default-image

ছোট মেয়ে সুমাইয়া সরকার (২০) মারা গেছেন। বড় মেয়ে মুনা সরকার আর তাঁর স্বামী আশিকুজ্জামান খান আছেন আইসিইউতে। স্ত্রী সুফিয়া সরকার ও ছেলে জুনায়েদ সরকারও হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ভর্তি হয়েছেন ইব্রাহিম সরকার নিজেও।
পুরান ঢাকার আরমানিটোলার আগুন ইব্রাহিম সরকারের ছয় সদস্যের পরিবারের কাউকেই রেহাই দেয়নি। সবাই এখন শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের শয্যায় কাতরাচ্ছেন।

আজ বেলা একটার দিকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে গিয়ে কথা হয় ইব্রাহিমের ভাগনি আমেনা খাতুনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘মুনা ও তাঁর স্বামীর অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন ডাক্তার। বাকিরা দগ্ধ হননি। ধোঁয়ায় অবস্থা খারাপ হয়েছে।’ খানিকটা ক্ষোভের সঙ্গে আমেনা বলেন, চুড়িহাট্টার ঘটনার পরও কারও সংশোধন হয়নি। কঠিন পদক্ষেপ দরকার। পুরো পরিবার শেষ!
সুমাইয়ার লাশ ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালে আছে। সেখান থেকে সোনারগাঁয়ে গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হবে। তবে বিদায়বেলায় মেয়েকে দেখতে পারবেন না ইব্রাহিম সরকারের পরিবারের কেউ। সুমাইয়া ইডেন মহিলা কলেজে ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন।

ইব্রাহিমের অপর মেয়ে মুনা সরকার ও তাঁর স্বামী আশিকুজ্জামান খানের বিয়ে হয়েছে মাত্র দেড় মাস আগে, জানান আমেনা। এই নবদম্পতি এখন ইনস্টিটিউটের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন। মুনা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে আর আশিকুজ্জামান বুয়েটে পড়াশোনা করছেন।

আশিকুজ্জামানের বাবা আবুল কাশেম খান ভোরে খবর পেয়েই ছুটে এসেছেন ময়মনসিংহ থেকে। তিনি বলেন, ‘এক মাস আগে বিয়ে হয়েছে। খালার বাসায় থেকে লেখাপড়া করে। শ্বশুরের বাসায় এসেছিল পরশু রাতে। নিচে কেমিক্যালের (রাসায়নিক) গুদামে আগুন লেগেছে শুনেছি। শুনেই বাড়ি থেকে কান্নাকাটি করে আসলাম।’ এর বেশি কিছু বলতে চাননি তিনি।

বিজ্ঞাপন

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সহকারী সার্জন খন্দকার নাজমুল হক আজ দুপুরে জানান, আরমানিটোলায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মোট ২০ জন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৬ জন পোস্ট অপারেটিভ ইউনিটে আছেন। বাকি চারজন আইসিইউতে। আইসিইউর রোগীদের সারা শরীর পুড়ে গেছে। শ্বাসনালিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান এই চিকিৎসক।

default-image

শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক চিকিৎসক সামন্ত লাল সেন জানিয়েছেন, আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ৪ জনের শরীরের ২৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।

নাক-মুখ দিয়ে ধোঁয়া ঢুকে পড়ে

বার্ন ইনস্টিটিউটের বিছানায় কাতরাচ্ছে একটি শিশুসহ একই পরিবারের আরও ছয়জন। তাঁরা হলেন দেলোয়ার হোসেন, তাঁর স্ত্রী লায়লা, দুই ছেলে সাফায়েত হোসেন ও শাকিল হোসেন, সাফায়েতের স্ত্রী মিলি ও তাঁদের দুই বছরের মেয়ে ইয়াশফা। এঁদের মধ্যে সাফায়েতের অবস্থা গুরুতর। তিনি আইসিইউতে চিকিৎসাধীন।
দেলোয়ার হোসেনের ভাবি হোসনে আরা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভোরে সাহ্‌রি খেতে বসেছি। তখনই দেবর (দেলোয়ার) ফোন দিয়ে কাঁদছিল। কান্নার জন্য কথাই বলতে পারছিল না। “আমাদের বাঁচানোর ব্যবস্থা করেন” বলে কাঁদছিল।’ কথা বলতে বলতে থেমে যান হোসনে আরা বেগম। দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলেন, ‘দেলোয়ার বলছিল, “আগুনে আটকা পড়েছি। মরে গেলে মাফ করে দিয়েন। কোরআন খতম করাইয়েন’’।’
ফোন পেয়েই আরমানিটোলার আগুন লাগা সেই ভবনের নিচে ছুটে আসেন হোসনে আরা বেগম। তবে ভেতরে ঢুকতে পারেননি। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এই পরিবারের ছয়জনকে উদ্ধার করার পর তাঁদের প্রথমে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে তাঁদের বার্ন ইনস্টিটিউটে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

হাসপাতালে আরেকটি পরিবারের চারজনকে পাওয়া গেল। তাঁরা হলেন ইউনুস মোল্লা, তাঁর স্ত্রী মেহেরুন নেসা, মেয়ে ফাবিহা ও ছেলে আকাশ। ভবনটির তৃতীয় তলায় থাকত পরিবারটি। ইউনুস মোল্লার পুরান ঢাকায় চালের দোকান আছে।
ইউনুসের বোন আসিয়া বেগম বলেন, ‘ফাবিহা আমাকে জানিয়েছে, আগুন লাগার পর দরজা খুলে তারা দেখতে গিয়েছিল সেখানে কী হচ্ছে। তখন নাক-মুখ দিয়ে ধোঁয়া ঢুকে অসুস্থ হয়ে পড়ে সবাই।’

যেভাবে ঘটে অগ্নিকাণ্ড

শুক্রবার ভোররাত সোয়া তিনটার দিকে আরামানিটোলার ওই ভবনে আগুন লাগে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। ১৯টি ইউনিটের তিন ঘণ্টার চেষ্টায় আজ সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। ওই ভবনের পাশের একটি ভবনের এক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, ওই ভবনের নিচে রাসায়নিকের গুদাম রয়েছে। তাঁর দাবি, আশপাশের প্রায় সব ভবনেই এ ধরনের গুদাম রয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস জানায়, অগ্নিকাণ্ডের কারণ এখনো বোঝা যায়নি। ফায়ার সার্ভিস তদন্ত কমিটি গঠন করবে।

default-image

সূত্র জানায়, আগুন লাগার পরপর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় ভবনের নিচতলা। ধীরে ধীরে ধোঁয়া উঠতে থাকে ওপরের দিকে। এতে ওপরের তলার বাসিন্দারা আগুনের বিষয়টি টের পান। এ সময় মানুষজন বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলেও ধোঁয়া ও আগুনের কারণে বের হতে পারেননি। তাঁরা ওপরের দিকে উঠতে থাকেন। তবে ভবনের ছাদ তালাবদ্ধ থাকায় কেউ ওপরে উঠতে পারেননি। বিভিন্ন ফ্লোরে আটকে থাকা লোকজন চিৎকার করতে থাকেন। আটকে পড়া বাসিন্দারা বারান্দা ও জানালা থেকে মুঠোফোনের আলো জ্বেলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন।

ভবনের বাসিন্দাদের জানালার গ্রিল কেটে বের করে আনা হয়।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান বলেন, ধোঁয়ার কারণেই বেশির ভাগ মানুষ অসুস্থ হয়েছেন।

বিজ্ঞাপন
রাজধানী থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন