলে কতটুকু উপকার পাচ্ছেন, এমন প্রশ্ন অনেকেরই।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ প্রথম আলোকে বলেন, বিপুল অঙ্কের কর ছাড় দিয়েও যদি সেটার সুফল ভোক্তা না পান, তাহলে সেটা বড় ধরনের ক্ষতি। সরকার মোবাইল অপারেটরদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছে। একটি অপারেটর এরই মধ্যে কিছুটা কমিয়েছে। অন্যরা যাতে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে পরিবর্তন আনতে পারে, সেই লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।

বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব) এমদাদ উল বারী প্রথম আলোকে বলেন, বড় অপারেটর সিমে বেশি ভর্তুকি দিয়ে সিম বিক্রি করতো। সিম কর প্রত্যাহারের পর সুস্থ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হবে।

আরও পড়ুন