এতে গবেষণায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত সামঞ্জস্যকে ‘গ্রহণযোগ্য’ (লেভেল-০) বলা হয়েছে৷ তবে এ ক্ষেত্রে একক উৎস থেকে সর্বোচ্চ ২ শতাংশের বেশি তথ্য ব্যবহার করা যাবে না। নীতিমালায় অন্য মাত্রাগুলো হলো নিম্ন (লেভেল-১), মধ্য (লেভেল-২), উচ্চ (লেভেল-৩) ও পুনরাবৃত্তি (লেভেল-৪)। গবেষণায় ২০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত সামঞ্জস্য নিম্ন, ৪০-৬০ শতাংশ মধ্য এবং ৬০ শতাংশের বেশি সামঞ্জস্য উচ্চমাত্রার সামঞ্জস্য হিসেবে গণ্য হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উদ্ধৃতি বা সূত্র ছাড়া কোনো গবেষণা বা লেখার সঙ্গে অন্য কারও তথ্য-উপাত্ত, ধারণা, লেখা বা কাজের সামঞ্জস্য চৌর্যবৃত্তি হিসেবে গণ্য হবে। নতুন নীতিমালায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত সামঞ্জস্য গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো শাস্তির মুখে পড়তে হবে না। তবে একই উৎস বা সূত্র থেকে ২ শতাংশের বেশি তথ্য ব্যবহার করা হলে তা নিম্নমাত্রার সামঞ্জস্যের (লেভেল-১) আওতায় পড়বে। এ হিসাবে ২০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত সামঞ্জস্য হবে নিম্নমাত্রার অপরাধ। ৪০-৬০ শতাংশ হবে মধ্যমাত্রা (লেভেল-২) আর ৬০ শতাংশের বেশি সামঞ্জস্য বিবেচিত হবে উচ্চমাত্রার (লেভেল-৩) অপরাধ হিসেবে। উচ্চমাত্রার অপরাধের পুনরাবৃত্তি হবে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ।

কোন অপরাধে কী শাস্তি

নীতিমালা অনুযায়ী, লেভেল-১-এর অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ডিগ্রি বা ক্রেডিট ৬ মাসের জন্য স্থগিত করে লেখক বা গবেষককে ১০ হাজার টাকা জরিমানা দেওয়া সাপেক্ষে পাণ্ডুলিপি সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হতে পারে। ওই সময়েও সংশোধনে ব্যর্থ হলে ১৫ হাজার টাকা জরিমানা দেওয়া সাপেক্ষে তাঁদের আরও ৬ মাস সময় দেওয়া হতে পারে। দ্বিতীয় পর্যায়েও সংশোধনে ব্যর্থ হলে লেখক বা গবেষকের ওই ডিগ্রি বা কোর্স বাতিল বা প্রত্যাহার করা হবে।

এই অপরাধে দায়ী ব্যক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক, কর্মকর্তা বা গবেষক হলে এবং তিনি নকল ডিগ্রির মাধ্যমে নিয়োগ-পদোন্নতি বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা পেয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট সময়ে পাওয়া সব টাকা অবিলম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাগারে ফেরত নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্ট ডিগ্রি ৬ মাসের জন্য স্থগিত করে ২০ হাজার টাকা জরিমানা সাপেক্ষে ৬ মাসের মধ্যে পাণ্ডুলিপি সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হবে। এই সময়ের মধ্যে ডিগ্রি চৌর্যবৃত্তিমুক্ত প্রমাণ করতে পারলে তা নবায়ন হবে। তবে ওই ব্যক্তি অন্য কোনো সুবিধা পাবেন না। কিন্তু ওই ব্যক্তি নির্দিষ্ট সময়ে পাণ্ডুলিপি সংশোধনে ব্যর্থ হলে পদাবনতি ও দুই বছরের জন্য পদোন্নতি বন্ধের শাস্তি পাবেন।

