জুলাই থেকে কি মুঠোফোনের দাম আবার বাড়বে

মুঠোফোনফাইল ছবি: রয়টার্স

নতুন একটি স্মার্টফোন কেনার পরিকল্পনা থাকলে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই। কারণ, ১ জুলাই থেকে একই ফোন কিনতে কয়েক হাজার টাকা বেশি গুনতে হতে পারে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে মুঠোফোন আমদানিতে ১৫ শতাংশ শুল্কছাড় দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সাময়িক এই সুবিধার মেয়াদ শেষ হচ্ছে ৩০ জুন। নতুন করে কোনো সিদ্ধান্ত না এলে জুলাইয়ের ১ তারিখ থেকে করভার বেড়ে যাবে। যার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে মুঠোফোনের খুচরা বাজারে।

মুঠোফোনের প্রতীকী ছবি
ছবি: রয়টার্স

এ নিয়ে মুঠোফোন আমদানিকারকদের সংগঠন মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এমআইওবি) ১৮ জুন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনে (বিটিআরসি) একটি চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে সংগঠনটি বলেছে, শুল্ক-সুবিধার মেয়াদ না বাড়ানো হলে আমদানি করা মুঠোফোনের ওপর মোট করভার বেড়ে ৬৪ দশমিক ২৫ শতাংশে পৌঁছাবে।

এমআইওবি সূত্র বলছে, করভার বেড়ে গেলে আমদানীকৃত মুঠোফোনের দাম ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। জানতে চাইলে সংগঠনটির সভাপতি জাকারিয়া শাহিদ প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ববাজারে মেমোরি চিপ, মাদারবোর্ড, সিপিইউ, ব্যাটারিসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশের দাম বাড়ছে। ফলে মুঠোফোনের দাম কমানো সম্ভব হচ্ছে না। এর মধ্যে আমদানি কর বেড়ে গেলে মুঠোফোনের দাম আরও বাড়বে। অনেক ক্রেতা কম দামে ফোন কিনতে আবারও ‘গ্রে মার্কেটের’ দিকে ঝুঁকতে পারেন।

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিদেশ থেকে আনা সম্পূর্ণ তৈরি মুঠোফোনের জন্য এই শুল্ক-সুবিধা বহাল রাখার কোনো ঘোষণাও দেওয়া হয়নি। ফলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সরকারের সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে আছে বাজার।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে সরকার আমদানীকৃত মুঠোফোনের ওপর কাস্টমস ডিউটি ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করেছিল। এর ফলে ভ্যাট, অগ্রিম আয়কর ও অন্যান্য কর মিলিয়ে আমদানি করা মুঠোফোনের ওপর মোট করভার নেমে আসে ৪৩ দশমিক ৪৩ শতাংশে। যার মেয়াদ ছিল ৩০ জুন পর্যন্ত।

এদিকে আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিদেশ থেকে আনা সম্পূর্ণ তৈরি মুঠোফোনের জন্য এই শুল্ক-সুবিধা বহাল রাখার কোনো ঘোষণাও দেওয়া হয়নি। ফলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সরকারের সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে আছে বাজার।

বিষয়টি নিয়ে বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারীর কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

‘আনঅফিশিয়াল’ ফোন বিক্রি কমেনি

গত এক দশকে দেশে মোবাইল ফোন সংযোজন ও উৎপাদনশিল্প গড়ে উঠেছে। স্থানীয় কারখানাগুলো মূলত নিম্ন ও মধ্যম দামের ফোন সংযোজন করে থাকে। তবে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অ্যাপল, গুগল, হুয়াওয়ে, মটোরোলা, স্যামসাং ও শাওমির অনেক প্রিমিয়াম মডেল স্থানীয়ভাবে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করা সম্ভব নয়। জটিল সরবরাহব্যবস্থা, বিশেষায়িত যন্ত্রাংশ এবং সীমিত বাজার চাহিদা এর অন্যতম কারণ।

দেশে ‘অফিশিয়াল’ ও ‘আনঅফিশিয়াল’—এই দুই ধরনের মুঠোফোন বিক্রি হয়। তুলনামূলক কম দামের কারণে অনানুষ্ঠানিকভাবে দেশে আসা ফোনের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহও বেশি। তবে এতে বছর বছর রাজস্ব হারায় সরকার। এই প্রবণতা কমাতে চলতি বছরের শুরুতে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) চালুর ঘোষণা দেয় বিটিআরসি। এর উদ্দেশ্য ছিল অনানুষ্ঠানিক বা গ্রে মার্কেটের ফোন নিয়ন্ত্রণে আনা।

তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা ফাহিম মাশরুরের মতে, স্মার্টফোন এখন আর বিলাসপণ্য নয়; এটি শিক্ষা, আয়-উপার্জন এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবার প্রধান মাধ্যম। ফলে এর দাম বাড়ার চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদেরই বহন করতে হবে।

একই সময়ে বৈধভাবে আমদানি করা মুঠোফোনের দাম কমাতে সরকার শুল্কহ্রাসেরও সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারের যুক্তি ছিল, বৈধ ও অবৈধ ফোনের দামের ব্যবধান কমে এলে ক্রেতারা বৈধ পথে আমদানি করা ফোন কিনতে উৎসাহিত হবেন।

তবে বাজারে প্রত্যাশিত প্রভাব দেখা যায়নি। শুল্ক কমানোর আগেই বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মুঠোফোনের দাম ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল। ব্যবসায়ীরা তখন এর কারণ হিসেবে বৈশ্বিক বাজারে মেমোরি চিপের মূল্যবৃদ্ধির কথা উল্লেখ করেছিলেন। অন্যদিকে বন্ধ করা যায়নি আনঅফিশিয়াল মুঠোফোনের বাজারও। রাজধানীর বিভিন্ন শপিং মলে নিয়মিত আনঅফিশিয়াল ফোন বিক্রি হচ্ছে।

আরও পড়ুন

গ্রাহকের ঘাড়েই চাপ

সরকারের দেওয়া সাময়িক শুল্ক-সুবিধা প্রত্যাহার হলে আমদানি পর্যায়ে করের চাপ আবারও বাড়বে। বাজারে তার প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়বে খুচরা দামে। ফলে দিন শেষে বাড়তি ব্যয়ের সেই বোঝা টানতে হবে গ্রাহককেই। ইতিমধ্যে বেড়ে যাওয়া দামের সঙ্গে নতুন কর যুক্ত হয়ে একটি স্মার্টফোন কিনতে ক্রেতার খরচ আরও বাড়বে।

এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা ফাহিম মাশরুর। তাঁর মতে, স্মার্টফোন এখন আর বিলাসপণ্য নয়; এটি শিক্ষা, আয়-উপার্জন এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবার প্রধান মাধ্যম। ফলে এর দাম বাড়ার চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদেরই বহন করতে হবে।

ফাহিম মাশরুর প্রথম আলোকে বলেন, স্মার্টফোনের দাম বাড়ানো মানে ডিজিটাল সেবার প্রবেশাধিকার আরও ব্যয়বহুল করে তোলা। স্মার্টফোনকে ডিজিটাল অবকাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করে এর ওপর করের চাপ কমানো প্রয়োজন।

আরও পড়ুন