স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম ড্যাপ পর্যালোচনাসংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিরও প্রধান। বৈঠকে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বাসযোগ্য শহর করব, মানুষের জন্য করব। কিন্তু কত মানুষের জন্য শহর বাসযোগ্য করব, সেটি ঠিক করতে হবে। তা না হলে বাসযোগ্য শহরের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে না। মানুষের জন্য আবাসন লাগবে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার জন্য, সেখান থেকে কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার জন্য রাস্তা লাগবে। স্বাস্থ্যসেবা ও উন্নত পরিবেশ বিবেচনায় নিতে হবে। মানুষ যাতে আলো-বাতাস পায়, সেটি বিবেচনায় নিতে হবে।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সাবেক সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, ধানমন্ডি একসময় সবচেয়ে পরিকল্পিত এলাকার একটি ছিল। এখানে একটি প্লটে একটি পরিবার থাকার কথা ছিল। কিন্তু থাকছে ৪০-৫০টি পরিবার। এতে হয়তো আবাসনের সুযোগ তৈরি হয়েছে, কিন্তু এর সঙ্গে পয়োনিষ্কাশন, পানির সুবিধা, বিদ্যুৎ-সংযোগ, পরিবেশ—সেগুলো পরিকল্পিতভাবে হয়নি, এটিই বাস্তবতা।

গত ২৩ আগস্ট নতুন ড্যাপ অনুমোদন দেয় সরকার। এটি ২০৩৫ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এটি পাস হওয়ার পর এর চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন পেশাজীবীরা। ড্যাপে যুক্ত করা এলাকাভিত্তিক ‘ফ্লোর এরিয়া রেশিও বা এফএআর’ নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। এফএআর মূলত ভবনের আয়তন বা উচ্চতা নির্ধারণের একটি সূচক।

পেশাজীবীদের একটি অংশ বলছে, ২০০৮ সালের ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় এফএআরের যে মান দেওয়া হয়েছিল তা অস্বাভাবিক এবং এটি সারা বিশ্বে সর্বোচ্চ ছিল। নতুন ড্যাপে এই মান সংশোধন করা হয়েছে। যাতে ঢাকা শহর বাসযোগ্য হয়। কিন্তু পেশাজীবীদের আরেকটি অংশ বলছে, এর মাধ্যমে ঢাকায় আবাসনসংকট তৈরি হবে। ২০৩৫ সাল নাগাদ ঢাকায় যত মানুষ থাকবে, তাদের সবার আবাস নিশ্চিত করা যাবে না।

এমন প্রেক্ষাপটে গোলটেবিল বৈঠকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি মোহাম্মদ ফজলে রেজা সুমন বলেন, ২০০৮ সালে ঢাকা মহানগর ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় এফএআরের মান অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছিল, যা সারা বিশ্বে সর্বোচ্চ। পেশাজীবীদের সঙ্গে বৈঠক করে এটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০১৩-১৪ সালে একটি খসড়াও তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে এফএআরের সর্বনিম্ন মান ১ দশমিক ৮ এবং সর্বোচ্চ মান ৪ দশমিক ৫ নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু ‘অদৃশ্য’ কারণে সেটি আর পাস হয়নি। নতুন ড্যাপে এফএআরের মান সংশোধনের পর এটি নিয়ে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ২০৩৫ সাল নাগাদ ঢাকায় যত মানুষ থাকবে, তাদের প্রত্যেকের আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। ড্যাপে নির্ধারিত সাধারণ জলস্রোত এলাকায় শর্ত সাপেক্ষে উন্নয়নের সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে জলাশয় ভরাট হয়ে যাবে বলেও তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যুক্ত নতুন ১৯টি ওয়ার্ড পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে সরকারের একটি উন্নয়ন প্রকল্প চলমান থাকা অবস্থাতেও সেখানে এফএআরের (ফ্লোর এরিয়া রেশিও, যার মাধ্যমে ভবনের আয়তন বা উচ্চতা নির্ণয় করা হয়) মান কম দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।

রাজউকের নগর-পরিকল্পনাবিদ ও ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল ইসলাম বলেন, কোনো ব্যক্তি বিশেষকে সুবিধা দেওয়ার জন্য ড্যাপ করা হয়নি। নতুন ওয়ার্ডগুলোতে বেশির ভাগ রাস্তা এখন ৮-১০ ফুট চওড়া। বিদ্যমান রাস্তা বিবেচনায় নিয়েই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নতুন যুক্ত ওয়ার্ডগুলোতে এফএআরের মান কম দেওয়া হয়েছে।

রাজউকের চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান মিঞা বলেন, ঢাকায় যত মানুষই আসুক আমরা তাদের পরিকল্পিত শহর দেব, এটি ভাবা অকল্পনীয়। মানুষের নিরাপদ আশ্রয় থাকলে, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাব্যবস্থা ভালো হলে ঢাকামুখী মানুষের চাপ কমবে বলে তিনি জানান।

রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী নূরুল হুদা বলেন, ঢাকা শহর জেলা ও জেলা থেকে প্রদেশের মূল শহর হয়েছে। এরপর স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হয়েছে। কিন্তু এর সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা শহরের মহাপরিকল্পনা করে যেভাবে উন্নয়ন করা উচিত ছিল, সেভাবে হয়নি। ২০১০ সালের ড্যাপ তাঁর সময়ে হয়েছিল। ওই সময় আবাসন ব্যবসায়ী ছাড়া অন্য কোনো পেশাজীবী ড্যাপের বিরোধিতা করেনি। ঢাকা শহর নিয়ে কাজ করে এমন ৫০টির বেশি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান আছে। এগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য একজন মন্ত্রীকে দায়িত্ব দেওয়া উচিত বলে তিনি মত দেন।

বৈঠকে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নির্বাহী প্রধান আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক বক্তব্য দেন। বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন বিএফইউজে-বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব ও নাগরিক টিভির হেড অব নিউজ দীপ আজাদ।