লেভেল-২-এর অপরাধ প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তি ২০ হাজার টাকা জরিমানা সাপেক্ষে পাণ্ডুলিপি সংশোধনে ১ বছর সময় পাবেন। এই সময়ে সংশ্লিষ্ট ডিগ্রি বা ক্রেডিট স্থগিত থাকবে। ওই সময়ে পাণ্ডুলিপি সংশোধনে ব্যর্থ হলে আরও ২০ হাজার টাকা জরিমানা সাপেক্ষে আরও ৬ মাস সময় দেওয়া হবে। পুরো সময় পর ওই ডিগ্রি বা কোর্সটি বাতিল করা হবে। অপরাধী ব্যক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা বা গবেষক হলে এবং তিনি নকল ডিগ্রির মাধ্যমে নিয়োগ-পদোন্নতি বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা পেয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট সময়ে পাওয়া সব টাকা অবিলম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাগারে ফেরত নেওয়া হবে। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট ডিগ্রি বাতিলের পাশাপাশি এক ধাপ পদাবনতি ও চার বছরের জন্য পদোন্নতি বন্ধের শাস্তি হবে তাঁর।

লেভেল-৩-এর অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ডিগ্রি বা কোর্স ২ বছরের জন্য স্থগিত করে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা সাপেক্ষে পাণ্ডুলিপি সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হবে। নির্ধারিত সময়ে সংশোধনে ব্যর্থ হলে ওই ডিগ্রি বাতিল ও কোর্সটি অনুত্তীর্ণ (এফ গ্রেড) বলে গণ্য হবে। অপরাধী ব্যক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা বা গবেষক হলে এবং তিনি নকল ডিগ্রির মাধ্যমে নিয়োগ-পদোন্নতি বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা পেয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট সময়ে পাওয়া সব টাকা অবিলম্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাগারে ফেরত নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিগ্রি বাতিলের পাশাপাশি এক ধাপ পদাবনতি ও ছয় বছরের জন্য পদোন্নতি বন্ধের শাস্তি হবে তাঁর। কোনো ব্যক্তি লেভেল-৩-এর অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটালে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চাকরিচ্যুত করা হবে।

চৌর্যবৃত্তিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ডিগ্রি বা কোর্সের তত্ত্বাবধায়ক, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব জার্নালের ক্ষেত্রে সম্পাদনা পরিষদের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শাস্তির বিধান আছে নতুন এই নীতিমালায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, অনুষদের ডিন, বিভাগের চেয়ারম্যান বা ইনস্টিটিউটের পরিচালক বরাবর যেকোনো ব্যক্তি লিখিতভাবে গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির বিষয়ে অভিযোগ করতে পারবেন। উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেটের সভায় ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি ও তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমে অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন। চৌর্যবৃত্তি রোধে গবেষণায় উদ্ধৃতির ব্যবহার, চৌর্যবৃত্তি শনাক্তের সফটওয়্যার ও টুলসের ব্যবহার প্রভৃতি বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন ধরনের কর্মশালা বা উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে নীতিমালায়।

গবেষণায় চৌর্যবৃত্তির বিষয়ে এত বিস্তারিত নীতিমালা দেশে এই প্রথম করা হলো বলে জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) এ এস এম মাকসুদ কামাল। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই নীতিমালা কোনো শাস্তি বিধান করার জন্য নয়, বরং চৌর্যবৃত্তি প্রতিরোধের জন্য। গবেষকদের নৈতিক মানের বিষয়ে শিক্ষকসহ সবার সচেতনতা বাড়িয়ে গবেষণার মৌলিকত্বকে প্রাতিষ্ঠানিকতা দেওয়ার জন্যই এই নীতিমালা। যেহেতু গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি নিয়ে সারা পৃথিবীতে সচেতনতা রয়েছে।

আমাদের এখানে আমরা শুরু করেছি। এই শুরু করাটাকে যাতে আরও প্রাতিষ্ঠানিকতা দেওয়া যায়, সে জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে নীতিমালাটি করা হয়েছে। এটি ইতিমধ্যে শিক্ষকদের কাছে পাঠানো হয়েছে। আগামীকাল এটি একাডেমিক কাউন্সিলের সভায় উত্থাপিত হবে। শিক্ষকদের মতামতের ওপর ভিত্তি করে প্রয়োজনে নীতিমালায় সংশোধন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করা হবে। পরে তা সিন্ডিকেটে অনুমোদিত হবে।’