‘কত বছর ধইরা এনে আইতাছি, এখন দেখলে কষ্ট লাগে’

ফারজানা আক্তারের কোলে টিকা দিতে নিয়ে আসা ১৩ দিন বয়সী মেয়ে। পাশে নাতিকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ফারজানার মা ফেরদৌসী। রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার, মিরপুর-১, ৩০ সেপ্টেম্বরছবি: প্রথম আলো

মায়ের কোলে ১৩ দিন বয়সী আফরিন। পাশে দাঁড়িয়ে নানি ফেরদৌসী বেগম। নাতনির মুখের দিকে তাকিয়ে কখনো মুচকি হাসছেন, আবার মেয়েকে বলছেন, ‘বাবুকে ভালো করে ধরো।’ এই দৃশ্যের সঙ্গে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ফেরদৌসীর সম্পর্ক যেন মিশে আছে চার প্রজন্মের গল্পে।

ফেরদৌসীর মা এখানে গর্ভকালীন সেবা নিয়েছেন। এরপর নিজের সন্তান জন্মের সময় তিনিও এসেছেন। মেয়ে ফারজানার গর্ভকালীন ও প্রসূতি-পরবর্তী সেবার জন্যও এসেছেন এই কেন্দ্রে। আর গতকাল বুধবার দুপুরে সেই মেয়ের ১৩ দিনের সন্তানকে কোলে নিয়ে এসেছেন টিকা দিতে।

এবার রাড্ডায় এসে চেনা জায়গাটিই যেন অচেনা লাগছিল ফেরদৌসীর। যে ভবনে একসময় তিনি নিজে সেবা নিয়েছেন, মেয়েকে নিয়ে এসেছেন, সেই ভবন এখন ভাঙা। চারপাশে ধ্বংসস্তূপ। তবু সেখানেই নাতনিকে দেওয়া হলো টিকা।

ভাঙা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে ফেরদৌসী বলছিলেন, ‘অনেক বছর ধইরা এই জায়গার সঙ্গে সম্পর্ক। সব ভেঙেচুরে ফেলা হয়েছে। দেখলে খুব কষ্ট লাগে।’

চার প্রজন্মের সম্পর্ক

মিরপুর-১ নম্বরের উত্তর বিশিল এলাকায় থাকেন ফেরদৌসী। তাঁর মেয়ে ফারজানা আক্তারের মেয়ে আফরিনের বয়স এখন ১৩ দিন। গতকাল দুপুরে আফরিনকে জন্মের পরের পোলিও টিকা দিতে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে এসেছিলেন তাঁরা।

রাড্ডার সঙ্গে ফেরদৌসীর পরিবারের সম্পর্ক অবশ্য এই শিশুকে দিয়ে শুরু নয়। অনেক আগেই শুরু হয়েছিল তাঁর মা রাবেয়া বেগমের সময় থেকে।

ফেরদৌসীর মা রাবেয়া বেগম এখানে গর্ভকালীন সেবা নিয়েছেন। পরে ফেরদৌসী নিজেও সন্তান জন্মের আগে ও পরে এই কেন্দ্রে চিকিৎসা ও পরামর্শ নিয়েছেন। এরপর নিজের মেয়ে ফারজানার গর্ভকালীন ও প্রসূতি-পরবর্তী সেবার জন্যও তাঁকে নিয়ে এসেছেন এখানে। এবার সেই ফারজানার সন্তানকে নিয়ে এসেছেন টিকা দিতে।

কথা বলতে বলতে নিজের জীবনের সঙ্গে রাড্ডার স্মৃতিগুলো মিলিয়ে নিচ্ছিলেন ফেরদৌসী। বললেন, ‘আমার মা এখানে সেবা নিছে। আমিও নিছি। আমার মেয়েকেও এখানে নিয়ে আসছি। আমার মেয়ের বাচ্চাকেও আজকে টিকা দিতে নিয়ে আসলাম। এত বছর ধরে এই জায়গার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক।’

‘কত্ত সুন্দর ছিল সবকিছু’

১৯৭৪ সালে মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের মাতৃ ও শিশুসেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের কার্যক্রম শুরু হয়। পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি শিশুদের টিকাদান, শিশু স্বাস্থ্যসেবা, প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন সেবা দিয়ে আসছে।

ফেরদৌসীর কাছে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র তাই শুধু চিকিৎসা নেওয়ার জায়গা নয়। তাঁর নিজের জীবনের অনেক স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে জায়গাটি।

কিন্তু গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে সেখানে হামলার পর সেই চেনা জায়গাটিই বদলে গেছে। অভিযোগ উঠেছে, দুই শতাধিক ব্যক্তি ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা চালিয়ে দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করেন। পরে চিকিৎসা সরঞ্জাম, ওষুধ, টিকা, অর্থসহ বিভিন্ন সামগ্রী লুট করা হয়। ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি আধা পাকা ভবনও গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে।

হামলার পর গতকালই প্রথম সেখানে গিয়েছিলেন ফেরদৌসী। ভাঙা ভবন আর ধ্বংসস্তূপ দেখে তাঁর পুরোনো দিনের কথা মনে পড়ছিল।

