দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে চারটি চিতা বাঘ কেন এল না

দক্ষিণ আফ্রিকার চিতা বাঘ, জাতীয় চিড়িয়াখানার জন্য এমন চারটি চিতা বাঘ আনার কথা ছিলফাইল ছবি: রয়টার্স

রাজধানীর মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানায় এখনো নেই কোনো চিতা বাঘ। দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ এই প্রজাতির চারটি প্রাণী গত অর্থবছরে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আনার পরিকল্পনা ছিল। দরপত্র, কার্যাদেশ, আন্তর্জাতিক অনুমতিসহ বেশির ভাগ প্রক্রিয়াও শেষ হয়েছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ভেস্তে যায় এই উদ্যোগ।

কেন আসেনি চিতা বাঘ? এই প্রশ্নে একে অন্যকে দুষছে বন বিভাগ ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান।

কার্যাদেশের মেয়াদ ছিল ২০ জুন পর্যন্ত। এর মধ্যে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান প্রাণীগুলো সরবরাহ করতে পারেনি
মো. মজিবুর রহমান, প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার, জাতীয় চিড়িয়াখানা

আন্তর্জাতিক অনুমতি যাচাইয়ের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকা কর্তৃপক্ষ ই–মেইল দিয়েছিল। বন বিভাগের দাবি, তারা দক্ষিণ আফ্রিকা কর্তৃপক্ষের ই–মেইলের জবাব দিতে দেরি করেনি। অন্যদিকে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের অভিযোগ, সেই জবাব পেতে দেরি হওয়ায় কার্যাদেশের সময়সীমা শেষ হয়ে যায়। এ কারণে প্রাণীগুলো আনা সম্ভব হয়নি।

শেষ ধাপে থেমে যায় আমদানির প্রক্রিয়া

চিড়িয়াখানা সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় চিড়িয়াখানার পাঁচ বছর মেয়াদি প্রাণী সংগ্রহ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে চারটি চিতা বাঘ, দুটি ওয়াইল্ড বিস্ট এবং দুটি কমন ইল্যান্ড কেনার জন্য পৃথক তিনটি দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। তিনটিরই কার্যাদেশ পায় ফ্যালকন ট্রেডার্স।

এই দরপত্রের আওতায় ওয়াইল্ড বিস্ট ও কমন ইল্যান্ড যথাসময়ে সরবরাহ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে চিতা বাঘ চারটি আনতে পারেনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫–২৬ অর্থবছর শেষ হয়েছে গত ৩০ জুন। অর্থবছর শেষ পর্যায়ে থাকায় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের বিল জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ছিল ২৩ জুন। সে কারণে কার্যাদেশে ২০ জুনের মধ্যে চিতা বাঘ সরবরাহের শর্ত রাখা হয়েছিল।

চিতা বাঘ আমদানির জন্য বিপন্ন বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিষয়ক কনভেনশনের (সাইটিএস) অনুমতি প্রয়োজন হয়। বিপন্ন বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে এই অনুমতি বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশের বন বিভাগ এই অনুমতি দিয়ে থাকে।

জাতীয় চিড়িয়াখানার প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার মো. মজিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, কার্যাদেশের মেয়াদ ছিল ২০ জুন পর্যন্ত। এর মধ্যে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান প্রাণীগুলো সরবরাহ করতে পারেনি।

চারটি চিতা বাঘ আনার বিষয়ে গত ২৮ মে প্রথম আলো একটি সংবাদ প্রকাশ করেছিল। বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেছিলেন জাতীয় চিড়িয়াখানার তৎকালীন পরিচালক মোহাম্মাদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার।

সাইটিসের অনুমতি নিয়ে জটিলতা

চিতা বাঘ আমদানির জন্য বিপন্ন বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিষয়ক কনভেনশনের (সাইটিএস) অনুমতি প্রয়োজন হয়। বিপন্ন বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে এই অনুমতি বাধ্যতামূলক। বাংলাদেশের বন বিভাগ এই অনুমতি দিয়ে থাকে।

