হ্রদে নৌকাভ্রমণের সব আয়োজন করেছে জাতীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ, যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন
রাজধানীর মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানার হ্রদে (লেক) দর্শনার্থীদের জন্য নৌকাভ্রমণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সে জন্য ইতিমধ্যে চিড়িয়াখানায় লেকে জেটি নির্মাণ করা হয়েছে। দুটি নৌকাও (বোট) কেনা হয়েছে। কেনাকাটা ও স্থাপনা নির্মাণের পর কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও নৌকাভ্রমণ শুরু হয়নি।
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, নৌকার ইঞ্জিন বেশি শব্দ করায় এই কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না। শব্দ ও পানিদূষণ করা ছাড়া কীভাবে নৌকাভ্রমণের আয়োজন করা যায়, তারা সে চেষ্টা করছে। ঠিক কবে নাগাদ নৌকাভ্রমণ শুরু করা সম্ভব, তা–ও বলতে পারছে না তারা।
অন্যদিকে জাতীয় চিড়িয়াখানার মতো জায়গায় নৌকাভ্রমণের আয়োজন কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রাণিবিদেরা।
জাতীয় চিড়িয়াখানা সূত্রে জানা গেছে, নৌকাভ্রমণ চালুর জন্য প্রায় ১৮ লাখ টাকায় একটি জেটি, সংযোগ সড়ক ও যাত্রীছাউনি নির্মাণ করা হয়েছে। দুটি বোট কেনা হয়েছে ১৭ লাখ টাকায়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জেটি, অ্যাপ্রোচ রোড ও যাত্রীছাউনি নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে গত জুনে। দুটি নৌকাও গত জুনের মধ্যে তারা পেয়েছে।
জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক মো. শাহিনুর আলম প্রথম আলোকে বলেন, নৌকাভ্রমণ চালুর জন্য যে দুটি নৌকা কেনা হয়েছে, সেগুলোর ইঞ্জিনের শব্দ অনেক বেশি, যা প্রাণীদের জন্য ভালো নয়। প্রধানত এ কারণে নৌকাভ্রমণ চালু করা যাচ্ছে না। ঠিক কবে চালু করা সম্ভব হবে, তা বলতে পারছেন না তিনি।
শব্দ করবে না, এমন ইঞ্জিন লাগানোর চেষ্টা করা হচ্ছে জানিয়ে মো. শাহিনুর আলম বলেন, শব্দহীন ইঞ্জিনের খোঁজ করছেন তাঁরা। পাশাপাশি তেল পানিকে দূষিত করবে না, সেটাও দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু জায়গায় এমন ইঞ্জিনের খোঁজ করে পাওয়া যায়নি। না পেলে কম শব্দ করে এমন ইঞ্জিন লাগিয়ে নৌকাভ্রমণ চালুর বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
৩২ একরের লেক, জেটি ও নৌকা
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ১৮৬ দশমিক ৬৩ একর আয়তনের চিড়িয়াখানাটি ১৯৭৪ সালে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এই চিড়িয়াখানায় দুটি হ্রদ খনন শুরু হয় ১৯৭৮ সালে। কাজ শেষ হয় ১৯৮০ সালে। জাতীয় চিড়িয়াখানার দক্ষিণ হ্রদের আয়তন ৩২ একর। আর উত্তর হ্রদের আয়তন ২৪ একর। উত্তর লেকে রয়েছে বৃহৎ আকারের দুটি পেলিকান পাখি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দুটি পেলিকান থাকায় চিড়িয়াখানার উত্তর লেকে নৌকাভ্রমণ চালু করা হবে না। ৩২ একরের দক্ষিণ লেকে দর্শনার্থীদের জন্য নৌকাভ্রমণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জাতীয় চিড়িয়াখানার মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ করে পিচঢালা পথে একটু সোজা যেতে হবে। পরে বাঁ দিকের রাস্তা ধরে একটু এগোতে হবে। এগোলে পাওয়া যাবে শিশুপার্ক। তার বিপরীত দিকে তাকালে দেখা যাবে গাছপালায় ঘেরা দক্ষিণ লেক।
২৬ সেপ্টেম্বর সরেজমিন দেখা যায়, শিশুপার্কসংলগ্ন সড়ক থেকে হ্রদের পাড়ে যে জেটি নির্মাণ করা হয়েছে, সেখানে যাওয়ার জন্য পাকা রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। জেটির পাশে নির্মাণ করা হয়েছে যাত্রীছাউনি। জেটির কাছেই বাঁশের খুঁটিতে বেঁধে রাখা হয়েছে নৌকা দুটি। জেটি, জেটি পর্যন্ত যাওয়ার সংযোগ সড়ক ও যাত্রীছাউনি নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। নৌকা দুটি সাদা রঙের। নৌকার ওপরে ছাউনি রয়েছে। জেটিতে দাঁড়িয়ে দর্শনার্থীরা লেক দেখছেন। জেটিকে কেন্দ্র করে লেকের এই অংশে দর্শনার্থীদের আনাগোনা বেড়েছে।
জানা গেছে, প্রতিটি নৌকায় ২০ জন যাত্রী একসঙ্গে নৌকাভ্রমণ করতে পারবেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন গত ১৪ মে পেয়েছে চিড়িয়াখানা। এখানে নৌকাভ্রমণ করতে হলে জনপ্রতি ১০০ টাকা লাগতে পারে।
বিশেষজ্ঞের প্রশ্ন
চিড়িয়াখানার হ্রদে জেটি নির্মাণ করে নৌকাভ্রমণের যে আয়োজন করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ফিরোজ জামান। উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘জাতীয় চিড়িয়াখানার এই উদ্যোগ ভালো হয়নি। তারা এ ধরনের স্থাপনা অজ্ঞতা থেকে করেছে। এটা অপসারণ করা উচিত।’
অধ্যাপক ফিরোজ জামান বলেন, কালিম, ডাহুক—এ–জাতীয় অনেক জলজ পশুপাখি আছে, সেগুলোকে ইচ্ছা করলে চিড়িয়াখানার হ্রদের জলজ পরিবেশে সংরক্ষণ করা যেত। সেটা না করে তারা জেটি করেছে, নৌকা এনেছে। নৌকাভ্রমণের আয়োজন হলে সেখানে শব্দ হবে, মানুষের ভিড় বাড়বে। ওখানে একটা অন্য রকম পরিবেশ তৈরি হবে। আশপাশে খাঁচায় থাকা প্রাণীগুলো ভীতসন্ত্রস্ত হবে, বিপন্ন হবে।
জাতীয় চিড়িয়াখানার হ্রদে একসময় অতিথি পাখি আসত উল্লেখ করে অধ্যাপক ফিরোজ জামান বলেন, পরিযায়ী পাখি আসার সেই পরিবেশ নষ্ট করা হয়েছে। তা ছাড়া পরিযায়ী পাখি এমনি নিরাপদ জায়গা পায় না। ওখানকার জায়গাটা সুরক্ষিত। একটু নিরাপদ জায়গা পেলে আসত। নৌকাভ্রমণ শুরু হলে ভবিষ্যতে পরিযায়ী পাখি আসার সম্ভাবনাও কম।