ফেরদৌসী বলেন, ‘হামলার পর আজকেই প্রথম আসলাম। অনেক খারাপ লাগছে। কত্ত সুন্দর ছিল সবকিছু। আমার বাড়ির সবাই কত বছর ধইরা এনে আইতাছি। এই জায়গার কত কিছু মনে পড়ে। এখন সব ভেঙেচুরে ফেলা হয়েছে। দেখলে খুব কষ্ট লাগে।’

ভাঙা ভবনের মধ্যেও টিকা

চারপাশের অবস্থা বদলে গেলেও স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির সেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ভাঙা জায়গার মধ্যেই গতকাল আফরিনকে টিকা দেওয়া হয়েছে।

এতে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন ফেরদৌসী। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালডার এইরম দশা, তা–ও যে তারা আমগো সেবা দিতাছে, এইটা দেইখা ভালা লাগতাছে। এইটা বন্ধ হইলে আমাদের মতো গরিব মাইনসে কই যাইব কন?’

ফেরদৌসীর সংসার খুব সচ্ছল নয়। মিরপুরেই তাঁর বেড়ে ওঠা। পরে বিয়ে হয়েছে টাঙ্গাইলের নাগরপুরে। তাঁর স্বামী ফরিদ আহমেদ একসময় মিরপুরে আড়তের ব্যবসা করতেন। এখন তিনি কিছুটা অসুস্থ।

তাঁদের তিন সন্তান ফারজানা আক্তার, আল ফুয়াদ ও ফারহানা আক্তার। তিন সন্তানের মধ্যে শুধু ফারজানার বিয়ে হয়েছে। ফারজানার স্বামী সুমন মিয়া ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালান। পরিবারের সবাই একই বাসায় থাকেন।

আরও পড়ুন
ফারজানার সন্তানকে টিকা দিচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মী। রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার, মিরপুর-১, ৩০ সেপ্টেম্বর
ছবি: প্রথম আলো

মেয়ের গর্ভকাল থেকে নাতনির টিকা

ফারজানা বলেন, গর্ভে সন্তান আসার পর থেকেই তিনি রাড্ডায় আসছেন। চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, পরীক্ষা করানোসহ নানা সেবা নিয়েছেন এখান থেকে।

ফারজানা বলেন, ‘বাবু পেটে আসার পর থেকেই আমি এখানে আসছি। ডাক্তার দেখানো, পরামর্শ নেওয়া—সবকিছু এই হাসপাতাল থেকেই করেছি। আমার নিজেরও অনেক সেবা এখানে হয়েছে। আজ মেয়েকেও টিকা দিতে নিয়ে আসছি।’

হামলার খবর শুনে ফারজানাও কষ্ট পেয়েছেন। কারণ, তাঁর কাছে রাড্ডা কেবল একটি হাসপাতাল নয়; নিজের জীবনের অনেক স্মৃতির জায়গা।

ফারজানা আরও বলেন, ‘হাসপাতালে হামলা হয়েছে শুনে অনেক খারাপ লাগছে। আমরা তো এই জায়গাটাকে নিজের জায়গার মতোই মনে করি। এখানে এসে কতবার ডাক্তার দেখিয়েছি, কতবার টিকা দিয়েছি, এগুলো আমাদের জীবনেরই অংশ হয়ে গেছে।’

ফারজানার নিজের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি রাড্ডার ওপর নির্ভরশীল আরও অনেক পরিবারের কথাও উঠে আসে তাঁর কথায়।

ফারজানা বলেন, ‘আমাদের মতো গরিব মানুষের জন্য এই ধরনের জায়গা খুব দরকার। এখানে কম খরচে বা সহজে যে সেবা পাওয়া যায়, সেটা সবার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতালটা বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের মতো অনেক মানুষ বিপদে পড়ে যাবে।’

আরও পড়ুন

এমন আরও অনেক পরিবার আছে

রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার বলেন, ফেরদৌসীর পরিবারের মতো আরও অনেক পরিবার রয়েছে, যারা কয়েক প্রজন্ম ধরে এই কেন্দ্রে সেবা নিয়ে আসছে।

নাসরিন আখতার বলেন, ‘এমন অনেক পরিবার আছে, যারা কয়েক প্রজন্ম ধরে আমাদের এখানে এসে সেবা নিয়েছে। এই ঘটনার পরও অনেকেই এসেছেন, আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁরা এসে ভাঙা জায়গাটা দেখে মন খারাপ করেছেন।’

নাসরিন আখতার আরও বলেন, এই এলাকার অনেক পরিচিত মানুষ, রাজনৈতিক নেতা, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী ছোটবেলায় এখানে এসে টিকা নিয়েছেন। তাঁদের মায়েরা এখানে গর্ভকালীন সেবা নিয়েছেন, চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েছেন।

নাসরিনের কথায় যেন সেই ফেরদৌসী-ফারজানার কথাই উঠে এল, রাড্ডার সঙ্গে এলাকার মানুষের সম্পর্ক অনেক পুরোনো।

নাতনিকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ভাঙা ভবনগুলোর দিকে আরেকবার তাকালেন ফেরদৌসী। তাঁর মা এখানে এসেছেন, তিনি এসেছেন, তাঁর মেয়ে এসেছেন। এবার এল তাঁর নাতনি। ভবনগুলো ভেঙে গেছে, কিন্তু চার প্রজন্মের সেই সম্পর্কটি যেন এখনো রয়ে গেছে রাড্ডার সঙ্গে।

আরও পড়ুন