বাংলাদেশের বন বিভাগ ফ্যালকন ট্রেডার্সকে এই অনুমতি দিয়েছিল। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকার সাইটিস কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশে পাঠানো পারমিটের সত্যতা যাচাই করতে বন বিভাগের কাছে ই–মেইলে জানতে চায়। এরপরই তৈরি হয় জটিলতা।

ফ্যালকন ট্রেডার্সের কর্ণধার মোহাম্মদ সোহেল আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব অনুমতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার সাইটিস কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের বন বিভাগের কাছে যাচাই–সংক্রান্ত ই–মেইল দিয়েছিল। বন বিভাগ বলেছে তারা চিঠি পায়নি। এভাবে বন বিভাগ ১৫ থেকে ২০ দিন সময় নষ্ট করেছে। একপর্যায়ে বন বিভাগ থেকেই সেই চিঠি বের হয়েছে। গত ২৩ জুন বন বিভাগ উত্তর দিয়েছে, তত দিনে কার্যাদেশের সময়সীমা পার হয়ে গেছে।

জাতীয় চিড়িয়াখানা সূত্র জানিয়েছে, ২০ জুনের মধ্যে চিতা বাঘ চারটি সরবরাহ না করায় এখন কার্যাদেশটি বাতিল হবে। এ বিষয়ে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে জাতীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। কমিটি খতিয়ে দেখবে, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, নাকি অন্য কোনো কারণে আমদানি ব্যর্থ হয়েছে।

সোহেল আহমেদ দাবি করছেন, তাঁর কোনো ব্যর্থতা নেই। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ব্যর্থতার কারণে চিতা বাঘ আমদানি করা সম্ভব হয়নি।

তবে বন বিভাগের বক্তব্য ভিন্ন। দপ্তরটি বলছে, তারা দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারের সাইটিস বিভাগ থেকে গত ২২ জুন ই–মেইল পায়। পরদিন ২৩ জুন তারা সেই ই–মেইলের জবাব পাঠায়। ই–মেইলের জবাব দিতে তারা কোনো দেরি করেনি।

বন বিভাগের প্রধান বনসংরক্ষক মো.আমীর হোসাইন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, গত ২২ জুন তাঁরা মেইলটি পেয়েছিলেন। পরদিন ২৩ জুন তাঁরা জবাব দেন। জবাব দিতে তাঁদের পক্ষ থেকে দেরি হয়নি।

এখন কী হবে?

জাতীয় চিড়িয়াখানা সূত্র জানিয়েছে, ২০ জুনের মধ্যে চিতা বাঘ চারটি সরবরাহ না করায় এখন কার্যাদেশটি বাতিল হবে। এ বিষয়ে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে জাতীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। কমিটি খতিয়ে দেখবে, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কোনো গাফিলতি ছিল, নাকি অন্য কোনো কারণে আমদানি ব্যর্থ হয়েছে।

সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ব্যর্থতার কারণে চিতা বাঘ আমদানি করা সম্ভব হয়নি
মোহাম্মদ সোহেল আহমেদ, কর্ণধার, ফ্যালকন ট্রেডার্স

চারটি চিতা বাঘ সরবরাহের চুক্তিমূল্য ছিল ১ কোটি ৯ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। তবে ফ্যালকন ট্রেডার্স প্রাণী সরবরাহ না করায় সরকার কোনো অর্থ পরিশোধ করেনি।

এ ছাড়া চুক্তির অংশ হিসেবে চিতা বাঘ চারটি আমদানির জন্য ফ্যালকন ট্রেডার্স ১০ লাখ টাকা জামানত জমা দিয়েছে। তদন্তে প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি প্রমাণিত হলে এই জামানত বাজেয়াপ্ত হতে পারে। না হলে তা ফেরত দেওয়া হবে।

চিতাবাঘ আমদানিতে এত কড়াকড়ি কেন

সাইটিস বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের একটি বৈশ্বিক চুক্তি। বন্য প্রাণীর অবৈধ পাচার রোধ ও বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ১৯৭৫ সাল থেকে এটি কাজ করছে। বাংলাদেশ এই চুক্তিতে যোগ দেয় ১৯৮১ সালে।

সাইটিসের তথ্য অনুযায়ী, চিতা বাঘ সাইটিসের ‘অ্যাপেনডিক্স–ওয়ান’ তালিকাভুক্ত প্রাণী। সাইটিসের নীতিমালা অনুযায়ী, অ্যাপেনডিক্স ওয়ানে এমন সব প্রজাতি অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যেগুলো বিলুপ্তির হুমকির মুখে আছে এবং যেগুলো বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রভাবিত হচ্ছে বা হতে পারে। এসব প্রজাতির নমুনার বাণিজ্য বিশেষভাবে কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় থাকবে, যাতে তাদের টিকে থাকা আরও বিপন্ন না হয় এবং কেবল ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতেই এ ধরনের বাণিজ্যের অনুমতি দেওয়া যাবে; অর্থাৎ চিতা বাঘ বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী হওয়ায় এর আমদানিতে আন্তর্জাতিকভাবেই কড়াকড়ি রয়েছে।

চিড়িয়াখানা সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় চিড়িয়াখানার পাঁচ বছর মেয়াদি প্রাণী সংগ্রহ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে চারটি চিতা বাঘ, দুটি ওয়াইল্ড বিস্ট এবং দুটি কমন ইল্যান্ড কেনার জন্য পৃথক তিনটি দরপত্র আহ্বান করা হয়। তিনটিরই কার্যাদেশ পায় ফ্যালকন ট্রেডার্স।

চিতা ও চিতা বাঘ এক প্রাণী নয়। চিতা পৃথিবীর দ্রুততম স্তন্যপায়ী প্রাণী হলেও চিতা বাঘ তুলনামূলক শক্তিশালী এবং শিকারকে গাছে তুলে নেওয়ার সক্ষমতা রাখে। মিরপুরে জাতীয় চিড়িয়াখানায় একটি চিতা ছিল। প্রায় দুই বছর আগে সেই চিতা মারা যায় বলে জানিয়েছে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ।

চিতা বাঘ না এলেও এসেছে দুই নতুন প্রাণী

একই সময়ে পৃথক দরপত্রের আওতায় দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দুটি ওয়াইল্ড বিস্ট ও দুটি কমন ইল্যান্ড সফলভাবে আনা হয়েছে। এই দুটি প্রাণী চিতা বাঘের মতো সাইটিসের অ্যাপেনডিক্স–ওয়ান–এর আওতায় পড়ে না। চিতা বাঘের মতো এ দুটি প্রাণী আমদানিতে এত কড়াকড়িও নেই।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় গত ২৩ জুন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দুটি কমন ইল্যান্ড এবং দুটি ওয়াইল্ড বিস্ট আনা হয়েছে। কমন ইল্যান্ডের একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রী। আর ওয়াইল্ড বিস্ট দুটি পুরুষ।

চিড়িয়াখানা সূত্রে জানা গেছে, ওয়াইল্ড বিস্ট দুটি ১১ লাখ ৯১ হাজার টাকায় এবং কমন ইল্যান্ড দুটি ৩৩ লাখ ৯৪ হাজার টাকায় কেনা হয়েছে। আর এগুলো দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে সরবরাহ করেছে ফ্যালকন ট্রেডার্স।

আমদানির আগে জাতীয় চিড়িয়াখানায় দুটি স্ত্রী ওয়াইল্ড বিস্ট ছিল। স্ত্রী ওয়াইল্ড বিস্ট দুটি এখন দুটি পুরুষ সঙ্গী পেল।

এ ছাড়া আগে একটি স্ত্রী কমন ইল্যান্ড থাকলেও এখন একটি পুরুষ যোগ হওয়ায় চিড়িয়াখানায় এ প্রজাতির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে তিন।

আরও পড়ুন